eibela24.com
রবিবার, ১৯, নভেম্বর, ২০১৭
 

 
বিজয়া রায়
আপডেট: ০৪:৩৪ pm ০৪-০৬-২০১৫
 
 


অর্থাভাবে যখন পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন সত্যজিৎ রায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার স্ত্রী বিজয়া রায়। যিনি নিজের স্বর্ণালঙ্কারটুকু বিক্রির টাকা দিয়ে পুনরায় চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কাজ শুরু করতে সাহায্য করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কোনো লেখা বা চলচ্চিত্রের প্রথম শ্রোতাও। বিশ্বচলচ্চিত্র ইতিহাসে স্বামী সত্যজিৎ রায়কে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম অনুপ্রেরণা দেয়া সমানুষটির নাম বিজয়া রায় ।
বিজয়া রায় সত্যজিতের ঘরণী হওয়ার আগে তিনি ছিলেন বিজয়া দাশ। ১৯১৭ সালে পাটনায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পাটনার ব্যারিস্টার চারুচন্দ্র দাশ ও মাধুরী দেবীর কন্যা বিজয়া দাশ। মা মাধুরী দেবী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রীর ছোট বোন। ১৯৩১ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর কলকাতায় কাকা প্রশান্ত দাসের বাড়িতে চলে যান। সেখানে একান্নবর্তী পরিবারে মানুষ হন তিনি। এরপর নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ম্যাট্রিক এবং আশুতোষ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ইংরেজীতে স্নাতক পাস করেন। পরের দিকে কমলা গার্লস স্কুল এবং বেথুন স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করেছেন।মাদার তেরেসার সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে তিনি কিছুদিন কাজ করেছেন।
১৯৩১ সালে প্রথম সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল তাঁর। তারপর ১৯৪৮ সালে মুম্বাইয়ে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তার রেজিস্ট্রি বিয়ে হয়। তারপর ১৯৪৯ সালে আনুষ্ঠানিক ব্রাহ্ম বিয়ে মা সুপ্রভা রায়ের উপস্থিতিতে বিয়ে হয় কলকাতায়। সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে চার বছরের বড় বিজয়া রায় সম্পর্কে তার মামাতো বোন। সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের প্রতি সত্যজিৎ রায়ের মতোই সমান ভালোলাগা ছিল তার।বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে সত্যজিতের প্রায় সব ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই বিজয়া প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।  ১৯৫৩ তিনি জন্ম দেন তাদের একমাত্র সন্তান  চলচ্চিত্র পরিচালক  সন্দীপ রায়ের।
বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়ের যে অবদান তার পেছনে বিজয়া রায়ের ভূমিকা অনেক। কারণ বিজয়া রায় একজন অভিনেত্রী এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী ছিলেন বলে সত্যজিতের চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। তবে নিজেকে কখনই প্রচারের আলোয় আনেননি বিজয়া রায়। সত্যজিৎ রায়ের বেশিরভাগ ছবির লোকেশন দেখা ও পোশাক ডিজাইনসহ নেপথ্যের অনেক কাজে জড়িয়েছিলেন তিনি।সত্যজিৎ রায় এবং পুত্র সন্দীপ রায়ের মত সিনেমাতে বিশেষ নামযশ করতে পারলেও তাঁর আগ্রহের কিছু নজির ভারতীয় সিনেমায় তিনি রেখে গিয়েছেন।
সত্যজিতের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের লোকেশন দেখা থেকে কস্টিউম ডিজাইনিং করেছেন। বিশেষ করে ‘পথের পাঁচালী’র বালক অপুকে খুঁজে বের করা কিংবা প্রথম স্ক্রিন টেস্টের জন্য ‘অপর্ণা’ শর্মিলা ঠাকুরকে সাজিয়ে দেয়া সবই করেছেন তিনি। এমনকি সত্যজিতের ঘরে ফিল্ম বা সন্দেশ পত্রিকার আড্ডা হতো বিজয়া রায়ের প্রচ্ছন্ন গৃহিণীপনার কারণে। স্বামীর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো নিয়ে ‘আমাদের কথা’ নামে একটি আত্মজীবনী লিখেছেন তিনি।
বিজয়া রায় শুধু প্রতিভাবান স্বামীর নান্দনিক এবং ঐতিহাসিক সৃষ্টির সহযোগীই ছিলেন না, এক সময় নিজগুণেই খ্যাত ছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি, জ্যাঠামশাই অতুলপ্রসাদ সেন থেকে হিমাংশু দত্তের গান রেকর্ড করেছেন। আত্মজীবনীতে লিখছেন, ‘একটা গানও আমার কাছে নেই, ইচ্ছা করেই রাখিনি। গান গেয়ে এবং শুনে এত খারাপ লেগেছিল যে রাখার কোনও তাগিদ অনুভব করিনি’। পিসিমা সাহানা দেবীর কাছে ছোট থেকে গান শিখেছিলেন বিজয়া। নিজেকে লুকিয়ে রাখার সাধনা ছিল তাঁর। চলচ্চিত্র, রেডিও পাশ্চাত্য সঙ্গীত এবং আরও অনেক কিছুর কারণে সত্যজিতের সঙ্গে এক হয়েছিলেন।
১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বামীকে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন বিজয়া। তাকেই প্রথম চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাতেন অস্কারজয়ী সত্যজিৎ। স্ত্রীর পরামর্শে তাতে পরিবর্তনও আনতেন। তাদের একমাত্র সন্তান খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক সন্দীপ রায়। স্বামীর মৃত্যুর পর বড় একা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
সঙ্গী ছিল স্বামীর স্মৃতি আর পৌত্র সৌরদীপ এবং পুত্র সন্দীপ ও পুত্রবধূ ললিতা। শুধু তাই নয়, সম্ভবত বিজয়া রায়ই স্বাধীনতার পরে প্রথম বাঙালী কন্যা যিনি ১৯৪৯ সালে কাজিন প্রেমিককে বিয়ে করছেন, দু’ জনকেই এই কৌতূহলী বাঙালী সমাজে সেই ঘটনা চেপে রাখতে হচ্ছে।
‘রিভার’ চলচ্চিত্রের সময়েও জঁ রেনোয়া সত্যজিৎ রায়কে তাঁর ছবি উপহার দিয়ে লিখছেন, ‘মানিক রায়কে, যাকে বিবাহিত দেখলে খুশি হব।’ সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিকূলতার চাপে মানিক রায় ও তাঁর স্ত্রীকে যে কিভাবে প্রথম কয়েক মাস নিজেদের রেজিস্ট্রির কথা চেপে রাখতে হয়েছিল, রেনোয়া জানতেন না। বিয়ের পর শাশুড়ি সুপ্রভা রায়কে বিজয়া জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ বার থেকে তোমাকে কী বলব? শাশুড়ি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এতদিন মাসিমা বলতে, এ বার শুধু মা বোলো।’
বিজয়া রায় আজ অবধি সুকুমার ও সুপ্রভা রায়ের পুত্রবধূ, সত্যজিৎ রায়ের পত্নী সন্দীপ রায়ের মা। বাঙালী সমাজে এগুলোই তাঁর পরিচিতি।
বিজয়াও তা মেনে নিয়েছিলেন। নইলে আত্মজীবনীর নাম ‘আমাদের কথা’ রাখবেন কেন? তাঁর ‘আত্ম’ সবসময় অপরের আলোয় উদ্ভাসিত, একক ‘আমি’র বদলে স্বামী-পুত্র-পরিবার নিয়ে ‘আমাদের’ বহুবচনই সেখানে প্রধান।
যেমন তিনি সত্যজিতের লেখা বা ছবির স্ক্রিপ্টের প্রথম শ্রোতা হতেন, তেমনই নিজেও লিখতেন।এছাড়াও সত্যজিত রায় আর তাঁর জীবনকাহিনী নিয়ে অকপট রচনা ‘আমাদের কথা’ বাংলা বইয়ের বাজারে বেস্টসেলারগুলির অন্যতম।
সত্যজিত রায়ের মৃত্যুর পরে তাঁদের পারিবারিক শিশুদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব নেন তিনি। আর সত্যজিত রায়ের ছোটবেলার স্মৃতিকথা ‘যখন ছোটো ছিলাম’-এর ইংরেজী অনুবাদও বিজয়া রায়ের করা।
১৯৪৪ সালে 'শেষ রক্ষা' এবং ১৯৫০ সালে 'মশাল' এই দুটি সিনেমাতে অভিনয় করতে দেখা যায় তাকে। এছারাও একটি তথ্যচিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। ক্যাথরিন বার্গ পরিচালিত 'গাছ'- এই তথ্যচিত্রেই তিনি শেষবার অভিনয় করেছিলেন বিজয়া রায়। 'আমাদের কথা'- এই বইতেই আত্মজীবনী তুলে ধরেছিলেন তিনি।   
অস্কার বিজয়ী প্রয়াত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায় ২ জুন ২০১৫সালে ৯৮ বছর  বয়সে কলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায়  মারা  যান।
সম্পাদনা : হাবিবুর রহমান সিজার