বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯
বৃহঃস্পতিবার, ৬ই আষাঢ় ১৪২৬
 
 
শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পর্যবেক্ষেণেই কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজন
প্রকাশ: ০২:৪০ pm ৩১-০১-২০১৯ হালনাগাদ: ০২:৪০ pm ৩১-০১-২০১৯
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


নজরুল ইসলাম তোফা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজ আমল থেকে আরম্ভ করে আজ অবধি চলে আসছে। এই ব্যবস্থা আসলেই পুস্তক কেন্দ্রিকই বলা চলে। পাঠ্য বইয়ের কথা গুলো কোনও রকমে মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উদ্গীরণ করতে পারলে যেন, কৃতিত্বের সহিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অসুবিধাটি তাদের আসে না। সুতরাং এমন এ পরীক্ষায় জ্ঞানের পরীক্ষা না হলেও 'স্মৃতি-শক্তির' পরীক্ষায় পর্যবসিত হয়েছে। তাদের সুন্দর জীবন গঠনে পুঁথিগত বিদ্যার কিছুটা প্রয়োজন আছেও বৈকি। এইকথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু, 'পুঁথিগত' শিক্ষা মানুষকে জীবনের সমস্যা সমাধান করে না। 

জার্মানির বোখুম শহরের একটি স্কুলে পড়াশোনা বিষয়টি একবারেই নতুন পদ্ধতিতে কিংবা খেলাধুলার ছলে শেখান হয়৷ সেখানে প্রোমোশন ও ভালো রেজাল্ট বড় কথা নয়৷ ছোট ছেলে-মেয়েরা কারিগরি ক্লাসে তরোয়াল তৈরি করতেই শেখে৷ আসলেই তারা খেলার ছলেই শেখে বিভিন্ন কায়দাকানুন৷ তাছাড়াও প্রতিটি শিশুর কাজ করার ধরনও আলাদা৷ সুতরাং শিশুরাই যেন প্রস্তাব দেয়, তারা কী করতে চায় বা না চায়৷ শিশুর ইচ্ছেটা প্রতি এখানে পুরোপুরি দাম দেয়া হয়। শিক্ষা লাভের ক্ষেত্র সঙ্কীর্ণ নয়- বলা যায় 'বিস্তৃত'। বিদ্যালয়ে লেখা পড়া ছাড়াও যে সমস্ত কাজ গুলো বিদ্যালয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, সেই গুলোকে আপাত-দৃষ্টিতে অর্থহীন বলে মনে হলেও যেন প্রকৃত পক্ষে তা- নয়। যেমন, বাগান করা, পিকনিক করা, নানাবিধ উৎসব পালনে শিক্ষা, গণতান্ত্রিক জীবনযাপনে শিক্ষা, ছড়া-আবৃত্তি এবং গল্পে শিক্ষা, কর্মসঙ্গীত, সাফাই কিংবা প্রার্থনায় শিক্ষা, চলতি খবর, সমবায় সমিতি মাধ্যমে শিক্ষা, পরিবেশ পর্যবক্ষেণে শিক্ষা, দিনলিপির দ্বারা শিক্ষা, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত এবং খেলাধুলাসহ ইত্যাদি ধরনের অনেক কাজ আছে, সেগুলোর দ্বারা তাদের শিক্ষার উন্নতি প্রসারিত হবে। 

বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুকিশোরা শিক্ষা ব্যবস্থায় বড্ড বেশিই একমুখী হয়ে যাচ্ছে। উপযুক্ত 'কর্মমুখী' শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিশু-কিশোররা যেন মনুষ্যত্ব অর্জনে যথার্থ ''মানুষ'' হতে পাবে। সুতরাং, সন্তানের শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠিত আছে শিক্ষা গ্রহণের নানা ধরনের 'প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো'। সকল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে 'জ্ঞানদান' করা। কিন্তু, "কারিগরি" জ্ঞানাঅর্জনের মাধ্যমেই যেন শিশু কিশোররা দিনে দিনে যোগ্যতা অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছে। সে উদ্দেশ্যে আজও তেমন 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠান' গড়ে উঠেনি। শিশু কিশোরদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ'কে যদি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বলে শিকার করি, তবেই এ প্রচলিত শিক্ষাকে কখনোই পরিপূর্ণ শিক্ষা আখ্যা দেয়া যায় না। 

প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যক্তিসত্তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। শিশু কিশোরদের অতি স্বাভাবিক মানসিক পরিনতি এবং কৌতূহল, আগ্রহ, আবেগ, আনন্দ, সামর্থ্য কিংবা অনুরাগের মতো এই 'স্বাভাবিক প্রবণতা' গুলোকে একে বারেই অস্বীকার করা হয়েছে। শিশুদের সুস্থ সবল দেহ ও মন, সাহস, ধৈর্য, কর্তব্য বোধ বা দ্বায়িত্ব পালনের যোগ্যতা, সত্য, সুন্দরের প্রতি শ্রদ্ধাবান হওয়া, কর্ম-ক্ষমতা বাড়ানো, স্বার্থ ত্যাগ, সহযোগিতা, রুচিবোধ, স্বদেশ প্রেম এবং নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা ছাড়াও বহু কিছুই আছে, যা এমন প্রচলিত পুঁথিগত শিক্ষা ব্যবস্থায় দেয়া হয় না। শিশু তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে জ্ঞান লাভ করে কেবল তার কান দুটি দ্বারা শুনে। তাই শিক্ষায় সমস্ত ইন্দ্রিয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিশু স্বভাবতই কর্মী- কিন্তু শ্রোতা হতে কষ্ট বোধ করে। ধৈর্য তাদের অনেকাংশে কম। কর্মচঞ্চলতাই তাদের স্বাভাবিক ধর্ম। শিশুদের এমন প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্মকে অস্বীকার না করে, নানা রকম শিল্প এবং হাতের কাজের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ দরকার। শিশুর প্রয়োজনের দিক গুলোকে দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে নিরানন্দ মনটিকে আনন্দিত করা বাঞ্ছনীয়। তারা লিখতে, পড়তে, অঙ্ক কষতেই শিখেছে, কিন্তু শেখেনি কাজের মানুষ হতে, সামাজিক হতে, স্বাবলম্বী বা আত্মপ্রত্যয়শীল হয়েও উঠা তাদের কখনোই হয়নি। 

এক কথায় বলাই যায়, প্রচলিত শিক্ষায় শিশুদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাতে পারেনি। শিক্ষার মুল কথা হল, শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ, তাদের দৈহিক বৃদ্ধি, মানসিক এবং আত্মার উন্নতি সাধন করা, আবেগ অনুভূতির যোগ্য প্রকাশের সুযোগ করানোটাকেই মনে করি।

বাংলাদেশের শিশু কিশোররা যোগ্যতা দিয়ে- শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে কেমন করে সেটিই আসলেও ভাবনার বিষয়। শিক্ষাতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিবর্তন না হলে তা কখনো সম্ভব নয়। শিশুরা যখন সারা বিশ্বে উন্নতি এবং অগ্রগতির অবদানের পাশাপাশি খেলা-ধুলা সহ সৃষ্টিশীলতায় পারদর্শিকতা অর্জনের সঙ্গেই সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছে। তখন এমন এ বাংলাদেশের 'শিশু কিশোররা' ক্রমশই যেন পিছিয়ে পড়ছে। সুতরাং, শিশুদের এগিয়ে যাওয়ার বিনোদন ক্ষেত্র সৃষ্টি করতেই হবে। শিশুদের বিনোদনের জন্য একেবারেই শৈশব থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে খেলার ব্যবস্থা করাতে হবে। 

শুধু তাই নয়, এ 'খেলা' গুলো যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়, সে দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। শ্রেণী কক্ষে আবধ্য শিশুদের কচি মুখের দিকে দৃষ্টি দিলে মনে কষ্ট জাগে। বদ্ধ কক্ষে বসে শিক্ষকদের 'বতৃতা' শুনতে নারাজ। একটু নড়া চড়াতেই যেন শিক্ষকের ধমকানী। তাদের দৈহিক এবং মানসিক দিক থেকে বিচার করলে এই শিক্ষা পদ্ধতি মনোবিজ্ঞান সস্মত নয়। শিশুকে অবাধ খেলাধুলার স্বাধীনতা কখনোই দেওয়া হয় না। আসলে ক্লাশ শুরুর আগে খেলাধুলা করলে সব শিশুরা শান্ত মনে এবং স্হির চিত্তে বিদ্যা পাঠে বা শিক্ষা গ্রহণে মনোযোগী হতে পারে। বিভিন্ন কারণে তাদের অনেকের মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ এবং ভয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। মনের মধ্যে ঐ সকল প্রবৃত্তি, ভাবাবেগ, শান্ত মন, অস্থির চিত্ত দূর হবে। 

সুস্থ কিংবা সবল জাতি গঠনেই খেলা ধুলার কোনো বিকল্প নেই। শিশুর পাঠাভ্যাসে একঘেয়েমির জন্যে স্কুলমূখী হতে চায় না। আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমেই পাঠদান করানো দরকার। রবীন্দ্রনাথ বলেছে তাহল ''বাল্যকাল হইতেই আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নেই, কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যক, তা কন্ঠস্হ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না। সঠিক শিক্ষা না হলেই যে পারিবারিক, সামাজিক- দ্বায়িত্ব পালনে তারা তেমন কোনও সহায়তাই করে না। সুতরাং জীবনের বৃহত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে- যে গুণাবলির প্রয়োজন, সেই গুলো পুঁথিগত শিক্ষা থেকেই আহরণ করা যায় না। জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়েই যে শক্তি অর্জিত হয়, সে শক্তি অর্জনটাই যেন- শিক্ষার উদ্দেশ্য। শিশুদের জন্মগ্রহণ করালেই সে শিশু প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। শিশু সন্তানকে যথার্থ মানুষের মতো মানুষ করে তোলার জন্যে সাধনার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হয়। কোমলমতী শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। শৈশবের সময়টাই প্রাণোচ্ছলতা কিংবা আরামের মুহূর্ত। সেই দিকটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে লালন-পালন করতে হবে। সন্তানরা তো কখনো কখনো 'ক্লান্ত-শ্রান্ত' হয়েই ঘুমে ঢুলুঢুলু বা অস্থির কিংবা চঞ্চল হয়। ঠিক তখন শিশুকে পাঠাভ্যাসে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণটা হলো তখন এসব শিক্ষা মনে বসবে না। এমনকি সে এসম্পর্কে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখাতেও পারে। তাই শিশুদের গল্প শুনাতে হবে। শিশুদের বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের গল্প, গাছপালা নিয়ে গল্প, রূপকথার গল্প, সহজ পৌরাণিক গল্প, মজার গল্প, জিন- পরীর গল্প এবং জন্তু-জানোয়ারের গল্পগুলি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে শেষ করা প্রয়োজন। কাল্পনিক গল্পই শিশুরা অনেক ভালবাসে কারণ তারা কল্পনা প্রবণ।

সৃজনশীলতা বাড়াতেই পাঠ্য পুস্তকের পড়া-শোনার পাশাপাশি কল্পনা ও কর্মমুখী বিষয়গুলোতেই জোর তাগিদ দেয়া আবশ্যক। 
পড়াশোনাকে প্রাণবন্ত এবং উপভোগ্য করবার জন্য মাঝে মধ্যে তাদেরকে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন রয়েছে বৈকি। মানসিক গঠনের জন্যে যে "মূল-মন্ত্র" আছে, তাকে পরিপূর্ণতা দিতে শিশু, কিশোর কিংবা শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষা-মূলক মজার মজার সহজ পুস্তক তুলে দেয়া দরকার। প্রযুক্তি গত ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, তাদেরকে এনে দিতেই পারে- সৃজনশীলতা, মননশীলসম্পন্ন অনেক আবেগ। তাদের পাঠ চর্চায় কঠোরতার কারণে- শিশুদের মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্য প্রীতি যেন বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা দিনে দিনেই মাদকতা, সন্ত্রাস, নেশা, দুর্নীতি সহ খুন নিয়েই কোনো না কোনো ভাবেই বড় হবে। এ সকল সংঘটিত হচ্ছে উঠতি বয়সী কোমলমতি সন্তানদের মাধ্যমেই। ফলে, যোগ্য হিসেবে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতেও পারছে না। এমন নানা ভাবনা চিন্তাবিদরা হরহামেশা পরামর্শ দিয়ে থাকে। এ থেকে পরিত্রাণের উৎকৃষ্ট উপায়টি হচ্ছে বিনোদন মূলক বই পড়ানোর অভ্যাস সৃষ্টি করা। বই পাঠে তাদের আনন্দ আসবে, মানসিক পরিবর্তন ঘটবে এবং সন্তানের উন্নত ধ্যান ধারণাও জন্মাবে। ফলত তারাই আপন জগতকেও চিনবে। অপরাধবোধ, অপচিন্তা দূর হবে। দেশ-প্রেম, জাতি-প্রেম, আপনাতেই জেগে উঠবে। আর তখনই উন্নত-সমৃদ্ধর 'জাতি' তৈরির পাশাপাশিও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে। শিশুর শিক্ষার প্রধান কথা শেষ নিরিখে বলা যায় আগ্রহ সৃষ্টি। তাই ভালো লাগা, মন্দ লাগা এবং রুচিশীলতা বৃদ্ধি করার সঙ্গে বুদ্ধির প্রবণতাকেই কর্মমুখী শিক্ষায় জীবন গড়ানো প্রয়োজন। কর্মমুখী শিক্ষার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবেই সরকারি উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ একটি সুনামধন্য অতিশয় গুনান্বিত নাগরিক জাতি পাবে।

নজরুল ইসলাম তোফা
সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক

নি এম/
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71