সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭
সোমবার, ৪ঠা পৌষ ১৪২৪
 
 
ধর্ষণ : নূরিতা নূসরাত খন্দকার (দ্বিতীয় খণ্ড)
প্রকাশ: ০৩:২৪ am ০৩-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ০৩:২৪ am ০৩-০৬-২০১৫
 
 
 


(গতকালের পর )  
ইস্তি তুমি কি সত্যি শাস্তি পেতে চাও?
হ্যাঁ পূজা আমাকে শাস্তি দাও তুমি। আমি সত্যি শাস্তি পেতে চাই।
না। তুমি সত্যি শাস্তি পেতে চাওনা।
আমি তো নিজেই বলছি।
এ তোমার মনের কথা নয়। যদি তুমি সত্যি শাস্তি পেতে চাও তাহলে নিজেই নিজেকে শাস্তি দিতে পারো। আমি নিজেকে কি শাস্তি দিব? সে কারণেই বললাম তুমি শাস্তি পেতে চাও না।
আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।
না বোঝার কিছুই নেই। তুমি কেন নিজেকে শাস্তি দিচ্ছ না যদি সত্যি তোমার অনুতাপ হয়ে থাকে? আমার কাছে শাস্তি কেন চাইবে? আমি জানি পুরোটাই তুমি অমানুষ নও। সামান্য পরিমান হলেও মানুষের কিছু লক্ষণ নিশ্চয়ই তোমার আছে। তাই যতটুকু পরিমান তুমি মানুষ- ততটুকু থেকেই বলো তোমার কি শাস্তি হওয়া উচিত? আমার যাকে শাস্তি দেয়ার ছিল আমি তাকে শাস্তি দিয়েছি ঠিকই। আমার প্রেমের সুযোগ নিয়ে যে প্রেমিক তোমার বিকৃত যৌনতার কাছে আমাকে তুলে দিয়েছে সেই জয়দীপের যৌনাঙ্গে গরম জল ঢেলে শীতল করেছি আমার মনের জ্বালা। নিজের মনের মত করে শাস্তি দিয়েছি। এখন তুমি বল তোমার মত ধর্ষকের কি শাস্তি হওয়া উচিত? তুমি নিজেই নিজেকে সেই শাস্তি দাও।
পূজা। তুমি আমাকে যা শাস্তি দিবে আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু আমি নিজেকে কি শাস্তি দিব সেটা আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বোলো না প্লীজ।
শোন ইস্তি আমি তোমাকে আবারও স্পষ্ট করে বলছি আমি এখানে আমার মৃত্যু বরণ করতে এসেছি। তোমাকে শাস্তি দিতে নয়। তোমার শাস্তি তুমি নিজেই ঠিক করবে।
এটাও তো কম বড় শাস্তি নয়।
যদি মনে কর তাই, তাহলে তাই। তোমার বয়স সাতাশ, তুমি মোটেও শিশু নও। বোঝার ক্ষমতা তোমার আছে। যদিও তুমি তেমন সমঝদার ব্যক্তি নও। কারণ সমঝদার মানুষ কখনও ধর্ষণ করে না।
তুমি একদম অন্যরকম এক নারী। সত্যি তুমি অনেক শক্তি রাখো।
আমি কি রকম সেটা যদি আমাকে রেপ করার আগে দেখে নিতে তাহলে হয়তো আমার এই পরিণতি হত না।
ঠিক বলেছ। এই পরিণতি হত না।
ইস্তি, তুমি কি মনে কর না যেসব বন্ধুর সঙ্গে তুমি মেতে থাকো ওরা কেবল তোমার ঠিকাদারির টাকা খেতেই আসে? জয়দীপ তোমার ঠিকাদারির বন্ধু। সে কেমন মানুষ এখন নিশ্চয়ই চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না? তুমি কেমন মানুষ সেটাও নিশ্চয়ই এতক্ষণে পরিষ্কার হয়েছে তোমার নিজের কাছে?
আমি মানুষ নই। আমি মানুষ নই পূজা। দীর্ঘদিন থেকে সেটা জেনে আসছি। অনেকদিন আগের একটা কথা মনে পরলো। আমি খুব ছোট, ক্লাস থ্রিতে পড়ি। ঈদের দিন ছিল সেদিনটা। নামাজ শেষে দাদা আর বাবার হাত ধরে বাসায় ফেরার পর সেমাই খেয়ে আর কোন কাজ খুঁজে পেলাম না। অনেক টাকা সেলামি পেয়েছিলাম কিন্তু বাইরে বেড়াতে যেতেও ইচ্ছে করছিল না। দুপুরের আগে পাড়ার বন্ধু আর ক্লাসের কয়েকজন বন্ধু বাসায় আসে। খুব আনন্দ হল ওদের দেখে। আমরা প্রায় সাত আটজন, সবাই মিলে আমার পড়ার ঘরে বসে ঈদের নামাজের ছবি এঁকে সময় কাটাচ্ছিলাম বেশ। খুব মনের মত সময় যাচ্ছিল সত্যি। ইচ্ছেমত যে যার ভাবনার রঙ ঢেলে ছবি এঁকে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেখছিলাম আর আলোচনা করছিলাম কার ছবি কোথায় বেশি সুন্দ্র হয়েছে এইসব। এমন সময় আমার দাদা ঘরে ঢুকে আমাদের ছবি প্রদর্শনীর বাহার দেখে 'নাউজুবিল্লাহ' 'আস্তাকফিরুল্লা' এই সব শব্দ তারস্বরে উচ্চারণ করে পারলে দেয়াল সহ ছিঁড়ে ফেলে এমন ভঙ্গিতে আমাদের সব ছবি টুকরো কুচি করে মেঝেতে ছুঁড়ে দিলেন। আমরা বিস্মিত! আমি তো কেঁদেই ফেললাম। দাদা বলতে থাকলেন, মুসলমান ঘরের পুত আমার নাতি হইয়া মাইনসের ছবি আকস? এইসব ছবি আঁকা হারাম কাজ। আস্তাকফিরুল্লাহ! আমার নাতি ছবি আঁকে, আল্লাহ্‌ কি আমারে বেহেস্ত দিব আর? আমি সেদিন প্রথম জানলাম মানুষের ছবি আঁকা হারাম কাজ। দুর্গা পূজার সময় মন্দিরে ঢাক বাজলেই আমার মন আনচান করত। ছোটবেলায় দৌড়ে চলে যেতাম মন্দিরে। ওখানে যত মূর্তি দেখতাম সবাই আমার স্বপ্নে এসে সত্যি সত্যি কথা বলত। আমি সেইসব কথাই ঠাকুর মূর্তির সাথে মনে মনে বলতাম মন্দিরে গিয়ে, কেউ এটা বুঝতে চাইত না। বাসায় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম দীর্ঘক্ষণ, দাদা পীঠে চাপড় মেরে বললেন, ঠাকুর দেখাও হারাম কাজ। কিন্তু মন্দিরে ঢাকের তাল, ধূপের ঘ্রাণ, পঞ্চ প্রদীপের আগুন দোলানো আরতি সবি আমার হৃদয়ে গভীর ভাল লাগা সৃষ্টি করে। এটা তো সত্য! একজনের পবিত্র ধর্ম কর্ম দেখাকে হারাম কি করে ভাবি? পুতুল নাচ, মানুষের গান- নাচ চতুর্দিকে যেখানেই আমার আনন্দ খুঁজে পেতাম সেখানেই সব হারামের রাজত্ব। গান শুনতে পহেলা বৈশাখের মেলায় বাবার সাথে যাব সেটাও হারাম কাজ। বাবা বোঝাতো, আমি যাই সমাজের দায়ে পরে, কারণ আমি মেয়র। তুমি ছোট মানুষ বুঝবেনা। বাসায় থাকো, কোরআন শরীফ পড়। বড় হলে বুঝবে। বড় হতে হতে একদিন বাবাকেই কোথায় যেন দেখি শহরের বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী স্বর্ণা ঘোষের গলা জড়িয়ে বাবা খুব হাসি তামাশা করছে। চোখ বন্ধ করে দ্রুত সরে যাই। মন থেকেই যেন বুঝেছিলাম ঐ দৃশ্যে আমার উপস্থিতি রঙতামাশায় বিষম পরিণতি আনতে পারে।
শহরে তোমার বাবার অনেক কেপ্ট আছে সেটা জানো?
জানি।
তোমার মা জানে?
জানে। ছোটবেলা থেকে সেসব নিয়ে বাবা মায়ের ঝগড়া বিবাদও বহুবার শুনেছি গভীর রাতে, যখন বাহিরের কোন লোকজন বাসায় থাকত না। ঐ রাতের ঘুমগুলো শ্বাস নেয়ার জায়গা খুঁজে বেড়াত কোন রাজপুত্রের কাছে কিম্বা লাল নীল পরীদের দেশে। সেখানেও চড়-থাপ্পড়-গালিগালাজ আর কান্নাকাটির অস্থির শব্দে আতংকিত একটা জগত দেখতে পেতাম। পূজা, তুমি বলছিলে আমার বিকৃত যৌনতার কথা তাই না?
হুম বলেছিলাম। বিকৃত যৌন চিন্তা থেকেই তুমি ধর্ষক হয়েছ।
এ কি আমি একা একাই শিখেছি তোমার মনে হয়? আমার পরিবেশ কি কিছুই এর দায় নিবে না, বল? অবুঝ বয়সে দাদা- নানা- মামা- চাচা- খালা- মামী- দাদী- নানী বহু বিচিত্র সম্পর্কের কতজনের কোলে ওঠা মাত্রই আমার শিশুতোষ যৌনাঙ্গে তাদের হাত অনুভব করেছি। কেউ কেউ ওটা বের করে চুষেও দিয়েছে অহেতুক। এতে আমার অস্বস্তি দিন দিন বেড়ে গিয়ে সময়ের আগেই আমি লিঙ্গের তাড়না বুঝতে শিখি। বাবা প্রতিটা কাজের মহিলাদের স্বভাব নষ্ট করায় আমার উপরও সেসব অত্যাচার ঝুঁকে আসে। না চাইতেই পেয়ে গেছি এমনও সুযোগ অল্প বয়সে চতুর্দিকে আমাকে ঘিরে রাখত। মনে পরছে, এস.এস.সি পাশের খুশিতে খুব খোঁজাখুঁজি করে একটা পতিতা এনে আমরা চার জন বন্ধু পাল্লা দিলাম কার যৌনশক্তি কত বেশি। পতিতার হাউমাউ কান্নায় নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লিংগবাজ- বীর্যবান মনে হল। কখনও ভাবিনি পতিতা তারও তো একটা শরীর আছে। পতিতা বিছানা ছেড়ে যখন বলল, এক্কেরে সব দিকে তোমার বাপের মতই হইছ। তখন সব বীর অহঙ্কার লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। নিজেকে একটা নিম্ন মানের পতিতার চেয়েও অসম্মানিত হতে দেখেছি। গাঁজার ধোঁয়ায়, মদের গ্লাসে খুঁজে বেড়াতাম আমার আমি ঠিক কোথায়? আমি মানুষ হব কখন বলতে পারো? পূজা, আমি আজ যত কথা বলছি এত কথা আর কোনদিনও বলতে পারিনি। আজ বহুবছর পর কথা বলে আমি নিজেকে মনে হয় সামান্য হলেও মানুষ ভাবতে পারছি। এইচ.এস.সি. পরীক্ষার আগের দিন আমার বন্ধুরা আমাকে ডুবিয়ে রাখলো বিদেশী মদ আর নতুন একটি মেয়ে দিয়ে। সেদিন থেকে আমি নতুন নতুন নারী খাওয়ার স্বাদ পেলাম। পরীক্ষার হলে বাবার আদেশে নকলের খোলা দরজা জানালা ছিল বলে উৎরে গেছি। কিন্তু ঐ জায়গায় সাধারণ কোন ছাত্র হলে ফেল করতই। জানো, এসব অন্যায় কাজগুলো আমার মধ্যে বেদনার চাপ সৃষ্টি করে এখনও। আবার সূর্য ডুবলেই নেশার টানে আবার টলে যাই নতুন অন্যায় পথে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স কোনোরকমে শেষ করে আমি যেন বেঁচে গেছি। আমার পড়ার প্রতি কোন মানসিকতা তৈরি হয় নি কোনোদিন। কিছু পড়ুয়া বন্ধুদের দেখি, ওরা বই ছাড়া কোন বন্ধুকে সময় দেয় না। আর আমার বই দেখলেই মনে হয় ওটাতো মুখস্ত করার জন্য। ওটা পড়ে পরীক্ষা দেওয়া ছাড়া আর কি কাজ থাকতে পারে !
তুমি কোন সাবজেক্টে পড়ালেখা করেছ?
পলিটিকাল সাইন্স। তুমি?
আমিও।
এখানে মিল আছে দেখছি।
কোন মিল নেই। তুমি ধর্ষক আর আমি ধর্ষিতা। দুজন দুই দিগন্তের।
আমাকে ক্ষমা করবে না জানি। আমি ক্ষমাও আশা করছি না। তবে কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন এই কাজ আমাকে দিয়ে হবে না।
হা হা হা। হি হি হি। হা হা হা।
তুমি অমন পাগলের মত হাসছ কেন?
হি হি হি। একটা ধর্ষক একটা ধর্ষিতার মাথায় হাত ছুঁয়ে দিব্যি করছে আর কোনওদিনও রেপ করবে না। এমন গাঁজাখোরি দৃশ্য দেখলে কে না হাসবে?
হাসো। যতখুশি হাসো। তবু আমাকে শুধরানোর একটা রাস্তা দাও। আমি নিজেকে নিজের সব অপকর্ম থেকে মুক্তি দিতে চাই। আমি নিজেই আজ থানায় যাব। সব স্বীকার করব।
তাই নাকি!
বিশ্বাস করলে না?
একটা ধর্ষককে একটা ধর্ষিতা কিভাবে বিশ্বাস করবে, শুনি?
এতক্ষণ কি আমার মধ্যে ধর্ষকের কোন চেহারা দেখেছ?
আমিতো এখন ছেড়াফাটা। ধুলোবালি মাখা। তার উপর উপোষ চেহারা। কোনও আবেদন এখন আমার চেহারায় নেই। তাই তোমার ধর্ষক চেহারাটা নেতিয়ে আছে।
ভুল বললে। তুমিই তো বলেছিলে, ধর্ষকের কাছে যে কোন নারী শরীর হলেই চলে, ভুলে গেছ?
না ভুলিনি।
তুমি তো একটা নারী শরীরই। কিন্তু তোমাকে ধর্ষণ নয়, আদর করতে ইচ্ছে করছে। এটা মনের কথা বললাম। এই আদরে কোন যৌনতা নেই। এমন আদর- আমি নিজেও কোনোদিন পাইনি, কাউকে কখনো করিওনি। এ আদর মনে হয় নিজেকে আর অন্যকে পবিত্র করে তোলার জন্যই। সকল ধর্ষককে এই আদরের ছোঁয়া দিতে ইচ্ছে করছে। দিতে চাই সকল ধর্ষিতাকেও। যেন এই আদরের ছোঁয়ায় অন্ধকারে নিমজ্জিত সকল ধর্ষক- ধর্ষিতা দুই দিগন্ত থেকে পবিত্র হয়ে জাগিয়ে তুলবে চেতনার একটি নতুন সূর্য। তার আলোতেই পুড়ে পুড়ে জগতের মানুষ ভুলে যাবে ধর্ষণের মত ঘৃণ্য অমানবিক কাজ।
চলবে ............
এইবেল ডট কম/এইচ আর
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71