eibela24.com
বৃহস্পতিবার, ০৩, ডিসেম্বর, ২০২০
 

 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
আপডেট: ১১:২৭ pm ১৬-০৬-২০২০
 
 


টেকনোমিডিয়ার সাথে যুক্ত হওয়া ব‍্যাংকগুলোর সুবাদে আমার কোম্পানি টেকনোমিডিয়া লিমিটেড একের পর এক সফলতার মুখ দেখতে লাগল। আমার প্রতিনিয়ত মনে হতে লাগলো আমার শিকরের কথা যেখানে আমার জন্মগ্রহণ থেকে বেড়ে উঠা। সেই ছোট্ট বেলার আমার স্মৃতি বিজরিত জায়গা আমার প্রানের গ্রাম, ঐ মাটির রাস্তা, চাঁদপুরে প্রাইমারি স্কুল, যেখানেই কতইনা দশ পয়সার মালাই কিনে খেয়েছি, খেয়েছি টোস্ট বিস্কুট, কুসুরের সেন্টারে কতোই না বসেছিলাম একটু কুসুর খাওয়ার জন্য, মনে পরে ছোট বেলার হাফপ‍্যান্ট পরা বন্ধুদের কথা- আনন্দ, পরান, বিভূতী, গোসাই, মাসুদ, আকতার, কাশেম, গুলনাহার, সীমা, মজিবর, দেলোয়ার আরো অনেকের কথা আমরা সবাই এক সাথে প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। কতোইনা ধীরেন স‍্যারের মাইর খেয়েছি। মনে পরে হাই স্কুলের কথা, সবাই মিলে কতোইনা স্মৃতি বিজরিত সময় পার করেছি, নতুন বন্ধু যোগ হয়েছে অন‍্য প্রাইমারী স্কুল থেকে এসে- চুন্নু, সাজু, আন্না, আজাদ, মুরাদ, মুসি, দেলো আরো কতো বন্ধু। স্মৃতির পাতায় আটকে থাকে তাদের কথা, মন সব সময় ছটপট করে এই ভেবে যে ঐ স্কুলে টিনের চাল দিয়ে ব‍ৃষ্টির জল পরে টপ টপ করে, ভাবতাম যদি আমার টাকা পয়সা হতো স্কুলটাকে পরিবর্তন করে আধুনিক করে দিতাম। কতোইনা মনে পরে পুরাভিটার তারাপদ নাথ, পরিমল নাথ, বুদ্ধিস্বর জেঠা মহাশয়, হরন নাথের কথা, এরা সবাই আজ না ফেরার দেশে চলে গেছে। রাসপূর্নিমার মেলা হত জগদীশ বাবুর বাড়ী লাঠি লজেন্স খাওয়া, চরকিতে ঘোরা, মেলার মাঠে ঘোরাঘুরি করার কথা, কতইনা বকাবকি করতো যতিন মন্ডল। এখন আর খাওয়া হয়না সেই লাঠি লজেন্স, হারিয়ে গেছে সেই জগদীশ মন্ডল, যতিন মন্ডল, কালিপদ বাবু, খুদুবাবু, হঠাৎ কোথায় যেনো হাড়িয়ে গেলো সুকুমার বাবু। আজকে আমরা এই সফলতায় যেনো তাদের হক আছে, আছে এই জন‍্যই যে আমরা সবাই একই এলাকা থেকে অক্সিজেন নিয়েছি তাই।

আমার বাবার কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে আমার সফলতার সাথে সাথে। তাই শিকরের টানে বাবা মার সুখের জন‍্য টিনের ঘড়টি ভেঙ্গে ইট, বালু আর সিমেন্টের ঘড় বানালাম, বসালাম শীততাপ যন্ত্র। তাদের সুখশান্তির জন‍্য করলাম মন্দির, ছোট ছোট সোনা মনিদের দুরের স্কুলে যাওয়া অসুবিধা হয় বিধায় নিজ গ্রামে আমার বাড়ির সামনেই করলাম সরকারি প্রাইমারী স্কুল। এত সফলতার মধ্যে আমার নিয়তি বাধসাধল আমার বাবার অসুস্থতা, দিন দিন তার বুকের ব‍্যাথাটা বেড়েই যাচ্ছে। অনেকবার তাকে ঢাকায় এনেছি, ডাক্তার দেখিয়েছি বহুবার। ঢাকার ডাক্তারদের প্রতি তার আস্তার ঘাটতি দেখা গেলো। বাবা আমাকে বলল- আমাকে ইন্ডিয়ার ভিসা করে দাও, আমি ইন্ডিয়া যেয়ে ডাক্তার দেখাবো, শংকরকে বললাম বাবাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাও, ও শংকর আমার বন্ধু। আমাদের পরিবারের সাথে ও অনেক আগে থেকেই পরিবারের একজন মেম্বার হয়ে গেছে। তাই শংকর দেরি না করেই পরের দিনই বাবাকে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। বড় বোনকে তুলে নিলো রানাঘাট থেকে, বাবাকে ভর্তি করা হলো- কলকাতার মকন্দপুরের দেবী শেঠীর কার্ডিয়াক হসপিটালে। আমিও চলে গেলাম ঢাকা থেকে। বাবাকে হসপিটালে দেখতে আসলো জয়দ্বীপ দা, শিল্পীদি, তাপস, রবিদা, নিপেন দা, দিপক কাকা আরো অনেকে। তাপস আমার কলেজ জীবনের বন্ধু ও কলকাতায় অনেক আগে থেকেই সেটেল হয়ে গেছে। ওর আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ। সকালে বিকালে ও সব সময় পাশে থাকতো বাবার। প্রতি দিন রাত ১১টার পরে বাসায় যেতো। বাবাকে আমি ভর্তি করে প্রতিনিয়ত ঢাকায় আসতে হতো ব‍্যবসার প্রয়োজনে। শ‍্যামলদা এবং তার স্ত্রী ডাক্তার দেখানোর জন‍্য কলকাতা গিয়েছিল। ডাক্তার দেখানো ভুলে তারাও ব‍্যস্ত হয়ে গেলো আমার বাবাকে দেখাশুনার জন‍্য। বাবার হার্টের সমস্যা, ডাক্তার বললো ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে তাড়াতাড়ি মানে বুকের অপারেশন করতে হবে। আমারা সবাই সম্মতি দিলাম বাবার ওপেন হার্ট সার্জারি করতে, অপারেশন রুমে যাওয়ার আগে মনে হল যেন বাবা কিছু বলতে চেয়েছিলো আমাকে! একদিন দুই দিন.........
সারা জীবনেও বাবা আর কিছু বলতে পারলোনা আমাকে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম, বুকের ভিতর থেকে কান্নার রোল বেড়িয়ে আসছে হুর হুর করে, কোন শান্তনাই আর মনকে বোঝানো যাচ্ছে না। ঐ হসপিটাল মুহূর্তের মধ্যে যেন এক শ্বশান ভুমিতে পরিনত হলো। তাপস, শংকর, শ‍্যামল দা, জয়দ্বীপ দা সবাই শান্তনা দিলো আমাকে। বললো ধৈর্য ধরতে, নিয়তি কখনো বলে কয়ে আসে না। তারা পাশাপাশি হসপিটাল ক্লিয়ারেন্স, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, বাংলাদেশ হাই কমিশনের ছারপত্র সব করতে করতে তাদের লেগে গেলো পরের দিনের বেলা ১২ টা। আমি যেহেতু ফ্লাইটে গিয়েছিলাম, ভিসায় কোন মাল্টিপুল রোড ছিলো না তাই চলে আসতে হলো ঢাকায়। বড়দিদি, শংকর, তাপস, জয়দ্বীপ দা, শ‍্যামল দা বাবাকে নিয়ে বেনাপোল বর্ডারে আসলো। এদিক থেকে আমার বন্ধু চান, নিমাই ওরা গেলো বাবার মৃতদেহ আনতে বেনাপোলে। আমি ফ্লাইট থেকে নেমে চলে গেলাম বাড়ীতে, এদিকে চান, নিমাই, বড়দি, শংকর পৌছে গেলো বাড়ীতে। বাবার মৃতদেহ যখন বাড়ীতে এসে পৌছালো, এলাকার সবার কান্নার রোলে যেন বাতাস ভারী হয়ে গেলো- মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে হয়ে গেলো এক বুক ভরা স্বপ্ন। সমস্ত আশা প্রত‍্যাশা যেন একটা ঝরো বাতাসে শুন্যে মিলিয়ে গেলো। কেন যেন নিয়তি প্রতি নিয়তো আমাকে নিয়েই খেলা করে ভাগ‍্য বিরম্বনার অদৃষ্টে। প্রত‍্যাশা কখনওই একই স্রোতে প্রভাবিত হয় না। তাই তো আজও আমার তৈরি ইট শুড়কির বাড়ী, মন্দির শুন‍্যের দিকে তাকিয়ে থাকে ঐ নীল আকাশের দিকে।

প্রিয় বাবা,
আমি জানিনা আমার সাথে তোমার শেষ বিদায়ে তুমি কি কথা বলতে চেয়েছিলে আমায়, জানো বাবা! আমি আজও ভাবি সেদিন তুমি কি বলতে চেয়েছিলে আমায়, শত বার, হাজার বার, লক্ষ বার ভাবনার গভীরে গিয়ে আমি একবারের জন্য আচ করতে পারিনি তুমি কি বলতে চেয়েছিলে। এটা কি আচ করা যায় বাবা? হয়তো আর কখনো শুনা হবে না তোমার সেই না বলা কথাগুলো। তুমি সুস্থ হয়ে আমাদের সাথে আবার গ্রামে ফিরে আসবে এই স্বপ্নটাই আমরা দেখতাম। তুমি জাননা বাবা, তোমায় নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি আমি, তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করে দেব, তোমার সব স্বপ্ন অবলীলায় আমি মিটিয়ে দেবো, কিন্তু কই! সে সুযোগটা দিলেনা তুমি আমায় বাবা। শুন‍্য থেকে এসে তুমি আবার শূন্যে মিলিয়ে গেলে, মাঝ পথে আমাদের ছেড়ে চলে গেলে তুমি একা, এ ভুবনের মায়া ত্যাগ করে, তোমার আপনজন এর মায়া ত্যাগ করে, রক্তের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে, তুমি চলে গেলে একা না ফেরার দেশে।

আমাদের ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে বলেই কি তোমার ছোট ছেলেকে আগেভাগে পাঠিয়ে দিয়েছিল তোমার গন্তব্যে। বটবৃক্ষের ছায়া তলে বেঁচে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ ছায়া শুণ্য হয়ে গেলে কতটা কষ্ট হয় বাবা তুমি জানো? বাবা তুমি একবারও ভাবলেনা তোমায় ছাড়া আমরা কতটা অসহায় হয়ে পড়বো। ওই নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে জোসনা ভরা রাতে অনেক কথা বলতে ইচ্ছা করে তোমায় বাবা, বাবা জানো এখনো বৃষ্টি হলে মনে পড়ে তুমি কলার পাতা কেটে আমাদের ঘরের চালের উপরে দিয়ে দিতে যাতে করে আমরা বৃষ্টিতে ভিজে না যায়। বাবা তুমি জানো না সেই ভাঙ্গা ঘরে জায়গায় আজ অট্টালিকা হয়েছে, আধুনিক সাজে সজ্জিত করা হয়েছে তোমার গোটা বাড়ি কে। তোমার ভিটাতে তৈরি করা হয়েছে বাচ্চাদের জন্য স্কুল যাতে করে গ্রামের বাচ্চারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, বাড়ির উঠোনে তে বাড়ির পাশে তৈরি করা হয়েছে মন্দির। জানো বাবা, সেই মন্দিরে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দের মিলন মেলার উৎসব হয়, সেখানে সমবেত হয় হাজার হাজার দর্শনার্থী, কত দূর দূরান্ত থেকে দেখতে আসে তোমার স্বপ্নে সাজান সেই আয়োজন। জানো বাবা, মা আর আমি দৃষ্টিনন্দন তাকিয়ে থাকি সেই উৎসবের দিকে সেই জনসমুদ্রের দিকে ভাইকে খুঁজি তোমাকে খুঁজি, দূর্গা পূজার মধ্যে এত লোকজনের সমাগম হয় তুমি জানোনা বাবা। বাবা তোমার জীবন চেষ্টা করেছে তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করার, একে একে চেষ্টা করে সব পূরণ করেছিল কিন্তু তুমি কোথায় বাবা? বাবা, তুমি কি এখন আছো, ঐ নীল আকাশের নীচে রুদ্রকন্ঠে পদ্মাসনে বসা, তুমিতো বেশ আছো ঐ ভাইকে নিয়ে শিব ঠাকুরের তলে। বাবা, তোমার জন্য আমার মন খুব কাঁদে জান বাবা, তোমার জন্য মা অনেক কাদে বোনরা কাদে সবাই কাঁদি আমরা। তোমার সবই পড়ে রইল শুন‍্যে, তুমিতো আর দেখলে না বাবা। বাবা, কত কথা বলি আমি নিজের সাথে, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে বাবা, তোমার স্বপ্নের মত করে আমি আজও বড় হতে পেরেছে কিনা, আরো কত স্বপ্ন ছিল তোমার যা আমি জানতে পারলাম না, ওই দুর আকাশে থেকে আজও তুমি আমাকে আশীর্বাদ করে যাচ্ছো তোমার সন্তান যেন ভালো থাকে, ভালো থাকে তোমার আপনজন। বাবা, তোমার অস্তিত্ব ধারণ করে প্রতিদিন মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে আমি পথ চলি, যে পথ তুমি আমাকে দেখিয়েছো, যেখানেই থাকো ভালো থেকো বাবা। চলবে...

নি এম/