সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০
সোমবার, ২৬শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
বিদেশি মদদে করোনা কালেও জেএমবি-র তৎপরতা বাড়ছে
প্রকাশ: ০৬:৩৭ pm ২৫-০৬-২০২০ হালনাগাদ: ০৬:৩৭ pm ২৫-০৬-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


বিশ্ব জুডে় করোনা অতিমারির মধ্যেও সক্রিয় জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। পশ্চিমবঙ্গও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে ধরা পড়া জঙ্গিদের জেরা করে এমনই তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশে জেএমবি তাঁদের গ্রামীণ তকমা মুছে ফেলে শহরেও বিস্তার করেছে নিজেদের জাল। বাংলাদেশে নাশকতা চালানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতের বাংলা ভাষী এলাকাকে। সেখান স্বার্থান্বেষি মহলকে কাজে লাগিয়ে গা ঢাকা দিয়েই কষছে নাশকতার ছক। ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত, জেএমবি বা নব্য-জেএমবি-র তহবিলে বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থায়ণ চলছে। সঙ্গে রয়েছে মাদক বা মানব পাচার কারবার থেকে শুরু করে বিভিন্ন অসৎ উপায়ে বিপুল অর্থ সংগ্রহ। বাংলাদেশ বা ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিলেও বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত মদদ পাচ্ছে জঙ্গিরা।

বাংলাদেশে এই করোনা কালেও ধরা পড়ছে জেএমবির সক্রিয় কার্যকলাপ। গত ১০ জুন রাজধানী ঢাকার মহাখালী থেকে জেএমবি’র দুই সদস্য টাঙ্গাইল জেলার সখীপুরের মো. রুহুল আমিন মল্লিক (৩৮) ও ঢাকার পল্লবীর মো.মোস্তাফিজুর রহমান (৬৩)-কে আটক করেছে র্যালব।একই দিনে, র্যাব ভালুকা থেকে জেএমবি -র মঞ্জুরুল ইসলাম, রুহুল আমীন তালুকদার তৌফিক ও আশরাফ খানকেও আটক করেছে। এর আগে ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকেই গ্রেপ্তার হন জেহাদি সংগঠন নব্য-জেএমবির মহিলা বাহিনীর প্রধান আসমানী খাতুন ওরফে নিখোঁজ আলো। তাঁকে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই খোঁজা হচ্ছিল। তাঁর স্বামী ইসলাম আল হিন্দ জেএমবির একটি অংশের আমির বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালাচ্ছেন। 

বাংলাদেশ পুলিশ নিশ্চিত, জেএমবি বেশ সক্রিয়।ভারতেও সম্প্রতি বেশ কয়েক জন জেএমবি সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। ৮ জুন কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স বা এসটিএফ হুগলির ডানকুনি থেকে গ্রেফতার করেছে জেএমবির জঙ্গি শেখ রেজাউল ওরফে কিরণকে। শেখ রেজাউল জেএমবির প্রধান সালাউদ্দিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল। এর দিন দশেক আগে মুর্শিদাবাদ থেকে গ্রেফতার হন জেএমবির আব্দুল করিম ওরফে বড় করিম। তাঁর কাছ থেকেই রেজাউলের নাম পাওয়া যায়। তাঁদের জেরা করে পুলিশ জানতে পারে, করোনা ভাইরাসকে হাতিয়ার করে পরিযায়ী শ্রমিকের ছদ্মবেশে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছে জেএমবি-র শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন সালেইন ও মিন্টুখান। সালাউদ্দিন ও মিন্টুর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে এসটিএফ জানিয়েছে। সীমান্তের উভয় পারেই জেএমবি বা নব্য-জেএমবি সদস্যদের জেরা করে পুলিশ জানতে পেরেছে, বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলের বদলে এখন শহরে শিক্ষিতদের মধ্যে বেশ সক্রিয় এই জঙ্গি সংগঠনটি।

সূত্রের খবর, ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রমে শিকড় মজবুত করেই সলামিক স্টেট বা আইএস জেএমবি জঙ্গি গোষ্ঠীর মাধ্যমে নিজেদের ‘জেহাদি’ মতাদর্শ ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশে লাগাতার চলা অভিযানের জেরে জেএমবি কিছুটা কোণঠাসা হলেও শেষ হয়নি। ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সেলগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে আবু মহম্মদ আল বাঙালি।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে 'জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ বা জেএমজেবি'র জন্ম হয়। ২০০৪ সালের দিকে সংগঠনটির নাম বদলে হয় জামা'তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবি। ২০০৫ সালে সারা সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের পর সবার নজর কাড়ে জেএমবি। ২০০৭ সালে সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম এবং শায়খ আব্দুর রহমানের ফাঁসি হয়। আরেক নেতা সালাহ উদ্দিন ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান। সালাউদ্দিন ভারতে গা ঢাকা দিয়ে জেএমবি-নের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘ইসলামী শাসন’প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ফেরি করছেন। বাংলাদেশ সরকার বার বার তাঁদের দেশে আইএস-এর কার্যকলাপের কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু আইএস'র মুখপত্র 'দাবি ক'-এ স্পষ্টই বলা হয়, জেএমবিকে বাংলাদেশে তাদের ঘনিষ্ঠ সংগঠন। গত বছরই জেএমবি ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। গত বছরের জুলাই মাসে ভারতের জাতীয় সংসদে জেএমবি জঙ্গিদের কার্যকলাপ বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেন গৃহমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী জিকিষান রেড্ডি। তিনি বলেছিলেন, 'নিরপাত্তারক্ষীরা জানতে পেরেছেন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরাতে জেএমবি-র সংগঠনের কর্মীরা লুকিয়ে রয়েছে। ভারতে গা ঢাকা দিয়ে জিহাদি দুনিয়ার দুই কুখ্যাত ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং আল কায়দার লড়াইয়ের ময়দান তৈরি করছে জেএমবি। দুই সংগঠনই গাঁটছড়া বেঁধেছে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পিছনে থাকা জেএমবি-র সঙ্গে।' আসলে আইএস-আলকায়দার লক্ষ্য বাংলার ‘গ্লোবালজিহাদ’ বাবাজার জিহাদ। সেই বাজারের দখল নিতেই তৈরি হয়ে গিয়েছে জামাতুল ইসলাম ইন্ডিয়া। অন্যদিকে রয়েছে জামাতুল ইসলাম বাংলাদেশের নব্য-শাখা যাঁরা নব্য-জেএমবি বলে বেশি পরিচিত।

উল্লেখ্য, আইএস কার্যকলাপের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত রিটাকাটজ্তাঁ-র একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ইরাক এবং সিরিয়াতে পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই আইএস ‘গ্লোবালজিহাদ’ ধারণার জন্ম দেয়। দুই জেমবি-র অন্তত ৩০০ সক্রিয় সদস্য রয়েছে ভারতে। দফায় দফায় তাদের দেওয়া হচ্ছে সামরিক প্রশিক্ষণও। ভারতে লুকিয়ে থাকলেও তাঁদের আসল টার্গেট বাংলাদেশ। 

২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের একটি পুলিশ ছাউনিতে বিস্ফোরণের ঘটনাও তারই ইঙ্গিত দেয়। হামলার দায় স্বীকার করে আইএস। তখন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রহমান বলেছিলেন,'নব্য-জেএমবি সদস্যরাই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি-না সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নই। তবে বিস্ফোরণের ধরন দেখে আগের ঘটনার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে।' নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজরজেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, সিরিয়া এবং ইরাকে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের আবির্ভাবের পর জেএমবি’র কর্ম পদ্ধতিও বদলে গেছে। 

গত পাঁচ বছরে ইন্টারনেটে জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জেএমবি’র মতো সংগঠন গুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ তৈরি করছে। দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা টার্গেট কিলিং-এ অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশে জেএমবি টার্গেট করছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিদেশী নাগরিকদের।

মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য জিম ব্যাঙ্কস, চাকফ্লাইশম্যান ওর্যা্ন্ডি ওয়েবার গত বছর নভেম্বর মাসেই সে দেশের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্টার টেররিজম দপ্তরকে এবিষয়ে চিঠি লিখে অবিহিত করেন। তাঁরা যৌথ চিঠিতে লিখেছিলেন,‘জামায়াতে ইসলামিও তার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বেনামি গ্রুপগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে। আমাদের হাতে এখন পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। এই গ্রুপ সমূহ জঙ্গি মতবাদের প্রচারেও তার পক্ষে অর্থ সংগ্রহেও ব্যস্ত।’এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, জেএমবির অর্থায়ণের বিষয়টি নিয়ে। সাউথ এশিয়ান টেরোরিজম পোর্টালে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ, কুয়েত, পাকিস্তান, সৌদিআরব, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন থেকে আর্থিক সাহায্য পায়। 

কুয়েত ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা রিভাই বল অব ইসলামিক হেরিটেজ, দৌলয়াতুল কুয়েত, আমিরাত ভিত্তিক আল ফুজাইরা, খাইরুল আনসার আল খায়রিয়া, বাহরাইন ভিত্তিক দৌলয়াতুল বাহরাইন এবং সৌদি আরব ভিত্তিক আলহার মেইন ইসলামিক ইনস্টিটিউট থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে। এছাড়াও মাদক ও মানব চোরা কারবার থেকেও অর্থ পাচ্ছেন জঙ্গিরা। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে হিমাগার এবং চিংড়ি পালন ব্যবসার থেকেও তোলা বাজি চলছে। মিডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী জামায়াতের প্রায় ৫২১ টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল সমিতি, ক্লিনিক, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কোচিং সেণ্টার পলিটেকনিক ইন্সটিউট প্রভৃতি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত টাকা সন্ত্রাসবাদের কাজেও খরচ করেন। বিদেশী রাষ্ট্রের কুটনীতিকেরাও জেএমবি-কে সাহায্য করে বলে এর আগেও বাংলাদেশি মিডিয়া সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আফগানিস্তানের তালেবান এবং আলকায়েদা বাংলাদেশে জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ এবং ইসলামী ঐক্যজোটকে তাদের কার্যক্রমে মদদ যুগিয়েছে বলেও গোয়েন্দাদের অনুমান।

জে এস/
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71