বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১
বুধবার, ২৪শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮
সর্বশেষ
 
 
খাল কেটে যেন কুমির না আনি
প্রকাশ: ০৩:৩৬ pm ৩০-০১-২০২১ হালনাগাদ: ০৩:৩৬ pm ৩০-০১-২০২১
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

গত কয়েক দিনে দুইটি দৈনিক পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী পাকিস্তান খুব শিগগিরই ১৯৭১-এ বাংলাদেশে গণহত্যা, গণধর্ষণসহ অন্যান্য নির্যাতনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইবে। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিয়াজি যখন ২০১৩ সালে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাসের জন্য মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের দেশপ্রেমিক বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, সেই ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান এখন তার ভাষায় দেশপ্রেমিকদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং বিবিধ নির্যাতনের জন্য সত্যি মাফ চাইবেন কিনা- এ বিষয়ে অনেকে সন্ধিহান রয়েছেন। আবার অনেকেই ভাবছেন, পাকিস্তান দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে আসায় এবং আরও বহুবিধ ক্ষয়িষ্ণু সমস্যায় নাস্তানাবুদ হওয়ায় চীন এবং তুরস্কের অনুপ্রেরণায় হয়তো ক্ষমা চাইতেও পারে। 

দৃশ্যত পাকিস্তানের অর্থনীতি এতই তলানিতে যে তাদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু চীনও একদিকে ঋণের টাকা পরিশোধের চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে আগে প্রতিজ্ঞা করা ঋণ দিতে নারাজ জোরালো গ্যারান্টি ছাড়া। 

টাইমস এবং ডন পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী, ইমরান খান মাদারে মিল্লাত পার্ক নামক ইসলামাবাদের বৃহত্তম পার্কটি বন্ধক রেখে সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত থেকে ৫০০ বিলিয়ন রুপি ঋণ নিতে যাচ্ছেন। ডন লিখেছে, পাকিস্তানের অর্থনীতি এতই ভঙ্গুর অবস্থায় ইমরান খানের এছাড়া পথ ছিল না। (সূত্র: দৈনিক মানবজমিন ২৫/১/২০২১) 

তার সাথে চলছে বেলুচিস্তান এবং সিন্ধুতে দুর্দমনীয় মুক্তিযুদ্ধ এবং পাশাপাশি পাকিস্তানের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যা। বেলুচিস্তান এবং সিন্ধুতে বিরামহীন গণহত্যা বিশ্বের সব দেশের এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনও রয়েছে সমালোচনামুখর। সম্প্রতি পাকিস্তানি চরেরা কানাডায় গিয়ে করিমা বালুচ নামে এক বালুচ স্বাধীনতাকামী নারীকে হত্যার পর সমালোচনার পারদ আরো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

তুরস্কের প্রতি ঝুঁকে যাওয়ার কারণে তুরস্কের প্রতি বৈরি সৌদি আরবও পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, পাকিস্তানকে পয়সা দিচ্ছে না। সব মিলে পাকিস্তানের অবস্থা তথৈবচ। চীন এবং তুরস্ক এ দুইটি দেশ এ ব্যাপারে দূতিয়ালি করছে। চীনের বিরাট স্বার্থ রয়েছে ভারতকে কোণঠাসা করার মানসে। তুরস্কের স্বার্থ সে দেশটি সৌদি আরবকে সরিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর নেতা হতে এবং অটোমান সাম্রাজ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করার। আর একটি বড় বিবেচনায় পাকিস্তান এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা হলো, ৭১ এ তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া। আর পাকিস্তান সেই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ৭১-এর পর থেকেই উন্মুখ হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য। 

অতীতে প্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার নীল-নকশা প্রণয়ন করে, পরে ২০০১-এর নির্বাচনের জন্য বিএনপি-জামায়াতকে প্রচুর অর্থ দিয়ে, ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলাযোগে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা করে। আমাদের দেশে জঙ্গিদের অর্থ এবং পরামর্শ দিয়ে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দিয়ে তারা অবিশ্রান্তভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও সফল না হয়ে তারা নতুন পন্থা ধরেছে মাফ চেয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সেখান থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্ছেদ ঘটানোর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া, তাদের প্রত্যাশায় যার চূড়ান্ত রূপ হবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া। তাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত এমনটি যে ক্ষমা চেয়েও যদি বৃহত্তর স্বার্থ হাসিল করা যায়, তাই তুলনামূলক বিচারে শ্রেয়।

পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার খবরে উৎফুল্ল বিএনপি এবং জামায়াত, আরো উৎফুল্ল সে সকল মুখচেনা বুদ্ধিজীবী যারা বর্ণচোরার মতো জামায়াত-বিএনপির এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী হলেও সতর্কতার সাথে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রেখে চোপা-রোস্তমের মতো তাদের আদর্শ নিয়ে এগিয়ে চলছে ৭১-এর পর থেকেই। এদের অনেকেই রাজাকারদের বংশধর। ক্ষমা চাওয়ার ছলে যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ৭১ এ যারা পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল তাদের হঠানো যায়, বাংলাদেশে পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। তাহলে তাই তো ভালো। 

শুধু ক্ষমা চাইলেই সব ঠিক হয়ে যাবে এমনটি নয়। আমাদের পাওনা অর্থ এবং সম্পদ আন্তর্জাতিক আইনের বিধান অনুযায়ী ফেরত দিতে হবে, ৭১ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বাংলাদেশ রয়ে যাওয়া বিহারিদের ফেরত নিতে হবে এবং সর্বপরি গণহত্যা-গণধর্ষণের বিচার অবশ্যই করতে হবে। 

দ্বিতীয় মহাসমরের পর নুরেমবার্গের মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল, টোকিও ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও কমান্ড কাউন্সিল-১০ এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিজয়ী দেশগুলো নিজস্ব বিচারালয় গঠন করে শুধু যুদ্ধাপরাধীদেরই নয়, তাদের মনিবদেরও সাজা দিয়েছে- সুপিরিয়র কমান্ড এবং মনিবের দায় তত্ত্বের বলে। অনেক গণহত্যা-গণধর্ষণকারী পাকিস্তানি সৈন্য এখন বেঁচে নেই। কিন্তু তাদের দায় তো নিতে হবে পাকিস্তান সরকারকে, যাদের নির্দেশনায় সৈন্যরা অপরাধগুলো করেছে। তাই বেঁচে থাকা সৈন্যদের সাথে পাকিস্তান সরকারকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আরো একটি মৌলিক কথা হলো এই যে, মাফ করার এখতিয়ার কিন্তু ৩০ লাখ শহিদদের উত্তরসূরিদের এবং নির্যাতনের শিকার হওয়া বীরাঙ্গনাদের। তারা ক্ষমা গ্রহণ করবে কিনা সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। অ্যাটম বোমা নিক্ষেপকারী যুক্তরাষ্ট্র জাপানের কাছে ক্ষমা চাইলেও জাপানের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষমা করেনি। একজন খুনি, ধর্ষক আদালতে ক্ষমা চাইলেই কি আদালত সাজা মওকুফ করে?

পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা কিন্তু আকাশচুম্বি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ৭ হাজার ৬৪০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পেয়ে তার ৮৪ শতাংশ ব্যয় করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, যেখানে ৩০ ভাগেরও কম দেওয়া হয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মোট রপ্তানিতে পূর্ব বাংলা থেকে পাঠানো দ্রব্য থেকে পাওয়া গিয়েছিল ২৫ হাজার ৫৫৯ মিলিয়ন টাকা, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঠানো দ্রব্য থেকে এসেছিল ২১ হাজার ১৩৭ মিলিয়ন টাকা। সে সময় সোনালি আঁশ খ্যাত আমাদের পাটই ছিল সবচেয়ে বড় রপ্তানি সামগ্রী। আমদানি খাতে পশ্চিম পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিল ২৯ হাজার ৬২৯ মিলিয়ন টাকা। অথচ পূর্ব বাংলাকে দেওয়া হয়েছিল ১৭ হাজার ৬৭ মিলিয়ন টাকা, যে তথ্য ১৯৭০ সালে করাচিতে প্রকাশিত মান্থলি ফরেন ট্রেড স্ট্যাটিসটিক্স থেকে পাওয়া গেছে। অনেক অর্থনীতিকের মতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করা অর্থের পরিমাণ ছিল ২ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী শুধু বৈদেশিক বাণিজ্য বাবদ পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা ছিল, যা সুদ-আসল এবং মুদ্রাস্ফীতিতে এখন বহু গুণ বেড়ে গেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, জাতিসংঘের কার্যক্রম পরিচালনা কর্তৃপক্ষের হিসেব অনুযায়ী, তার আর্থিক মূল্য ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী তা ছিল ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা, যা এখন অনেক বেড়েছে। তাছাড়া ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর সারা পৃথিবী থেকে যে টাকা এসেছিল ত্রাণ হিসেবে, সে টাকারও   বড় অংশ রেখে দিয়েছে পাকিস্তান। বিভিন্ন দেশে পাকিস্তান দূতাবাস ভবনেরও আমরা অংশীদার যার হিস্যা পাকিস্তান আমাদের দিতে বাধ্য বটে। পাকিস্তান বিহারীদের ফেরত নেয়নি যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সৈন্যদের সাথে মিলে গণহত্যা, গণধর্ষণ চালিয়েছিল। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ব্যাপারে বেশকিছু সমীকরণের প্রশ্নও জড়িত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে বিশ্বব্যাপী জঙ্গি অর্থায়ন তদারকি করার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স নামক যে আন্তর্জাতিক সংস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, যার দায়িত্ব কারা জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে তা নির্ধারণ করা এবং সেসব দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, সেই সংস্থা পাকিস্তানকে ধুসর তালিকাভুক্ত করেছে পাকিস্তান জঙ্গিদের অর্থ সাহায্য করে চলছে বলে। পাকিস্তান মাত্র ৫ বছর আগেও আমাদের দেশের জঙ্গিদের অর্থায়ন করে ধরা পড়ার পর দুইজন পাকিস্তানি কূটনীতিককে বহিস্কার করা হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ঢাকায় পাকিস্তানি দূতাবাসের বিরুদ্ধে বহুবছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এবং ভারতবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি পর্যায় থেকে তাদের সতর্কও করা হয়েছে। কিন্তু তা যে তারা বন্ধ করবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? পাকিস্তান আরো বৃহত্তর স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে কৌশলগত কারণে মুখে ক্ষমা চাইলেও, সেটা তাদের অন্তরের কথা হবে না। মনের মণিকোঠায় তাদের থাকবে ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ, যার জন্য তাদের সার্বক্ষণিক তাক থাকবে মুক্তিযুদ্ধের সরকারের পতন ঘটানো। এ কাজে তারা অতীতের মতো যে তাদের দূতাবাসকে ব্যবহার করবে না, তার নিচ্ছিদ্র নিশ্চয়তা ছাড়া পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন হবে আমাদের জন্য আত্মহত্যার সামিল। সম্পর্ক উন্নয়নের নামে আমাদের অভ্যন্তরে একবার প্রবেশ করতে পারলেই পাকিস্তান তাদের গোয়েন্দা আইএসআই বাহিনী দিয়ে ভরে ফেলবে এদেশ, যেমনটি করেছিল জিয়া এবং খালেদা জিয়ার সময়। 

বাংলাদেশে তাদের চরের অভাব নেই, যাদের বেশিরভাগ হলো ৭১-এ পরাজিত অপশক্তির লোকেরা বা তাদের বংশধররা এবং ধর্ম ব্যবসায়ীরা। এছাড়া প্রচুর টাকা বিতরণে অভ্যস্থ পাকিস্তান তাদের অকাতরে পয়সা বিতরণ করে তাদের চরের সংখ্যা বহুগুণে বাড়িয়ে ফেলে আমাদের জন্য সংকট ঘনীভূত করবে। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানের আইএসআই অত্যন্ত নিপুণ এক বাহিনী।

পাকিস্তানি নাগরিকদের অবাধ ভিসা দেওয়া হলে তারা যে আবার ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? পাকিস্তান যদি অতীতের মতো আমাদের দেশে বসে ভারতবিরোধী কার্যক্রম শুরু করে, যার সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ, তাহলে ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক বিঘ্নিত হতে বাধ্য। যার ফলে আমরা এ অর্থে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো যে- ভারতের সাথে সুসম্পর্ক উভয় দেশের স্বার্থেই অপরিহার্য। 

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতের সাথে বৈরিতার কারণে আমাদের উন্নয়ন ২৫ বছর পিছিয়ে গেছে। বর্তমানে সৌদি আরব এবং তুরস্কের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। পাকিস্তানের সাাথে তুরস্কের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক উন্নয়ন হলে, ফলে সৌদি আরবের সাথে আমাদের সম্পর্কে অবনতি হলে আমরা বহুবিধ ক্ষতির সম্মুখীন হবো। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে যে বিশ লাখের কাছাকাছি বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক মুখে যাই বলুক একজন রোহিঙ্গাকেও গ্রহণ করেনি।

তুরস্কের বর্তমান রাষ্ট্রপতি এরদোগান ইসলামিক উগ্রপন্থার মদদদাতা বলে অভিযোগ রয়েছে, যাদের নীতি হচ্ছে জঙ্গিবাদ। পাকিস্তান তুরস্কের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার কারণে সৌদি আরবের কোপানলে পড়েছে। সৌদি আরব এরইমধ্যে এ কারণে অর্থ দেওয়া বন্ধ করাসহ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেশকিছু প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

তুরস্ক আমাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে এমন কঠিন অবস্থান নিয়েছিল যে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসির আদেশ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে ফোনও করেছিলেন। সেই তুরস্কের তাদের অবস্থান ১৮০ ডিগ্রি মাত্রায় পরিবর্তন করাটা সন্দেহজনক বৈকি।

সম্প্রতি সৌদি আরবের অতি গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে ‘সৌদি গেজেটে’ তুরস্ককে ‘অটোমান সাম্রাজ্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় লিপ্ত একটি আগ্রাসী দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা লিখেছে- তুরস্ক অন্যায়ভাবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে অপসারণের জন্য সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সেনা মোতায়েন করেছে, ইরাকের উত্তরাঞ্চলে আক্রমণ চালিয়েছে এবং ইরাকে ইরাকি টার্কমেন নামক এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, আরব দেশসমূহে বিভেদ সৃষ্টিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে নিজেদের জড়িয়েছে, যার সবকিছু করা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের উচ্চাভিলাস চরিতার্থ করার জন্য। সৌদি গেজেট আরও লিখেছে, তুরস্ক পুরো এলাকায় জঙ্গিদের সমর্থন করছে এবং মুসলিম ব্রাদারহুডকে সুসংহত করছে, তুরস্ক এখন তার সম্প্রসারণমূলক নীতি দক্ষিণ এশিয়ায়ও প্রসারিত করেছে।

‘পাকিস্তানও তুরস্কের প্রভাব বলয়ে পড়ে গেছে’- উল্লেখ করে পত্রিকাটি লিখেছে- পাকিস্তানকে ভাবতে হবে এটা পাকিস্তানের জন্য বিপজ্জনক কিনা যখন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স পাকিস্তানের পিছু ছাড়ছে না। আমিরাতের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার গারগাশ তুরস্কের দ্বৈত অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। 

বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টার অন্যতম উদ্যোক্তা চীন। এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ স্বার্থ হচ্ছে বাংলাদেশকে ভারতবিরোধী অবস্থানে ঠেলে দেওয়া এবং পাকিস্তানের ঘাড়ে ভর করে, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রবেশ করে তাদের প্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করা। গত বছর ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দিন, খালেদা জিয়ার বিতর্কিত জন্মদিবসে তাকে উপহার পাঠানো চীন প্রমাণ করেছে তাদের প্রিয় দল বিএনপি এবং সেই দলকে খুশি করার জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যা দিবসেও উপহার পাঠালো। চীন আরো প্রমাণ করলো, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের মনোভাব এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

গত ২২ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার খবরে প্রকাশ পাকিস্তানের শীর্ষ আমলারা প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছে পাঠানো অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, পাক-চীন অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প তৈরির সময় থেকে দফায় দফায় চীন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঘুষ দিয়েছে। এতে  বলা হয়েছে, চীন সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম সেলিম বাজওয়াকে, যিনি ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডর অথরিটি’র চেয়ারম্যান অর্থাৎ শীর্ষপদে ছিলেন। 

চীনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ বাংলাদেশেও রয়েছে। ২০১৮ সালে সরকারের সড়ক ও মহাসড়ক সচিবকে ‘৫০ লাখ টাকা ঘুষ সাধায়’ চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সম্প্রতি পাকিস্তানের এফ এম শাকিল লিখেছেন, পাকিস্তান সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রাক্তন সভাপতির নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার প্রতিবেদন দেখেই বোঝা যায় যে বিদ্যুৎ খাতে চীন কী ধরনের দুর্নীতি করছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের আওতায় চীনের কোম্পানিগুলো সরকারের নিয়ম-কানুন লংঘন করে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ মুনাফার সুযোগ করছে। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ২৩ জানুয়ারি) কয়েক মাস আগে পাকিস্তান সিনেটের এক প্রভাবশালী সদস্য চীনকে ‘নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এ প্রকল্পের অধীনে গোয়েদার বন্দরের নিকটবর্তী কয়েকটি দ্বীপ চীনকে দিয়ে দিচ্ছে- এমন দাবি তোলে বেলুচিস্তান এবং সিন্ধুর জনগণ ফুসে ওঠে। চীনের এমন কর্মকাণ্ডের জন্য সম্প্রতি অতীতে চীনের ফাঁদে পা দেওয়া শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপও চীন থেকে সরে এসেছে; এমনকি নেপালেও পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

আজ যখন আমরা দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলের জন্য যুদ্ধ করছি সেখানে চীন দুর্নীতির বিরাট থলি নিয়ে আমাদের দেশে পাকিস্তানের ঘাড়ে বসে প্রবেশ করলে আমাদের দুর্নীতিবিরোধী যুদ্ধ বাধাগ্রস্ত হবে। চীন যে অত্যন্ত প্রচ্ছন্নভাবে নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রবেশ করে তাদের পছন্দের লোককে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করেছে, সেটি আমাদের দেখতে হবে গভীর সতর্কতার সাথে যাতে আমাদের দেশেও তারা তাদের পছন্দের দলের জন্য এমনটি করতে না পারে।

পাকিস্তানি দূত ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান চুক্তি দেখিয়ে এই মর্মে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করছেন যে, এই চুক্তির পরে আর কিছু থাকে না। কিন্তু চুয়াত্তরের সেই চুক্তিতে আমাদের পাওনা সম্পদ ফেরত দিতে হবে না বলে, বা পাকিস্তানিরা ৭১ সালে যে ধ্বংযজ্ঞ চালিয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না, এমন কথা নাই। চুক্তিতে বিহারিদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে যে কথা রয়েছে, পাকিস্তান তা পালন করছে না। এ ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানে ‘ডমিসাইলড বিহারি’দের কথা বলা হয়েছে। ডমিসাইল আইনি তত্ত্ব যা নির্ধারণ করতে আনুগত্য এবং সম্পর্কের নিবিড়তাই মূল উপাদান বিধায় দুই-চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া সকল বিহারিই পশ্চিম পাকিস্তানের ডমিসাইলড। ডমিসাইলড আর বাসিন্দা এক কথা নয়। চুক্তিতে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, সরকার ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করবে না, কিন্তু কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা করতে পারবে না, এমন কথা নাই বা কেউ যাতে মামলা করতে না পারে তার জন্য দায়মুক্তি আইন করা হবে- এমন কোনো কথাও নাই। সে অর্থে যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। 

তাছাড়া এ ব্যাপারে যদি হাইকোর্টে সরকারের উপর নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে রিট করা হয়, তাহলে সেই রিটেও ফল পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চুক্তিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এ মর্মে ঘোষণা আছে যে, তিনি জনগণকে বলবেন অতীত ভুলে যেতে। সুতরাং তিনি নিজে কোনো প্রতিজ্ঞায় না গিয়ে বিষযটি জনগণের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। তাছাড়া অতীত ভুলে যাওয়া মানে ক্ষমা চাওয়ার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়, বরং ভুলে যাওয়া এবং ক্ষমা চাওয়ার দায় অঙ্গাঙ্গিভাবে এ অর্থে জড়িত যে অতীত ভুলে যাওয়া ক্ষমা চাওয়ার উপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় মহাসমরের পর নুরেমবার্গ এবং টোকিওর মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ছাড়াও কমান্ড কাউন্সিল-১০ এর সিদ্ধান্ত মতে বিজয়ী রাষ্ট্রগুলো নুরেমবার্গে গঠন করেছিল, সেগুলোও সেসব নিজস্ব ট্রাইব্যুনালগুলোও বহু যুদ্ধাপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।

এ চুক্তির পর ১৯৭৪ সালের জুন মাসে ভুট্টো বাংলাদেশে এলে বঙ্গবন্ধু তাকে পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন, আমাদের পাওনা সম্পদ এবং আমাদের দেশে ধ্বংযজ্ঞের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে। বঙ্গবন্ধু তার শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সে দাবি তুলেছেন। 

আমাদের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানে গিয়েও এ দাবি তুলেছিলেন। শুধু  জিয়া, এরশাদ এবং খালেদা এ ব্যাপারে চুপ করে থাকতেন। প্রথম মহাযুদ্ধের বিজয়ী দেশগুলো জার্মানির উপর দায় চাপিয়ে দিল ১৩২ বিলিয়ন স্বর্ণমার্কস দেওয়ার দায় চাপিয়ে দিল। যা পরে ১২১ বিলিয়নে নামানো হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিকে বাধ্য করা হয়েছিল ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে। এগুলো সবই আন্তর্জাতিক আইনের বিধান হওয়ায় পাকিস্তানও আমাদের পাওনা সম্পদ ছাড়াও ধ্বংযজ্ঞের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।

সম্প্রতি এক বাংলাদেশি সাংবাদিক পাকিস্তানকে মাফ করে দেওয়ার পক্ষে লিখতে গিয়ে বলেছেন, “জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্রিটিশ রানি মাফ চেয়েছেন।” কথাটা তিনি ঠিক বলেননি। ১৯৯৭ সালে ভারত ভ্রমণকালে রানি বলেছিলেন- ব্যাপারটি কঠিন, তবে ইতিহাস নতুন করে লেখার সুযোগ নাই। এ বিষয়ে বরং ২০১৩ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন- জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। অবশেষে ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্য সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছিল মাত্র। মাফ কেউই চাননি। 

এ ব্যাপারে ক্ষমার সাগর গান্ধী, যিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নাথুরাম গডসেকে ক্ষমা করতে বলেছিলেন, তিনিও ১৯২১ সালে এলাহাবাদে কংগ্রেস সভায় বলেছিলেন, “আমরা জেনারেল ডায়ারকে (জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যার খলনায়ক) মাফ করতে পারি, কিন্তু তার হত্যাযজ্ঞের কথা ভুলে যেতে পারি না।” গান্ধী বলেছেন, “যদিও আমরা অন্যায়কে ভুলে যাওয়ার এবং ক্ষমা করার কথা বলি, তবুও এমন কিছু বিষয় আছে যাকে ক্ষমা করা পাপের কাজ।”

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একই ধরনের কথা বলেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানি দূতকে যা বলেছেন, তাও কিন্তু একই ধরনের। জাপানে অ্যাটম বোমা ফেলে দুই লাখেরও বেশি মানুষ হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমা চাইলেও জাপানিরা কিন্তু ক্ষমা করতে পারেনি। 

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন-রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে বারবার মিয়ানমারের পক্ষে ভেটো না দিলে ২০১৭ সালে নিরাপত্তা পরিষদেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। কেন না নিরাপত্তা পরিষদের রয়েছে প্রয়োগ এবং পুলিশি ক্ষমতা। তদুপরি আন্তর্জাতিকভাবে আগ্রাসী দেশ হিসেবে পরিচিত চীন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লংঘন করে দক্ষিণ চীন সাগরে একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করে সে অঞ্চলের সব দেশের সাথে বৈরিতা গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া। চীনের সাথে অতিশয় সম্পর্কে জড়ালে এসব দেশের সাথে আমাদের সম্পর্কে কী প্রভাব পড়বে তা অবশ্যই বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। 

অতীতে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে বর্তমানে শ্রীলংকা, মালদ্বীপ তাদের নীতি পাল্টাচ্ছে, এমনকি নেপালেও পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সুতরাং খাল কাটার আগে ভাবতে হবে শেষে কুমির না এসে যায়। সূএ: বিডি নিউজ

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2021 Eibela.Com
Developed by: coder71