বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০
বৃহঃস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: ড: যশোদা জীবন দেবনাথ
প্রকাশ: ০৫:৪৭ pm ০২-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ০৫:৪৭ pm ০২-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


আমি হয়তো কলেজের ভর্তি ইচ্ছুক শেষ ছাত্র, কলেজ ফিরে গেলাম। ক্যাশিয়ারের কাছে টাকা জমা দিয়ে ভর্তির কাজটি শেষ করলাম। বুক ভরা এক স্বস্তি নেমে এলো আমার ভেতর। আমি বাইরে তাকালাম কলেজের কৃষ্ণচূড়া গাছে সদ‍্য প্রস্ফুটিত ফুল গুলো যেনো প্রসারিত হয়ে সারা গাছ সেজে আছে, হৃদয়ে আনন্দ ধারা প্রভাবিত হচ্ছে আমার। আমি ইসলামিয়া লাইব্রেরীতে গেলাম, যেহেতু আমি এইচ.এস.সি'তে কমার্স বিষয়ে ভর্তি হয়েছি, তাই কিছু হিসাব বিজ্ঞানে বই কিনলাম। আনন্দের আত্ম উপলব্দিতে দোলা দিচ্ছে আমার মন, এই ভাবে কেটে গেলো দু-চার দিন। কলেজের প্রথম ক্লাস শুরু হবে, অনেকটাই উৎফুল্ল, কিছুটা টান টান উত্তেজনা আবার সংকিত। সংকিত এই ভেবে যে কলেজে যাওয়ার মতো তেমন কোন ভালো জামা কাপর নাই আমার। কিছু টাকা অবশিষ্ট ছিলো ফরিদপুর নিউমার্কেটে গিয়ে আমার এক বন্ধু ওর নাম গুলু, ওকে নিয়ে এক সেট ড্রেস কিনলাম। নতুন পরিবেশে নতুন বন্ধুদের সাথে আলাপ হবে এই ভেবে আনন্দ লাগছে অবশেষে সেই সময়টা চলে আসলো।লাক্সারি হোটেল থেকে কলেজের গাড়ীতে কোরে কলেজে পৌছালাম। অদ্ভূত একটা আনন্দ শিহরণ দিচ্ছে মনে। প্রথম ক্লাস স‍্যারদের সাথে পরিচয়, নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচয়, সবাই কিছু না কিছু শো-আপ করছে, নাই কোন স্টাইলের কমতি বিষয়টা আমি লক্ষ্য করলাম। সবাই ফরিদপুরের বিভিন্ন স্কুল থেকে এসেছে। প্রথমেই কমন ক্লাস এক সাথে শুরু, কমন ক্লাস মানে সায়েন্স, আর্টস, কমার্সের সবাই এক সাথে, পরিচয় হলো অনেকের সাথে। পরিচয় হলো অজয়, বাবুল, কমলেস, তাপস, রুবেল, অলোক, কবির, মহসিন আরো অনেকের সাথে। শহরের স্কুল থেকে যারা এসেছে তাদের একটু শো-আপের ভাব আছে। সিনিয়র ভাইয়েরা দল ধরে এসে আমাদের বরন করে নিলো। বরন করা মানে হাতে হাত মিলানো। যারা রাজনীতি করে তাদের পিছনে পিছনে অনেক ছেলেরা হাটে। জুনিয়রা হাত উঠিয়ে ছালাম দিচ্ছে। আনন্দের মুহুর্তের সময়টা কেটে গেলো, কেটে গেলো কতোগুলো দিন। এদিকে গোপাল'দার অবস্থা ভালো না, বোবা বৌ সব সময়ই ক‍্যাচ ক‍্যাচ করে, সংসারে অশান্তি লেগেই থাকে। গোপাল'দার মেসোমশাই নাম উনার শচীন সাহা আমাকে প্রস্তাব ছিল উনার বাড়িতে লজিং মাস্টার থাকার জন‍্য বিনিময়ে উনার ছেলে সুজিত এবং মেয়ে শান্তি ওদের পড়াতে হবে রাজি হয়ে গেলাম আমি।

মার জন্য মনটা কাঁদছে, মনে হলো দুদিনের জন‍্য বাড়ী যাই, দেরি না করে রওনা হয়ে গেলাম। সেই একই অর্থ কষ্ট গমের ভাত, ভুট্টার রুটি, জানি না এই অভাব আর কষ্ট কবে শেষ হবে। সারাদিনে একবার ভাত জোটে, অভাব যেনো আকড়ে ধরছে আমাদের পরিবারকে। রাতে ছোনের ঘড়ে শুয়ে থেকে স্বপ্ন দেখছি অভিজাত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সাথে মিশার, এ যেনো কল্পনার জগতের আবোল তাবোল প্রলাপ। কলেজের ওরা কেনই বা আমার বন্ধু হবে? কি আছে আমার? ছনের ঘড়ের চালের দিকে তাকিয়ে ভাবছি আর সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছি মনে মনে, এই বলে ডাকছি যে হে প্রভু আমাকে রাস্তা দেখাও। চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন শুক্রবার, কানাইপুর হাটের দিন। বাজার করতে হবে কিন্তু ভাগ‍্য দেবতা আমাদের উপর এতটাই বিমুখ যে বাজারে বিক্রি করার মত আমাদের কিছুই নেই। মা বাবার অসহায় মূখটার দিকে তাকিয়ে আছে, মৌনতায় বুঝিয়ে দিচ্ছে হাট থেকে কিন্তু বাজার আনতেই হবে নইলে রাতে না খেয়ে থাকতে হবে। বাড়ীতে বিক্রি করার মতো ছিলো দুটো লোহার দাউ একটি লোহার কোদাল আর দুই টুকরো লোহার রড সব মিলে ১০-১২ কেজি হবে। বাবা ওগুলো নিয়ে কানাইপুর হাটে রওনা হলেন কুমারে কাছে বিক্রি করবে বলে। আমার মার আত্ম বিশ্বাস বাবা কিছুনা কিছু বাজার নিয়েই আসবে। হটাৎ মা আমাকে বললো গত মাসের ঝরে ঐ খাল পারের আম গাছের বড় একটি ডাল ভেঙ্গে পরেছিলো ওটা পারলে কেটে আন বাসায় রান্না করার মতো লারকি নাই। মার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না, তাই মাকে না বলতে পারলাম না। মার কথা মতো আম গাছের শুকনো ডালটি কাটতে গেলাম। ডালটি দেখে মনে হচ্ছে ঝরে ৯৫% ভেঙ্গে গেছে, শুধু একটা ডাল বাকলার সাথে ঝুলে আছে। আর যেটা আমি গত মাসেও দেখেছি ঝরে পরা আম গাছের ডালটি প্রায় শুকিয়ে গেছে। আটকে থাকা গাছের বাকলার অংশটা টুলাল ডালের ৫% এর বেশি হবে না। যখন আমি দাউ দিয়ে কাটতে যাচ্ছিলাম হটাৎ করে চোখে পড়লো ডালের মাথায় অনেক গুলো গুটি গুটি আম ধরেছে আর অন‍্য একটি ডালের দিকে তাকালাম যে গাছটি ঝরে ভেঙ্গে পরেনি। পরিপূর্ণ গাছের ডালে একই প্রকৃতির গুটি গুটি আম। আমার মনটা হটাৎ করে বিচলিত হতে শুরু করলো, আমি নিজেই নিজেকে বার বার প্রশ্নে জরজরিত করছি আর ভাবছি আম গাছের একটি ভাঙ্গা ডালের বাকলার উপর ভর করে যদি ভাঙ্গা ডালে আম ধরতে পারে, তাহলে আমি সুস্থ সবল একজন মানুষ আমি কেনো দাড়াতে পারছি না? কি আমার দুর্বলতা? সৃষ্টিকর্তা কি আমাকে কোন সিগন‍্যাল দিচ্ছে? আমি তখন আর আম গাছের ডালটি কাটতে পারলাম না। কিন্তু প্রশ্নটা আমার থেকেই গেলো...। চলবে...

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71