eibela24.com
বুধবার, ৩০, সেপ্টেম্বর, ২০২০
 

 
খোকন সাহার মৃত্যু: বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুর বিবেক
আপডেট: ১১:২৩ pm ২৮-০৪-২০২০
 
 


এ্যাড: উৎপল বিশ্বাস

নারয়ণগঞ্জের খোকন সাহা বেশ ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাও ছিলেন। সাধারণত আওয়ামী লীগের হিন্দু নেতারা আবার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃত্বে থাকেন। তিনি ঠিক ঐক্য পরিষদের কোন পদে আসীন ছিলেন, জানা নেই। এহেন খোকন সাহা বাড়ি করার সময় সাত বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি করলেন। তাঁর এই সাত বন্ধুর সকলে হিন্দু।

খোকন সাহা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তবে মারা যাবার আগে এবং পরে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুর বিবেককে সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়ে গেলেন।

খোকন সাহার অবস্থা অবনতি হবার পর, তাঁর স্ত্রী ও কন্যারা ভবনের অন্যান্য ফ্লাটের মালিক - যারা কিনা খোকন সাহার বন্ধু - তাদের সহযোগিতা চেয়ে ছিলেন, তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য। কেউ এগিয়ে আসেনি। এরপর তারা যোগাযোগ করেন আত্মীয়দের সাথে, তারাও কেউ এগিয়ে এলো না। অগত্যা মা-মেয়ে মিলে খোকন সাহাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে তাঁর পরিস্থিতির এতই অবনতি হয়, সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

সিঁড়িতেই পড়েছিলো খোকন সাহার মৃত দেহ। তাঁর স্ত্রী ও কন্যারা পুণরায় খোকন সাহার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সাথে যোগাযোগ করলেন - যাতে অন্তত শেষকৃত্য করা যায়। এবারও কেউ এগিয়ে এলো না। খবর পেয়ে এগিয়ে এলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খোরসেদ।

এই ওয়ার্ড কাউন্সিলর গতকাল পর্যন্ত ৩৪ টি মৃত দেহের দাহন (হিন্দু মতে) ও দাফন (মুসলিম মতে) সম্পন্ন করেছেন। তিনি খোকন সাহার দাহনও সম্পন্ন করেন। খোকন সাহার কোনো পুত্র নাই বলে এবং কন্যার পিতার মূখ্য অগ্নিতে অধিকার রাখেন না বলে শ্মশানের পুরোহিতের বিধান মতো ওয়ার্ড কমিশনার মূখ্য অগ্নি সম্পন্ন করেন।

এ ঘটনা নিয়ে কি আর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে? তবে আমার মনে হয় আয়নায় আমাদের চেহারাটা ভালোভাবে দেখা উচিৎ।

খোকন সাহার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন সকলে বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দু। তাদের সাথেই তাঁর মেলামেশা ওঠা বসা। সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তি হবার কারণে তাঁর মুসলিম বন্ধু থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিলো তাঁর অন্তিম সময়ে হিন্দু বন্ধু-আত্মীয়রা পাশে দাঁড়াবেন। বাস্তবত তাঁরা তা করলেন না।

বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুর চরিত্রের জন্য শুধু খোকন সাহা নয়, পুরো বাঙালি হিন্দু মরে সিঁড়ির উপর পড়ে আছে। যে কোনো সমাজের মধ্যবিত্তের উপর সমাজের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। কারণ মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে বেরিয়ে আসা মানুষেরা সমাজের অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দু এই সব দায়িত্ব পালনের ধারের কাছে নেই। ১৯৪৭ সালের বাঙলা ভাগের ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুরা যে অদৃষ্ট পূর্ব সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়েছে, তার থেকে পরিত্রাণের কোনো সার্বিক উদ্যোগ এদের মধ্যে নেই। এরা যে যখন পেরেছে, দেশ থেকে পালিয়েছে, পালাচ্ছে। অথচ এরাই আবার ধর্মস্থানে গিয়ে উচ্চারণ করে "অখণ্ড মণ্ডলাকারং/ ব্যপ্তম যেনো চরাচরম....।" কিন্তু সমাজের অখণ্ড সত্তা তাদের মনের মধ্যে নেই। আমরা সে জন্য কয়েক বছর যাবৎ বলে আসছি বাংলাদেশ থেকে হিন্দু নির্মূল হবার কারণ শুধু রাষ্ট্রীয় বৈরীতা এবং সাম্প্রদায়িক শক্তি নয়। এর সাথে আমাদের প্রতিরোধহীনতা দায়ী। প্রতিরোধ করতে হলে তো আমাদের এক হতে হবে। কিন্তু আমরা এক হবার পরিবর্তে পরস্পর থেকে বিছিন্ন হচ্ছি। বিছিন্ন হচ্ছি ধর্মীয় গুরুদের নেতৃত্বে, শত শত সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলে, রাজনীতি অঙ্গনে দাসের মতো আচরণ করে এবং সময় সুযোগ মতো দেশত্যাগ করে।

তাহলে কি আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই? আমরা মনে করি আছে। একটি সামাজিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে মধ্যবিত্তের এই ছা-পোষা মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পুত্র-কন্যার বিয়ে দেবার সময় জাতপাত আর বর্ণের গণ্ডি ভাঙতে হবে। বিশ্ব পরিস্থিতি, দেশীয় পরিস্থিতি আমাদের এক নোতুন সমাজ গড়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আমাদের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাম্যের সমাজ গড়ে তুলতে হবে - যেখানে কেউ কাউকে ছোট বা বড় ভাববে না - সকলে সমান এই বোধ জাগিয়ে তুলতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে এক ভাগ শত ভাগকেই উৎসাহিত করে। আমরা সমাজকে চারটি বর্ণের ভাগ করেছি, ভাগ করেছি শত শত জাতপাতে। আমাদের চোখের আড়ালে এই ভাগাভাগি পারিপারিক এককে গিয়ে ঠেকেছে। পরিবারের বাইরে কাউকেই যেনো আর আমরা আপন ভাবতে পারছি না। তাই খোকন সাহার শেষ মুহুর্তে কেবলমাত্র তাঁর স্ত্রী-কন্যাকে পাওয়া গেলো। কোনো হিন্দু নয়, তাঁর দহন কাজ সম্পন্ন করলেন একজন অকুতোভয় মুসলিম। আর আমাদের ছা-পোষা মানসিকতা অনুরূপ অকুতোভয় সৈনিক তৈরীতে নিদারুন ভাবে ব্যর্থ।

নি এম/