সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭
সোমবার, ৪ঠা পৌষ ১৪২৪
 
 
ফেসবুকে সাম্প্রদায়িকতা
প্রকাশ: ০৯:৫৮ am ২৩-১১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৯:৫৮ am ২৩-১১-২০১৭
 
আনিস আলমগীর
 
 
 
 


মানুষের মন মানুষের ধর্মশালা। সাধারণ মানুষ সম্পর্কে এই কথাটা শতাংশে সত্য। মানুষ যখন তার ধর্মের প্রবর্তক সম্পর্কে অথবা তার ধর্ম সম্পর্কে কারও মুখে কটূক্তি শুনে তখন তার ধর্মশালায় আঘাত লাগে। আর তখনই সে দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। শুক্রবার রংপুরের পাগলা পীর এলাকার ঘটনা, বছরের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগরের ঘটনা আর এর আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধমন্দিরের পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এমনই দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া। আর সব স্থানেই এই প্রতিক্রিয়া তৈরি করার পেছনে কলকাঠি নাড়ার মানুষগুলো ছিল একটি গোষ্ঠী।

তিনটি ঘটনাতেই প্রমাণ হয়েছে, যাদের নামে ফেসবুকের স্ট্যাটাস নিয়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পোড়ানো হয়েছে, প্রার্থনার স্থান পোড়ানো হয়েছে, সম্পদ লুট হয়েছে- তারা কেউ স্ট্যাটাস দেয়নি। কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্যাগ করা হয়েছে, কারও ভুয়া অ্যাকাউন্ট বানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছে বা অন্যের পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে। তারপরও মানুষ সতর্ক হচ্ছে না। ভাবতে পারছে না, একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যজনেও এইসব করতে পারে। এর পেছনে থাকতে পারে সংঘবদ্ধ চক্র। সাধারণ মানুষকে কী বলবো, সরকার নিজেই সতর্ক নয় এই ব্যাপারে।

তিনটি ঘটনাতেই সংঘবদ্ধভাবে জড়িত থাকায় অভিযোগ এসেছে জামায়াত-শিবির নামের বিষবাষ্প চক্রের বিরুদ্ধে। আর সব ক্ষেত্রেই তারা ব্যবহার করেছে ফেসবুক। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত শিবিরের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতার দ্বন্দ্বকেও হিন্দুদের বাড়ি ঘর পোড়ানোতে দায়ী করা হয়েছে। জামায়াত-শিবির জানে কিভাবে পরিকল্পিত উপায়ে ধর্ম নিয়ে খেলা যায়, গোলযোগ পাকানো যায় আর হত্যা লুণ্ঠন করা যায়।  এসব ১৯৭১ সাল থেকেই তাদের উত্তরসূরীরা করে আসছে। করতে করতে হাত পাকিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী তারানা হালিম ইন্টারনেটে পর্ন বন্ধ করার জন্য ব্যস্ত। কিন্তু তিনি ভেবে দেখছেন না যে, ইন্টারনেটের পর্ন একজন ব্যক্তিকে হয়তো বিকৃত করছে, পুরো সমাজকে সম্ভব নয়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তার পরিবার আছে। আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ইন্টারনেটে পর্ন দেখলে জাতির মহা ক্ষতি হচ্ছেও না, এটি কারও কারও চাহিদাও হতে পারে– সব কিছুতে রাষ্ট্রের নাক গলানোর দরকার নেই। কিন্তু ফেসবুকে জামায়াত-শিবির যে অপপ্রচার মিশন নিয়েছে তা ব্যক্তিকে নয়, সমাজকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। আগামীতেও জ্বালাবে। এক সময় বাঁশেরকেল্লা তৈরি করে তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে ফেসবুক পাতা খুলে অপপ্রচার করেছিল এখন বাঁশেরকেল্লার প্রতিটি অ্যাডমিনই এক একটা ‘ডটকম’ খুলে প্রোপাগাণ্ডায় লিপ্ত আছে।

কারা এইসব ডটকমের মালিক তার কোনও হদিস থাকে না তথাকথিত গুজব সাইটগুলোতে। ডোমিনের মালিক খোঁজ করলে দেখা যায় সঠিক ঠিকানা নেই। অনেক সময় বিদেশ থেকে কেনা। একের পর এক খবরের আদলে ভুয়া খবর আপ করে সেটাকে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, বুস্ট করছে এই চক্র। যখন কেউ তাদের বিরুদ্ধে কলম ধরছে তখনই এইসব আবর্জনা ডটকমগুলো তার সম্পর্কে মনগড়া খবর তৈরি করে চালিয়ে দিচ্ছে। ধরার কোনও উপায় নেই, প্রতিবাদের ভাষাও নেই। সরকারও নিশ্চুপ।

ডটকম আবর্জনার বিরুদ্ধে আপনি কী অ্যাকশন নেবেন, কী প্রতিবাদ করবেন। হয়তো খোঁজ খবর নিয়ে জানবেন, এক সময় শিবির করতো এখন সাংবাদিক সেজে লন্ডনে কিংবা নিউইয়র্কে বসে সে আবর্জনাটি চালাচ্ছে সে। তারা ইউটিউবও চালাচ্ছে একই ধারায়, একই উদ্দেশ্যে। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের বাহবা নিচ্ছে আর আর তার সুযোগ নিয়ে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে জামায়াত-শিবির। শুধু জন্মদানই বড় নয়, তার দেখভাল করারও যে বিষয় আছে সেটা ভুলে গেছেন আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। সজীব ওয়াজেদ জয় সাহেবের আনুকূল্য পাওয়াই তাদের প্রচেষ্টা কিন্তু জয় সাহেবের পরিশ্রমের ফসল দিয়ে তার এবং তার সরকারের বিরুদ্ধেই যে একটি অশুভশক্তি দিনে দিনে মহীরুহ হচ্ছে তা দেখার সময় নেই ওনার চারপাশের তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট লোকদের।

আগেই বলছি সাম্প্রদায়িক অত্যাচারের সব ঘটনার উৎপত্তি স্থল ফেসবুক। ফেসবুক সাধারণ মানুষের বিষয় নয়। ফেসবুকের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রচার-অপ প্রচারের কায়েমী স্বার্থ নিয়ে বসে থাকে চক্রটি। আগামী মাসের শেষের দিকে রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন আর তার লাগোয়া আরও কয়েকটা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হবে। তারপর হবে দেশের একাদশ সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনগুলোকে সামনে রেখে এখন একটার পর একটা এমন ঘটনা দেশে ঘটতেই থাকবে।

রংপুরের জনৈক টিটু রায়ের ফেসবুকের স্ট্যাটাসের জের ধরে শুক্রবার ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের আটটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল বিক্ষোভকারীরা। তাদের নিবৃত্ত করতে পুলিশের গুলিতে হাবিবুর রহমান নামের একজন জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহত নয়জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান চিকিৎসকেরা। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

টিটু রায়ের মা জীতেন বালা বলেছেন, ‘১০ বছর আগে ছেলে বাড়ি থেকে সেই যে চলি যায় আর একদিনও বাড়িত আইসে নাই। ছাওয়া টিটু এইগলা কইরবার পারে না।’

টিটু রায় লেখাপড়া জানে না। নিরক্ষর টিটুর পক্ষে আদৌ ফেসবুক চালানো সম্ভব কিনা- স্থানীয় লোকদের কি তা জানা নেই! ঠিকই আছে। কিন্তু পত্রিকার খবর হচ্ছে, এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে জামায়াত ইসলামী এবং বিএনপি সম্মিলিতভাবে এটি নিয়ে প্রচারণা চালায় এবং সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে সঙ্গী করে। এটা নিয়ে প্রথমে তারা মানববন্ধন করেছিলো। মানববন্ধনে নেতৃত্ব দিয়েছে জাতীয় ওলামা দলের রংপুরের সভাপতি এনামুল হক মাজেদী, বিএনপির সদস্য মাসুদ রানা, জামায়াতের গঙ্গাচড়ার সহকারী সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম।

ভারতে বর্তমানে সংঘ-পরিবার ক্ষমতায়। রংপুরের ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হলে তার তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া ভারতেও হতো। ইতিমধ্যে ঢাকাস্থ ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কাণ্ড ঘটিয়েছেন তাদের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলায় যেসব হিন্দু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে আশ্বস্ত করেছে। এক টুইট বার্তায় সুষমা স্বরাজ বলেছেন, বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ ঢাকায় তাদের হাই কমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে জানিয়েছেন, হামলায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের বাড়িঘর পুননির্মাণে তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

আক্রান্ত হিন্দুদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের তরফ থেকে কিছু শোনার আগে তারতের তরফ থেকে শোনাটা কতটা বিব্রতকর, অবমাননাকর ভেবে দেখা দরকার আমাদের সরকারকে।

রংপুর নিয়ে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কোনও অশুভ পরিকল্পনা ছিল কিনা জানি না- তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করলো কেন! ভারতে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসে শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি সহজ করে রেখেছে। বিজেপি সরকারের ঘোষিত নীতি হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ থেকে ধর্মীয় নির্যাতনের কারণে সংখ্যালঘু হিন্দু খ্রিস্টান বৌদ্ধ যারাই ভারতে পালিয়ে আসবে তাদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এই তালিকায় শুধু মুসলমানদের নাম নেই। এখন ভেবে দেখেন, দলবেধে রোহিঙ্গাদের মতো কিছু হিন্দু ভারতে পৌঁছলেই তো বাংলাদেশের অবস্থা বিপদের সম্মুখীন হতো।

এ বছর উত্তরবঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী বন্যা হয়েছে। ফসল বিনষ্ট হয়েছে আবার আছে মিয়ানমার থেকে আসা ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা। এটা একটা অতিরিক্ত বোঝা। মানবতার দিকে চেয়ে হোক আবার একই ধর্মের মানুষ হিসেবে হোক তাদের জায়গা না দিয়েও উপায় ছিল না। এসব বিষয় নিয়ে জাতি মহা-সংকটে রয়েছে। সুতরাং সবাইর উচিত হবে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকা।

আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভারতের মুসলমানদের ওপর। তাদের পক্ষে নিজ ধর্মে স্থিত থাকা পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘর ওয়াপসি কর্মসূচি, গরু খাওয়া নিয়ে হত্যা- সব মিলিয়ে তারা কঠিন বিপদের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের এমন কাজ থেকে বিরত থাকা উচিৎ যা ভারতীয় মুসলমানদের দুর্দশা বাড়ায়। সেখানেও দুস্কৃতিকারীরা বসে আছে সুযোগের অপেক্ষায়। তাই রংপুরের ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কঠোর সাজার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেন ভবিষ্যতে এমতো কোনও দুরভিসন্ধির ফাঁদ না পাতে।

ইতিমধ্যে অনেক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, আলোচিত ইসলাম অবমাননার মূল স্ট্যাটাসটি দিয়েছেন খুলনার লোক আসাদুল্লাহ্ হামিদী। তিনি ১৮ অক্টোবর এ স্পর্শকাতর স্ট্যাটাসটি দেন এবং এ পর্যন্ত ৮৭ জন ফেসবুক ব্যবহারকারী তাদের ওয়ালে এর শেয়ার দিয়েছেন যাদের একজন রংপুরের ‘এমডি টিটু’। টিটুর নামে শেয়ার দেওয়া হয় ১৯ অক্টোবর। আসাদুল্লাহ হামিদী স্ট্যাটাস দেওয়ার কথা সাংবাদিকদের কাছে স্বীকারও করেছেন। তিনি ফেসবুকে নিজের পরিচয় দিয়েছেন: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দিঘলিয়া উপজেলার সভাপতি এবং খুলনা জেলার সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। এখন পুলিশের উচিত হবে মওলানা আসাদুল্লাহ্ হামিদীকেও তদন্তের আওতায় আনা।

জামায়াত-শিবির এখন তার কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে ডটকম আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। এ বিষয়টাতে তারা হাত পাকা। ফলে তাদের অপকর্ম থেকে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের যেমন সতর্ক থাকতে হবে, সরকারকেও এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য কঠিন তদন্তের দরকার নেই। বিভিন্ন পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের খবরের শেষে প্রতিক্রিয়াদাতাদের দেখলেই শত শত ভুয়া আইডির জামায়াত শিবির পাওয়া যাবে, যাদের কাজই হচ্ছে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে, সরকারের বিরুদ্ধে, ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো আর ভিন্নমতের লোকদেরকে ছদ্মবেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রমণ করা। দুর্ভাগ্যবশত বলতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অপতৎরতায় লিপ্তদের ছাড়া গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই ধরনের দুস্কৃতকারীদের কমই ধরতে পেরেছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71