eibela24.com
মঙ্গলবার, ২৩, জুলাই, ২০১৯
 

 
বছরের ৩৬৫ দিনই হোক ‘মা দিবস’     
আপডেট: ১২:০৯ pm ১৪-০৫-২০১৯
 
 


জন্মদাত্রী হিসেবে আমার, আপনার, সকলের জীবনে ‘মায়ের’ স্থান সবার ওপরে। তাই তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়তো কোনো প্রয়োজন নেই। তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিকে ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যার সূত্রপাত ১৯১৪ সালের ৮ই মে থেকে। সঙ্গে উপহার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সাদা কার্নেশন ফুল।

সমীক্ষা বলছে, বছরের আর পাঁচটা দিনের তুলনায় এদিন অনেক বেশি মানুষ নিজের মাকে ফোন করেন, তাঁর জন্য ফুল কেনেন, উপহার দেন। তবে সত্যি করে বলুন তো, মায়েদের কি আলাদা করে কোনো উপহারের প্রয়োজন পড়ে? তাঁরা যে সন্তানের মুখে শুধুমাত্র ‘মা’ ডাক শুনতে পেলেই জীবনের পরম উপহারটি পেয়ে যান।

উপনিষদে বলা হয়েছে, ‘‘মাতৃ দেব ভব”। অর্থাৎ মা দেবী স্বরূপিনী, জীবন্ত ঈশ্বরী। তাছাড়া হিন্দুধর্মে মহাশক্তি, আদিশক্তি, রক্ষাকর্ত্রীর ভূমিকায় আমরা যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের কিন্তু আমরা মাতৃরূপেই চিনেছি। এ জন্য কুসন্তান বলা হলেও, কুমাতা কখনও বলা হয় না।

কোনো মা, তা তিনি যে পেশাতেই থাকুন না কেন, যত কুশ্রীই হন না কেন, সন্তানের কাছে তিনি কিন্তু দেবীর মতোই। আর শুধু হিন্দু ধর্মে কেন? ইসলামে ‘মায়ের পায়ের নীচে বেহেস্ত’ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। খ্রিষ্টধর্মেও রয়েছে ‘মাদার মেরির’ বিশেষ তাৎপর্য। সেই মায়ের জন্য কিনা বছরে একটা মাত্র দিন!

তবে বর্তমান সময়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়, সন্তানদের তাঁর বাবা-মা ছোটবেলায় পরম স্নেহে লালন-পালন করে তুললেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন অধিকাংশ সন্তানই তাঁর বাবা-মাকে কাছ থেকে দূরে সড়িয়ে দেয়। অনেকেই ওল্ড হোম বা বৃদ্ধদের জন্য আবাসিক ভবনে এসে আশ্রয় নেন। কেউ হয়তো স্বাধীনভাবে থাকার জন্য স্বেচ্ছায় চলে যান বৃদ্ধাশ্রমে, কেউবা নিতান্ত বাধ্য হয়েই এ ভাগ্যকে বরণ করে নেন। বয়স্ক বাবা-মা কোথায় কেমন আছেন, সেই খবর নেয়ার সময় যার নেই তার নিজের সন্তানও হয়তো একদিন তার সাথে এমন আচরণই করবে! প্রবীণরা আমাদের অনেকের কাছেই স্রেফ ‘বুড়া-বুড়ি’। তবে আমরা ভুলে গিয়েছি সমাজে প্রচলিত প্রবাদবাক্য, ‘যদি কিছু শিখতে চাও, তিন মাথার কাছে যাও’। আর তা হচ্ছে আমাদের প্রবীণরা, আমাদের শেকড়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা সে শেকড়টি যেন উপড়ে ফেলছি।

বর্তমান সময়ে বাইরে আমরা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে যেকোনো বিষয় নিয়ে হেসে-খেলে কথা বললেও, বাড়িতে এসে বাবা-মায়ের সাথে সামান্য বিষয়েই রেগে গিয়ে তাঁদের মুখের উপর দু-চার কথা শুনিয়ে দিই। আমরা ভুলে যাই তাঁরা আমাদের পিতা এবং মাতা। যারা কিনা আমাদের সুখের জন্য তাঁদের জীবনের সর্বসুখ বির্সজন দিয়েছেন। যে বাবা-মা একসময় নিজে না খেয়েও সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের কপালে জোটে নিদারুণ লাঞ্চনা-বঞ্চনা।

তবে সবার মনে রাখা উচিত, তার নিজের সন্তানকে তিনি যেভাবে লালন-পালন করছেন, তাঁর পিতা-মাতাও তাঁকে সেভাবেই লালন-পালন করে বড় করেছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে নিজের সন্তানের মতোই বাবা-মাকে আরেক সন্তান মনে করে, অবহেলায় বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে না দিয়ে, তাদের সেভাবেই সেবা-যত্ন দিয়ে তাদের বাকি জীবনকে যতটুকু সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা যায়, তা করে যেতে হবে। অবহেলা, অযত্ন আর দায়মুক্তির মন-মানসিকতা নিয়ে কোনো সন্তানই যেন তাঁর মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে না দেন। এই উদ্দেশ্যে যেমন কঠোর আইন করা দরকার, তেমনি দরকার নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার, সামাজিক অনুশাসনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। আপনার কোমলমতি সন্তান ইঞ্জিনিয়ার হবে, ডাক্তার হবে এই স্বপ্নে আপনি হয়তো বিভোর। সন্তান “মানুষ” হবে কিনা, সেটি ভাবার সময় কোথায়?

আমাদের মনে রাখা উচিত- আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যান, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। আপনি ভেবে দেখুন- বেঁচে থাকতে কতদিন, কতবার বাবা-মাকে আদর করেছি আমরা? কতবার বলেছি ‘মা/বাবা, তোমায় খুব ভালোবাসি’? জীবনচক্রের ঘূর্ণন শুরু হয় সেই জন্মলগ্ন থেকে। এরপর ছোটবেলা কাটিয়ে উঠে কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য, আর সবশেষে অনিবার্য মৃত্যু। এই ধ্রুব সত্য শুধু আপনার-আমার নয়, সবার জন্য। তাই দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিন। যতদিন ‘মা’ বেঁচে আছেন, ততদিন, প্রতিটি দিন পালন করুন ‘মা দিবস’ হিসেবে।

নি এম/