eibela24.com
শনিবার, ২৪, জুলাই, ২০২১
 

 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
আপডেট: ০৫:৪৭ pm ১২-০৫-২০২০
 
 


অবশেষে দুর্চিন্তা এবং এক অনিশ্চয়তার মধ্যে গাবতুলি এসে পৌছাইলাম দুপুর ২:৩০ মিনিটের দিকে। এখনো জানি না আমার গন্তব্য স্হল কোথায়? হঠাৎ করে মনে পড়লো জগন্নাথ হলে নিতাই ভট্টাচার্য্যের রুমে যাবো। আমরা এক সময় ফরিদপুরে শচীন সাহার বাড়ীতে এক সাথে থাকার সুযোগ হয়েছিল। গাবতলিতে কিছু খেয়ে রওনা হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দিকে। এক অপরিচিত শহর জানি না কোথায় নামতে হবে? কম পক্ষে দশ জনের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, কি ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া যায়। গাবতুলি থেকে আসতে তিন থেকে চার বার বাসের রুট পরিবর্তন করেছি। অবশেষে পৌছালাম জগন্নাথ হলে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যখন তার রুমে গেলাম রুমমেটরা বললো দুদিন আগে তিনি বাড়ীতে গেছেন। অসহায়ের মতো নিতাইদার রুম মেটের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফিরে আসতে হলো ওখান থেকে। দিশেহারা অবস্থায় হঠাৎ মনে পড়লো আমার এক বন্ধুর বড় ভাইয়ের কথা। আমার বন্ধু তুষার ওর বড় ভাই তপন দা, উনি পিজি হাসপাতালে এফসিপিএস করে শুনেছিলাম তুষার এর কাছ থেকেই। খোঁজ করতে করতে বের করলাম তার রুম পিজি হাসপাতালের প্রথম বিল্ডিং এর ছয় তলায়। ভাগ্য এখানেও আমার সহায় হলো না তার রুমে তালা দেওযাঁ, রাত তখন ৯ টা বেজে গেছে। কি করব বুঝে উঠতে পারছিনা পরে পিজি হাসপাতালের নিচে নেমে সিলভানা নামে একটি হোটেলে রুটি তরকারি খেলাম রাতের খাবার হিসাবে। ভাগ‍্যের বিরম্বনা-জানি না কোথায় যেয়ে থামবে, কোথায় রাতে থাকবো এ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলাম। হাটতে হাটতে নিলক্ষেতের মোরে চলে আসলাম, বাম দিকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, একটু এগুলেই এফ রহমান হলের মধ্যে মসজিদ আমি মসজিদে ঢুকে গেলাম। ভীষন ক্লান্তি লাগছে, হাতের ব‍্যাগটি মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লাম মসজিদের মধ্যে। কখন যে ভোর হয়ে গেছে টেরই পাইনি। জেগে দেখলাম পাশে দুই একজন ছাত্র নামাজ পড়ছে। মনে মনে ভেবে নিলাম পৃথিবীতে সব চেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়স্হল মসজিদ বা মন্দির যেখানে কেই বিরক্ত করে না আর দুর দুর করেও কাউকে তাড়িয়ে দেয় না। যা হোক হল থেকে হাতমুখ ধুয়ে হাটতে হাটতে চলে গেলাম ভিতরের বিকে সূর্যসেন হল পাশ কাটাতেই দেখতে পেলাম ডান দিকে একটি ক‍্যান্টিন। ছেলেরা ঢুকছে মনে হলো সকালের খাবার খেতে। আমিও ঢুকে পড়লাম। সকালের নাস্তা ৬ টাকা। নাস্তা শেষ করে হাটা শুরু করলাম ধানমন্ডির দিকে। উদ্দেশ্য কম্পিউটার সার্ভিসেস। হেটে আসতে আসতে অনেকটা সময় লেগে গেলো। পৌছাইলাম ৯:২৫ মিনিটে। রিসিপশনে অপেক্ষা করতে থাকলাম সাব্বির ভাই এর জন‍্য। সাব্বির ভাই অফিসে আসলেন ১১:৩০ মিনিটের দিকে। বসে থাকলাম আরো এক ঘন্টা, ডাক পড়লো অবশেষে। উনি আগে থেকেই আমার সম্মন্ধে অবগত। তাই আমাকে ধরিয়ে দিলেন উনার ম‍্যানেজারের হাতে। ম‍্যানেজার অনিল দা, খুব রাগি টাইপের মানুষ। বললো প্রথমে তোমাকে কম্পিউটার শিখতে হবে। পাশের একজনের কাছে শিখতে বললো। কম্পিউটারের কি-বোর্ডে এটাই আমার প্রথম হাতেখরি। এমএমএক্স টেকনোলজি, ৪৮৬ প্রোসেসর, ৮ এমবি র‍্যাম। স্বপ্নের মতো মনে হতে লাগলো। কিবোর্ড ABCD লিখলে মনিটরে ভেসে উঠে। ৪/৫ ঘন্টায় অনেক কিছু শিখে ফেললাম আমি। শিখে ফেললাম নিজের নাম ঠিকানা লিখতে। ডকুমেন্ট সেফ করা শিখাও বাদ রইলো না। হাতের স্পীড উঠানোর পাশে একটি টাইপ রাইটার ছিলো। ওটায় প্রাকটিস করা শুরু করলাম। জীবনে প্রথম কম্পিউটারে হাত দিয়ে, প্রথম ডকুমেন্ট সেফ করতে যেয়ে একটি আত্মউপলব্দিতে উপনিত হলাম এই ভেবে যে, একটি কম্পিউটারের মেমোরি যদি অনেক ডকুমেন্ট সেফ করে রাখতে পারে অনেক দিনে জন‍্য বা যুগ যুগ ধরে তাহলে জলজ্যান্ত মানুষের মধ্যে যে হিউম‍্যান চিপ আছে, সেই চিপতো আরো বেশি সময় ধরে রাখতে পারে। হিউম‍্যান চিপকে তো আবার প্রোগ্রামও করা যেতে পারে। শুনেছি সমাজ ব‍্যবস্হায় অনেক মানুষ আছে যে কিনা-হিউম‍্যান ক্যালকুলেটর, ফটোস্কান মেমোরি। কতো কিই যে মনে পড়ছে আর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি এই কম্পিউটারটির দিকে। কখন যে সময় গড়ে বেজে গেছে সাতটা আমি যেনো টেরই পাইনি। সাব্বির ভাই চলে যাবার সময় হয়েছে, আমাকে দেখে ডাক দিলো। ফরিদপুরের দুই একটা কথা জিজ্ঞেস করলো আর বললো মন দিয়ে কম্পিউটার শিখতে। কম্পিউটারের স্পেসিফিকেশন সম্মন্ধে শিখতে বললেন। অফিস থেকে বের হলাম আজও জানি না রাতে কোথায় থাকবো। বাইরে থেকে কিছু খাবার খেয়ে ঐ মসজিদে অবশেষে যেয়ে ঘুমালাম। চিন্তা হচ্ছে এই রাত গুলো স্মৃতি আমার জীবনের পাতায় আর কতোদিন চলতে থাকবে, পরের দিন যথারীতি ওখান থেকে বের হলাম। নাস্তাটি সেরে নিলাম হলের ঐ ক‍্যান্টিনেই। হেঁটে হেঁটে শাহাবাগ আসলাম, হটাৎ করে দেখা হয়ে গেলো ফরিদ ভাই এর সাথে। ফরিদ ভাই এর বাড়ি কানাইপুর ইউনিয়নের ঝাউখোলা গ্রামে। আমাদের গ্রামের বাড়ী থেকে বেশী দুর নয়। সে মোহাম্মদপুর কাটাসুরে থাকেন, চাকরি করে হেল্থ ডিপার্টমেন্টে। প্রথম দেখাতেই তার সাথে আমার ম‍্যাচে থাকার কথা বললাম, রাজী হয়ে গেলো। আমার বুক থেকে যেন কষ্টের পরও এক পাহাড় নেমে গেল।

আমি ইতিমধ্যেই শিখে গেছি, যে কোন কেন্দ্রে পৌছাইতে গেলে ধাক্কা একটা আসবেই সেই ধাক্কা বুদ্ধি বিচক্ষনতা দিয়ে টিকে যেতে হবে নইলে নিজেই ছিটকে পড়ে যেতে হবে। একই কেন্দ্রবিন্দু স্হান, কাল, পাত্র ভেদে ভিন্নতর হতে পারে। আজকে কম্পিউটার সার্ভিসেস থেকে সারাদিন প্রাকটিস করে একটু আগে বের হলাম। বের হলাম এই জন‍্যই যে আমাকে ফরিদ ভাই এর ওখানে যেতে হবে যার ঠিকানা সকালে আমাকে দিয়েছে। যথারীতি আমি পৌছে গেলাম ১০/৩ কাটাসুর, মোহাম্মদপুর। এটা আমার প্রথম ম‍্যাচের জীবন ঢাকা আসার পর আর ভাবছিলাম গতো দুই দিন কিইনা কষ্ট করেছি। চলছে পর্যায়ক্রমে কম্পিউটার শেখার পালা। দুই মাসে কোর্স করে ফেললাম ১৫ দিনেই। টেকনিক্যাল নলেজ আমার আগা গোরাই ভালো ছিল তাই হয়তো আয়ত্বে চলে এসেছে। ওসি মোস্তফা কবির মনে হয় বলেই দিয়েছিলেন আমাকে কম্পিউটার শেখানোর জন‍্য এবং শিখে যাওয়ার পরে আমার বেতনও ধার্য‍্য করছিলেন কিন্তু এর মধ্যে পেয়ে গেলাম একাধিক কাজের অফার। একদিন সাব্বির ভাই এর বন্ধু আকবর ভাই আমাকে চাকরির অফার করলো তার সিপিং লাইনের কোম্পানিতে আর এক বন্ধু অফার করলো যমুনা ব্রিজের প্রধান কন্টাক্টর হুন্দাই করিয়ান কোম্পানিতে। করিয়ান কোম্পানিতে সুযোগ সুবিধা অনেক ভালো তাই আমি রাজি হলাম হুন্দাই কোম্পানিতে জয়েন্ট করার জন‍্য। চলবে...

নি এম/