বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯
বৃহঃস্পতিবার, ৬ই আষাঢ় ১৪২৬
 
 
বাংলা ও বাঙালি গর্ব ঢাকার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশ: ০৪:৫৭ pm ০১-০৩-২০১৯ হালনাগাদ: ০৪:৫৭ pm ০১-০৩-২০১৯
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


মাজহারুল ইসলাম  
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় খাঁটি বাঙাল এবং অনিবার্যরূপে আমাদেরই লোক। পূর্ববঙ্গের তো বটেই। খাস ঢাকারও। ভানুর প্রকৃত নাম সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। জন্ম ২৭ আগস্ট ১৯২০ ঢাকার বিক্রমপুরে। পিতা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। মা সুনীতি বন্দ্যোপাধ্যায়। শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের শুরুটা কেটেছে ঢাকায়। সদরঘাটের সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজের শিক্ষা শেষে ১৯৪১ সালে জীবিকার জন্য চলে যান কলকাতায়। শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, সাধারণ পেশা, সম্মানজনক জীবিকার সুযোগের কারণে কলকাতার গুরুত্ব তখন ছিল সর্বাধিক। পূর্ববাংলার প্রচুর মানুষ শিক্ষা, পেশার কারণে কলকাতায় দ্বিতীয় আবাস গড়ে তুলেছিলেন। কলকাতার বালীগঞ্জের অশ্বিনী দত্ত রোডে বোনের আশ্রয়ে থেকে চাকরিতে যোগ দেন আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি নামক সরকারি দফতরে। দুই বছর বোনের কাছে থাকার পর টালিগঞ্জের চারু এভিনিউতে নিজের পৃথক আবাসে ওঠেন।

১৯৪৬ সালে নীলিমা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ে করেন। তাদের তিন সন্তান। গৌতম, বাসবী এবং পিনাকী। চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করেন ‘জাগরণ’ ছবিতে। সেটি মুক্তি পায় ১৯৪৭ সালে। একই বছর দ্বিতীয় ছবি ‘অভিযোগ’ মুক্তি পাওয়ার পর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ক্রমেই হয়ে পড়েন চলচ্চিত্রের ব্যস্ত শিল্পী। আর মার্চের ৪ তারিখে ১৯৮৩ সালে মাত্র ৬২ বছর বয়সে মানুষ হাসানোর অসামান্য এই মানুষটি অকালে মৃত্যুবরণ করেন।

ঢাকার স্থানীয় কুট্টি ভাষাকে পশ্চিমবাংলা জুড়ে ছড়িয়ে ঢাকার ভানু খ্যাতিমান হয়েছিলেন। তার কৌতুক নকশাসমূহে এবং বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের সংলাপগুলো নির্ভেজাল ঢাকার কুট্টি ভাষায় প্রয়োগ ও প্রচার করে নিজেকে ঢাকার ভানু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। এমনিতে পূর্ববঙ্গীয় বাংলা ভাষা নিয়ে পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের নাক সিটকানো, ব্যঙ্গোক্তি, বিদ্রূপ, হাসি-তামাশার কমতি ছিল না। পূর্ববাংলার প্রচলিত বাংলা ভাষাকে তারা রীতিমতো উপহাস করতেন। এর ওপর ঢাকার স্থানীয় কুট্টি ভাষা তাদের পক্ষে সহ্য-হজম করা কঠিন থেকে কঠিনতর ছিল। ভানুর ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা নিশ্চিত তাদের কান গরম করে দিত। তাচ্ছিল্যের ঢাকাইয়া ভাষাকে পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে উল্টো তাদেরই নাজেহাল করে ছেড়েছেন। ভানুর অসাধারণ কৌতুকপূর্ণ ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা তারা নিরুপায়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভানুর কৌতুকে মানুষ হেসেছে— নির্মল আনন্দ উপভোগ করেছে। ভানুর কৌতুক কেবল হাসিসর্বস্ব ছিল না। তির্যক ছিল বহুলাংশে। অসঙ্গতি-অনাচারের শৈল্পিক উপহাস করেছেন কৌতুকের মাধ্যমে। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি সকল ক্ষেত্রের অসঙ্গতি নিয়ে কৌতুকে তির্যক করেছেন— খোঁচা দিয়েছেন। ভানুর কৌতুকের উল্লেখযোগ্য দিকটি অসঙ্গতিকে উপহাস করা। সেটা সার্থকভাবে তিনি করেছেন। দম ফাটানো হাসিতে লুটোপুটি খেলেও ভানুর তির্যকপূর্ণ কৌতুক শ্রোতাদের বুঝতে বেগ পেতে হতো না। সহজ-সাবলীল এবং সর্বজন বোধগম্যে ভানুর কৌতুকের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।

১৯৪৭ থেকে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পূর্ববর্তী বছরগুলোতে পূর্ববাংলায় কলকাতায় নির্মিত বাংলা এবং মুম্বাইর হিন্দি ছবি অবাধে প্রদর্শিত হতো। সে কারণে পূর্ববঙ্গের দর্শকদের কাছে ভানু অপরিচিত-অজ্ঞাত কেউ ছিলেন না। বরযাত্রী (১৯৫১), পাশের বাড়ি (১৯৫২), সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩), ওরা থাকে ওধারে (১৯৫৪), ভানু পেল লটারী (১৯৫৮), যমালয়ে জীবন্ত মানুষ (১৯৫৮), পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (১৯৫৯), ভানু অভিনীত অনেক ছবি এখানে নিয়মিত প্রদর্শিত হওয়ার কারণে ভানু দুই বাংলায়ই সমান জনপ্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতার পরই অডিও ক্যাসেটে ভানুর কৌতুক নক্শা শোনার সুযোগ পেয়েছিলাম। এর-ওর থেকে ক্যাসেট সংগ্রহ করে হরহামেশা শুনতাম অসাধারণ সব কৌতুক নক্শা। ভানুর মতো বাংলা ভাষায় অন্য কেউ তার স্থানে আজ অবধি দাঁড়াতে পারেনি এবং তাকে অতিক্রমও করতে পারেনি। ভানু তাই আজো একমাত্র এবং অদ্বিতীয়। ভানুর অভিনয়শৈলী, অভিব্যক্তি, বাচনভঙ্গি, কণ্ঠস্বর সব মিলিয়েই হাস্যকৌতুকের দিকপাল ভানু। দর্শক-শ্রোতাদের কখনো সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর বৃথা চেষ্টা তিনি করেননি। শ্রোতা-দর্শকদের হাসানোর অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ভানু। ক’বছর আগে কলকাতা ভ্রমণে নন্দনে ছবি দেখতে গিয়েছিলাম। ছবি দেখে বের হচ্ছি, হঠাৎ কলকাতার স্থানীয় আমার সঙ্গীটি ইশারায় এক ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে নিচুস্বরে বলেন, ওই মহিলা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় মেয়ে। শুনেই আমি ছুটে যাই ভদ্রমহিলার কাছে। দ্বিধা-সংকোচের পরোয়া না করে জিজ্ঞেস করি তিনি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে কিনা? অপরিচিত আমার প্রশ্নে তিনি কিছুটা ইতস্তত। তার মুখে হ্যাঁ শোনার পর তাকে বলি— আমি ঢাকা থেকে এসেছি। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আমার ছিল না। কিন্তু তার সৃজনশীলতার সঙ্গে আমার পরিচয় বহু আগের। আমার কথায় তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তার পিতার প্রসঙ্গে অনেক প্রশ্ন করি এবং তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন নির্মল আন্তরিকতায়, সামান্যতম বিরক্ত না হয়ে। ভানুর সদৃশ তাঁর মেয়ে বাসবী, একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ভানু পারিবারিক পরিমণ্ডলে আজীবন খাস ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন। কলকাতার স্থানীয় বাঙালিদের ঘটি বলতে ছাড়তেন না। বাসবীর কাছে জেনেছিলাম ভিন্ন এক ভানুর কথাও। যে কথা কেউ কেউ জানলেও, অনেকেই জানেন না। আমিও জানতাম না। মাত্র গত ডিসেম্বরে জি-বাংলা চ্যানেলের ‘মীরাক্কেল’ অনুষ্ঠানে বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছিলেন। রজতাভ দত্ত সে প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেনও আমাকে বলা সেই একই কথা, তার বাবা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সশস্ত্র স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সক্রিয় সদস্য ছিলেন সশস্ত্র স্বদেশী সংগঠন অনুশীলন দলে। কলকাতার রাইটার্স অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন তিন দেশপ্রেমিক স্বদেশী বীর। বিনয়, বাদল এবং দীনেশ। অপারেশনে তিনজন পৃথকভাবে রাইটার্সে ঢুকেছিলেন সেদিন। দীনেশকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অপারেশন সংঘটনে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল ভানুর ওপর। সাইকেলের সামনে বসিয়ে দীনেশকে রাইটার্সের গেটে পৌঁছে দিয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে দীনেশকে নামিয়ে গেটের বাইরে সাইকেল নিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ভানু রাইটার্স এলাকা ত্যাগ করেছিলেন। রাইটার্স অপারেশনের পরিণতি আমরা জানি। ইউরোপীয় পোশাকে সজ্জিত তিন বিপ্লবী রাইটার্সে আচমকা আক্রমণ করে হত্যা করেন কুখ্যাত কর্নেল সিম্পসনকে। নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিন ইংরেজ পুলিশ কর্মকর্তা টোয়াইনাম, প্রেন্টিস ও নেলসন গুরুতর আহত হন। ধরা পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে বাদল বসু পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে ঘটনাস্থলে আত্মহত্যা করেন। বিনয় বসু ও দীনেশ গুপ্ত নিজেদের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেডিকেল ছাত্র বিনয় বসু সবার অলক্ষ্যে বুলেটের ক্ষতস্থানে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে আত্মহত্যা নিশ্চিত করেন। গুলিবিদ্ধ দীনেশ সুস্থ হলে বিচারে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে উপনিবেশিক ইংরেজ শাসক। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের রাজনৈতিক-দেশপ্রেমের এই অধ্যায় জানা সম্ভব হতো না, যদি সেদিন আগ বাড়িয়ে বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ না করতাম। ভানুর টানেই সেদিন তাঁর মেয়েকে পেয়ে ছুটে গিয়ে আলাপ করে ভানু সম্পর্কে জেনেছিলাম অনেক অজানা কথা।

এই অসামান্য প্রতিভার মানুষটিকে যোগ্য সম্মান আমরা দিতে পারিনি। আমাদের একজন চলচ্চিত্রকার কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাঁকে এখানে কেউ ডাকেনি। এই লজ্জা আমাদের বহন করতেই হবে। অগত্যা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। বিটিভি তাকে নিয়ে অনুষ্ঠানও সম্প্রচার করেছিল। সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, কৌতুক পরিবেশন করেছিলেন ওই অনুষ্ঠানে। জানি না বিটিভির আর্কাইভে সেই অনুষ্ঠানটি সংরক্ষিত আছে কি-না? বিটিভির সাক্ষাৎকারে ভানু আক্ষেপে-শ্লেষে বলেছিলেন— ‘আমাকে আপনারা কেউ ডাকলেন না। আপনাদের ডাকের অপেক্ষায় বহুদিন ছিলাম। কিন্তু আপনারা কেউ আমাকে ডাকেননি।’ আমরা নিশ্চয়ই ভানুর প্রতি সুবিচার করিনি। ঢাকার ভানুকে ঢাকা যোগ্য সম্মান দিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই লজ্জা আর মোচন হবে না। নিজেকে কেবল পূর্ববঙ্গীয় নয়, খাস ঢাকার বলেই গর্ব করে বলতেন—আমি বাঙাল। এতে তার হীনমন্যতা ছিল না। ছিল প্রচণ্ড অহংকার বোধ।

তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র মনোমুগ্ধ (১৯৪৯), বরযাত্রী (১৯৫১), পাশের বাড়ি (১৯৫২), বসু পরিবার (১৯৫২), সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩), ওরা থাকে ওধারে (১৯৫৪), ভানু পেল লটারী (১৯৫৮), যমালয়ে জীবন্ত মানুষ (১৯৫৮), পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (১৯৫৯), গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬), ৮০-তে আসিও না (১৯৬৭), মিস প্রিয়ংবদা (১৯৬৭), ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট (১৯৭১), সর্বশেষ ছবি শোরগোল তার মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল। বান্দিশ (১৯৫৫) এবং এক গাঁও কি কাহানী (১৯৫৫) এই দুটি হিন্দি ছবিসহ ভানু অভিনীত সর্বমোট চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৩১টি। ২২৯টি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন অসামান্য প্রতিভাধর সপ্রতিভ অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কৌতুক নক্শাসমূহ ভানু এলো কলকাতায়, লর্ড ভানু, টেলিফোন বিভ্রাট, ভানু সদানন্দ, নব রামায়ণ, ঘাতক সংবাদ, কর্তা বনাম গিন্নি, কর্তা বাবুর দেশভ্রমণ, হনুমানের নগর দর্শন, কলকাতা ও ভদ্রতা, চাটুজ্যে-বাড়ুজ্যে ইত্যাদি।

মনে-প্রাণে খাঁটি এই বাঙালি ভানুর মৃত্যুদিন আর মাত্র দু’দিন পরে। বাংলা ও বাঙালির গর্ব ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

মাজহারুল ইসলাম
নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71