বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০
বৃহঃস্পতিবার, ২৯শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১১:১৬ pm ০৭-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১১:১৬ pm ০৭-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


কেউ জীবন থেকে চলে গেলেও চলতে হয় সামনের দিকেই তাইতো আমারও চলতে হচ্ছে সামনের দিকেই। প্রতিদিনের মতো মানিক, হীরা, চিত্রা ওদের পড়ায়ে কলেজে যেতে হচ্ছে। কিই বা লাভ আছে নিজের ব‍্যর্থতা বা দুঃখের কথা অন‍্যকে শেয়ার করে। আমাদের সমাজ ব‍্যবস্হাটা এতোটাই যান্ত্রিক যেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে আমাকে আগামীতে পথ চলার জন্য, এই পথ চলা যেন কখনোই শেষ হবার না। তাই দৈনন্দিন ক্লাস, হাসি ঠাট্টা, বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিয়েই সময় গুলো কাটাতে হচ্ছে আমাকে। তাই ফরিদপুরে আমার কলেজ জীবন এমন ভাবে কেটে যাচ্ছিল আমি যেনো টেরই পায়নি, এরই মাঝে অনেক সময় কেটে গেছে আমার। অনেক বন্ধু-বান্ধব প্লান করছে পরীক্ষার পর সবাই ঢাকায় ভর্তির হবে। আমিও তার ব‍্যতিক্রম কোন চিন্তা করছি না কিন্তু ঢাকার জীবন তো অনেক ব‍্যায় বহুল। বন্ধুদের সবারই পারিবারিক একটা পরিচিতি আছে, আছে তাদের উচ্চশিক্ষার মতো আর্থিক অবস্থা। আমার আর্থিক অবস্থা ভালো না তার পরেও আমি ওদের সাথে মিশতাম। একসাথে প্রাইভেট পড়তাম জিতেন স্যারের কাছে, স্যার আমার কাছ থেকে বেতন নিত না, আমি তালে তাল মিলিয়ে চলতাম তাই বন্ধুরা কেউ কখনো ছোট করে দেখতে সাহস পেত না, তবে হ্যা কিছু বন্ধুরা আমার ব্যাপারটা জানতো কিন্তু স্যারের বেতন না নেওয়ার ব্যাপারটা জানতো না। বিশেষ কিছু বন্ধু ব্যতীত আমাদের আর্থিক অবস্থার কথা কাউকে বলতাম না। আমার আর্থিক দুরবস্থার কথা সব বন্ধুদের বলে লাভ কি? না বলাই ভালো। তাতে করে সব বন্ধুদের সাথে মন খুলে আড্ডা দিতে পারতাম জুয়েল, পপি, শামীম, রিনা, ওপেল, মুজিব, হালিমা, রিনি, হরিশবার আরো দুই বান্ধবী ভারতী ও বিউটি সবাই আমার ক্লাসমেট। মধুখালি থেকে আসে আমাদের আরেক বান্ধবী মনি কি যে আড্ডা বলে বুঝানো যাবে না। আমাদের এই অড্ডার যেনো শেষ নাই, শেষ নাই দুই এক বন্ধুদের প্রেম কাহিনীও। অজয় এদিকে কলেজ হোস্টেলের পাশের বাড়ীর এক মেয়ের সাথে সম্পর্ক করতে থাকলো। বাবুল ও বাকী রইলো না ওর এক সহপাঠীর সাথে খাতির করতে। অজয়ের কি যে কাহিনি, শীতের সকালে যেয়ে রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা। ঐ মেয়েটা রিক্সায় যেতো, রিক্সায়টা এক মিনিটের জন‍্য দাড়ও করতো না, অসয‍্য লাগতো। বন্ধুর জন্য এতোটুকু কষ্ট তো করতেই হয় তাই কিছু বলতাম না। হাজারো কষ্টে কলেজের জীবনটা যেন একমুঠো রোদ নিয়ে হাজির হয়েছিল আমার যদিও মেঘলা আকাশের লুকোচুরি আর বৃষ্টির খেলা এখনও শেষ হয়ে যায়নি আমার জীবন থেকে, তারপরও ভালোলাগতো আমার কলেজ জীবনটা, জীবনে একটু ভাল লাগা না থাকলে বেঁচে থাকাটা খুব কঠিন।

যাক সেকথা, হটাৎ করে একদিন আলাউদ্দিন স‍্যারের সাথে পরিচয় হলো, আলাউদ্দিন স‍্যার ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমির গীটারের টিচার, বাড়ী হড়িশভা। স‍্যার আমাকে গীটার শিখার জন‍্য বললো, কোন চিন্তাভাবনা না করে গিটার শেখার জন্য ভর্তি হয়ে গেলাম। অজয়, বাবুল রাজনীতি করে তাই গীটার শিখার ধৈর্য‍্য ওদের নাই। একা একাই আলাউদ্দিন স‍্যারের কাছে শিখতে থাকলাম হাউয়াইন গীটার বাজানো। পর্যায় ক্রমে শিখতে শুরু করলাম সারগাম, তারে তারে টুকরা দিয়ে গিটারে সারেগামা সুর তোলা মোটেই সহজ কাজ নয়। সহজ নয় রবীন্দ্র সংগীতের একটা গান উঠানো। সারগাম শিখতেই আমার পনেরো দিন কেটে গেলো। যতটা সহজ মনে করেছিলাম ততটা নয় ধৈর্য্যৈর বাদ যেনো ভেঙ্গে যেতে লাগলো আমার। এভাবে কাটতে থাকলো প্রায় দুই মাস হটাৎ করে গীটারে ভর্তি হলো গোয়ালচামট খোদাবক্স রোড থেকে আসা একটি ব্রাহ্মণ মেয়ে, মেয়েটি আলাউদ্দীন স‍্যারের কাছে হাওয়াই গীটার শিখবেন। এদিকে আমি সারগাম শিখে ফেলছি আরো শিখেছি দুই তিনটি রবীন্দ্র সংগীত। আলাউদ্দীন স‍্যার আমাকে দায়িত্ব দিলো আমি যতটুকু শিখেছি ঐ পর্যন্ত যেন মেয়েটিকে শিখিয়ে আমার সমতায় নিয়ে আসি তারপর আলাউদ্দিন স্যার আমাদের দুজনকে একসাথে গিটার শিখাবে। স্যারের আদেশ কোনভাবে অমান্য করা যাবে না, কি আর করা আমি দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলাম। ঐ মেয়েটিকে সারগাম শিখাতে এক মাসের উপরে সময় লেগে গেল আমার। গিটার শিখাতে গিয়ে মেয়েটির সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় কেন জানি মেয়েটিকে ভালো লাগতে শুরু করলো আমার। তাই মাঝে মাঝে আমি ওর সাথে দুষ্টামি করতাম কিন্তু ভালোবাসার সাহস হতো না। গরিবের জীবনে ভালোবাসা বাসি বলতে কিছু নাই তাই জীবনের এই চ্যাপ্টারটা আমি কেটে দিয়েছি আমার জীবন থেকে। কাউকে নতুনত্ব কিছু শিখাতে গেলে নিজেকে হিরো হিরো মনে হয়, তাই আমি ক্লাসের ফাকে ফাকে ওকে দেখার জন‍্য গোয়ালচামট খোদাবক্স রোডে যেতাম, হিরোগিরি ফলাতে। আমার হিরোগিরি বাইরের কার্যকলাপের সাথে মনের ভেতর এর কোন মিল নাই, থাকবে বা কি করে নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে সংসারের সেই সংসারের জন্ম আমার। আমার আর্থিক দৈন্যদশার সমস্ত অবস্থায় আমি বুঝতে পারছি কিন্তু হিরোগিরি কোনভাবে থামছে না আমার তাই, সন্ধ্যার দিকে হাটার ছল করে ঐ মেয়েটিকে দেখতে যেতাম কখনও দেখা হতো আবার কখনো কত না। এভাবেই হিরোগিরি করতে গিয়ে আমার মাস দুয়েক চলে গেল। এদিকে অজয় তো ঐ মেয়েটার সাথে খুবই খাতির জমিয়ে ফেলছে। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দাড়িয়ে থাকতে হয় রাস্তায়। অজয়-মুক্তির প্রেম কাহিনি ইতিমধ্যে সমস্ত বন্ধুবান্ধব জেনে ফেলেছে জেনে ফেলেছে ওর গার্জিয়ানরা, তাই আমি কাছের বন্ধু হিসেবে খুব বিপদের আশঙ্কা দেখছি ওদের এই সম্পর্ক নিয়ে। ওদের কোন অবস্থাই মেনে নিবে না। জটিল সমস্যায় চলতে থাকলো দিনের পর দিন। অজয়ের কাছে শুনতে পাই মুক্তির জন‍্য ছেলে দেখাদেখি চলছে, তাই অজয়ের দুঃশ্চিন্তার শেষ নাই। বন্ধু বলে কথা, ওর টেনশন হলে আমাদেরও টেনশন। অজয় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো মুক্তিকে নিয়ে ভাগবে, মানে পালিয়ে যাবে। সঠিক দিন ক্ষন খুজতে লাগলো। কবে পালাবে, কবে পালাবে এই নিয়েই ওরা পরিকল্পনা করতে লাগলো। একদিন সত্যি সত্যিই অজয় মুক্তিকে নিয়ে পালালো। আমি নিজেও তো হিরো মুডে আছি তাই বিপদটা প্রথম আমার কাছে আসলো, মুক্তির বাড়ী থেকে আমার কাছে খোঁজ নিতে। অজয় বলেছিলো মাগুরা ঐ দিকে যাবে ঐখানে ওর এক আত্মীয় বাড়ী আছে । তাছাড়া আমি জানিও না কোথায় ওর আত্মীয় বাড়ী তাই সঠিক কোন উত্তর দিতে পারলাম না। হটাৎ করে ওরা ফিরে আসলো দু-চারদিন পরে লক্ষীপুর এক বান্ধবীর বাসায়, ওখানে ওদের বিয়ে দিতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েরতো অনেক নিয়ম কানুন আছে। বিয়ের পড়ানোর জন্য দরকার পুরোহিতের কোন কিছুই যোগার নাই আর বাদ্যযন্ত্রের কথা তো বাদই দিলাম। অজয় মুক্তির এই বিপদ দেখে আমার হিরো ভাবটা কাটেনি এখনো তাই আমি নিজেই ওদের গায়িত্রি মন্ত্র পাঠ করে আরো কিছু ভুলভাল মন্ত্র জব করে বিয়ে দিয়ে দিলাম। বিয়েতো আসলো দুটি মনের মিলোনের ব‍্যাপার, ওইসব মন্ত্র তন্ত্র কিছুই না। যাইহোক পুরোহিত সেজে আমি ওদের বিয়ে দিয়ে দিলাম পরে ওরা ঢাকা চলে গেল।

আমার সময়টা চলছে ভালোই গীটার শিখা, প্রাইভেট পড়ানো, মাঝে মধ্যে কলেজ করা সব মিলিয়ে চলছে আর কি। মাঝে মধ্যে গোয়ালচামট যেতাম এই ব্রাহ্মন মেয়েটিকে দেখতে পেতাম না কারন টিউশনি করে ফিরতে রাত হয়ে যেতো। একদিন গীটার ক্লাশে মেয়েটিকে বললাম তোমাকে তো ইদানিং দেখা যায় না তোমার বাড়িতে। ও বললো মা রাতে ঘড়ের বাইরে যেতে মানা করেছে। আমি বললাম সন্ধ্যার পরে আমি একটি কোকিল পাখির ডাক দিবো তুমি বের হইও, ও সম্মতি দিলো। ঔ দিন সারা দিন প্রাকটিস করলাম কোকিল পাখির ডাক শিখা, সন্ধ্যা পর্যন্ত শিখে ফেললাম আমি একদম কোকিল পাখির ডাক। হিরো হয়ে ওর জন্য একটা ডাক শিখতে পারব না তাই কি হয়! যথারীতি ওদের বাসার সামনে গিয়ে কোকিলের ডাক দিলে ও বের হয়ে আসতো, এভাবেই চলতে লাগলো মাস দুয়েক কোকিলের ডাক দিয়ে দূর থেকে আমাদের দেখা। গীটার ক্লাসে আবার একদিন দেখা হলো, সিড়ি কোঠায় দারিয়ে দু-চার মিনিট কথাও হলো আমাদের। বললাম এবার কোকিলের ডাক দিলে তুমি বাসার বাইরে এসো, ও সম্মতি দিলো। ওর কথা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে যদিও আগে আলাপ করেছি, অজয় মুক্তিও জানে কিছুটি, বাবুলও জানে। বাবুল আবার চালাক আছে, ও তলে তলে রিনার সাথে খাতির জমিয়ে ফেলছে এটা অবশ‍্য কাউকে বুঝতে দেয় না, বুঝতে দেয় না ওদের প্রেমের কাহিনি, কলেজে হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যায় ওরা। দেখা যায় কোন গাছের নিচে বসে গল্প করতে। যেহেতু বাবুল রিনা আমাদের কিছু বলে নাই তাই কোনো মাথাব্যথা নাই ওদের কারো নিয়ে আমাদের। যাহোক কথা মতো আমি গোয়ালচামট খোদাবক্স রোডে গেলাম, রাত তখন আট'টা কি সাড়ে আট'টা বাজে। আমি যথারিতি ওদের বাসার সামনে গিয়ে কোকিলের ডাক দিলাম, পর পর দুটো কোকিলের ডাক। অন্ধকার রাত, মনে হয় অমাবস্যা, যাকে বলে ঘুটঘুটে অন্ধকার, মনের মধ্যে ভয় ভয় লাগছে আবার ভাবছি আমি তো হিরো। প্রেম করতে এসেছি ভয় পেলে আমাকে চলবে না আমি ভয় নিয়ে আস্তে আস্তে আম গাছের নিচে দাড়ালাম। আচমকা একটু শব্দ হলো! আমিও ভয়ে লাফ দিয়ে উঠলাম, যাই হোক মনে মনে ভাবছি এতো ভয় নিয়ে হিরোগিরি কেমনে দেখাবো ভালোবাসা তো দূরের কথা। যাক সে কথা শব্দটা মনে হলো দরজা খোলার শব্দ ও মনে হলো দরজা খুলে বের হচ্ছে। ও একটু এগিয়ে আসছে আমিও এক-পা দুপা করে এগুচ্ছি, ও আমার দিকে আরো এক-পা দুপা করে এগুচ্ছে আমিও এগুচ্ছি। আমরা দুজনে খুব কাছাকাছি এমন অন্ধকার রাত মুখটা পযর্ন্ত দেখা যাচ্ছে না, হায়রে আমার হিরোগিরি। হটাৎ করে ও আমার হাতটা ধরে ফেললো, আচমকা মনের মধ্যে দোলা দিলো আমার। মনে হলো ও আমাকে দু-হাত ধরে আকরে ধরছে, বুঝতে পারছি না কি হতে চলছে। এই রাতে এত কষ্ট করে এসেছি মনে হয় ও আমাকে চুমু টুমু দিবে। আমি চুমু খাওয়ার জন্য অপ্রস্তুত অবস্থায়, মুখের কাছে মুখ, খুব কাছাকাছি আমরা, নিঃশ্বাসের শব্দ কানে শুনতে পাচ্ছি। খুব কাছে থেকে ওর মুখ দেখলাম আমি। আমি অন্ধকারের মধ্যে চোখ ডলছি, দেখায় কোন ভুল হল কিনা আমার, বারবার ওর মাকে দেখছি কেন আমি? আমি হাতটি ছিটকে ফেলে আজও দৌড় কালও দৌড়...। চলবে....

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71