eibela24.com
সোমবার, ২৮, সেপ্টেম্বর, ২০২০
 

 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
আপডেট: ১০:৪০ pm ২৬-০৬-২০২০
 
 


আমার UNFPA এর কাজটি শেষ না হওয়ার জন‍্য প্রায়ই যেতে হচ্ছে দিল্লিতে আমাকে। গোপসন সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে করতে হচ্ছে দেশের জাতীয় সেনসাস। ঢাকা বোর্ডের ওএমআর ফর্মও প্রিন্ট করেছি বহুবার। দিল্লিতে গেলে পীযূষ দার বাড়ীতে গেছি কয়েকবার। পীযূষ দা আমাদের গ্রামের ছেলে, ইন্ডিয়াতে চলে গেছে অনেক আগে। গ্রামের কালিপদ বাবুর ছোট ছেলে। অনেকদিন যোগাযোগ ছিলো না। শুনেছিলাম লন্ডনে বার এট ল করেছে, তার পরের খবর আর জানতাম না। উনার বড় ভাই এর সাথে কিছুটা যোগাযোগ ছিলো। বাবা মারা যাওয়ার সময় নীপেন দা, রবি দা, অকুমার দা হাসপাতালে এসেছিলেন। তারা সবাই কলকাতাতেই থাকেন। তাদের আন্তরিকতা বেশ ভালো। দিল্লিতে পীযূষ দার বাড়ীতে গিয়েছিলাম। তার এবং বৌদির আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তার সাথে দেখা হলো ৩৩ বছর পরে। পীযূষ দা লন্ডন থেকে ব‍্যারিষ্টারি পাশ করে দিল্লি হাইকোর্টে প্রাকটিস করেন, তিনি হাইকোর্টে বার এসোসিয়েশনের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। বৌদি ও হাই কোর্টে প্রাকটিস করেন। আমি বাসায় যাবো বলে সেদিন উনারা কেই কোর্টে যাননি। গ্রামের ছেলে বলে কথা, ধোপাডাঙ্গা গ্রামে তাদের অনেক নাম ডাক ছিলো, ছিলো অনেক জমিদারি, কালিপদ বাবুকে এক সময় সবাই চিনতো। বাবু বাড়ি হিসাবে খ্যাতি ছিলো তাদের অনেক। ফরিদপুরেও ছোট আঙ্গিনায় ও তাদের একটা বাসা ছিলো যেখানে রবি দা, নীপেন দা, পরিমল দাদারা থাকতেন। স্কুল জীবনে অনেক বার যেয়ে থেকেছি তাদের বাসায়। দেশ ত‍্যাগ করার মতো যে কঠিন সিদ্ধান্ত যাদের নিতে হয় তারাই একমাএ হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করতে পারে যখন দেশের মানুষকে কাছে পায়, হৃদয়ের স্পন্ধন যেনো শিহরিত হয়ে যায়। যায় তার কথার প্রশ্নবানে। অনর্গল বলতে থাকে, ভাই সীতানাথ দাদু কেমন আছে? মানিক সাহার বাড়ীর লোক কে কি করে? জলিল কেমন আছে? বুদ্ধিমন্তর কি ভাবে মারা গেলো? হাজারো প্রশ্ন হাজারো কথা, সেই ছোট বেলার কথা, সেই ধান ক্ষেতে ঘুড়ি উড়ানোর কথা! বৈশাখে আম তলায় আম কুড়ানো কথা! সারারাত্রি যেন তাদের কথা শেষ হয় না। শিকরের কথা মানুষ কিভাবে ভুলে যাবে? তাই আমি তাদের অনুরোধ জানালাম, পীযূষ দা এবারের দুর্গপূজায় ধোপাডাঙ্গা আসেন, আপনাদের ভালো লাগবে। যেখানে জন্মগ্রহণ, শৈশব কেটেছে তাদের, পীযূষ দা কি করে এই অনুরোধ ফেলবে? তাই বললো এবারের দুর্গা পূজায় বাংলাদেশে আসবো। পীযূষ দা কথা রেখেছে, তাইতো তারা সবাই, কলকাতা বাসা থেকে নীপেন দা ও তার বৌ, তার ছেলে মেয়ে, অকুমার দা সহ সবাই আসলো ধোপাডাঙ্গা। দুর্গা পূজা'তো আগে তাদের বাড়ীই হতো, এখন কালের বিবর্তনে আমাদের বাড়ী চলে এসেছে। বাবার ও ইচ্ছা ছিলো বাড়ীতে যেনো দুর্গা পূজা হয়। সোমার ও আগ্রহের কোন কমতি ছিল না। পূজার আয়োজন যেনো শুরু করে চার পাঁচ মাস আগে থেকেই, রামায়নের বর্ননা করতে যেয়ে ঠাকুর বানাতে হয় ২৩০ থেকে ২৫০ টি। বাড়ির পূজার সমস্ত কাজ কর্ম সোমাই দেখা শুনা করে। ইতিমধ্যে আশেপাশের চারপাশে ইউনিয়ন সহ নাম ফুটে গেছে সমস্ত ফরিদপুরে আমাদের বাড়ির দুর্গা পূজার। হাজার লোকের সমারোহ হয় পূজাকে কেন্দ্র করে। চাঁদপুর থেকে গ্রামে এক কিলোমিটার রাস্তা পীযূষ দাদের আসতে গাড়ীতে লেগে গেলো এক দের ঘন্টা, মানুষের ঢল দেখে পীযূষ দা হতভাম্ব হয়ে গেছে। মানুষে মানুষের বন্দন দেখে বলতে বাধ‍্য হলো- ভাইরে আমরা ইন্ডিয়া যেয়ে মনে হয় ভুলই করেছি। এখানে সৃষ্টি হয়েছে হিন্দু মুসলমানের ভাতৃত্বের বন্ধন, ভিড় ভিড় করে বলতে লাগলো, কেন যে আমাদের পৃতিকূলেরা দেশ ত‍্যাগ করেছে? তোরাতো ভালই আছিস। আমাদের ওখানে হিন্দুতে হিন্দুতে করে রাহাজানি, নেই কোন মায়া-মমতার বন্ধন। একে অপরের আন্তরিকতা যেন বই পুস্তিকার গল্প।

পূজার মধ্যে দেখতে দেখতে আমার বাড়িতে লোক সমাগম হয়ে গেলো বিশ ত্রিশ হাজার, দুপুরের খাবার খেয়ে পীযূষ দারা ফরিদপুর যাবে ঠাকুর দেখতে, বিদায় দিতে হয়, বিদায় দিতে কি আর মন চায়, হাটতে হাটতে চললাম আমাদের বাড়ির পেছনের দিকটাতে, পীযূষ দাদের ফেলে যাওয়া সেই দীঘির ঘাট পারে, যেখানে ছোটবেলার হাজারো স্মৃতি তাদের জড়িয়ে আছে, সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশে তাদের বিদায় জানাতে হলো, চোখের জলটা ধরে রাখতে পারলাম না, এই বিদায়ে আমার মন দুমড়ে মুচরে ভেঙ্গে যাচ্ছে জানিনা কেন? নিজের অনুভূতি লোকানোর জন‍্য, বললাম পীযূষ দা, আমার একটু কাজ আছে! আমি যাই! আমার এ যাওয়া'তো আবেগের তাড়না থেকে পালানোর চেষ্টা করা মাত্র। ভেতরের আবেগের অনুভূতি কোনো ভাবে আমি ধরে রাখতে পারছিনা, তাই চোখের জল টলমল করে গড়িয়ে পড়ছিল আমার নিজের অজান্তে। নিজেকে লুকানোর জন্যই কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে আসি, আমার সাথে ছিলো লেলিন, কাঁদো কণ্ঠে ওকে বললাম চলো যাই, ও লেলিন আমার ছোট ভাই এর মতো, ফরিদপুরে রাজবাড়ী রাস্তারমোড়, ব্রাহ্মণকান্দা ওদের বাসা, ও ঢাকাতে থাকে, একটা ফাইন্যান্স কোম্পানিতে কর্মরত, লেলিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ফরিদপুর চলে এসেছে দাদার (আমার) বাড়িতে দুর্গা পূজা উপলক্ষে, তাই সকাল থেকে রাত অব্দি ও আমার সাথে আমাদের বাড়িতে ছোট ভাইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করেছে। মানুষের জীবনে চলার পথে ভালোবাসা, ডেডিকেশন, সততা আর শ্রদ্ধাবোধের কাছে অনেক সময় হার মানতে হয়, ওর বেলায় আমার তাই হয়েছে। আমার চোখে জল দেখে লেলিন এর চোখও কান্নার জলে ভরে গেছে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে নিরবে কান্না করতে থাকলো। মানুষের প্রতি মানুষের আবেগ আর অনুভূতির জায়গাটা কখনো কখনো রক্তের বন্ধনকে হার মানিয়ে দেয়। পীযূষ দা- এদের ব্যাপারে আমি লেলিন'কে সব বলেছিলাম, তাই চোখের জল আর ভেতরের অনুভূতি বলছে এ বিদায় যেন জন্ম জন্মান্তের ভালোবাসার বন্ধনে বিদায়। পীযূষ দারা চলে গেলো। এরপর পীযূষ দার সাথে দেখা হয়েছিল দিল্লিতে, ঐ সময় আরো একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সাথে দেখা হয়েছিল আমার। তার সম্মন্ধে লিখতে গেলে একটা পান্ডলিপি লিখলেও লেখা শেষ হবে না।

আমি যার সম্মন্ধে লিখছি তার সম্মন্ধে একটু ধারণা দেওয়ার আগে ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত কিভাবে হয় তা নিয়ে কিছু কথা বলি-

ভারতে রাষ্ট্রপতি এক নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় ভারতীয় সংসদ (লোকসভা ও রাজ্যসভা) এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের নিয়ে। রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর। অতীতে দেখা গিয়েছে যে, শাসক দলের (লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল) মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি পুণরায় নির্বাচনে লড়তে পারেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, যাতে নির্বাচকমণ্ডলীতে প্রতি রাজ্যের জনসংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধায়কদের প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা এবং রাজ্য বিধানসভার সদস্যসংখ্যার সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্যসংখ্যার সামঞ্জস্যবিধান করা যায়। কোনো প্রার্থী এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট পেতে ব্যর্থ হলে, একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরাজয়শীল প্রার্থীদের ভোট অন্য প্রার্থীতে হস্তান্তরিত হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে সেই প্রার্থী নির্বাচন থেকে বাদ পড়তে থাকেন, যতক্ষণ না একজন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন। ভারতের উপরাষ্ট্রপতি অবশ্য লোকসভা ও রাজ্যসভার সকল সদস্যের (নির্বাচিত ও মনোনীত) প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। যদিও ভারতীয় সংবিধানের ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতা সরাসরি প্রয়োগ করতে পারেন, তবুও, কয়েকটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃ স্বাধীন। ভারতের রাষ্ট্রপতি নতুন দিল্লিতে একটি এস্টেটে বাস করেন। এই এস্টেটটি রাষ্ট্রপতি ভবন নামে পরিচিত। রাষ্ট্রপতির অবসরযাপনের জন্য ছারাব্রা, শিমলা ও
হায়দ্রাবাদে তিনটি রিট্রিট বিল্ডিং রয়েছে। হায়দ্রাবাদের রিট্রিট ভবনটির নাম রাষ্ট্রপতি নিলয়ম। ১৯ জুলাই, ২০১২ ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের ফল ২২ জুলাই ঘোষিত হয়েছে। প্রণব মুখোপাধ্যায় বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। ২৫ জুলাই বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল তার কার্যভার ত্যাগ করেছেন। একই সাথে প্রণব মুখোপাধ্যায় ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। আমি তার কথাই বলছি যিনি বাংলার অহংকার প্রণব মুখার্জি। তিনিই আমাদের শুভ্রা মাসীমার স্বামী। আমি তার কথাই বলছি যে এপার বাংলার মানুষের মঙ্গল কামনা করতেন। উনার কাছ পর্যন্ত পৌছাইলে কেউ খালি হাতে ফিরেছে তার নজির নেই।

প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের বন্ধু আর এই বন্ধুত্বের সূচনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে। তাঁর আত্মজীবনীমূলক সিরিজের প্রথমটি দ্য ড্রামাটিক ডিকেড: দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস–এ তিনি একটি পুরো অধ্যায়ই লিখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ: দ্য মেকিং অব বাংলাদেশ’ নামে। বইয়ের এই অধ্যায়টি প্রণব মুখার্জি শুরু করেছেন ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত ডমিনিয়ন প্রতিষ্ঠার সময় থেকে। এরপর জওহর লাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর আমলের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে যখন এসব ঘটছিল, তখন পাকিস্তানের পূর্বাংশে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এ ঘটনাই ১৯৭১ সালে উপমহাদেশের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পাকিস্তানের জন্য বছরের শুরুটা ইতিবাচক হলেও বছরের শেষে দেশটি ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল দুটি পৃথক ভৌগোলিক অংশের সমন্বয়ে, যার মাঝখানে ছিল ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নামে তারা দুটি দেশে পরিণত হয়। এরপর প্রণব মুখার্জি পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের প্রতি পশ্চিমাদের শোষণ ও বঞ্চনা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশে যে ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে, তারও দীর্ঘ বর্ণনা দেন। তাঁর লেখায় আছে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, সত্তরের নির্বাচন পেরিয়ে কী প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে। ৩০ মার্চ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ভারতের লোকসভায় নেওয়া প্রস্তাবটি ছিল এ রকম: ‘পূর্ব বাংলার সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে লোকসভা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছে। পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সেখানে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ন্যায়সংগতভাবে যে রায় দিয়েছে, সেই রায়ের প্রতি যথার্থ সম্মান জানানোর বদলে পাকিস্তান সরকার তাদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছে। এই লোকসভা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামরত পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করছে এবং পাকিস্তান সরকারের প্রতি অবিলম্বে নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে। প্রণব মুখার্জি তখনো ইন্দিরার দলে ভেড়েননি। বাংলা কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাঁর দ্বিমত হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, ‘১৫ জুন বাজেট অধিবেশন চলাকালে আমি রাজ্যসভায় বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিই। আমি বলেছিলাম, ভারতের উচিত বাংলাদেশের প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া। একজন সদস্য জানতে চান, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। উত্তরে আমি জানাই, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই এর রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব। রাজনৈতিক সমাধান মানে গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে বস্তুগত সহায়তা করা। আমি সংসদকে এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম যে বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করার বহু নজির আছে।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রণব মুখার্জি কী ভূমিকা রেখেছেন, তা–ও তিনি আমাদের জানিয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে এই মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। তিনি লিখেছেন, ‘সে সময় থেকেই ইন্দিরা গান্ধী আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরে আমাকে প্রথম আন্তসংসদীয় ইউনিয়নের বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য মনোনীত করেন। সেই বৈঠকে আমাদের কাজ ছিল প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং ভারতের অবস্থান বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা, যাতে তাঁরা যে যাঁর দেশে ফিরে গিয়ে নিজেদের সরকারকে বিষয়টি অবহিত করতে পারেন। হতে পারে এই বৈঠকে আমার ভূমিকার কথা প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছেছিল এবং তিনি খুশি হয়েছিলেন। কেননা, এরপর একই দায়িত্ব দিয়ে তিনি আমাকে ইংল্যান্ড ও জার্মানি পাঠান।’ প্রণব মুখার্জি ১৯৭২ সালে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ১৯৭৬ সালে ইন্দিরার মন্ত্রিসভার সদস্য হন।

বাংলাদেশের প্রতি প্রণব মুখার্জির দুর্বলতা অপরিসীম; অনেকটা জ্যোতি বসুর মতোই। জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়ি ছিল বারদিতে, লোকনাথ বাবার আশ্রমের পাশেই। সেই অর্থে তিনি ছিলেন বাঙাল। প্রণব মুখার্জি আপাদমস্তক ঘটি তাঁদের আদি বাড়ি দীঘাতে। তবে বিবাহসূত্রে তিনিও বাংলাদেশের জামাই। সিপিআইএমের নেতা জ্যোতি বসু একাত্তরের জুলাই মাসে বিধানসভায় বক্তৃতাকালে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছে এবং সেখানকার মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালাচ্ছে। আমাদের উচিত সর্বতোভাবে তাদের সহায়তা করা। ভারত-পাকিস্তান বিবাদের কারণে সার্ক এখন পুরোপুরি অকার্যকর। কিন্তু ২০০৬ সালে প্রণব মুখার্জি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে সার্ককে কার্যকর সংস্থা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। ২০০৭ সালের এপ্রিলে যখন দিল্লিতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হয়, সে সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর উদ্যোগী ভূমিকার কথাও সবার জানা। সেবারের সম্মেলনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আন্ত-আঞ্চলিক সংযোগ ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভারতে কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়। আর যখন অকংগ্রেসি সরকার আসে, তখন সম্পর্ক ভালো হয়। প্রণব মুখার্জি এই ধারণা অনেকটা অসত্য প্রমাণ করেছিলেন। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উত্তরণ ঘটে। বাঙালি হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রণব মুখার্জির একধরনের হার্দিক সম্পর্ক রয়েছে। এ নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা হলো: ভারত ও বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী নয়, তাদের মধ্যে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত বন্ধন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি ভারত সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কেননা, আমরা অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভৌগোলিক সংহতি ধারণ করি। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় হয়। এতে অনেক ঘরবাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। সেই ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, দুর্যোগের খবর পেয়েই ভারত ওষুধ, তৈরি খাবার, কম্বল, তাঁবু ও বহনযোগ্য বিশুদ্ধ পানিসহ ত্রাণসামগ্রী বাংলাদেশে পাঠায়। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ভারত চাল রপ্তানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। প্রণব মুখার্জির উদ্যোগেই বাগেরহাটের দুটি উপজেলায় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের জন্য ২ হাজার ৮০০ ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। সেসব ঘরে এখনো মানুষজন বাস করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রণব মুখার্জির পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয় পঁচাত্তরের পর তিনি (শেখ হাসিনা) যখন দিল্লিতে নির্বাসিত ছিলেন। সেই সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা আমার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু এবং আমি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে ভারত সহায়তা করেছিল।’ সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘প্রকৃত ঘটনা হলো, যখন কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা তাঁকে ত্যাগ করছিলেন, আমি তাঁদের ভর্ৎসনা করে বলি, যখন কেউ বিপদে পড়েন, তখন তাঁকে ত্যাগ করা অনৈতিক।

যে মানুষটা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি এতোটা টান তার পায়ে হাত দিনে প্রনাম করাটাও একটা ভাগ‍্যের ব‍্যাপার। বাংলাদেশের অনেক সাধারণ মানুষেরও তার সাথে ব‍্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। তার মন মানুষিকতা কখনও শিশুসুলভ আবার কখনও বা আকাশ সমতুল‍্য। সৌভাগ্য হয়েছিল তার অফিস রুমে এবং ডাইনিং টেবিলে এক সাথে লাঞ্চ করার। আমি শুধুই পরিচয় দিয়েছিলাম আমার বাড়ি সুদুর ফরিদপুরের নড়াইলের পাশ্ববর্তী বোয়ালমারী উপজেলায়। নড়াইলের অনেকের খোজ খবর নিলেন, বুঝাগেল তান্তরিকতা এখন আগের মতোই আছে। সুভাষ বাবুর কথাও জিজ্ঞেস করলেন, বুঝা গেল উনার যাওয়া আশা আছে ওখানে। আমাকে খুব স্নেহ করলেন আর উনার কাছ থেকে আশীর্বাদ হিসেবে আমি যা পেলাম তা আমার প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মনে রাখবে।

নি এম/