বুধবার, ২৬ জুলাই ২০১৭
বুধবার, ১১ই শ্রাবণ ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
নাসিরনগরে মামলা করে এখন বিপদে সংখ্যালঘুরা
প্রকাশ: ০৯:০০ am ২৭-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৯:৩৩ am ২৭-১২-২০১৬
 
 
 


ডেস্ক নিউজঃ  মেম্বার ফোন দিয়া কইল উপজেলায় যাওয়া লাগব। পরদিন মেম্বারের লগে গেলাম উপজেলায়। আমার দস্তখত নিল।

পরে কইল আমারে দিয়া মামলা করানো হইছে। আমরা গরিব মানুষ, মাছ ধইরা খাই। মামলা কইরা কি কিছু হইব, খালি গ্রামের লোকের লগে শত্রুতা বাড়ব।’ নিজে মামলার বাদী হওয়ার বিষয়ে এভাবেই বললেন দয়াময় দাস।

এখন সামাজিক শত্রুতার শিকার হওয়ার ভয় আর আতঙ্কে রয়েছেন তিনি।দয়াময়ের ভাই রসরাজ দাসের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে গত ৩০ অক্টোবর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দু বসতি ও মন্দিরে হামলা হয়।

নাসিরনগর সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে হরিণবেড়ে রসরাজদের বাড়িও ভাঙচুর করা হয়। এরপর আরও চার দফায় হিন্দু সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এসব ঘটনায় আটটি মামলা হয়েছে; যার তিনটির বাদী পুলিশ। বাকি পাঁচটির মধ্যে চারটি মামলার বাদীরা বলছেন, অনিচ্ছায় বা অনুরোধে তাঁরা মামলা করেছেন। এসব মামলার বাদী হয়ে সামাজিকভাবে তাঁরা শত্রুতার শিকার হন কি না, এখন সেই শঙ্কা পেয়ে বসেছে তাঁদের।

ঢালাও গ্রেপ্তারের অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘আমাদের জোর প্রচেষ্টা রয়েছে একজন নিরীহ মানুষও যেন হয়রানির শিকার না হন।

সে জন্য আমরা থানাপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে নজরদারি করছি। ঘটনার ভিডিও দেখে ও অন্য সূত্রের খবর থেকে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদেরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

অন্যদিকে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি স্পষ্ট যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ হামলা হয়েছে। এর সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের দুই পক্ষই কোনো না কোনোভাবে জড়িত।

এই দুই পক্ষের একটির নেতৃত্বে আছেন সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির। আরেক পক্ষ চলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের কথায়। এই দুই নেতাই প্রভাবশালী।

তাই হুট করে মামলার আসামি গ্রেপ্তার করে চাপে পড়তে চান না পুলিশ কর্মকর্তারা। নিতান্ত অনিচ্ছায় তদন্ত চলছে, তা বোঝা যায় তাঁদের কথায়।

একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘কারা জড়িত তা আপনারা ভালো করে লেখেন। তাহলে দুই পক্ষের নেতারাই চাপে পড়বেন। তখন আমাদের কাজ করতে সুবিধা হবে, কোনো ঝামেলা ছাড়াই আসামিও ধরতে পারব।’

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২৯ অক্টোবর রসরাজের ফেসবুক পোস্টের খবর জানাজানি হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেন নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাওসার হোসেন।

পরদিন ৩০ অক্টোবর মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলার ঘটনায় দুটি মামলা হয়। গৌড় মন্দিরে হামলার ঘটনায় মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী বাদী হয়ে একটি ও দত্তবাড়িতে হামলার ঘটনায় কাজলজ্যোতি দত্ত বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেন।

এই দুই মামলার বাদী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন মূলত পুলিশই মামলার বিবরণ লিখেছে; অনেকটা অনিচ্ছায় স্বাক্ষর করেছেন তাঁরা। দুটি মামলার বিবরণই পুলিশের লেখা, একই কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট নেওয়া। তাই দুটি মামলার বিবরণ হুবহু একই রকম; কেবল ঘটনার স্থান, কাল ও পাত্র ভিন্ন।

দুটি মামলার বিবরণের মূল অংশটি এক রকম। এতে বলা হয়েছে, ‘রসরাজ দাস নামের এক যুবক পবিত্র কাবা শরিফকে ব্যঙ্গ করিয়া ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরিফের ওপর হিন্দুদের শিবের ছবি সংযুক্ত করিয়া তার ব্যবহৃত ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করে। ... সমাবেশ চলাকালে সমাবেশস্থলের আশপাশের কিছু লোকজনসহ স্থানীয় লোকজন অনুমান ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাসিরনগর সদর এলাকায় ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার সময় হামলা চালায়।’

একটি মামলার বাদী কাজলজ্যোতি বলেন, ‘মামলা করে আর আমাদের কী পাবার আছে। এটা একটা লৌকিকতা মাত্র। তবে আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের পুলিশ চাইলে সব কাজ সম্ভব। তারা চাইলেই প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে পারে।’

একটি মামলার বাদীর একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলেন, ‘আমাদের মামলার বাদী করে বিপদে ফেলা হয়েছে। কোনো উসকানি ছাড়াই বিনা কারণে আমাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে গেল।

পুলিশের সামনেই সব ঘটনা, পুলিশ কিছু করতে পারেনি। এখন আমাদের পরিবারের লোককে মামলার বাদী বানিয়ে আরও বিপদে ফেলছে।

পুলিশ ঢালাও লোক ধরতাছে, একেকটা করে লোক ধরে আর আমার বুকে একটা করে কিল পড়ে। এলাকার লোকজন (মুসলমানরা) এখন মামলার বাদী হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখে। কেন মামলা করা হলো, সে জন্য না আবার বাড়িতে হামলা হয়।’

রসরাজ দাসের ভাই দয়াময় দাস বলেন, ‘দাদা, আমরা তো গরিব মানুষ। এখন বাজার গরম, পুলিশ আছে, সাংবাদিকেরা বাড়িতে আসতাছে।

পরে সব ঠান্ডা হইলে তো কেন মামলা করলাম, সে জন্য আমারে আইসা ধরব। আমরা তো দাদা কাউরে দায়ী করি না, আমাগো তো এই গ্রামেই এই মানুষদের সঙ্গেই থাকতে হইব।’

১৩ নভেম্বর অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলার বাদী ছোট্টলাল দাস বলেন, এক সকালে পুলিশ তথ্য নেওয়ার কথা বলে ডেকে নেয়।

এরপর তিনি জেনেছেন তিনি একটি মামলার বাদী। তবে ১৬ নভেম্বর অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের করা আরেকটি মামলার বাদী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন কুমার দেব প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় দায়িত্ববোধ থেকে মামলা করেছেন।

জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান  বলেন, ‘আমরা এই মামলা তদন্তে খুব শক্তভাবে নিয়মনীতিগুলো অনুসরণ করছি।

তদন্তে যাঁদেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাঁদেরই আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা নিশ্চয়তা দিতে চাই, এ ক্ষেত্রে কোনো দলমত বিচার করা হবে না। যাঁরা আসলে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অল্প কয়েকজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

 

এইবেলাডটকম/গোপাল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71