eibela24.com
সোমবার, ২৮, সেপ্টেম্বর, ২০২০
 

 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
আপডেট: ১০:৪৯ pm ৩০-০৬-২০২০
 
 


ভারত থেকে আসার পরপরই ডাক পরলো আমেরিকা থেকে। এবার এনসিআর ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে লাস ভেগাস স্টেটে। আমি কখনোই একা বিমানে লং জার্নি করতে পারি না। কেমন যেন নিজেকে একা একা মনে হয়। তাই যে বার ফ্লোরিডায় গেলাম তখন আমার সফর সঙ্গী হয়েছিলেন- আমাদের সাতরের নাসির ভাই। এরপরের জার্নিতে আমি লন্ডন থেকে অলিকে নিয়ে গিয়েছিলাম ওরল্যান্ডতে। সে জার্নিতেও আমার বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল! এবারের ভ্রমণের গল্প একটু আলাদা, তাই তুলে ধরছি৷

আমি আর অলি। আমরা দুজন যে জার্নিতে নিউইয়র্ক গেলাম সে জার্নিটা খুব ভালো লেগেছিল। জার্নি আর ভ্রমণ একই শব্দ। এরপরও বাংলায় ভ্রমণ বললে যে বিষয়টা মনে নাড়া দেয়, ইংরেজিতে জার্নি বললে ঠিক আলাদা বিষয়কে নাড়িয়ে দেয়। আমার লেখায় ভ্রমণ আর জার্নি মিলেমিলে একাকার হয়ে যায় কখনো কখনো। ওহ্, জার্নির কথা বলছিলাম। সেবারের জার্নিটা ভালো লেগেছিলো এই জন্যই যে, বাঙালিরা যেখানে থাকে তাদের একটা ইউনিটি আছে। নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটস সবার সাথে সবার একটি দারুণ মিল। একটা হৃদয়ের টান। দেশে থাকলে এই টান হয়তো বোঝার বাইরেই থেকে যায়, বা থেকে যেত। নিউইয়র্কে আমার প্রথম খাতিরের সূত্রপাত সানাউল কি দিয়ে। সানাউল আমেরিকাতে DV-১ লটারির মাধ্যমে গিয়েছিলো। ও ওখানে হলুদ ট্যাক্সিক্যাব চালায়। সময়ের কোন ঠিক ঠিকানা নাই, কাঁচা পয়সা ইনকাম করে। ভীষন মিশুক টাইপের একটা ছেলে। ওর মাধ্যমে নিউইয়র্কে পরিচয় হয়, শেখর, সুমন, রেজা, সোহেল, আক্কাসের সাথে। ওরা সবাই নিউইয়র্কে পার টাইম ট্যাক্সি চালায়। বলে রাখি, নিউইয়র্কের ট্যাক্সি ক্যাব চালানো আমাদের দেশের ট্যাক্সি ক্যাব চালানো অনেকটা আলাদা। এরা সবাই থাকেও জ্যাকসন হাইটস-এর পাশেই সিংহ মার্কা বিল্ডিং এ। সিংহ মার্কা বলে কথা।

ওদের মাধ্যমে পরিচয় হয় আরো ত্রিশ চল্লিশ জনে বাঙালী অবাঙালী মানুষের সাথে। এদের সবার ঠিকানা একই, নিউইয়র্ক। আন্তরিকতায়ও আছে অদ্ভুত মিল! সবাই একই টাইপের। টাইপ মানে ধরণ। পোষাক, সংস্কৃতি, জীবন যাপণ.. এগুলোর কথা বলছি। মাত্র দু-চার দিনেই এই অপরিচিত মানুষটা সেদিন ওদের প্রিয় দাদা হয়ে উঠলাম। একদিন তো এক মজার কান্ড, এনসিআর এর ভাইস প্রেসিডেন্ট পিটার লিভস্ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে ট্যাক্সিতে উঠেছে যাবে এয়ারপোর্ট। কথা প্রাসঙ্গিকতায় পিটার লিভস ট্যাক্সি ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করছে- তোমার বাড়ী কোথায়? ট্যাক্সি ড্রাইভার উত্তর দিলো- আমার বাড়ী বাংলাদেশ। Peter Leaves বললো, I know one of the company in Bangladesh name Technomedia Limited. বলার সাথে সাথে সে বলে উঠলো- Do you know, Owner name is Joshoda Jibon DebNath? শেষে এমন কথা শুরু হয়েছে আমার সম্বন্ধে, এয়ারপোর্ট নামার পর ক্যাবে $১২৫ ডলার ভাড়া উঠেছে, সে পিটার লিভস এর কাছ থেকে এক ডলার ও নেয়নি। ড্রাইভার ওকে বলেছে -তুমি আমাদের জীবনদার অথিতি, ভাড়া লাগবে না। পিটার লিভস এই ঘটনাটি আমাকে একাধিক বার বলেছে এবং পাঠিয়েছে Note of Thanks.

হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, অনেকদিন ধরেই কথা হচ্ছিল সুজনের সাথে। এবার আমেরিকা গেলে এক সাথে যাবো, পরিকল্পনা টা এমনই ছিলো। আমি ঢাকা থেকে লন্ডন যাবো। দুদিন লন্ডন থাকবো, তারপর সুজন আর আমি লন্ডন থেকে এক সাথে আমেরিকা যাবো।

সুজন লন্ডনে থাকে, ব্যারিষ্টারি পাশ করে, বিদেশী একটি চেইন সপের এড়িয়া ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে লন্ডনেই। আমাদের অলিরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে। সুজন আগে থেকেই চাচ্ছিল যে আমরা একসাথেই আমেরিকা যাবো। কথা মতো আমি লন্ডনে গেলাম, ও আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আমি লন্ডনে একদিন ওর কাছে থেকে যাই। এরপর লন্ডন থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্য রওনা হলাম। আমাদের ফ্লাইট ছিলো আমেরিকান এয়ারলাইনস। হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে জেএফকে আট ঘন্টার ফ্লাইট। এক সময় পৌঁছে গেলাম JFK এয়ারপোর্ট। যন্ত্রণায় পরলাম সুজনকে নিয়ে! ইমিগ্রেশন দুই ঘন্টা ওকে নিয়ে বসিয়ে রাখলো। সিকিউরিটি চেক করলো আপাদমস্তক।
পরে এক পর্যায় ওকে ছাড়লো। এয়ারপোর্ট পুলিশ সুজনের ব্রিটিশ পাসপোর্ট, ওর নামের ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছিল না, তাই এ সমস্যা। পরে ছাড়া পেয়ে বাইরে এলাম। আমেরিকার মুক্ত আকাশে এসে দাঁড়ালাম। এখানে সানোয়ার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, মানে আমাদের রিসিভ করার জন্য। আমাদের হোটেল বুকিং দেয়া আছে ম্যানহাটনে।

ম্যানহাটনে নিউইয়র্ক ম্যারিয়ট মারকুইস হোটেল। এখানেই থাকবো দুই দিন। ম্যানহাটন সিটির প্রশস্ত পরিচ্ছন্ন রাস্তার পাশেই এ হোটেল। এতোদিনের পরিচিত বন্ধুদের আসতে বললাম এখানে। জ্যাকসন হাইটস এর ট্যাক্সি ড্রাইভার বন্ধু বান্ধব যারা আমাকে ভালোবাসে অন্তর দিয়ে ওদের জন্য আলাদা নিমন্ত্রণ দেয়া হল মনের ভিতর থেকে।

দুদিন ভরপুর আড্ডা চলল। হৃদয় নিংড়ানো, বসন্ত জড়ানো সে আড্ডা। এখান থেকে আসার সময় সানোয়ারই পৌঁছে দিলো JFK এয়ারপোর্টে, উদ্দেশ্য লাজভেগাস। সেখানে এনসিআর এর একটা ইভেন্ট আছে। সেখানে আমাদের গ্রান্ড ক্যানিয়ন যাওয়ার কথা।

ঠিক সময় মতোই আমরা ছয় ঘন্টার ফ্লাইটে পৌঁছে গেলাম লাসভেগাস। আমাদের হোটেল বুকিং হলো ইন্টারকন্টেনেন্টাল হোটেল, লাসভেগাস। এখানে এয়ার পোর্ট পৌঁছে আমরা চলে গেলাম বুকড্ হোটেলে। পরদিন সকালে এনসিআর এর ইভেন্ট। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা চলে এসেছে ইতোমধ্যে। আমি উপস্থিতি হলাম এ অনুষ্ঠানে। এখানে ভিন্ন ভিন্ন হলরুমে এনসিআর এর প্রোডাক্ট প্রেজেন্টেশন চলছে। এর অনেকগুলো প্রেজেন্টেশনে আমরা পারটিসিপেট করলাম। পরদিন আমাদেরকে ডিসটিংগুয়িসড এ্যাওয়ার্ড দেয়া হলো। তুলে দিলেন এনসিআর এর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা।

অনুষ্ঠান শেষ করলাম। পরদিন আমার আর সুজনের প্রস্তুতি চলছে গ্রান্ড ক্যানিয়ন যাওয়ার জন্য। গ্রান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি। বাসে যেতে ৬ ঘন্টার বেশি লাগবে ভেবে আমরা হেলিকপ্টার ভাড়া করলাম।

আমি গ্রান্ড ক্যানিয়ন সম্মন্ধ পুস্তক ঘেটে থেকে যা জানতে পেরেছি তাই তুলে ধরলাম।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দৈর্ঘ্যে ২৭৭ মাইল, প্রস্থে সর্বোচ্চ ১৮ মাইল এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১ মাইলেরও অধিক। এর গঠনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং সময় ভূতাত্ত্বিকদের নিকট বিতর্কের বিষয়। বর্তমান গবেষণায় জানা যায় যে কলোরাডো নদী এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া শুরু করে কমপক্ষে ১৭ মিলিয়ন বছর আগে। তখন থেকে কলোরাডো নদী তার প্রবাহ এবং ভূমি ক্ষয়ের মাধ্যমে এই ক্যানিয়নের বর্তমান রূপ পেয়েছে। প্রাকৃতিক যে সব বিস্ময় মানুষকে যুগে যুগে মুগ্ধ করেছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এরই একটি। ৪৪৬ কিলোমিটার লম্বা, ৬.৪ থেকে ২৯ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসস্থ আর ১.৮৩ কিলোমিটার গভীর পৃথিবীর ২০০ কোটি বছরের ইতিহাসকে সামনে তুলে ধরছে। ভূগর্ভস্থ টেকটনিক প্লেটের নানান কাজের সাক্ষী হয়ে আছে সে। টেকটনিক প্লেটগুলো ভূঅভ্যান্তরের উত্তপ্ত ও গলিত ম্যাগমার উপরে ভাসমান অবস্থায় আছে। এগুলোর স্থান পরিবর্তনের ফলেই তৈরি হয়েছে মহাদেশ ও সাগর। টুকরো টুকরো এই সব প্লেটগুলোর অবস্থা দিন রাত সব সময়ই পরিবর্তন হচ্ছে।

ক্রটেশাস পিরিয়ডে, ১৩০ মিলিয়ন বছর আগে ভূগর্ভস্থ দুটি টেকটনিক প্লেট -ওশিয়ানিক প্লেটের সাথে নর্থ আমেরিকান প্লেটের পশ্চিমাংশের সংঘর্ষ ঘটে। ওশিয়ানিক প্লেটের পুরুত্ব হলো ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। অন্য দিকে নর্থ আমেরিকান প্লেট ছিল অপেক্ষাকৃত হালকা। নর্থ আমেরিকান প্লেট হালকা বলে ওশিয়ানিক প্লেটের উপর উঠে যায় আর ওশিয়ানিক প্লেট নর্থ আমেরিকান প্লেটের নীচের দিকে ঢুকে যেতে শুরু করে। ওশিয়ানিক প্লেটের এই চাপের ফলে হালকা আমেরিকান প্লেট সংকুচিত ও ঘনীভূত হতে শুরু করে এবং এক সময় পশ্চিম আমেরিকার পুরোটাই উপরের দিকে ফুলে উঠতে শুরু করে। মাটি উপরের দিকে ওঠার ফলে পানির নিচে থাকা সাগরের অংশ গুলো থেকে পানি সরে যায় আর বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর দেহাবশেষ রয়ে যায় উপরে ওঠা এ মাটির উপর। এ ভাবেই উত্তরে তৈরি হয় পাহাড় আর দক্ষিণে প্রাচীন পর্বত মোগোলান হাইল্যান্ডস আরো উঁচু হয়ে ওঠে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে। ২১০০ মিটার পর্যন্ত।

পরবর্তী সময়ে ৭০ মিলিয়ন বছর আগে কলোরাডো নদী বরফ গলা পানি সহ মোগোলান হাইল্যান্ডস এর উপর প্রবাহিত হতে শুরু করে। এর ফলে সেখানে শুরু হয় ভূমিক্ষয়। পুরোনো সেই নদীর অস্তিত্ব এখনও বোঝা যায়। যদিও নদীতে এখন আর কোন পানির অস্তিত্ব নেই।

আজ কলোরাডো নদী আগেকার পাহাড়ী অঞ্চল হতে দক্ষিণ-পশ্চিমে গলফ অব ক্যালিফোর্নিয়া দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কিন্তু পুরোনো কলোরাডো নদীর উপর প্রাপ্ত পাথরের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, নদীটা দক্ষিণের সেন্ট্রাল আরিজোনা হতে উত্তরে প্রবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ পুরোনো কলোরাডো নদী উত্তর-পূর্ব দিকে বহমান ছিল, যা ছিল বর্তমান কলোরাডো নদীর ঠিক উল্টো দিকে প্রবাহিত। কি করে এই বিপরীত মুখী স্রোতের উদ্ভব হলো? আমার অজানা।

এরপর আরো অনেক গবেষণায় দেখা যায় সুউচ্চ মোগোলান হাইল্যান্ড হঠাৎ প্রায় ৮০০০ মিটারের মত দেবে গেছে। ফলে তৈরি হলো এক বিশাল আকারের বেসিন। দক্ষিণাঞ্চল দেবে যাওয়া উত্তরাঞ্চল উঁচু হয়ে গেল। ফলশ্রুতিতে উত্তর-পূর্বে ধাবমান কলোরাডোর গতিপথ পাল্টে দক্ষিণ পশ্চিম মুখী হয়ে গেল।

পুরোনো কলোরাডো নদী হতে বর্তমান কলোরাডো নদীর ব্যবধান প্রায় ৬ কিলোমিটার। এটা কেমন করে ঘটলো? বর্তমান কলোরাডো নদী অনেকটা খাড়াভাবে নিচে নেমে এসেছে। ফলে পুরোনো নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে ফেলেছে।

কলোরাডো নদী সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৭০০ মিটার উঁচু, যা প্রতি ৮০০ মিটারে ৩ মিটার নেমে গেছে। তা এতটা খাড়াভাবে নেমে আসাতে এখানে ভূমিক্ষয়ের পরিমাণ অন্যান্য নদীর তুলনায় অনেক অনেক গুন বেশি। মিসিসিপি নদী কলোরাডোর দশগুন পানি বহন করলেও তা প্রতি ৮০০ মিটার দুরত্বে মাত্র ৩ সেন্টিমিটারের মত নেমে গেছে। যার ফলে মিসিসিপি নদীর দ্বারা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মত গভীর গিরিখাতের জন্ম হয়নি।

গ্রান্ড ক্যানিয়নে কলোরাডো নদীর এই নেমে আসার ধারাটি এখনও সম্পূর্নরূপেই বিদ্যমান। এ ভাবেই যদি চলতে থাকলে আগামী ২০ লাখ বছরে গ্রান্ড ক্যানিয়নের গভীরতা আরো অনেক গুন বৃদ্ধি পাবে। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে হয়ে উঠবে আরো বেশি গ্র্যান্ড আরো বেশি মহিমান্বিত৷

আমরা হেলিকপ্টারে উড়ে গেলাম পাহাড়ের ঢালু দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নদীর পাশে। হেরিকপ্টার ল্যান্ড করলো এখানে। অনেক বিদেশী সিনেমারও স্যুটিং হয় এখানে। এগুলোই আমরা বিদেশী টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখি।

এখনো স্বপ্ন দেখি পৃথিবীর বাকী ছয়টি আশ্চর্য স্থান দেখার জন্য।

মানুষের মন কখন যে কি বলে কিছুই বোঝা যায় না। কাজের ভীড়ে মন চায় ছুটির স্বাদ পেতে আবার কাজ ছেড়ে থাকলে মন ডাকে কাজের পরশ পেতে। ঠিক সে অনুভূতির মতোই বাইরে গেলে মন কাঁদে দেশের জন্য, আবার দেশে থাকলে ইচ্ছে হয় ঘুড়ে বেড়াতে। আর তাইতো চলে আসতে হলো দেশে। দেশের টানে, কাজের টানে। চলবে....

নি এম/