বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০
বৃহঃস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন দেবনাথ
প্রকাশ: ১০:১৭ pm ০১-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১০:১৭ pm ০১-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


জ্বরের ঘোরেই রাতটা কাটলো আমার। সকাল বেলা দেখলাম একটু ভাল লাগছে মনে হয় জ্বর আর আসবে না। বাবা ইতিমধ্যে কাজে বের হয়ে গেছে, কানাইপুর ইসমাইল কাকার কাঠের দোকানে মোহরীর কাজ। খুব একটা বেতন করি বাবাকে দেয় না। মাসে ৭০০ টাকার মতো পায়, এ দিয়ে কোন মতে সংসার চলে আমাদের, যাই হোক দু-এক দিন বাড়িতে থাকলাম আমি। মনে হচ্ছে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছি তাই পরের দিন মাকে বলে ফরিদপুরের দিকে রওনা হলাম। ফরিদপুর যাবার পথে কানাইপুর বাবার সাথে দেখা করলাম। বাবা দিলীপ কাকার লেপ তোশকের দোকান থেকে বাকীতে মশারি সহ আমার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনে দিল। ওগুলো নিয়ে আমি গোপাল'দার বাসায় চলে আসলাম, গোপাল'দার বাড়ী থেকে শুরু হলো আমার লজিং মাস্টার এর জীবন, তার ভাই বোনদের পড়াশুনা করানোর কাজ। গোপালদার বাড়ী থেকে দু-চারদিন যেতে না যেতেই পেয়ে যাই আরো দুটি টিউশনি। পলাশ, আনন্দ, কামনা ওরা সবাই মহিম স্কুলে পরে, মাথায় একগাদা গবর ভর্তি, পড়াশোনা মাথায় ঢুকতে চায় না, গোপাল'দার অনুমতি নিয়ে ওদের বাসায় গিয়ে পড়ানো শুরু করলাম। ইতিপূর্বেই আমার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে গেছে।

ন‍্যাশনাল ট্রেডার্সে থাকা অবস্থায় রাজেন্দ্র কলেজ ভর্তি পরীক্ষাও দিয়েছিলাম, অপেক্ষা করছিলাম রেজাল্টের। মনে প্রানে ধরে নিয়েছিলাম পড়ালেখা আর হবে না, হবেই বা কি করে হাতে টাকা পয়সা নাই, এত অভাবে থেকে কি পড়াশোনা হয়? যখনই ভাবতাম আমার আর অর্থের অভাবে পড়াশোনা হবে না তখন আমার ভেতরটা খা খা করে কেঁদে উঠতো চোখের কোনায় জল এসে যেত। টিউশনি সবে মাত্র শুরু করেছি, হাতে মাত্র দু-একশ টাকা আছে, ভর্তি হতে তো অনেক টাকা লাগে তারপর বই পত্র আরো কতো কি? নিজের পরার মতো ভালো জামা কাপরও নাই, নাই কোন ভালো জুতা। সাহায্য চাওয়ার মতো কেউ নাই, কি যে এক অস্থির চিন্তা আমাকে আকরে ধরলো এই ভেবে যে, আমি কলেজে চান্স পেয়েও পড়ালেখা করতে পারবো না। আমাদের মনের সহজাত স্বভাব যখন বিপদে পরি তখনই সৃষ্টিকর্তাকে বেশি বেশি স্বরণ করতে থাকি, আমিও তার ব‍্যতিক্রম নই, হে ঈশ্বর তুমি আমায় রাস্তা দেখাও। গোপাল'দার বাড়ী থেকে আঙ্গিনা মন্দির বেশী দূর না, বিকালে হেঁটে হেঁটে ওখানে গেলাম, মন্দিরে ভিতরে যেয়ে অনেক কান্না করলাম। মন্দিরের আঙ্গিনায় চব্বিশ ঘন্টায়ই হরিনাম কৃত্তন হয়, খোল কত্তালের আর একনাম গানের শব্দে আমার বুকের ভিতরে যেনো আলাদা একটা কম্পন হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে বিশেষ শুন‍্যতা, মনে হচ্ছে শুধুই হাহাকার, অন্তর থেকে ভেসে আসছে কান্না, গলা দিয়ে যেনো ঢক চিপতে পারছি কান্নায়, দুটো চোখ যেনো অশ্রুসিক্ত হয়ে যাচ্ছে। হে প্রভু হে সৃষ্টিকর্তা আমাকে রাস্তা দেখাও। সন্ধ্যা গরিয়ে আসছে, ঐ দিন আঙ্গিনাতে একটি অনুষ্ঠান ছিলো, অনেক ভক্তবিন্দের আনা গোনা দেখছি। একটু এগিয়ে ভিতরে গেলাম, সবাই বৈঠকে বসে খিচুড়ি প্রসাদ খাচ্ছে আবার কেউ দাঁড়িয়ে আছে আমিও এক পাশে যেয়ে দাড়ালাম। প্রথম বৈঠকটি উঠলে যাতে দ্বিতীয় বৈঠকে সবার সাথে বসতে পারি। খিচুরি প্রসাদ খাওয়ার জন‍্য মনটাও যেনো ছটপট করছে। আঙ্গিনার ভিতরে খোলা ঐ জায়গায় সবাই নিচে বসে প্রসাদ পায় আর এটাই এখানকার নিয়ম। ইতিমধ্যে প্রথম বৈঠক টি উঠে গেছে বাকীরা দ্বিতীয় বৈঠক বসার জন‍্য প্রস্ততি নিচ্ছে, এদিকে আকাশে মেঘের গর্জন যে কোন সময় বৃষ্টি আসবে বলে মনে হচ্ছে। তারাতারি সবার সাথে মাটিতে বসে পড়লাম। খাবার পরিবেশনের জন‍্য আঙ্গিনার এক সাধু কলার পাতা দিয়ে গেলো আর এক সাধু বালতিতে করে খিচুরি প্রসাদ ধারাবাহিকভাবে সবাইকে দিচ্ছিল। আমি সবার শেষে একটি কর্নারে বসেছি। সাধু আমার পাশের লোকটিকে দুহাতা খিচুড়ি প্রসাদ দিলো, এবার আমাকে দিবে, আমার নাকে প্রসাদের খিচুরি ঘ্রান পাচ্ছি, সাধু আমার কলার পাতার উপর এক হাতা খিচুড়ি দিতে না দিতেই ভাগ‍্যের নির্মম পরিস্থিতি-ঝপ ঝপ করে বৃষ্টি চলে আসলো, কোন ভাবে বসে থাকতে পারলাম। আর প্রসাদটাও ভাগ‍্যে জুটলো না, দৌড়ে পাশের টিন সেটের নিচে গেলাম। নিজেকে অপরাধীর মতো মনে হচ্ছে আর তখন আমার মন বলছিলো হে প্রভু আমার যদি কোনদিন টাকাপয়সা হয় তখন আমি আঙ্গিনায় ভক্তদের খাওয়া জন্য একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল খাওয়ার সেট করে দিবো আর এটা আমার অবচেতন মনের ভাবনা। কাল বৈশাখী বৃষ্টি বেশী সময় থাকে না একটু পরেই থেমে গেলো। আঙ্গিনা থেকে বের হলাম আমি।

রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় আমার পাশে সিট পরেছিলো যে ছেলেটির তার সাথে দেখা হয়ে গেল। ছেলেটির সাথে দুই-এক মিনিট কথা বলেই বুঝা গেলো ওরা সবাই কলেজে ভর্তি হয়ে গেছে। আরো বললো ভর্তির আগামীকালই শেষ দিন। এই কথা শুনে মাথার উপর যেনো আকাশ ভেঙ্গে পরল, আর সেই সাথে ভেঙে যাচ্ছে আমার সারা জীবনের সমস্ত স্বপ্ন, বুকের ভেতরটা চুরমার করে ভেঙে যাচ্ছে। ফিরে গেলাম গোপাল'দার কাছে টাকা চাইলাম, গোপাল'দার কাছে কোন টাকা নাই। মিতার কাছে গেলাম ও আমার হয়ে অপু ইন্ডাস্ট্রির ম‍্যানেজারে কাছে গেলো গেল টাকা চাইতে, শূন্য হাতে ফিরে আসলো, সব জায়গা থেকে হতাশা আর হতাশা তাই সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে আশার আলো নিভে গেল আমার। রাতে যখন বাসায় ফিরলাম তখন দেখি সবাই ঘুমিয়ে আছে, কাউকে ডাকতে ইচ্ছে হলো না তাই না খেয়ে বিছানায় চলে গেলাম।

কতো টাকা লাগবে ভর্তি এবং বই কিনার জন‍্য এটা জানার জন‍্য সকালে আমি কলেজে গেলাম। রেজিস্টার কে অনুরোধ করলাম আমাকে ভর্তির সময় কয়েক দিন বাড়িয়ে দেয়া যায় কিনা? কলেজের রেজিস্টার সাফ জানিয়ে দিলো আজকেই ভর্তির শেষ দিন। আজকে ভর্তি হওয়ার কোনো উপায় আমার নাই, ভর্তি হতে পারছি না এটা নিশ্চিত হয়ে গেলাম। চোখে জল যেনো ছল ছল করছে, কান্না যেনো থামিয়ে রাখতে পারছি না। দৌড়ে চলে গেলাম কলেজের মসজিদের সামনে একটা পুকুর সেখানে, হাউ মাউ করে কান্না শুরু করে দিলাম, কান্নার শব্দটাকে কোনভাবে ধামাচাপা দিতে পারলাম না তাই জোরে জোরে শব্দ হচ্ছিল। অনেকে পাশ কেটে যাচ্ছে, কেউ তাকিয়েও দেখছে না আমায়, আমার কান্না যেনো কোনভাবেই থামছে না। হটাৎ করে স্বর্গের দূতের মত সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরা একটি বয়স্ক লোক, হাতে লাঠি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো এই ছেলে তোমার কি হয়েছে? আমি তার সামনে অসহায়ত্ত্বের মতো দাড়ালাম। বা-হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বললাম - আমার আজ কলেজে ভর্তির শেষ দিন টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারছিনা। আমার কথা শেষ না হতেই তিনি তার বাঁ-হাত পকেটে দিয়ে পকেটে থেকে একটি কালো মানিব্যাগ বের করলেন। ভদ্রলোক মানিব্যাগ থেকে দশটি নীল রঙের ৫০০ টাকার নোট আমাকে দিয়ে বললো যাও কলেজে ভর্তি হয়ে নাও। আমি ভদ্রলোক'কে চিনি না, কোন ভাবে সে আমার পূর্ব পরিচিত না, তাই টাকা নিতে ইতস্ত বোধ করছিলাম, জীবনের স্বপ্ন নিভে যাওয়ার শেষ পর্যায়ে আছি তাই হিতাহিত জ্ঞান দিয়ে না ভেবে টাকাটা হাতে নিলাম, হাতে টাকা পেয়ে বিদ‍্যুত চমকানো মতো আমার মস্তিষ্কে উল্লাসিত আনন্দ ধারা প্রভাবিত হতে শুরু করলো। আমি ভদ্রলোক'কের নাম জানিনা, নাম জিজ্ঞাসা করার মতো সাহসও আমার নাই তাই পিছু পিছু হাটা শুরু করলাম ইতিমধ্যে উনি আমার থেকে কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। টেলিফোন অফিসের সামনে একটি লোক দেখতে পেয়ে দাড়িয়ে গেলাম আমি। চুপিস্বরে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম ভাই ভদ্রলোক'কে চিনেন? সে তড়িৎ গতিতে উত্তর দিলো কেন চিনবো না ওনার নাম নুরু মিয়া। ঐ যে কলেজ হোস্টেলের পাশে উনাদের বাড়ী। আমি কৃতজ্ঞতা চিত্রে ওই ভদ্রলোকের হেঁটে যাওয়ার প্রস্তানটি দেখতে থাকলাম। চলবে....

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71