eibela24.com
বুধবার, ১৭, জুলাই, ২০১৯
 

 
কর্ম ও কর্মফল বুদ্ধের ব্যখ্যা 
আপডেট: ০৬:০৩ pm ৩০-০৬-২০১৯
 
 


জগতে সকল প্রাণী জীবমাত্রই কর্মের অধীন।নিয়তি লেখা বাধ্যতা কর্মফল ভোগ করতে হইতে হবে।কর্মফল'কে কেউ ফাঁকি দিতে পারবেনা এবং রেহাই পাবেনা। কর্মফল ভোগ করতে হইতে হবে।তারপর বিচার ও পাওনা সমাপ্তি সমাধান কর্মফল।

যে অতীত ও ভবিষ্যৎ কর্মফল বিশ্বেস করবেনা এবং রাখতে পারবেনা। সেই ব্যক্তি জর্ম্ম জর্ম্মান্তর ভংয়কর শাস্তি ফল ভোগ করতে হইতে হয়। যেই ব্যক্তি কর্মফল'কে বিশ্বাস করে,চিন্তা করে,ভাবনা করে। সেই ব্যক্তি ভুল করে পাপ কাজ করবেনা।সেই ব্যক্তি তাড়াতাড়ি দুঃখ কষ্ট বেদনা সংহার বিচারের সমমুখী থেকে বিরতি থাকে

এক সময় ভগবান বুদ্ধ জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে বাস করেছিলেন।সে সময় তোদেয়্য ব্রাহ্মনের পুত্র শুভ মাণবক বুদ্ধের নিকট উপস্থিত হয়ে বুদ্ধের সাথে আনন্দময় আলাপ-আলোচনা করেন।

তারপর তোদেয়্য পুত্র শুভ মাণবক বুদ্ধকে বললেন, হে গৌতম পুত্র!

কী কারণে মানুষের মধ্যে কেউ হীন ও কেউ উৎকৃষ্ট, কেউ অল্পায়ু ও কেউ দীর্ঘজীবি, কেউ রোগী ও কেউ নিরোগী, কেউ বিশ্রী ও কেউ সুশ্রী, কেউ গরিব ও কেউ ধনী, কেউ অল্পশক্তিযুক্ত, কেউ নীচু কুলজাত, কেউ উচ্চ কুলজাত, কেউ জ্ঞানী ও অজ্ঞানী লোক জগতে দেখা যায়?

হে গৌতম!মানুষের মধ্যে এরূপ হীন ও শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ কী?

তখন বুদ্ধ উত্তরে বললেন, ‘হে মাণবক!
এ জগতে জীবমাত্রই কর্মের অধীন।
√কর্মই জীবগণের একমাত্র বন্ধু।
√কর্মই তাদের একমাত্র শরণ বা আশ্রয়।
√কর্মই জীবগণের একমাত্র রক্ষাকারী।
√কর্মই জীবগণকে হীন ও শ্রেষ্ঠভাবে বিভক্ত কর

তখন বুদ্ধ বললেন,‘হে মাণবক!

এ পৃথিবীতে কোনো কোনো প্রাণী হত্যাকরী এবং লোভী হয়্তারা সবসময় প্রাণীর রক্তে হাত রঞ্জিত করে।এভাবে হত্যা বা আহত করে জীবের প্রতি নিষ্ঠুর আচরন করে।
এ রকম আচরণের ফলে তারা মৃত্যুর পর অপায়, দুর্গতি, অসুরলোক বা নরকে যায়।যদি মানবকুল জন্ম নেয় তবে তারা কম আয়ু পায়।

হে মাণবক!
প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর হওয়া এবং হতাহত জীবের প্রতি নিষ্ঠুরতাই কম আয়ু পাওয়ার অন্যতম কারণ।

হে মাণবক!
কোনো কোনো নারী পুরুষ প্রাণীহত্যা থেকে বিরত থাকে।তারা অস্ত্র ফেলে দেয়, প্রাণী হত্যায় লজ্জা অনুভব করে।সকল প্রাণীর প্রতি করুণা প্রদর্শনপূর্বক জীবন ধারণ করে।

এভাবে কুশল কাজ করে এবং কুশল জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে তারা জীবনযাপন করে।এ জন্য মৃত্যুর পর তারা স্বর্গে যায়।
স্বর্গে না গিয়ে আবার মানুষ হয়ে জন্ম নিলেও দীর্ঘ জীবন পায়।প্রাণীদের প্রতি করুণা পরায়ণ ও উপকারী হয়ে জীবহত্যা থেকে বিরত থাকার জন্য তারা দীর্ঘজীবি হয়।

‘হে মাণবক!
পৃথিবীতে কোনো কোনো নারী বা পুরুষ প্রাণীদের উপর অত্যাচার করে।তারা ঢিল, লাঠি বা অস্ত্রের দ্বারা জীবের উপর অত্যাচার চালায়।জীবের উপর এ রকম অত্যাচার করা উচিত নয়।
এ ধরনের কষ্ট দেওয়ার জন্য তারা অপায়, দুর্গতি, অসুরলোক অথবা নরকে জন্ম নেয়।আর যদি মানবকুলে জন্মগ্রহন করে তবে তারা সবসময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়’।

‘হে মাণবক!
এ পৃথিবীতে কোনে কোনো নারী বা পুরুষ রাগী হয়।সামান্য কথাতেই তারা রেগে উঠে।মন্দ কথা বলে।রাগ, হিংসা দীর্ঘদিন ধরে মনে পুসে রাখে এবং পরে তা আবার প্রকাশ করে।

এরূপ কাজের জন্য তারা অপায়, দুর্গতি, অসুরলোকে অথবা নরকে জন্মগ্রহণ করে।আর যদি তার মানবকুলে জন্ম নেয়ও তবে তাদের চেহারা খুবই বিশ্রী হয়।এটিই তাদের বিশ্রী হওয়ার কারণ’

‘হে মাণবক!
পৃথিবীতে কোনো কোনো নারী বা পুরুষ রাগহীন হয়।তাদের শত কিছু বললেও তারা রাগ করে না, লাফালাফি ও উচ্চবাক্য করে না।এ জন্য তারা মৃত্যর পর স্বর্গে যায়।

স্বর্গে না গিয়ে আবার মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও দীর্ঘ জীবন পায়।প্রাণীর প্রতি করুণা পরায়ণ ও উপকারী হয়ে জীবহত্যা থেকে বিরত থাকার জন্য তারা দীর্ঘজীবি হয়।হে মাণবক!এটি তাদের সুশ্রী হওয়ার অন্যতম কারণ।

‘হে মানবক!
কোনো কোনো নারী বা পুরুষ ঈর্ষাপরায়ণ হয়।যশ-গৌরব সম্মান, শ্রদ্ধা বা পুজা পাওয়া লোকদের তারা ঈর্ষা করে।আক্রোশ প্রকাশ করে।দোষী বলে সাব্যস্থ করে।এরূপ কাজের জন্য তারা অপায়, দুর্গতি, অসুরলোকে অথবা নরকে জন্মগ্রহণ করে।

তারা মানবকুলে জন্ম নিলেও গরিব পরিবারে জন্মগ্রহণ করে।হে মানবক!এটাই গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণ।

‘হে মানবক!
কোনো কোনো নারী বা পুরুষ ঈর্ষাপরায়ণ হয় না।যশ-গৌরব, সম্মান, শ্রদ্ধা পূজা পাওয়ার লোকদের তারা ঈর্ষা করে না।ঈর্ষার কারণে কারো প্রতি আক্রোশ প্রকাশ করে না।

দোষী বলে সাব্যস্থ করে না।এজন্য তারা স্বর্গে যায়।মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করলে মহাপরিবারে জন্ম নেয়।এটাই মহাপরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণ।

‘হে মাণবক!
এ পৃথিবীতে কোনো কোনো নারী বা পুরুষ দাতা হয় না।শ্রমণ ব্রাহ্মণকে খাদ্য, পানীয়, কাপড় কোন কিছুই দান করে না।
এরূপ কাজের জন্য তারা অপায়, দুর্গতি, অসুর লোক অথবা নরকে জন্ম নেয়।আর যদি মানবকুলে জন্ম নেয়ও তবে তারা খুব গরিব হয়।এটাই গরিব হওয়ার কারণ’।

‘হে মানবক!
এ পৃথিবীতে কোনো নারী বা পুরুষ অহংকারী হয়।

সে অভিবাদনের যোগ্য ব্যক্তিকে অভিবাদন করে না।দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর যোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান করে না।আসন দানের যোগ্য ব্যক্তিকে আসন দান করে না।

পূজনীয় ব্যক্তিকে পূজা করে না।মান্য করার যোগ্য ব্যক্তিকে মান্য করে না।এরূপ কাজের জন্য তারা অপায়, দুর্গতি, অসুরলোক অথবা নরকে জন্ম নেয়।আর যদি মানবকুলে জন্মগ্রহণ করে তারা নীচুকুলে জন্ম নেয়।

আর যদি মানবকুলে জন্ম নেয়ও তবে তার নীচকুলে জন্মগ্রহণ করে।এটাই নীচুকুলে জন্ম নেওয়ার কারণ’।

‘হে মানবক!
এ পৃথিবীতে কোনো কোনো নারী বা পুরুষ অহংকারী হয় না।

অভিবাদনের যোগ্য বক্তিকে অভিবাদন করে।এছাড়া যোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করেন, আসন দানের যোগ্য ব্যক্তিকে আসন দান করে, পূজা করার ব্যক্তিকে পূজা করে, মান্য করার যোগ্য ব্যক্তিকে মান্য করে।

এজন্য তার স্বর্গে যায়।আর মানুষ হয়ে জন্ম নিলেও উচ্চকুলে জন্মগ্রহন করে।এটাই উচ্চকুলে জন্মগ্রহণ করার কারণ’।

‘হে মানবক!
এ পৃথিবীতে কোনো কোনো নারী বা পুরুষ শ্রমণ বা ব্রাহ্মণের নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ভন্তে, কুশল কী?অকুশল কী?

কী দোষের নয়?কী সেবা করা উচিত নয়।কোন কাজ করলে তা আমার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্টকর ও দুঃখকর হবে এবং কোন কাজ করলে তা আমার জন্য দীর্ঘকাল সুখ বয়ে আনবে?

এরূপ কাজ করলে তারা অপায়, দুর্গতি, অসুরলোক অথবা নরকে জন্ম নেয়।আর যদি মানবকুলে জন্মও নেয় তবে তার প্রজ্ঞাহীন নয়।এটাই প্রজ্ঞাহীন হয়ে জন্মগ্রহণের কারণ’।

‘হে মাণবক!
এ পৃথিবীতে কোনো নারী বা পুরুষ, শ্রমণ ব্রাহ্মণের নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, কুশল কী?অকুশল কী?

কী কী দোষের নয়?কিসের সেবা করা উচিত?কিসের সেবা করা উচিৎ নয়?কোন কাজ করলে তা দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট অনিষ্টকর দুঃখকর হবে?

কোন কাজ করলে তা আমার জন্য দীর্ঘকাল সুখ বয়ে আনবে।এরূপ কাজের জন্য তারা স্বর্গে যায়।আর মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করলে মহাজ্ঞানী হয়ে জন্ম নেয়।এটাই মহাজ্ঞানী হয়ে জন্মগ্রহণ করার কারণ’।

‘হে মাণবক!
এরূপে অল্প আয়ু, দীর্ঘ আয়ু, জটিল ব্যাধিগ্রন্থ, নিরোগ, বিশ্রী, সুশ্রী, দুঃখী পরিবার, ‍সুখী পরিবার, গরিব, ধনী, অল্পশক্তিসম্পন্ন, মহাশক্তিসম্পন্ন, উঁচুকুল, নিচুকুল, জ্ঞানহীন, মহাজ্ঞানী নানারকম মানুষ দেখা যায়’।

‘হে মাণবক!
কর্মই জীবগণের সঙ্গী।জীবগণ কর্মেরই অধীন।কর্মের মাধ্যমেই মানুষ বিভিন্নকুলে জন্মগ্রহণ করার কারণ হয়।

অর্থাৎ তারা দুর্গতি, অপায়, অসুরলোক, নরক বা মানবকুলে জন্ম নেয়।কর্মই বন্ধু।কর্মই প্রতিকারণ।সুতরাং কর্মই মানুষকে হীনকুলে নিয়ে যায়।কর্মই আবার মানুষকে উঁচুকুলে নিয়ে যায়।উঁচুবংশে জন্মাতে সাহায্য করে।শ্রেষ্ঠ করে তোলে’।

নি এম/