সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭
সোমবার, ৪ঠা পৌষ ১৪২৪
 
 
নজরুল জীবনের কয়েকটি অধ্যায়
প্রকাশ: ১২:৩৩ pm ২৪-০৫-২০১৫ হালনাগাদ: ১২:৩৩ pm ২৪-০৫-২০১৫
 
 
 


গণমানুষের কবি, সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) জীবন হাজার রকম বৈচিত্র্যে ভরা। প্রথম জীবনে আসানসোলে রুটির দোকানের কর্মচারী পরে সেনাবাহিনীর হাবিলদারের জীবন এবং তার সৃষ্টিশীল লেখক জীবন। নানা বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্য জীবন তার। তার জীবনের নানা অংশজুড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর গণমানুষের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কাজী নজরুল ইসলামের যৌবনের কিছুটা সময় কেটেছে কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরে। মোট পাঁচবারে সেখানে প্রায় ১১ মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন কবি। তরুণ কবি নজরুল ১৯২১ সালের এপ্রিলে কুমিল্লার দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন। সেখানে বাড়ির পাশের কামরাঙা গাছতলায় বাঁশিতে সুর তুলে, আর পুকুরঘাটে বসে কবিতা লিখে লিখে সময় কেটেছে তার। নজরুলের প্রথম প্রেম সৈয়দা খানম (নজরুল তাকে নাম দেন নার্গিস, ফার্সি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম)। তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকালে নার্গিসের মামা ক্যাপ্টেন আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নজরুলের। ১৯১৯ সালে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। নজরুল তখন মুসলিম সাহিত্য সমিতির (কলকাতা) অফিসে আফজাল-উল হকের সঙ্গে থাকতেন। ওই সময় আলী আকবর খানের সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। আকবর খান নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে কুমিল্লায় তার গ্রামের বাড়িতে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। আলী আকবর খানের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে কলকাতা থেকে ১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেইলে নজরুল কুমিল্লা এসে পৌঁছেন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ছাড়ার পর এটিই ছিল নজরুলের প্রথম পূর্ববঙ্গ যাত্রা। যাওয়ার পথে তিনি 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' কবিতাটি লেখেন। ট্রেনে কুমিল্লা পৌঁছে নজরুলকে নিয়ে আলী আকবর খান তার স্কুলের বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় ওঠেন। চার-পাঁচদিন সেখানে কাটিয়ে কবি রওনা দেন দৌলতপুরের খাঁ বাড়ির উদ্দেশে। তবে সেই চার-পাঁচ দিনেই সেনবাড়ির সবাই বিশেষ করে বিরজা দেবীর সঙ্গে নজরুলের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। নজরুল তাকে 'মা' সম্বোধন করতেন।

দৌলতপুরে নজরুলের জন্য আলী আকবর খানের নির্দেশে উষ্ণ অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ির জ্যেষ্ঠ আত্দীয়স্বজনের সঙ্গে খুব অল্প সময়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে নজরুলের। কবিতা শুনিয়ে, গান গেয়ে তাদের তো বটেই দূরদূরান্ত থেকেও লোকজন ছুটে আসত কবির নৈকট্য লাভের আশায়। আলী আকবর খানের বোন আসমাতুন্নেসার বিয়ে হয়েছিল খাঁ বাড়ির পাশেই। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় আসমাতুন্নেসা তার ভাইয়ের বাড়িতে তেমন সমাদর পেতেন না। আসমাতুন্নেসার স্বামী মুনশী আবদুল খালেক একটি মেয়ে রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। আর সেই মেয়েটিই কবি নজরুলের প্রথম প্রেম নার্গিস। নার্গিসের সঙ্গে কবির আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছিল কবির বাঁশি বাজানো নিয়ে। এক রাতে কবি খাঁ বাড়ির দীঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হন নার্গিস। খাঁ বাড়ির মুরবি্বরা নার্গিসের বর হিসেবে নজরুলকে তেমন পছন্দ করতেন না। নজরুলকে তারা ছিন্নমূল বাউণ্ডুলে হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু গ্রাজুয়েট আলী আকবর খানের চাপে তারা প্রতিবাদ করতেন না। এক পর্যায়ে খোদ নজরুলই বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করলেন।

একদিন নার্গিস নজরুলের কাছে এসে বললেন, 'গত রাতে আপনি বাঁশি বাজিয়েছিলেন? আমি শুনেছি।' এভাবেই প্রেমের সূত্রপাত। আলী আকবর খান নজরুল-নার্গিসের বিয়ের আয়োজন করলেন জাঁকজমকের সঙ্গে। তার অতি আগ্রহ ও নার্গিসের কিছু আচরণ নজরুলকে এই বিয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা করে তোলে। ঘটনার আরও অবনতি হয় যখন কাবিননামায় আলী আকবর খান একটি শর্ত রাখতে চাইলেন- 'বিয়ের পরে নজরুল নার্গিসকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবেন না, দৌলতপুরেই তার সঙ্গে বাস করবে।' এ অপমানজনক শর্ত মেনে না নিয়ে নজরুল ইসলাম বিয়ের মজলিশ থেকে উঠে গিয়েছিল। তার মানে, সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস বেগমের সঙ্গে নজরুল ইসলামের 'আকদ' বা বিয়ে একেবারেই হয়নি। (কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা- মোজাফফর আহমেদ পৃষ্ঠা-৬৭)।

 

১৩২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ আষাঢ় বিয়ের দিন ধার্য করা হয়। এরপর শুরু হয় নাটকীয়তা। আলী আকবর খান তার গ্রাম্য ভগিনীকে বিখ্যাত কবি নজরুলের জন্য গড়তে নেমে পড়লেন। অশিক্ষিত নার্গিসকে খুব কম সময়ে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিনি শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য সাহিত্যিকের উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো থেকে নার্গিসকে জ্ঞান দিতে থাকলেন।

নার্গিস কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম বধূ নন, তিনি নজরুলের বাগদত্তা। প্রমীলাই কাজী নজরুলের প্রথম ও একমাত্র স্ত্রী।

১৩২৮ (ইংরেজি ১৯২১ সাল) বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ়

নার্গিস-নজরুলের আকদ হওয়ার কথা ছিল। কাজী নজরুল ৩ আষাঢ় রাতে দৌলতপুর ছেড়ে ৪ আষাঢ় সকালে কুমিল্লায়

এসে পৌঁছেন।

পরবর্তীতে নার্গিস তাদের ভুলগুলো বুঝতে পেরেছিলেন বিধায় ঘটনার প্রায় ১৫ বছর পর নজরুলকে একটি চিঠি লেখেন। ১৫ বছর পরে হঠাৎ একটি পত্র লেখা উপলক্ষের প্রয়োজন ছিল। নার্গিস নজরুলের 'দূত' পাঠানোর একটি বানানো কথাকেই নজরুলকে তার পত্র লেখার উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। চিঠির উত্তরে নজরুল একটি চিঠি ও একটি গান পাঠিয়েছিলেন, যাতে চিঠির উত্তরটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। নজরুল লিখেছিলেন-

"আমি কখনো কোনো 'দূত' প্রেরণ করিনি তোমার কাছে। আমাদের মাঝে যে অসীম ব্যবধানের সৃষ্টি হয়েছে, তার সেতু কোনো লোক তো নয়ই স্বয়ং বিধাতাও হতে পারেন কি-না সন্দেহ।... তোমার ওপর আমার কোনো অশ্রদ্ধা নেই, কোনো অধিকারও নেই আবার বলছি।... তুমি রূপবতী, বিত্তশালিনী, গুণবতী, কাজেই তোমার উমেদার অনেক জুটবে- তুমি যদি স্বেচ্ছায় স্বয়ম্বরা হও, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। আমি কোন অধিকারে তোমায় বারণ করব বা আদেশ দিব? নিষ্ঠুর নিয়তি সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন। আমি জানি তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবী-মূর্তির মতো আমার হৃদয়-বেদিতে অনন্ত প্রেম অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম।

 

সেদিনের তুমি সে বেদি গ্রহণ করলে না। পাষাণ-বেদির মতোই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদি-পীঠ।"

নজরুলের এসব ভনিতা একেবারেই পছন্দ ছিল না, তিনি আলী আকবর খানকে তা জানালেও তিনি নজরুলকে পাত্তা দেন না। সেইসঙ্গে খুব দ্রুত বিয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন, নিমন্ত্রণপত্রও অতিথিদের মাঝে বিলিয়ে ফেলেন। এসব ব্যাপার নজরুলকে পীড়া দেয়, আস্তে আস্তে তার মোহ ভাঙতে থাকে। এর ফাঁকে আলী আকবর খান সবার অগোচরে আরও একটি কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি নজরুলের জন্য কলকাতা থেকে আসা বন্ধুদের সব চিঠিই সরিয়ে ফেলতেন, সেইসঙ্গে নজরুলের পাঠানো চিঠিও পোস্ট না করে নিজের কাছে রেখে দিতেন।

এদিকে নজরুল বিয়েতে তার পক্ষের অতিথি হিসেবে বিরজাসুন্দরী দেবী ও তার পরিবারকে মনোনীত করেন। বিয়ের আগের দিন সবাই দৌলতপুরে এসে উপস্থিত হন। কলকাতায় নজরুলের বন্ধুদের এমন সময় দাওয়াত দেওয়া হয় যেন কেউ আসতে না পারে। কবির অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু কমরেড মোজাফফর আহমেদ নিমন্ত্রণপত্র পান বিয়ের পরে। এরপর এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত ৩ আষাঢ়। যতদূর জানা যায়, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় এবং আকদও সম্পন্ন হয়। কিন্তু কাবিনের শর্ত উল্লেখ করার সময়ই ঝামেলা বাধে। আলী আকবর খান শর্ত জুড়ে দেন যে, নজরুলকে ঘরজামাই থাকতে হবে। বাঁধনহারা নজরুল এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন। আকদ হয়ে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন নজরুল অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষুব্ধ। তিনি ছুটে যান বিরজাসুন্দরী দেবীর কাছে। তাকে বলেন, 'মা, আমি এখনই চলে যাচ্ছি'। বিরজাসুন্দরী দেবী বুঝতে পারেন এ অবস্থায় নজরুলকে ফেরানো সম্ভব নয়। তিনি তার ছেলে বীরেন্দ্রকুমারকে নজরুলের সঙ্গে দিয়ে দেন। সেই রাতে দৌলতপুর থেকে কর্দমাক্ত রাস্তা পায়ে হেঁটে নজরুল ও বীরেন্দ্রকুমার কুমিল্লা পৌঁছেন।

পরিশ্রম ও মানসিক চাপে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। নজরুলের জীবনে নার্গিস অধ্যায় সেখানেই শেষ হয়। শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সংগীতচর্চা এবং একটা সুসম্পর্ক ছিল কবির। সেই সূত্রে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে ১৯২১ থেকে ১৯২৩ সালের বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করেন কবি। সেখানেই ইন্দ্রকুমারের ভাইয়ের মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলা দেবীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যা পরে পরিণয়ে রূপ নেয়।

 

 নজরুলের প্রেম-বিদ্রোহের কুমিল্লা অধ্যায়

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লার জামাতা। তিনি ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচবার কুমিল্লায় এসেছেন। কুমিল্লা মহানগর ও মুরাদনগরের দৌলতপুরে কাটান এক বছরের বেশি সময়। তার জীবনে যে দুজন নারী এসেছিলেন সে দুজনই কুমিল্লার। প্রথমজন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের খাঁ বাড়ির আলী আকবর খানের ভাগিনী নার্গিস আসার খানম। অপরজন কুমিল্লা মহানগরের বসন্ত কুমার মজুমদারের মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তা দুলী। কুমিল্লায় অবস্থানকালে তিনি যেমন কবিতা, গান লিখেছেন, সংস্কৃতি চর্চা করেছেন, তেমনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করেছেন। হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে কুমিল্লার রাস্তায় ইংরেজবিরোধী গান গেয়েছেন। এ কারণে গ্রেফতার হয়েছেন। মুরাদনগরের দৌলতপুর, কুমিল্লা মহানগরের কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়ি, ধর্মসাগর পাড়, রানীর দীঘিরপাড়, মহেশাঙ্গন, দারোগা বাড়ি, টাউন হল ময়দান, সংগীতজ্ঞ শচীন দেব বর্মণের বাড়ি, নবাব বাড়িসহ কুমিল্লার আনাচে-কানাচে তার পদচারণার অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি শাখায় ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কবি নজরুল ছাত্রাবাস।

 

 

কুমিল্লা মহানগরীর নানুয়ার দীঘির দক্ষিণ পাড়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে 'নজরুল মেমোরিয়াল একাডেমি' নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কবির অন্যতম একটি কাব্যগ্রন্থের নামে কুমিল্লা ধর্মসাগরের উত্তরপাড়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে 'গুলবাগিচা প্রাথমিক বিদ্যালয়'। কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে 'নার্গিস-নজরুল বিদ্যানিকেতন' নামের একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। এখানে সংগীত নৃত্য, নাটক প্রশিক্ষণ ও পাঠাগারের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে 'নজরুল নিকেতন পাঠাগার'। কুমিল্লা হাউজিং এস্টেটে গড়ে তোলা হয়েছে নজরুলের নামে একটি সংগীত বিদ্যালয়। কুমিল্লার বিবিরবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'জাতীয় কবি নজরুল শিশু নিকেতন' নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

 

মুরাদনগরের দৌলতপুরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করার জন্য স্থাপন করা হয়েছে 'নজরুল মঞ্চ'। দৌলতপুরের 'খাঁ' বাড়িতে ঢোকার পথে স্থাপন করা হয়েছে 'নজরুল তোরণ'। মুরাদনগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনের নামকরণ করা হয়েছে 'কবি নজরুল মিলনায়তন'। ১৯৬২ সালে কুমিল্লার সে সময়ের জেলা প্রশাসক কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ নজরুল স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য শহরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সামনের সড়কটি 'নজরুল এভিনিউ' নামকরণ করেন। ১৯৭০ সালে কুমিল্লায় সাহিত্য চর্চার মানসে গঠিত হয় 'নজরুল ললিত কলা পরিষদ'। যা পরবর্তীতে 'নজরুল পরিষদ' নামে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭২ সালে 'নজরুল স্মৃতি পরিষদ' গঠিত হয়। এ পরিষদ নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহে স্মৃতিফলক নির্মাণের ব্যবস্থা করে। ১৯৯২ সালে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমির সামনে শিল্পী উত্তম গুহের তৈরি 'চেতনায় নজরুল' শীর্ষক একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলাকে ভাগ করে নতুন উপজেলা করার সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন উপজেলা 'কবি নজরুল' উপজেলা নামকরণের দাবি উঠেছে।

 

কুমিল্লায় নজরুল জন্মজয়ন্তী জাতীয়ভাবে ১৯৯২ সালে প্রথম পালিত হয়। এবার ২৫ মে থেকে তিন দিনব্যাপী দ্বিতীয়বারের মতো কুমিল্লায় নজরুল জন্মজয়ন্তী জাতীয়ভাবে পালিত হবে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, নজরুল কুমিল্লায় এসে হয়ে উঠেন অসাধারণ। এখানের গুণীজনদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠে। তিনি প্রেমে-বিরহে, সংগ্রাম আর গ্রেফতারে হয়ে উঠেন বিদ্রোহের কবি নজরুল।'

 

 বর্ণাঢ্য নজরুল

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান।

 

 

প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক করপোরাল থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন।

 

উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবীর কাছে তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন। এছাড়া সহসৈনিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে একই সঙ্গে।

 

বর্ণাঢ্য নজরুল

 

করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন তার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্দকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প : হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধি ইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এই সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফার্সি কবি হাফিজের কিছু বই ছিল।

 

এ সূত্রে বলা যায় নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

 

 নজরুল স্মৃতিধন্য ত্রিশাল :

'জ্যেষ্ঠের ঝড়' হয়ে বাংলা সাহিত্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের। এ কবির ২৩ বছরের সাহিত্যজীবনের একটি বিরাট অংশ ও নিজের বেড়ে উঠার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের সেই ত্রিশাল। জাতীয় কবির ১১৬তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান এবার জাতীয় পর্যায়ে উদযাপিত হচ্ছে কুমিল্লায়। কিন্তু উৎসবের ঘনঘটা রয়েছে কবির শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে।

ময়মনসিংহ জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পর্যটন সম্ভাবনাময় উপজেলার নাম ত্রিশাল। নজরুল স্মৃতিবিজড়িত এ উপজেলায় রয়েছে বিচ্যুতিয়া বেপারী বাড়ি, কবিপ্রিয় শুকনী বিল, দরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়। নজরুলের দুরন্ত শৈশবের নামাপাড়ার বুকে শতবর্ষী বটগাছ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নজরুলকে ত্রিশালের মানুষ কতটুকু ভালোবাসে তার প্রমাণ মেলে তার নামে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আছে দরিরামপুরে নজরুল একাডেমি, নজরুল মঞ্চ, নজরুল ডাকবাংলো, বিচ্যুতিয়া বেপারী বাড়িতে নজরুল জাদুঘর ও কাজীর শিমলা নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়। এখানকার নয়নাভিরাম প্রকৃতি আর নজরুলকে নিয়ে আগন্তুকদের কল্পনা মিলে হয়ে যায় একাকার। এছাড়া এখানে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের প্রথম ও একমাত্র সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। নজরুলপ্রেমীরা ত্রিশালে তাদের নিজ উদ্যোগে কবির নামে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। নজরুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নজরুল ডিগ্রি কলেজ, দুখুমিয়া বিদ্যানিকেতন, বিদ্রোহী কবি পাঠাগারসহ অসংখ্য ক্লাব সংগঠন আগলে রেখেছে বাঙালির প্রিয় কবি নজরুলকে। স্বপ্নপুরীর মতোই মিষ্টি ত্রিশালের একটি গ্রাম কাজীর শিমলা। এ গ্রামেই প্রথম পা পড়ে কবি নজরুলের। ১৯১৪ সালে দারোগা রফিজউল্লাহর মাধ্যমে এ গ্রামে আসেন তিনি। তখন রফিজউল্লাহ দারোগা পেশাগত কাজে কর্মরত ছিলেন আসানসোলে। নজরুলের প্রতিভায় বিমুগ্ধ দারোগা রফিজউল্লাহ ও তার স্ত্রী তাকে পড়ালেখা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। চলে আসেন ত্রিশালে। এখানে এসে ডানপিঠে ছেলেটি থাকতেন দারোগার বাড়ির বৈঠকখানায়।

 

দারোগা রফিজউল্লাহ ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে (বর্তমানে নজরুল একাডেমি) ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারির কোনো এক সময়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করেন তাকে। জানা গেছে, স্কুলে কবির প্রিয় শিক্ষক ছিলেন খিদির উদ্দিন পণ্ডিত, কৈলাস বাবু, মহিম চন্দ্র খাসনবিস। শিক্ষক বাবু মহিম চন্দ্রীতের সুরে মূর্ছনায় বিমোহিত করে তোলেন। খিদির পণ্ডিত তার শ্বশুরবাড়ি দরিরামপুর গ্রামে মাঝে মাঝে নজরুলকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন। পণ্ডিত সাহেবের শালিকা নূরজাহানের অপূর্ব মনোহারিণী রূপে মুগ্ধ হন কবি। এরপর নজরুল চলে আসেন বিচ্যুতিয়া বেপারী বাড়িতে। থাকেন জায়গীর হিসেবে। সুকনী বিল এখান থেকে খুব কাছাকাছি হওয়ায় কবি প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতেন এ বিলে।

 

ত্রিশালের বিচ্যুতিয়া বেপারী বাড়ির যে ঘরে নজরুল থাকতেন তা ঢেলে সাজানো হয়েছে নতুন করে। সেখানে নজরুল মিলনায়তন ও মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে। কিশোর নজরুলের কৈশোর স্মৃতিমাখা দারোগা রফিজউল্লাহ ও বিচ্যুতিয়া বেপারী বাড়ির ছায়াশীতল পরিবেশের এসব বৃক্ষরাজি, নজরুলের সাঁতারকাটা পুকুরের শান বঁাঁধানো ঘাট আর স্মৃতিকেন্দ্রের জাদুঘরে রক্ষিত ব্যবহৃত খাট, নজরুলের কলের গান দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য নজরুলপ্রেমী ভক্ত-অনুরাগী ও পর্যটক।

এইবেল ডট কম/এইচ আর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71