eibela24.com
বুধবার, ৩০, সেপ্টেম্বর, ২০২০
 

 
দর্শন করে এলাম দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও বেলুড় মঠ
আপডেট: ০৮:৫৯ pm ১২-০৩-২০২০
 
 


প্রণব রায়

ভারতের তীর্থস্থান বা দর্শনীয় স্থান নিয়ে কোনও পরিকল্পনা বা আলোচনাই দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। তাইতো তীর্থদর্শন পরিকল্পনার প্রথমে শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে আমরা দু’জন কলকাতার সল্টলেক থেকে উবারকারে বেরিয়ে পড়ি রাণী রাসমণির স্বপ্নের মন্দির দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ী তথা শ্রীরামকৃষ্ণ তীর্থ দর্শনে।

কলকাতার জানবাজারের প্রসিদ্ধ রাণী রাসমণি ১৮৪৭ সনে নৌকাবহরে কাশীযাত্রার পূর্বরাত্রে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গা অববাহিকার পূর্বতীরে বায়ান্ন বিঘা জমি ক্রয় করে মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন এবং ১৮৫৫ সালের ৩১ মে স্নানযাত্রার দিন মহাসমারোহে মন্দিরে দেবীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরে অধিষ্ঠাত্রীদেবী কালীকে মা "ভবতারিণী" নামে পূজা করা হয়। এই মন্দিরটিই দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির বা দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি নামে সুপরিচিত।

মূল মন্দিরটি তিন তলা। উপরের দুটি তলে এর নয়টি চূড়া বণ্টিত হয়েছে। মন্দির দক্ষিণমুখী। একটি উত্তোলিত দালানের উপর গর্ভগৃহটি স্থাপিত। গর্ভগৃহে শিবের বক্ষোপরে ভবতারিণী নামে পরিচিত দেবীকালীর বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠিত। এই বিগ্রহদ্বয় একটি রুপোর সহস্রদল পদ্মের উপর স্থাপিত।

প্রকৃতপক্ষে এই দেবালয় অঙ্গন অনেকগুলি মন্দিরের সমবায়ে গঠিত। মূল মন্দির ছাড়াও রয়েছে "দ্বাদশ শিবমন্দির" নামে পরিচিত উত্তর ও দক্ষিণ অংশে ছ’টি করে বারোটি আটচালা শিবমন্দির। মূল মন্দিরের উত্তরে রয়েছে "শ্রীশ্রীরাধাকান্ত মন্দির" নামে পরিচিত রাধাকৃষ্ণ মন্দির এবং মূল মন্দিরের দক্ষিণে রয়েছে নাটমন্দির। মন্দির চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বাসগৃহ। মূল মন্দির চত্বরের বাইরে ঠাকুর ও তাঁর সহধর্মিনীর স্মৃতিবিজড়িত আরও কয়েকটি স্থান রয়েছে, যা আজ পুণ্যার্থীদের কাছে ধর্মস্থানরূপে বিবেচিত হয়। মন্দিরচত্বরের বাইরে উত্তরদিকে রয়েছে ঠাকুরের সাধনক্ষেত্র পঞ্চবটিবন। তাঁর সহধর্মিনী সারদা দেবী মন্দির চত্বরের বাইরে দ্বিতল একটি ছোট্ট ভবন নহবতখানায় অবস্থান করতে থাকেন। এই নহবতখানা এখন সারদা দেবীর মন্দির।

মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে লোকমাতা রাণী রাসমণিকে নানা বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করতে হয়েছিল। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসের বড়দাদা শ্রীরামকুমার চট্টোপাধ্যায় রাণীকে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। রামকুমারই ছিলেন মন্দিরের প্রথম প্রধান পুরোহিত আর তাঁর সহযোগী ছিলেন ছোট ভাই গদাই। ১৮৫৭-৫৮ সালে কিশোর রামকৃষ্ণ যিনি গদাধর বা গদাই নামে পরিচিতি, এই মন্দিরের প্রধান পূজকের কাযভার প্রাপ্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি এই মন্দিরকেই তাঁর সাধনক্ষেত্ররূপে বেছে নেন। তাঁর অবস্থানের কারণে পরবর্তীকালে এই মন্দির পরিণত হয় একটি তীর্থক্ষেত্রে।

রাণী রাসমণির স্বপ্নের মন্দির দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দির প্রকৃতবিচারে শ্রীরামকৃষ্ণ তীর্থ। শ্রীরামকৃষ্ণ না থাকলে জানবাজারের রাণরি তৈরি এই মন্দির কতটা খ্যাতি পেতো সন্দেহ আছে। তবে সাহস দেখিয়েছিলেন রাণী। বাংলার ব্রাহ্মণ সমাজ যখন এই মন্দির বয়কট করেছেন, তখনও তিনি দমে যাননি। লড়াই চালিয়ে গেছেন। অবশেষে পাশে পেয়েছেন কামারপুকুরের সাহসী যুবক রামকুমারকে। আর বিশ্ববাসী পেয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে।

অতঃপর বেলুড় মঠে যাত্রা। হেঁটে হেঁটে ঘাটে পৌছে আনন্দ ফেরিতে করে পাড়ি দিয়ে হুগলী নদীর পশ্চিম পাড়ে বেলুড় মঠ-ঘাটে অবতরণ করলাম। কেউ দক্ষিণেশ্বর গিয়ে বেলুড় মঠে যায়নি এমনটি ভাবা বিস্ময়কর!

বেলুড় মঠ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্যালয়। বেলুড় মঠ রামকৃষ্ণ ভাব-আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। মন্দির, মসজিদ ও গির্জা--তিন ধর্মের উপাসনাস্থলের গঠনশৈলির সংমিশ্রণে তৈরি এই অসাধারণ শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরটি। এটি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদেরও একটি অনুপম নিদর্শন। মন্দিরের ভিতরে বিশাল উপাসনা কক্ষ। বেদীর উপর উপবিষ্ট শ্রীরামকৃষ্ণের শ্বেতমর্মর সৌম্যমূর্তি।

এই প্রতিষ্ঠান স্বামী বিবেকানন্দের সমাজচিন্তাকে ছড়িয়ে দেওয়া ও আধ্যাত্ম-চর্চার পবিত্র কেন্দ্র হিসেবে বাঙালি সমাজ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। স্বামী বিবেকানন্দের পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে মন্দিরের নকশা নির্মাণ করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের অপর সাক্ষাতশিষ্য স্বামী বিজ্ঞানানন্দ। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এই মঠের ধারেই এক দ্বিতল ভবনে স্বামী বিবেকানন্দ থাকতেন। ভবনটির দ্বিতলায় নিজকক্ষে তিনি দেহ রাখেন। স্বামীজীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখতে বহু মানুষ এই বাড়িটিতে যান। ফলে একে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। গঙ্গার পাড় ধরে দক্ষিণ দিকে এগোতে একে একে পড়ে ব্রহ্মানন্দ মন্দির, মা সারদার মাতৃমন্দির, স্বামীজির মন্দির ও মহারাজদের সমাধি।

ঠাকুর রামকৃষ্ণের স্মৃতিধন্য এই মন্দিরের শোভা দেখতে দেশবিদেশ থেকে বহু পর্যটক এখানে আসেন।

জয় রানী রাসমণি! জয় মা ভবতারিণী! জয় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব! জয় মা সারদামণি! জয় স্বামী বিবেকানন্দজী! জয় বেলুড়মঠ! সূএ: প্রণব রায়ের নিজস্ব পেজবুক থেকে সংগৃহিত

নি এম/