বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
বুধবার, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা এবং তিনটি বইয়ের ভূমিকা প্রসঙ্গ
প্রকাশ: ০৮:৪৩ pm ০১-০৮-২০২০ হালনাগাদ: ০৮:৪৩ pm ০১-০৮-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


২০২০ সালের শোকের মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫ তম শাহাদত বার্ষিকী ও  জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর তিনটি বইয়ের ভূমিকা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করাই বর্তমান লেখাটির উদ্দেশ্য। শুরুতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদত বরণকারী জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ আবু নাসের, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, বেগম আরজু মনি,শেখ কামাল, সুলতানা কামাল খুকি, শেখ জামাল, পারভীন জামাল রোজি, শেখ রাসেল, কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুল হক, সুকান্ত আব্দুল্লা বাবু, শহীদ সেরনিয়াবাত, আব্দুল নায়েম খান রিন্টু এবং ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে শাহাদত বরণকারী জাতীয় চার নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ,  ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এবং এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান প্রমুখের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

এ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বই তিনটি হচ্ছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজ নামচা’, এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে স্মৃতিকথা এবং ঐতিহাসিক আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর আরও দু’টি বই প্রকাশিত হবে। এ তিনটি বইয়েরই ভূমিকা লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ্য সন্তান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিহাসেরও একটা ইতিহাস থাকে। বঙ্গবন্ধুর আলোচিত তিনটি বই প্রকাশিত হওয়ার আগে, বইগুলোর পান্ডুলিপি প্রস্তুতকরণ, পান্ডুলিপি হারিয়ে যাওয়া এবং খুঁজে পাওয়া প্রভৃতি পরিস্থিতি সম্পর্কে এই বই তিনটির ভূমিকা থেকে পাওয়া যায়। যাহোক, প্রকাশিত তিনটি বই একত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও এসম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন পরিস্থিতি তথা সহজ ভাষায় বাংলাদেশের ইতিহাসের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর বইগুলো বাংলাদেশের  ইতিহাস সম্পর্কে আকর গ্রন্থ। এই বইগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের ধ্রুপদী আখ্যান। লেখার স্টাইল, কাহিনীর বর্ণনা এবং ঘটনার সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপন, সব দিক দিয়ে এগুলো অতুলনীয়। তবে, অত্যন্ত দু:খ ও হতাশার বিষয় হচ্ছে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় এই বই তিনটি প্রকাশ করতে পারেননি।  মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত ডানপন্থি সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ও চীন পন্থী উগ্রবাম গোষ্ঠীর যোগসাজশে দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে  যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ-এর প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে ২০১৯ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘ইনস্টিটিউশনালাইজেশন অব ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’  শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য ১৯৭৩ সালেই ১৮৯৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে পাটের গুদামে আগুন দেয়া হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে একজন এম.পি.-কে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে আরও দুইজন এম.পি.-কে হত্যা করা হয়েছিল। এভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে খোন্দকার মোশতাক গংদের দ্বারা মদদপুষ্ট হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার শোকাবহ ও কলঙ্কময় আগস্ট মাস  বাংলাদেশের শোকের মাস। 
যে ধাপগুলো অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধুর বই তিনটি প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে এসম্পর্কিত ইতিহাসের ইতিহাস এবং তা’ বই তিনটির ভূমিকা থেকে পাওয়া যায়। বই আকারে প্রকাশের আগে এগুলো ছিল বঙ্গবন্ধুর  ডায়েরি বা খাতায় লেখা, যা বইগুলোর মূল পান্ডুলিপি।  তবে বঙ্গবন্ধুর বইয়ের পান্ডুলিপি যেহেতু ডায়েরি বা খাতায় লেখা হয়েছিল সেহেতু এই ডায়েরি লেখা এবং তাও আবার কারাগারে বসে লেখার ব্যাপারটি বইগুলোর ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছে। লেখা এবং লেখকদের জগতে ডায়েরি থেকে বই বিষয়টি বিশ্বব্যাপী বেশ পরিচিত। যে লেখকগণ তাদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা অথবা আবেগ আনুক্রমিকভাবে রেকর্ডভূক্ত করেন তাদের সেই লেখাগুলো থেকে ঐতিহাসিক সময়কাল সম্পর্কে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সুক্ষ্ বিচার শক্তি লাভ করতে পারি। 

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই শ্রেণীর লেখকদের মধ্যে আছেন ইংরেজ প্রশাসক ও পার্লামেন্ট সদস্য স্যামূয়েল পেপি, যার প্রত্যক্ষ্যদর্শীর বিবরণের মধ্যে সপ্তদশ শতাব্দীর বিভিন্ন ঘটনা, এবং বিশেষভাবে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে লন্ডনের বিশাল অগ্নিকান্ড সম্পর্কে বিবরণ উল্লেখযোগ্য। এক্ষেত্রে আরও একটি বিশ^খ্যাত উদাহরণ হচ্ছে অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি। ১৩ বছর বয়সে ওলন্দাজ লেখক অ্যান ফ্রাঙ্ক (১৯২৯-১৯৪৫) ডায়েরি লিখেছিলেন। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত এই ইহুদি বালিকা তার ডায়েরিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন সেসবের বিবরণের পাশাপাশি একজন বয়ো:সন্ধিকালের বালিকা হিসেবে আন্ত-পরিবার পারস্পরিক সম্বন্ধের ব্যাপারগুলো তিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য জীবন-মরন লড়াইয়ে অবতীর্ন হওয়া বঙ্গবন্ধু তার সংগ্রামবহুল জীবনের অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছিলেন তাঁর ডায়েরির পাতায়। তবে, স্যামূয়েল পেপিস-এর  ডায়েরি বা অ্যান ফ্রাঙ্ক-এর দ্য ডায়েরি অব অ্য ইয়ং গার্ল  থেকে বঙ্গবন্ধুর ডায়েরি এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়েরি বা খাতা লিখেছিলেন কারাবন্দী থাকা অবস্থায়। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ভূমিকায় বলা হয়েছে ‘বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনের সব আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে বন্দি জীবন যাপন করেছেন। তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন। মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে।তাঁর জীবনে এমন সময়ও গেছে যখন মামলার সাজা খাটা হয়ে গেছে, তারপরও জেলে বন্দি করে রেখেছে তাঁকে। এমনকি বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন নাই, হয় পুনরায় গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন অথবা রাস্তা থেকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে।’ 

আবার কারাবন্দী থাকাকালে লেখা হয়েছে এবং তা পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে এধরনের বিশ^খ্যাত উদাহরণ অনেক আছে। মিগুয়েল ডি সার্ভ্যনটিস কারাগারে থাকা কালে স্প্যানিশ সাহিত্যের সর্বাধিক খ্যাতনামা উপন্যাস ‘ডন কুইকজোট’ লিখেছিলেন। ইতালীয় পরিব্রাজক, ব্যবসায়ী এবং লেখক মার্কো পোলো ২৪ বছর পর এবং প্রায় ১৫,০০০ মাইল ভ্রমণ শেষে যখন ইতালি ফিরেছিলেন তখন ভেনিস এবং জেনওয়ার মধ্যে যুদ্ধ চলছিল। এই সময় জেনওয়া কর্তৃক ভেনিসের একটি নৌবহরের ওপর চড়াও হওয়ার পর পোলো-কে বন্দী করা হয়েছিল। দীর্ঘকাল কারান্তরালে থাকার সময় সহ-কারাবাসী রুস্টিছেল্লো দ্যা পিসার নিকট পোলো তাঁর ভ্রমণ কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। পিসা এই কাহিনীকে লিখে রেখেছিলেন এবং পরে এটি ‘দ্য ট্রাভেলস অব মার্কো পোলো’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। অতিদ্রুত এই বইটি সমগ্র ইউরোপে প্রচার লাভ করে। আর এর দ্বারা ‘চমকপ্রদ প্রাচ্য’ সম্পর্কে পাশ্চাত্যবাসী সম্যক ধারনা লাভ করে। হেনরি ডেভিড থরো  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচাচুসেট্স এর কনকর্ডের ‘ওয়ালডেন পন্ড’-এর নৈসর্গিক তীরে থাকাকালে সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বই ওয়ালডেন বা লাইফ ইন দ্য উড্স লিখেছিলেন। তিনি সেই অর্থে কারাবাসী ছিলেন না। তবে, সরকারের মূল্য সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করে  কর দিতে অস্বীকার করার কারণে এক রাত তাঁকে কারাবাস করতে হয়েছিল। আর এই একরাত কারাবাস থরোকে সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স সম্পর্কে তাঁর ধ্রুপদী রচনা লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। থরোর সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স-এর একজন ভক্ত মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার। আলবামায় বর্ণ বৈষ্যম্যের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ করার কারণে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার আটক করে কারা বন্দী করা হয়েছিল। আর কারাবন্দী থাকাকালেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক প্রবাদপ্রতীম ভাষ্য, যেকোন স্থানের অবিচার সকল স্থানের ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি (ইনজাস্টিস এনিহয়ার ইজ অ্য থ্রেট টু জাস্টিস এভরিহয়ার)

যাহোক, আমাদের বিবেচ্য বিষয় বঙ্গবন্ধুর ডায়েরি বা খাতা। ডায়েরি বা খাতা লেখার আগে এগুলো ছিল বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা ও চেতনার মধ্যে। জীবনের যে বিপদসঙ্কুল ও সংগ্রামমুখর পথ তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন সেই পথে তিনি যা কিছুর মুখোমুখি হয়েছিলেন তার সামান্য অংশ এই বই গুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর লিখিত খাতার বর্ণনার চেয়ে তিনি যে ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছিলেন তা ছিল আরও ভয়ঙ্কর। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর সততা, সাহস, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস, ভালোবাসা, কর্তব্যেও প্রতি অঙ্গীকার প্রভৃতি দিয়ে তা অতিক্রম করেছেন। এই মহামানব তাঁর জীবদ্দশায় যে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ অতিক্রম করে স্বাধীনতার সূর্য আমাদের উপহার দিয়েছেন সেইসব ঘটনা-দুর্ঘটনাবহুল কাহিনীগুলো থেকে বেশকিছু অংশ এই বইতে তুলে ধরেছেন। একারনে, যে কাহিনী বইতে বর্ণনা করা হয়েছে তার গুরুত্ব, যিনি এগুলো লিখেছেন তার অবস্থা তথা মন মানসিকতা, যিনি বা যাদের প্রচেষ্টায় বইটি বা বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বা তাঁদের অবস্থা এসবকিছুই গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবী রাখে। ১৯৬৬-১৯৬৯ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি থাকাকালে একান্ত নিরিবিলি সময়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের কাহিনী ডায়েরিতে লিখেছেন। 
বঙ্গবন্ধুর বই তিনটির ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পারি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের অপরিসীম অপরিসীম ও নি:স্বার্থ আত্মত্যাগ এবং অজানা কিছু তথ্য। বঙ্গবন্ধু যেমন কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে খাতার পাতায় লিখে রেখেছিলেন এদেশের ইতিহাসের অনেক অজানা কথা তেমনি তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও কারাগারে থাকাকালে  ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ভূমিকা প্রথম লিখেছিলেন ২০০৭ সালের ৭ আগস্ট। এসময় তিনি শেরে বাংলানগর সাব জেলে বন্দী ছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এই বইয়ের ভূমিকার পুনশ্চ লিখেছিলেন ২০১০ সালের ৩০ জুলাই। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ভূমিকা থেকে জানা যায় ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশে ফিরে আসার পর জিয়া সরকার তাঁকে ওই বাড়িতে প্রবেশ করতে দেয় নাই।  পরে ১৯৮১ সালের ১২ জুন সাত্তার সরকার বাড়িটা হস্তান্তর করার পর বঙ্গবন্ধুর ‘লেখা স্মৃতিকথা, ডায়েরি ও চীন ভ্রমণের খাতাগুলো পান। কিন্তু আত্মজীবনীর খাতাগুলো তখন পাননি। একপর্যায়ে ওগুলোর আশা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিলেন তখন বঙ্গবন্ধুর অমূল্য আত্মজীবনীর ‘চারখানা খাতা’ তাঁর হাতে আসে। এই খাতাগুলো ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণির অফিসের টেবিলের ড্রয়ারে। সম্ভবত বঙ্গবন্ধু শেখ ফজলুল হক মণিকে এগুলো দিয়েছিলেন আত্মজীবনী ছাপানোর কথা চিন্তা করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শাহাদাৎবরণ করায় তা আর করতে পারেন নাই। কাজটা অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছিল। 
‘কারাগারের রোজ নামচা’র ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুর খাতাগুলি উদ্ধারের প্রথম দিকের আরো কিছু ঘটনা জানা যায়।  
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাবার আহ্বান জানানোর সাথে সাথেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে প্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং কারাগারে বন্দী করে রাখে। সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ওপর দমন পীড়ন ও পোড়ামাটি নীতি এবং গণহত্যা শুরু করে। এরই এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবার এক মাসে ১৯ বার জায়গা বদল করেও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায় নাই, তাঁরা ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব, পুত্র লে. শেখ জামাল, কন্যা শেখ হাসিনা ও তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ,  শেখ রেহানা  এবং পুত্র শেখ রাসেলকে ধানমন্ডি ১৮ নম্বর রোডের একটি একতলা বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এক সময় পাকিস্তানি হানাদার শাসকগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) ঘোষণা দিল যে সবকিছু স্বাভাবিক আছে। এসময় তারা বাচ্চাদের স্কুলে যেতে বলে। স্কুলে যেতে হলে তো বই খাতা প্রয়োজন। সেগুলো ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কস্থ বাড়িতে ছিল।  পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর যে মেজর স্কুলে যেতে বলেছিলেন তার কাছে একথা বলায় সে ৩২ নম্বরের বাসায় নিয়ে যেতে রাজি হলো। আর সেখানই খাতাগুলো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা পেয়েছিলেন। তাঁর কথায়, “আমি মায়ের কথামতো জায়গায় গেলাম। ড্রেসিং রুমের আলমারির উপর ডান দিকে আব্বার খাতাগুলি রাখা ছিল, খাতা পেলাম . . . ।”
    
বঙ্গবন্ধুর লেখা এই খাতা উদ্ধার ছিল বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছার প্রেরণা ও অনুরোধের ফসল। বঙ্গবন্ধু যতবার জেলে যেতেন বেগম মুজিব খাতা, কলম দিতেন লেখার জন্য। বার বার তাগাদা দিতেন। আবার বঙ্গবন্ধু যখন জেল থেকে ছাড়া পেতেন তখন বেগম মুজিব জেল গেটে যেতেন বঙ্গবন্ধুকে আনতে আর বঙ্গবন্ধুর লেখাগুলি যেন আসে তা নিশ্চিত করতেন। বেগম মুজিব এগুলি অতি যত্নে সংরক্ষণ করতেন। যাহোক, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে খাতাগুলি উদ্ধারের পর সেগুলো ঢাকার আরামবাগে বঙ্গবন্ধুর আর এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর এই আত্মীয়রা বেগম মুজিবের হাতে খাতাগুলি পৌঁছে দিয়েছিলেন। এগুলো বৃষ্টির পানিতে কিছু নষ্ট হলেও মূল খাতাগুলি মোটামুটি ঠিক ছিল। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রধান জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন।  ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কস্থ বঙ্গবন্ধুর  বাড়িটি জিয়া সরকার তখন সিল করে রেখেছিল। ১৯৮১ সালের ১২ জুন সাত্তার সরকার বঙ্গবন্ধুর কন্যার নিকট বাড়িটা হস্তান্তর করে। তখন বঙ্গবন্ধুর লেখা স্মৃতিকথা, ডায়েরি ও চীন ভ্রমণের খাতাগুলো তিনি পান। এপ্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ ভূমিকায় বলেন, ‘আত্মজীবনী লেখা খাতাগুলো পাইনি। কিছু টাইপ করা কাগজ পাই যা উইপোকা খেয়ে ফেলেছে। ফুলস্কেপ পেপারের অর্ধেক অংশই নেই শুধু উপরের অংশ আছে। এসব অংশ পড়ে বোঝা যাচ্ছিল যে,  এটি আব্বার আত্মজীবনীর পান্ডুলিপি, কিন্তু যেহেতু অর্ধেকটা নাই সেহেতু কোন কাজেই আসবে না।’  প্রথম  বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।  

‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইয়ের ভূমিকা লেখা হয়েছে ২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালে চীন ভ্রমণ করেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার পর বঙ্গবন্ধু যখন সমগ্র পূর্ববঙ্গে সফর করছিলেন তখন ফরিদপুর গোপালগঞ্জ-সহ বিভিন্ন জায়গায় গ্রেফতার হন। মুক্তি পেয়ে আবারো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৪৯ সালের অক্টোবওে আবার গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে কারাবন্দী থাকাকালে বঙ্গবন্ধু তাঁর খাতায় লিখেছিলেন ১৯৫২ সালের চীন ভ্রমণের কাহিনি। খাতার ওপর গোয়েন্দা সংস্থার সেন্সর করার এবং কারা কর্থৃপক্ষের যে সিল দেয়া আছে তা থেকেই সময়কালটা জানা যায়। বঙ্গবন্ধুর এই তিনটি বইয়ের পান্ডুলিপি তথা খাতাগুলি কীভাবে রক্ষা পেয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেগুলো কীভাবে খুঁজে পেয়েছেন সেকথা ‘অসমাপ্ত আত্মঝীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’র ভূমিকাতে বিস্তারিত লেখার কারণে তা’ ‘আমার দেখা নয়াচীন’ এর ভূমিকাতে লেখা হয় নাই।
 
প্রফেসর ড. অরুণ কুমার গোস্বামী 
সাবেক চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য-সচিব, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদ।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71