শুক্রবার, ২০ এপ্রিল ২০১৮
শুক্রবার, ৭ই বৈশাখ ১৪২৫
 
 
চিতলমারীতে রজ্জবআলী’র নেতৃত্বে অসংখ্য হিন্দুকে হত্যা করা হয়
প্রকাশ: ১০:৩৭ am ১৭-১২-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৩৭ am ১৭-১২-২০১৭
 
চিতলমারী প্রতিনিধি
 
 
 
 


স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৬ বছর পর এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের খড়মখালি গ্রামের ষষ্টি চরণ হালদারের দ্বিতল ভবনটি। '৭১-এর  অনেক স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি দেখার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে এখনো অনেকে ছুটে আসেন। নতুন প্রজন্মের কাছে বাড়িটি দর্শনীয় হয়ে উঠছে দিন দিন। আর এখান থেকে যুদ্ধের অনেক ইতিহাস জানতে পারছেন অনেকে। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় চার যুগ অতিবাহিত হয়ে গেলেও চিতলমারী এলাকার একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি এখনো সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
 
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকসেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উপজেলার খড়মখালি গ্রামের ষষ্টি চরণ হালদারের দ্বিতল ভবনটি এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প তৈরি করে সেখানে বসে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। এছাড়া এলাকার আরো ২-৩টি বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ‘একটি বাড়ি, এক যুবক, এক লাঠি ও এক টাকা’ এই স্লোগান সামনে রেখে এলাকার নারী-পুরুষ ও যুবকরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এলাকা শত্রুমুক্ত করার জন্য শপথ নেন তারা। ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও বলেশ্বর সংলগ্ন পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাটসহ ১১ জেলার গেরিলা বাহিনীর প্রধান এস এম এ সবুরের নেতৃত্বে এক জরুরী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এদিন কমিউনিস্টপার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত সশস্ত্র গেরিলা ইউনিটের সদস্যসহ প্রায় ১০-১২ হাজার লোক এ সমাবেশে যোগ দেন। এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয় এ সমাবেশের মাধ্যমে। অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে সতর্ক অবস্থানে থাকেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা। এলাকাটি নিরাপদ মনে করে আশপাশের নাজিরপুর, পিরোজপুর, বরিশালের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাণ ভয়ে লোকজন চিতলমারী এলাকায় আশ্রয় নেন। এ অবস্থায় ১৯৭১ সালের ১১ জুন সকালে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। হঠাৎ গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারিদিক। পাকসেনা ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনী যৌথ কোম্বিং অপারেশন চালায়। চারিদিক থেকে একযোগে আক্রমণ চালানো হয়।
 
এদিন প্রায় এক হাজার পাকসেনা ও পাঁচ শতাধিক রাজাকার অংশ নেয় নারকীয় ধ্বংস ও গণহত্যা যজ্ঞে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল বাগেরহাটের রাজাকার শিরোমণি রজ্জবআলী ফকির, সিরাজ মাস্টার ও আকিজ উদ্দিন। চতুর্মুখী আক্রমণ চালায় তারা। চিতলমারী সদর ইউনিয়নের ঝালোডাঙ্গা গ্রামের পাশে সিংগা নদীতে লঞ্চযোগে, বাগেরহাট-চিতলমারী সড়কপথে, বলেশ্বর নদীপথে গানবোট ও স্পিডবোটে চড়ে এসে একযোগে চিতলমারীর চারপাশ ঘিরে ফেলে। হিন্দু অধ্যুষিত দশমহল ও তার আশপাশের গ্রামের শত শত ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করাসহ অসংখ্য লোককে সেদিন হত্যা করা হয়।   
 
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীষষ্টি চরণ হালদারের পুত্রবধূ ইছামতি হালদার (৭১) এখনো বেঁচে আছেন। তিনি গর্ব করে জানান, যুদ্ধের সময় তাদের অনেক অবদান রয়েছে। হালদার বাড়ির পুরো ভবনটি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প করার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়াসহ সব ধরণের সাহায্য করতেন বাড়ির লোকজন। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা এই ভবনটিতে ক্যাম্প তৈরি করে বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকসেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় এখানেও চলে তুমুল লড়াই। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৬ বছর পার হলেও স্মৃতিবিজড়িত এই বয়োবৃদ্ধ ক্যাম্প ভবনটিকে আজও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
 
উপজেলার পূর্ব খড়মখালী গ্রামের প্রবীণ গৌর চন্দ্র মজুমদার সেদিনের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা তুলে ধরে জানান, সেদিন বলেশ্বর নদী দিয়ে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরা আক্রমণ চালায়। গুলির শব্দে চারিদিক কেঁপে ওঠে। অনেকে খলিশাখালী ও পূর্বখড়মখালী  গ্রামের একটি মাঠের  মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে  থাকে। এ সময় পাকবাহিনী তাদের দেখে ফেলায় গুলি চালিয়ে খড়মখালী গ্রামের বিমল কান্তি ভদ্র কান্তি হীরা, রাজদেব হীরা, যোগেন্দ্র নাথ মজুমদার, মহেন্দ্র নাথ মণ্ডল, আদিত্য মজুমদার, নীল কমল মণ্ডল, জিতেন মজুমদার, খগেন মণ্ডল (খোকা), অমীয় চৌকি দারের ভাইসহ আশপাশের এলাকা থেকে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য লোককে সেখানে হত্যা  করা  হয়। 
 
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ডেপুটি  কমান্ডার মো. আবুতালেব শেখ জানান, ওইদিন বাগেরহাট থেকে কুখ্যাত রাজাকার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে একটি পাকবাহিনী এলাকায় প্রবেশ করে বাড়ি-ঘরে  অগ্নিসংযোগসহ গণহত্যা চালায়। এছাড়া বলেশ্বর নদী থেকে গানবোডে সেল নিক্ষেপ করার পাশাপাশি রাইফেলের গুলি চালাতে চালাতে পাকবাহিনী এলাকায় ঢুকে গণহত্যা চালায়।


প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71