সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭
সোমবার, ৪ঠা পৌষ ১৪২৪
 
 
বাংলাদেশের শেষ ইহুদি পরিবার
প্রকাশ: ১১:৫১ am ২৬-০৫-২০১৫ হালনাগাদ: ১১:৫১ am ২৬-০৫-২০১৫
 
 
 


ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতেই রাজশাহী শহর ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ অগ্রসর ছিল। এ সময় ওলন্দাজরা রাজশাহী শহরে কুঠি তৈরি করে, আবার বাংলার তদানীন্তন রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে বেশ কিছু ধনী ও রাজকীয় পরিবার বর্গীদের ভয়ে সরে রাজশাহীতে চলে আসে। রাজশাহী শহর উদারভাবে এসব বহিরাগতকে বরণ করে নেয়। ফলে রাজশাহী শহরে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের সম্মিলন ঘটে। দীর্ঘকাল ধরে এসব জাতি ও ধর্মের মানুষ এ শহরে একত্রে বসবাস করছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এ রকম অনুকূল পরিবেশে একটি ইহুদি পরিবার রাজশাহী শহরে আসে এবং প্রায় ১৩৫ বছর সেখানে বসবাস করে।
ইহুদিরা কখন, কেন, কীভাবে রাজশাহী এসে পৌঁছায়, তা কোথাও কোনো দলিলপত্রে উল্লেখ নেই। ১৮৭৬ সালে উইলিয়াম হান্টার প্রথম উল্লেখ করেন, রাজশাহী জেলায় চারজন ইহুদি বসবাস করেন। এই পরিবারের পঞ্চম প্রজন্ম এবং রাজশাহীতে শেষ প্রতিনিধি ছিলেন মর্ডিসাই কোহেন বা মডি (এই নামে আরও কয়েকজন ইহুদি ছিলেন)। মডি তাঁর পরিবারের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, কোহেন পরিবারের প্রথম সদস্য—যিনি রাজশাহী পদার্পণ করেন—তাঁর নাম ছিল ইসহাক কোহেন, সেটা ছিল ১৮৩৩ সালের দিকে। ইসহাক কোহেন ইরানের ইস্পাহান প্রদেশ থেকে কলকাতায় আসেন, সেখান থেকে সপরিবারে নদীপথে প্রথমে কুষ্টিয়া, পরে ঢাকা এবং শেষে রাজশাহী এসে থিতু হন।
রাজশাহীসহ ভারতবর্ষে যেসব ইহুদি বসবাস শুরু করে, তারা মূলত ছিল সেমেটিক গোত্রের এবং তাদের মূল পেশা ছিল ব্যবসা। প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদের মতে, ভারতবর্ষে আসা ইহুদিরা মূলত ছিল বোহেমিয়ান বা যাযাবর ধরনের, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ইহুদিদের মধ্যে এ প্রবণতা দেখা যেত।
ইসহাক কোহেন রাজশাহীতে বেশ কিছু সম্পত্তি ক্রয় করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল গোদাগাড়ীর দিগ্রামে ৫০০ বিঘা কৃষিজমি, বিমানবন্দরের কাছে ২০ বিঘা জমি, কাজিরগঞ্জে দুই বিঘা জমি, মালোপাড়ায় এক বিঘা জমি এবং গণকপাড়ায় তেলকলের কাছে পাঁচ কাঠার ওপর বসতবাড়ি। রাজশাহীতে স্থায়ী হওয়ার কারণে ইসহাক কোহেন ইহুদি সম্প্রদায়ে ‘রাজশাহী কোহেন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ইসহাক কোহেনের পর তাঁর ছেলে সাসয়ন রাহেমিম কোহেন এসব সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন। রাহেমিমের পর তাঁর ছেলে মর্ডিসাই কোহেন এই সম্পত্তির মালিক হন। মর্ডিসাই কোহেন ‘মোনা সাহেব’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মোনা সাহেবের আগে কোহেন পরিবার মূলত কৃষিনির্ভর থাকলেও মোনা সাহেবের সময় থেকে ব্যবসায় মনোযোগী হন এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে অথবা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রানীবাজারে ‘এম কোহেন অ্যান্ড সন্স (জেনারেল মার্চেন্টস)’ নামে মনিহারি ব্যবসা শুরু করেন। মোনা সাহেবের প্রথম ছেলে পিনহাস হে কোহেন ১৯০৩ সালে জন্ম নেন। তাঁর অপর ছেলে সাসয়ন রাহেমিম ১৯০৮ সালে জন্ম নেন। মোনা সাহেব ১৯৫৮ সালের ৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। শেষকৃত্যের জন্য তাঁর মরদেহ কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
হে এবং সাসনি উভয়ে মিলে রানীবাজার ও গণকপাড়ায় সাইকেল, পেট্রোমেক্স (হ্যাজাক বাতি), কেরোসিন স্টোভ, গ্রামোফোন ইত্যাদির দোকান দেন। তাঁদের দোকানের নাম ছিল ‘নর্থ বেঙ্গল সাইকেল স্টোর’ এবং ‘সাইকেল হসপিটাল’। হের মেয়ে ফ্লোরেন্স, ছেলে এজরা কোহেন ও মর্ডি কোহেন বর্তমানে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। হে ষাটের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁদের তিন ছেলে ছিল—যাঁদের নাম স্যামুয়েল (সামি) কোহেন, আব্রাহাম (অ্যাবি) কোহেন এবং মর্ডিসাই (মর্ডি) কোহেন। সাসনি কোহেন ১৯৬৮ সালের আগেই রাজশাহীর সম্পত্তি বিক্রি করে ঢাকায় ছোট ছেলে মর্ডি কোহেনের কাছে চলে যান এবং ১৯৬৮ সালে ঢাকা থেকে কলকাতায় চলে যান। সাসনি কোহেন কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মর্ডি কোহেনের প্রথম ছেলে রাফায়েল কোহেন (রাফি) নিউইয়র্কে এবং দ্বিতীয় ছেলে মিখায়েল কোহেন (ছুটু) ও মেয়ে পেরোনা এমা ইসরায়েলে বসবাস করছেন।
কোহেন পরিবারে মূলত ফার্সি ও আরবি ভাষা প্রচলিত ছিল, তবে ষাটের দশকের প্রথম পর্যন্ত তাঁরা বাসায় আরবিতেই কথা বলতেন। সাসনি কোহেনের সময় থেকে তাঁরা বাসায় বাংলায় কথা বলা শুরু করেন। কোহেন পরিবারে উর্দু ও ইংরেজিরও চর্চা ছিল।
কোহেন পরিবার রাজশাহী ত্যাগ করার আগে তাদের যাবতীয় সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়। শেষের দিকে কোহেন পরিবার বাটার মোড়ে অসীম কৃষ্ণ সিংহ রায়ের (বর্তমানে মুক্তা হোটেল) বাসায় ভাড়া থাকত। পঞ্চম প্রজন্মের মর্ডি কোহেন ১৯৬৪ সালে এবং তাঁর পিতা সাসনি কোহেন ১৯৪৮ সালে রাজশাহী ত্যাগ করলে রাজশাহী ইহুদিশূন্য হয়ে যায়।


শেষ প্রতিনিধি
রাজশাহীতে এই পরিবারের শেষ প্রতিনিধি ছিলেন মর্ডিসাই কোহেন, যিনি রাজশাহীবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন ‘মডি’ হিসেবে। মর্ডিসাই কোহেন ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় যান এবং ১৯৬৮ সালে দেশত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। মডি যদিও মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে রাজশাহী থেকে চলে যান, তথাপিও তাঁর সদাহাস্য গৌরকান্তী সুন্দর চেহারা, সবার প্রতি আন্তরিক আচরণ, ক্রীড়াপ্রীতি ও অভিনয় প্রতিভা তাঁকে সে সময়ের কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আলোচিত চরিত্রে পরিণত করে।
মর্ডিসাই কোহেন ১৯৫০ সালে কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। তাঁর স্কুলজীবন সম্পর্কে মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান লিখেছেন, ‘বাৎসরিক স্পোর্টস-এ আমি উপভোগ করতাম সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ সাইক্লিং প্রতিযোগিতা। অবশ্যম্ভাবীভাবে দীর্ঘকায় ও সুদর্শন মডি কোহেন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করত। সেই রাজশাহীতে একমাত্র ইহুদি পরিবারের সন্তান । তার বাবার সাইকেল মেরামতের বড় দোকান ছিল রানীবাজার এলাকায় সাধনা ঔষধালয়ের মোড়ে। সে কারণে ছোটবেলা থেকেই সাইকেল চালনায় সে পারদর্শী হয়ে ওঠে। স্কুলে ক্যাডেট কোর ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার সপ্রতিভ পদচারণ ছিল।’
মর্ডিসাই কোহেন ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী কলেজে (নৈশ) ভর্তি হন। ছাত্রজীবনে মর্ডি ক্রিকেট খেলতেন, তবে সাইকেল খেলায় পারদর্শী ছিলেন, তাঁর ভাই সামিও সাইকেল খেলায় পারদর্শী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ১৯৬২ সাল থেকে তিনি রেডিও বাংলাদেশ রাজশাহীর নিয়মিত ঘোষক হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রের যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে তিনি সেখানে ঘোষক এবং সংবাদপাঠক হিসেবে যোগ দেন। তরুণ বয়সে মডি অত্যন্ত সুদর্শন হওয়ার সুবাদে ঢাকায় চারটি (নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মানুষ অমানুষ, তুম মেরে হো) এবং কলকাতায় তিনটি (সাগিনা মাহাতো, সাগিনা, এক যে ছিল দেশ) ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৬৮ সালে মডি দেশত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান, সেখানে তিনি এলিন (জো) কোহেনকে বিয়ে করেন। বর্তমানে মর্ডিসাই কোহেন কলকাতায় ৩০ পার্ক লেনে সস্ত্রীক অবসর জীবন যাপন করছেন।
মর্ডিসাই কোহেনের সঙ্গে আমার কলকাতায় দেখা হয়েছিল। মর্ডিসাই কোহেনের বয়স এখন প্রায় ৭০ বছর, শরীরের কাঠামো ঠিক থাকলেও ভেতরে ঘুণ ধরেছে, লাঠিতে ভর করে চলতে হয়। বাংলাদেশে শৈশব, কৈশোর আর তরুণ বয়সের ২৪টি বসন্ত কেটেছে তাঁর, এর মধ্যে ২০টি রাজশাহীতে। মর্ডিসাই কোহেনের সঙ্গে আলাপচারিতায় মনে হয়েছে, তাঁর স্মৃতিতে রাজশাহী এখনো সজীব। তিনি জানেন, যে রাজশাহীকে ছেড়ে গেছেন, তার খুব কমই এখনো টিকে আছে। তবুও জীবনসায়াহ্নে তিনি অন্তত একবার রাজশাহী আসার স্বপ্ন দেখেন, তাঁর তাঁর যৌবনের রাজশাহী ও সেই সময়ের বন্ধুদের সঙ্গে শেষ দেখা দেখতে।

[বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে এখনো কিছু ইহুদি পরিবার অবশিষ্ট আছে। তবে তারা তাদের ধর্মীয়পরিচয় জানাতে আগ্রহী নয়।]

সুত্র : প্রথম আলো

এইবেল ডট কম/এইচ আর


 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71