eibela24.com
শনিবার, ২০, জুলাই, ২০১৯
 

 
প্রীতিলতার প্রতি শ্রদ্ধা
আপডেট: ০৯:১৯ pm ২৬-০৯-২০১৮
 
 


লুৎফুল কবীর রনি

প্রীতিলতা এক মহীয়সী বাঙালি নারীর নাম, তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী বীরকন্যা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ৮৩ বছর আগে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ২১ বছর বয়সে যে ত্যাগ আর বীরত্বের নিদর্শন রেখে গেছেন বাঙালি জাতি, আমাদের পিছিয়ে থাকা সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে লৈঙ্গিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে প্রেরণা হয়ে থাকবেন।

মাতৃভূমিকে বিদেশি নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে উপমহাদেশের প্রথম আত্মোৎসর্গকারী নারী শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

আদর করে মা প্রতিভাদেবী তাকে "রাণী" ডাকতেন। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম শহরের আসকার খানের দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে টিনের ছাউনি দেয়া মাটির একটা দোতলা বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতেন ওয়াদ্দেদার পরিবার। অন্তর্মুখী,লাজুক এবং মুখচোরা স্বভাবের প্রীতিলতা ছেলেবেলায় ঘর ঝাঁট দেওয়া,বাসন মাজা ইত্যাদি কাজে মা-কে সাহায্য করতেন।

ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ছিল প্রীতিলতার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯১৮ সালে তিনি এই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রতি ক্লাসে ভালো ফলাফলের জন্য তিনি সব শিক্ষকের খুব প্রিয় ছিলেন। সেই শিক্ষকের একজন ছিলেন ইতিহাসের ঊষাদি। তিনি প্রীতিলতাকে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষীবাই এর ইংরেজ সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন। স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত (পরবর্তীকালে বিপ্লবী)। এক ক্লাসের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তাদের স্বপ্নের কথা লিখেছেন কল্পনা দত্ত. "কোন কোন সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড় বিজ্ঞানি হব। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদের আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখা শুরু করলাম।"

স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিলো। ১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অঙ্কের নম্বর খারাপ ছিল বলে তিনি বৃত্তি পেলেন না। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বন্ধের সময় তিনি নাটক লেখেন এবং মেয়েরা সবাই মিলে সে নাটক চৌকি দিয়ে তৈরি মঞ্চে পরিবেশন করেন। পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার সময়টাতে তার বাড়িতে এক বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু প্রীতিলতার প্রবল আপত্তির কারণে বিয়ের ব্যবস্থা তখনকার মতো স্থগিত হয়ে যায়।

আই.এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতন ও হয়ে যেত। এ কারণেই অল্প বেতনের চাকুরে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে আই.এ. পড়তে ঢাকায় পাঠান। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান। বেথুন কলেজে মেয়েদের সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বানারসী ঘোষ স্ট্রীটের হোস্টেলের ছাদে বসে প্রীতিলতার বাশীঁ বাজানো উপভোগ করতো কলেজের মেয়েরা।

প্রীতিলতার বি.এ. তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সবার চাইতে ভালো ফলাফল লাভ করতেন। এই বিষয়ে তিনি অনার্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিপ্পবের সঙ্গে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে অনার্স পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করেন। কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তার সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাদের ২০১২ সালের ২২ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

`মাগো, অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?`

-স্বেচ্ছা-আত্মাহুতির আগে প্রীতিলতা তার মায়ের কাছে লিখেছিলেন।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে `ইউরোপিয়ান ক্লাব`-এর বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা "কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ"। ক্লাবের ভেতরে চলছে বড় বড় সব ব্রিটিশ অফিসারদের পার্টি। ধুতি, পাঞ্জাবি আর মাথায় পাগড়ি পরা একজন ক্লাবের বাইরের রাস্তায় অনেকক্ষণ ধরে ওঁত পেতে আছেন।`ফুলতার` নামে সবাইকে নিজের পরিচয় দেন তিনি। একটু পরে ঘড়িতে সময় দেখলেন ফুলতার। রাত ১০টা বেজে ৪৫ মিনিটে হুইসেল বাজালেন। তখন অন্ধকার থেকে মূর্তিমান আতংকের মতো বেরিয়ে আসলো আরো ৬-৭ জন। তারা হলেন কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী, মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে আর পান্না সেন। হাতে তাদের `ওয়েবলি রিভলভার`। মুহূর্তের মাঝে সুশীল দে আর মহেন্দ্র চৌধুরী ক্লাবের দেয়াল টপকে দক্ষিণের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন, আর গুলি করে বিশাল বড় হলরুমের বাতিগুলো নিভিয়ে দেন। ব্রিটিশ অফিসারদের বুঝে উঠতে একটু সময় লাগলো, আসলে কী ঘটেছে! যখন তারা বুঝলো, তখন তারাও পাল্টা গুলি ছুঁড়তে লাগলো। মুহূর্তেই ক্লাব ঘর পরিণত হলো রণক্ষেত্রে।

ফুলতার নামের ধুতি-পাঞ্জাবি পরা যে ব্যক্তি হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি আসলে কোনো পুরুষ নন। তিনি পুরুষের ছদ্মবেশে একজন নারী। তার আসল নাম `প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার`। আক্রমণ শেষে পালানোর সময় বুঝলেন ব্রিটিশরা কুকুর নিয়ে তাড়া করেছে। এদিকে প্রীতিলতা গুলি খেয়ে দৌড়ুতেও পারছেন না। কিন্তু ধরা দেওয়া যাবে না ব্রিটিশদের হাতে কোনোমতেই। প্রীতিলতা তার সঙ্গে দৌড়াতে থাকা কালীকিংকরের কাছে পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলেন। সেটা পেয়েই মুখে ঢেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন প্রীতিলতা। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে রাতের আঁধারে মিশে গেলেন সাথের কমরেডরা।

প্রীতিলতার মৃত্যুর পর তার পরিবারের অবস্থা নিয়ে কল্পনা দত্ত লিখেছেন- `প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন,

কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন,`আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে`। তাদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না। তবু তিনি তারা দুঃখেকে দুঃখ মনে করেননি। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে নিয়েছেন। প্রীতির বাবা প্রীতির দুঃখ ভুলতে পারেননি। আমাকে দেখলেই তার প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন`।

প্রীতিলতা কালো ছিলেন। আত্মীয়স্বজনের বিরূপ মন্তব্যের উত্তরে মা প্রতিভাময়ী দেবী বলেছিলেন, ‘আমার কালো মেয়ে তোমাদের সবার মুখ আলো করবে।’ হ্যাঁ, প্রীতিলতা আলোর যে মশাল জ্বেলেছিলেন ধলঘাটের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে, সেই আলো ছড়িয়ে যাক সারা দেশে, সারা বিশ্বে—এ প্রত্যাশা

বিপ্লবী কন্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। একটি নাম। শতকোটি চেতনার গর্বিত শিহরণ। যিনি ছিলেন সদা অবিচল তার কর্তব্যনিষ্ঠায়, দেশপ্রেম চেতনায়, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। যার কাছে তার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান ছিল দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মুক্তি।

প্রয়াণ দিবসে বলি বিপ্লবের জননী,আমি আজও বিশ্বাস করি প্রীতিলতার জন্ম যে মাটি সে মাটিতে মৌলবাদের কবর রচিত হবেই।

লেখক: সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মী।

নি এম/