সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭
সোমবার, ৪ঠা পৌষ ১৪২৪
 
 
মানব পাচারে 'পুরো' থাইল্যান্ড জড়িত
প্রকাশ: ০৮:৩৫ pm ২২-০৫-২০১৫ হালনাগাদ: ০৮:৩৫ pm ২২-০৫-২০১৫
 
 
 



আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মালয়েশিয়ায় মানব পাচারে থাইল্যান্ডের সবাই জড়িত, এমনই এক ভয়ানক তথ্য উঠে এসেছে বিবিসির এক সাংবাদিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।  


তিনি তার প্রতিবেদনে জানান, দেশটির সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ জনগণ সবাই মানব পাচারের ব্যবসার সাথে জড়িত।  


গত মাসের শেষ দিকে আন্দামান সাগরে থাইল্যান্ডের একটি দ্বীপে পাচারের শিকার মানুষের গণকবরের সন্ধান পাওয়ার খবর যখন বাতাসে ভাসছে, তখন একদল থাই স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে ওই এলাকায় যান বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রতিবেদক জোনাথন হেড।


পাচারকারীরা কীভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, ভাগ্য বদলের আশায় কাঠের নৌকায় সাগরে ভাসা মানুষকে জিম্মি করে কীভাবে তারা মুক্তিপণ আদায় করছে, এবং থাই প্রশাসন কীভাবে তাতে সহযোগিতা দিচ্ছে তার বিস্তারিত উঠে এসেছে শুক্রবার বিবিসিতে প্রকাশিত হেডের প্রতিবেদনে।


থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের ওই দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই জায়গাটি মানবপাচারের আস্তানা হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ার খবর হেডের কানে আসে। আর যে জায়গায় গণকবর পাওয়া গেছে, সে স্থানটি পাচারকারীরা ব্যবহার করছিল অবৈধ অভিবাসীদের সাময়িকভাবে রাখার ক্যাম্প হিসাবে। সময় সুযোগ মতো সেখান থেকে তাদের পাঠানো হত দক্ষিণে, মালয়েশিয়ার সীমান্তের দিকে।


হেডের সঙ্গে থাকা স্বেচ্ছাসেবীরা জলাকাদার মধ্যে গভীর করে মাটি খুঁড়ে প্রথমে এক টুকরো হাড়ের সন্ধান পান। এরপর পাওয়া যায় ভেজা কাপড়, যার মধ্যে পাওয়া যায় হলদে হয়ে আসা এক নারীর কঙ্কাল। 


হেডের মতে, তিনি কে ছিলেন, কীভাবে তার মৃত্যু হল তা আমরা হয়তো আর জানতে পারব না। তবে এটা প্রায় নিশ্চিত, তিনি পাচারের শিকার হাজারো মানুষের একজন ছিলেন।


হেড বলেন, গত অক্টোবরে ঠিক প্রায় ওই এলাকাতেই ছিলেন তিনি। তাকুয়া পা জেলার কর্মকর্তারা এক দল অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে শুনে আমরা ব্যাংকক থেকে ছুটে গিয়েছিলাম। স্থানীয় কমিউনিটি হলে আমরা মারাত্মক বিপর্যস্ত ৮১ জন পুরুষকে পেলাম; তারা কাঁদছিলেন এবং প্রার্থনা করছিলেন।


মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে সেখানে যাচ্ছে- এমন খবর প্রচলিত থাকলেও জোনাথন হেড যাদের দেখা পেলেন তারা ছিলেন বাংলাদেশি। তারা আমাদের বলেন, তাদেরকে জোর করে নৌকায় তুলে এখানে আনা হয়েছে।



জঙ্গলের যে জায়গাটায় নারীর কঙ্কাল পাওয়া যায়, তার কাছাকাছি ওই জায়গায় হেডকে নিয়ে যান জেলার প্রধান মনিত পিয়ানথং। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই মানুষদের মারধর করা হয় এবং বেশ কয়েকদিন ধরে তারা অভুক্ত রয়েছে।


জোনাথন হেড বলেন, মনিত আমাদের বলেন,  নৌকা থেকে অভিবাসীদের ট্রাকে স্থানান্তরের জায়গা হিসেবে তার জেলাটিকে দীর্ঘদিন ধরে পাচারকারীরা ব্যবহার করছে। তিনি এটাকে বন্ধ করতে চাইলেও কেন্দ্রীয় সরকার বা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে তেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন না।


বেশ কয়েকদিন ধরে আমি দেখলাম, তিনি ক্ষুব্ধ সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের ফোন ধরায় ব্যস্ত ছিলেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য তারা তাকে ধমকাচ্ছিল। একইসঙ্গে মনিত বাংলাদেশিদের অভিবাসন হেফাজত কেন্দ্রে পাঠাচ্ছে দাবি করে তাকে বকছিল। এখানে পাঠানো অভিবাসীদের অনেককেই যে পাচারকারীদের কাছে বেচে দেওয়া হয়- তা মোটমুটি ওপেন সিক্রেট


অস্থায়ী ওই ক্যাম্পগুলির সন্ধানে মনিত নিজের কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ব্যবহার করতেন। ট্রাকবোঝাই অভিবাসীদের থামাতে তিনি দক্ষিণমুখী প্রধান সড়কে ২৪ ঘণ্টা পাহার বসান। এমনকি, জেলেদেরও তিনি বলে রাখেন, যাতে তারা কোনো নৌকা আসতে দেখলেই তাকে খবর দেন।

 

বিবিসির এই সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ, সঙ্গে বাড়তে থাকা বাংলাদেশিদের আগমন প্রমাণ করে যে আদম ব্যবসাবিস্তৃত হচ্ছে এবং আশ্চর্যের কিছু নেই যে, এটা অত্যন্ত মুনাফাযোগ্য ব্যবসা।

 

লাভ জনক ব্যবসা আদম পাচার:

জোনাথন হেড লিখেছেন, রাবার গাছগুলোর নিচে ছিল হাঁস ফাঁস করা গরম। পাহারে উঠতে আমার যখন দম ফুরিয়ে আসছিল, তখন উজ্জ্বল কমলা রঙয়ের শার্ট পরা এক যুবক আমার সামনে চলে এল। সামনে দৃশ্যমান কেনো পথ ছিল না। যুবকটি থেমে তাড়াতাড়ি কথা বলতে শুরু করলো।

 

ওই যুবক বললো, ছয় মাস আগে আরো ৬০০ জনের সঙ্গে তাকেও সেখানে আনা হয়। ছাদবিহীন অবস্থায় কীভাবে ঘুমাতো- তা বুঝাতে সে ঝরা পাতা ও পোকামাকড়ের উপর শুয়ে পড়লো।

 

সেখানে একটা তাবুতে তাদের এনে রাখে পাচারকারীরা। অর্থের জন্য তাদের বাবা-মার কাছে ফোন করতে বাধ্য করে তারা। টাকা দিতে না পারলে তাদের পেটানো হয়।

 

কিছু দূরে ইঙ্গিত করে যুবকটি দেখালো, ওখানে এক নারীকে ধর্ষণ করতে দেখেছে তারা। পাচারের শিকার এসব মানুষের মৃত্যু হলে ট্রাকে করে তাদের লাশ সরিয়ে নেওয়া হতো।

 

থাইল্যান্ডের গ্রামবাসীর সামনে পাচারকারীরা কীভাবে এই ব্যবসা চালাচ্ছে তারও অনুসন্ধান চালিয়েছেন জোনাথন হেড। তিনি বলেন, আমি যে ক্যাম্পটি দেখলাম তার থেকে হাত ইয়াই শহর গাড়িতে মাত্র ৩০ মিনিটের পথ। তারা স্থানীয় লোকদেরও এই পাচার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

 

ওই ক্যাম্পের কাছেই একটি গ্রামের লোকরা কীভাবে পাচার ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, ‘বয়নামে গ্রামের এক মুসলিম যুবকের কথায় তাও তুলে ধরেছেন হেড। ছেলেটি বলল, কয়েক বছর আগে পাখি শিকার করতে এসে এই ক্যাম্প অতিক্রম করার সময় সে দেখে, শিশুসহ অভিবাসীদের পেটানো হচ্ছে। এর পর থেকে সে একাই পলাতক অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়া শুরু করে।

ওই অঞ্চলের প্রধান উৎপন্ন রাবারের দাম পড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে উপার্জনের মোক্ষম বিকল্প হিসেবে গ্রামবাসীরা এই কাজ বেছে নেয়।

 

জড়িত থাই কর্তারা:

বিবিসির সাংবাদিক লিখেছেন, থাই কর্মকর্তাদের সায় না থাকলে এই ঘটনাগুলি অসম্ভব হলেও এর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততা কতটুকু- তা পরিষ্কার নয়। তবে এখানে অবশ্যই অনেক উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তার হাত রয়েছে।

 

তিনি বলেন, গত বছরের শেষ দিকে, আদম ব্যবসা সম্পর্কে ভাল জানে এরকম একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে ব্রিফিংকরে। মালয়েশিয়ার সীমান্তে হাজারখানেক মানুষকে রাখা যায় এরকম একটা বড় ক্যাম্পের কথা তিনি আমাকে জানান।

 

ওটা বন্ধ করা হয়নি কেন- হেডের এই প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা হেসে বলেছিল, তুমি জান, সীমান্ত হলো সামরিক এলাকা। সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আমার করার কিছুই নেই। ওটা বন্ধ করার অনুমতি কখনোই পাননি ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

 

ওই কর্মকর্তা বলেন, নীরবে দেখে যাওয়া ছাড়া তার কিছুই করার নেই। ছয় মাস পর ওই ক্যাম্পে ২৬টি মৃতদেহের প্রথম একটি গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পরও তিনি নির্বিকারভাবে পর্যবেক্ষণ করেই যাচ্ছিলেন।

 

এই ব্যবসার সাথে দেশটির সেনা কর্মকর্তারাও জড়িত। পাচারের সঙ্গে জড়িত বহুল পরিচিত রাজ্য রানোংয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ব্যবসায়ীর বিষয়ে তদন্তের কাগজপত্রও একজন কর্মকর্তা তাদের দেখিয়েছেন বলেন জানান হেড।

 

থাইল্যান্ড-মালিয়েশিয়ার সীমান্ত এলাকা সামরিক এলাকার আওতাভুক্ত। আর সেসব এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী আছে। প্যাকেটেরবিনিময়ে অনুমতি নেওয়া ছাড়া কারও পক্ষে এই রকম আকারের ক্যাম্পগুলি পরিচালনা করা সম্ভবই না।


সূত্র- বিবিসি


এইবেলা ডট কম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71