eibela24.com
বৃহস্পতিবার, ০৬, আগস্ট, ২০২০
 

 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
আপডেট: ১০:১৯ pm ২৯-০৫-২০২০
 
 


আমার বিয়ের সব আয়োজন ঠিকঠাক মত হয়ে গেল, মানে আমার বিয়েটা হয়ে গেলো। সপ্তাহ খানেক আমাদের গ্রামের বাড়িতে কাটালাম আমরা, ছোট আকারে আমাদের গ্রামেও একটা বৌভাতের আয়োজন করলাম, কারন গ্রামের মানুষেরও একটা হক আছে আমার উপর। সব মিলিয়ে সময়টা ভালোই কাটলো। জয়দ্বীপ দাদা আমাদের সাথে গ্রামে গেলো, জয়দ্বীপ মানে সোমার বড় বোনের বর। উনি কলকাতায় থাকেন, ওখানেই উনার জন্ম। তার পূর্ব পুরুষেরা দেশ ভাগের আগে কলকাতা চলে যায়। জয়দ্বীপ বিক্রমপুরের ভাগ‍্যকুল জমিদার বাড়ীর একমাএ বংশধর। কলকাতায় তার বেড়ে উঠা ও পড়াশুনা সর্বপরি শিল্পী দির সাথে জয়দ্বীপ দাদার বিয়ে হয়। শিল্পী দি সোমার বড় বোন। যাহোক তার পিড়াপিরিতে ঢাকায় এসে কলকাতা যাওয়ার জন‍্য সিদ্ধান্ত নিলাম। নিলাম এই জন‍্য বিয়ের পর একটু ঘোরাও হলো- জয়দ্বীপ দার সাথে একটু সময়ও কাটানো গেলো। তাই ঢাকায় এসে অফিসে গেলাম আমি। বোরহান ভাই এর সাথে দেখা করলাম, ১৫ দিন ছুটি আরো বাড়িয়ে নিলাম আমি।

আমার ইন্ডিয়ার ভিসা ব‍্যবস্হা হলো। সোমার ভিসা আগেই ছিলো কারন ও ইন্ডিয়াতেই পড়াশুনা করে বলে স্টুডেন্ট ভিসা ছিলো। রওনা হলাম ইন্ডিয়া, সাথে জয়দ্বীপ দা, শিল্পী দি, উনার একটি ছেলে রাজদ্বীপ, শাশুড়ি, সোমা, ঝুমা আর আমি, ঝুমা হলো সোমার ছোট বোন। পৌছে গেলাম কলকাতার কাকুরগাছি বাসায়। দুই চার দিন কাকুরগাছি থাকলাম। গেলাম জয়দ্বীপ দার বাড়িতেও। উনারা তখন ভবানিপুর থাকে। পুরাতন একটা তিনতলা বাড়ী ওখানে জয়দ্বীপ দার বাবা মা থাকেন, পাশে একটি ফ্লাটে জয়দ্বীপ দা এবং শিল্পী দি থাকেন। আরো কয়েকদিন আমরা ঐ ফ্লাটে থাকলাম। জয়দ্বীপ এদিকে গ‍্যাংটক, সিকিম যাওয়ার প্লান আগে থেকেই করে রেখেছিল, হটাৎ করেই আমি জানতে পারলাম। উনি বললো কাল সকালে আমরা গ‍্যাংটক যাচ্ছি, এদিকে আমার অবস্থাতো সূচনীয় আর্থিক দিক দিয়ে, পকেটে তেমন কোন পয়সা পাতি নাই, চুপি চুপি সোমাকে বললাম, ও বললো এটা কোন অসুবিধাই না, জয়দ্বীপ দাই সব ব‍্যবস্হা করবে। জয়দ্বীপ দা সোমা ঝুমাকে ছোট বোনের মতো দেখে তাই ওদের একটু আবদার বেশি। সোমা ঝুমা জয়দ্বীপ দার উপর একটু বেশিই অধিকার ফলায়। হয়তো এটা অধিকার বোধ থেকেই। যাহোক সন্ধা ৭টার মধ্যে হাউরা স্টেশনে পৌছাতে হবে তাই তৈরি হয়ে নিলাম। নিলাম শীতের জামা কাপর কারন গ‍্যাংটকে অনেক শীত যদিও কলকাতাতে অনেক গরম। ভারতবর্ষ এক আজব দেশ, কোথাও শীত আবার কোথাও গরম। ট্রেনে যেতে হবে শিলিগুড়ি, প্রায় ১২ ঘন্টার জার্নি, জয়দ্বীপ অবশ‍্য ট্রেনে একটি রুম নিয়েছিলো, তাই তেমন কোন অসুবিধা হলো না। সকালে পৌছে গেলাম শিলিগুড়ি। সকালে শিলিগুড়ি রেলস্টেশন থেকে নাস্তা করা হলো, ওখান থেকে যেতে হবে গ‍্যাংটক, ভাড়া করলো টাটা সুমো গাড়ি, পাহাড়ি রাস্তা একে বেকে চলছে উপরের দিকে, কোথাও সরুরাস্তা আবার কোথাও পাহাড় ঘেসে, পাচ/ছয় ঘন্টা লাগবে যেতে, গ‍্যাংটক শহরটি সমতল ভূমি থেকে ১৮০০০ ফিট উপরে, কানে যেনো তালা বন্ধ হয়ে আসছে, মাঝে মাঝে দুই হাত দিয়ে কান আটকে রাখি। বিপত্তি ঘটলো মাঝ পথে, কারণ সিকিম যেতে হলে নন ইন্ডিয়ানদের পূর্ব অনুমতি নিতে হয়, আর আমি তো নন ইন্ডিয়ান, জয়দ্বীপ শিখিয়ে দিলো ইন্ডিয়ান বলতে, পার পেয়ে গেলাম শিখানো কথা বলে, টাটাসুমো চলতে থাকলো আরো উপরে, খুবই সরুরাস্তা, এদিকে সুমোর ড্রাইভার বলে গতো সপ্তাহ একটি নব দম্পতি পাহাড় থেকে গাড়ী পড়ে যেয়ে মারা গেছে, তাদের লাশও খুজে পাওয়া যায় নাই, মনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে গেলো। কি যে সরু রাস্তা পাহাড় ঘেসে, কোন অবস্থাতেই অন‍্য কোন গাড়ি ক্রস করা সম্ভব না কিন্তু ড্রাইভার দক্ষ নি:সন্দেহে বলা যায়, পাহাড়ি ড্রাইভার বলে কথা, গাড়ি গুলো সাইড দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। অবশেষে পৌছে গেলাম গ‍্যাংটক। হোটেল জয়দ্বীপ দা আগেই বুকিং দিয়েছিলো সবচেয়ে পাহাড়ের উচু হোটেলটি। আহ কি সুন্দর পরিবেশ, বলে বুঝানো যাবে না।

গ্যাংটক শহরের প্রাণকেন্দ্র মূলত এমজি মার্গ। ছবির মতো সাজানো গোছানো এ শহরের কোথাও কোনো শব্দ নেই, যানজট কিংবা ময়লা-আবর্জনা নেই। ঝকঝকে এ শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মহাত্মা গান্ধীর প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার সুবিশাল এক ভাস্কর্য ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে সিকিম এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের নাম। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্য এশিয়ার অন্যসব পর্যটন এলাকার চেয়ে অনেক আলাদা সুউচ্চ পাহাড়, ঝর্না, লেক আর হিমশীতলের পরশ পেতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ছুটে যান সিকিমে চীন- নেপাল আর ভুটানের স্থলসীমায় এ রাজ্য পর্যটকদের কাছে যেন অচিনপুরীর দেশ। দেখছি আর ভাবছি এই অপরুপ শহরটি। মনে মনে ধন্যবাদ দিচ্ছি জয়দ্বীপ দাকে, এই জায়গা টি সিলেক্ট করার জন‍্য। বিকালে একটি মন্দিরে গেলাম। পরন্ত বিকালে পাহাড় ঘেসে বরফের স্তপ যেন এক অপরুপ সাজে সজ্জিত। মনে হতে লাগলো এক স্বর্গীয় অনুভূতি। সোমার হাত ধরে একটু হাটলাম। এ এক অন‍্য অনুভূতি। সিনেমার পর্দায় দেখেছি ফেলুদার গল্প -উত্তর-পূর্ব ভারতের এ রাজ্যের সাথে অনেকেরই প্রথম পরিচিত হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজ 'গ্যাংটকে গণ্ডগোল'-এর মাধ্যমে। রহস্যের পেছনে ধাওয়া করতে করতে গ্যাংটকের অপরূপ সৌন্দর্য সত্যজিৎ রায় আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন তাঁর আশ্চর্য কলমের জাদুতে।

ছেলেবেলায় যতবারই উপন্যাসটি পড়েছি, ততবারই যেন গ্যাংটক তার সমস্ত রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের কল্পনায়। আর সেই কল্পনার সাথে বাস্তবকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেলাম আর ছাড়ে কে। কল্পনার রাজ্যের সন্ধানে উদ্দেশ্য এটাকে হানিমুন বলা চলে না। সবাই মিলে একটা ট‍্যুর। একটু দুরেই কাঞ্চনযজ্ঞা পাহাড়। হোটেলের পাশে আমি আর সোমা দাড়িয়ে আছি এক শৈল্পিক সৌন্দর্য দেখার জন‍্য। সমস্ত পাহাড় টাই যেনো বরফ দিয়ে আবৃত। আগামীকাল সাঙ্গু লেকের অনুমতির জন্য হোটেল ম্যানেজারকে কাগজপত্র দিয়ে আমরা রুমে ফিরলাম আমরা সবাই, সকাল নটায় গাড়িতে চড়ে বসলাম পূর্ব সিকিম জিপ স্ট্যান্ড থেকে। আমাদের আজকের গন্তব্য পূর্ব সিকিমের পর্যটন কেন্দ্র সাঙ্গুলেক। দূরত্ব গ্যাংটক থেকে ৩৮ কিলোমিটার। সময়ের হিসেবে আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথে প্রায় দুই ঘণ্টা। সিকিম হাউস (মুখ্য মন্ত্রীর বাসভবন), তাশিভিউ পয়েন্টসহ গ্যাংটক শহরের চড়াই উৎরাই পার করে এগিয়ে চললাম। ছোট ছোট ঘর বাড়ি ও গ্রামকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলার সময়। কোথাও দেখা মিলছে ঝলমলে রোদ। আবার একটু পরেই ঘনকুয়াশার চাদরে ঢাকা। প্রথম দিকে সবুজের দেখা মিললেও কিছু দূরে গিয়ে প্রকৃতির রূপে বিবর্ণতার ছোঁয়া। রেশম পথের অনেকগুলো শাখার একটি হল সাঙ্গু-নাথুলা পাস। চীন-ভারত সীমান্ত হওয়ায় কিছু দূর পরপর সেনা ছাউনি। এই পথটি প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো। এ পথের নামকরণ করা হয়েছিল তখনকার দিনের চীনের রেশম ব্যবসার নামে। রেশম পথ উপমহাদেশীয় দেশগুলোর মধ্যে দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপকে সংযুক্ত করা একটা প্রাচীন বাণিজ্যিক পথ। যাত্রা পথের বিরতিতে, বিশাল আকাশকে মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবো। এখানে সুউচ্চ পাহাড়ের সঙ্গে হয়েছে আকাশের মিতালী। রোমাঞ্চকর এ পথ ভ্রমণ বাস্তবে যে কত সুন্দর তা না আসলে হয়তো বোঝাই যেত না। আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ড্রাইভার উপরে উঠতে থাকল। রাস্তার দুই পাশের বরফের স্তূপ বলে দিচ্ছে আমাদের গন্তব্য নিকটে। সাঙ্গুর কাছাকাছি পসরা সাজানো এক দোকানে দাঁড়ালো গাড়ি। জুতা ও জ্যাকেট ভাড়া করে উষ্ণ কফিতে চুমুক দিতে দিতেই চলে এলাম সাঙ্গুলেক। পর্যটন মৌসুম হওয়ায় লোকে লোকারণ্য।সাঙ্গুলেকটি ঘুরে দেখার জন‍্য আমি আর সোমা একটি বন‍্যগরু ভাড়া করলাম, দুজনেই গরুর উপরে উঠে পরলাম। ঐ গরু গুলো অন‍্য ধাচের। সাঙ্গুলেকের জল এক অসাধারন স্বচ্ছ। ভেবেছিলাম আবার যাবো কিন্তু হলো না এপর্যন্ত। আসার সময় পাহাড় থেকে দেকতে পেলাম সূর্যের রস্মি পড়েছে কাঞ্চনজঙ্গা পাহাড়ের উপর, বরফগুলো সুর্যের রস্মির বিকিরনে এক অদ্ভূত সোনালী রংগের দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে এ যেন এক সোনার পাহাড়।হোটেলে ফিরলাম সন্ধ্যায়, হোটেলের খাবার গুলো মোটেই পছন্দসই না। ওখানে সব খাবারের মধ্যে মিস্টি দেয় আর এটাই তাদের অভ‍্যাস।

আমরা গ‍্যাংটকে আরো দু-দিন থেকে চলে আসলাম কলকাতা শুধু রেখে আসলাম কিছু স্মৃতি, কিছু অভিজ্ঞতা আর রেখে আসলাম সোমা আর আমার জীবনের স্মৃতিময় কিছু কথা। কলকাতায় আরো সপ্তাহ খানেক থাকলাম, গেলাম রানাঘাটে বড় বোনের বাড়ী, খোজ নিলাম, হালিশহরের আমার পিশিদের যারা ১৯৭১ সালে চলে গেছে আর ফিরেনি। একদিন গেলাম, খিদিরপুরে আমাদের গ্রামের কিছু মানুষ ঐ খিদিরপুর ডকের পাশে থাকে, প্রকাশ, প্রফুল্ল, নরেন, মাইঝিলি, ভুলনা, সবুজ ওরা ঐ আগের মতোই আছে, বাবা বলেছিলো কলকাতা গেলে খোজ খবর নিস দমদমের খুদুবাবুদের, গেলাম তাদের বাসায়, কমল দা, রবি দা, পরিমল দা, পিযুষ দা, দেখে ভালো লাগলো, দমদমে তাদের কয়েটি বাড়ী অনেক ভালো আছে তারা। সুশিক্ষ‍ায় শিক্ষিত হয়েছেন তারা। আন্তরিকতা আছে সেই আগেরি মতো। সময় চলে আসলো ঢাকা ফিরার। সোমার পরীক্ষা সামনে তাই ও আর আসলো না। পরীক্ষার পর ঢাকা আসবে। তাই ওকে রেখে আমাকে ঢাকায় ফিরতে হলো।

নি এম/