মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
মঙ্গলবার, ১৬ই ফাল্গুন ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
বেলকুচিতে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে সমাজ ও প্রশাসনের ভূমিকা
প্রকাশ: ০৬:০২ am ১১-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৬:০২ am ১১-০১-২০১৭
 
 
 


সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ  সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে সমাজ এবং উপজেলা ও থানা প্রশাসন গ্রিন সিগনাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

অতিতের ন্যায় বেলকুচিতে শিক্ষার হার যেমনি বেড়েছে তেমনি সমাজের লোকের দায়িত্ব বোধটাও অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। সমাজের লোকের সচেতনার কারনেই প্রশাসনিক দায়িত্ববোধটাও অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে।

আসলে বাল্য বিবাহ’র কারণ কি? বাল্য বিবাহ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা, সমাজের বাল্য বিবাহের পরিস্থিতি, বাল্য বিবাহের প্রভাব, বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে পরিবারের প্রভাব, নারীদের উপর বাল্য বিবাহের প্রভাব অপর দিকে বাল্য বিবাহ কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় তার হিসাব নিকাশ নিয়ে সমাজ ও প্রশাসনের ভূমিকা অনেকটাই লক্ষনীয়।

বেলকুচি উপজেলা ও থানা প্রশাসন যেখানে বাল্য বিবাহের খবর পাচ্ছে সেখানেই তারা থানা ফোর্স নিয়ে বাল্য উপজেলার গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত রাত দিন চষে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু সচেতন সমাজের লোকের ধারণা বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করতে হলে সমাজ এবং প্রশাসনের ভূমিকা থাকতে হবে সমান সমান। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ না করা গেলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরীর উপর কি ধরণের অপকারিতা আসতে পারে তা নিয়েও বর্তমান সমাজ উদ্বিগ্ন। বাল্য বিবাহ সমাজের ব্যবস্থায় দীর্ঘকালীন সমস্যা।

সুপ্রাচীন কাল থেকে এটি প্রথা হিসেবে এ দেশে বিদ্যমান হয়ে সামাজিক ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে। এ অমানবিক প্রথা মানুষকে অবমূল্যায়ন করছে।

বৃদ্ধি করছে সামাজিক সমস্যা, বয়ে নিয়ে আসছে মানব সমাজে অনাকাঙ্খিত দুঃখ দুর্দশা। বিবাহের পর পারিবারিক নানা সমস্যা যেমন- দাম্পত্য কলহ, অশান্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা এসবের জন্য দায়ী মূলত বাল্য বিবাহ।

সাধারণ ভাবে শৈশব কাল অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে যে বিবাহ সম্পন্ন হয় তাই বাল্য বিবাহ। অর্থাৎ সরকার স্বীকৃত বাংলাদেশের আইনের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের ১৮ বছরের পূর্বেই এবং ছেলেদের ২১ বছরের পূর্বের বিবাহকে বাল্য বিবাহ বলে।

এ ক্ষেত্রে নারীকে তার মানসিক প্রস্তুতির পূর্বে বৈবাহিক ও সন্তান গ্রহনের গুরু দায়িত্ব নিতে হয়। বাল্য বিবাহের জন্য দায়ী মূলত এ দেশের প্রচলিত সামাজিক প্রথা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়।

বাল্য বিবাহের প্রেক্ষিতে দারিদ্র বাল্য বিবাহকে উৎসাহিত করে। দারিদ্রতার কারনে অনেক সময় বিবাহের বয়স হওয়ার পূর্বেই পিতা মাতা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠায়।

এছাড়াও ইভটিজিং, যৌন হয়রানী, অশ্লীলতা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এজন্য পরিবার এসব অপ্রীতিকর ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেতে মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়।

উপজেলার গ্রামাঞ্চলের লোক অশিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত হওয়ার কারণে বাল্য বিবাহ প্রবন উপজেলার শহর অঞ্চল গুলোর চাইতে ইউনিয়ন সমূহের গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চল অন্যতম।

বিভিন্ন বে সরকারী সংস্থা গুলোর জরিপে দেখা যায়, ৬৬ ভাগ নারীদের বিবাহ হয় ১৮ বছরের পূর্বে এবং এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বিবাহ হয় ১৫ বছরের পূর্বে।

এর কারনে দেখা গেছে সমাজে নারীদের ৪৮ শতাংশ বিবাহ অথবা বিবাহ বিচ্ছেদ বা বৈধব্য গ্রহন করে ১৮-১৯ বছর বয়সের মধ্যে। যার জন্য দায়ী মূলত বাল্য বিবাহ।

বাল্য বিবাহ নারী সমাজের অভিশাপ স্বরূপ এবং নারীদের স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপও বটে। অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দানের সময় মেয়েদের মৃত্যু ঝুকি বেশী থাকে।

এছাড়াও বাল্য বিবাহের কারনে নারী শিক্ষার অভাবে যথাযথ কর্মদক্ষতা অর্জন করতে না পারার কারনে নারীরা শ্রম বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। তাই তাদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়।

তাদের কোন স্বাধীনতা থাকে না। এতে তাদের উপর নেমে আসে নানা ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতন। বাল্য বিবাহের কারণে পিতা মাতার সাথে সন্তানের প্রায়ই সম্বন্ধ থাকে না।

পিতা-মাতা পুত্র এবং পুত্র বধু নিয়ে সংসার করা তো দূরের কথা তাদেরকে দেখতেও পারে না নাবালক সন্তান। বাল্য বিবাহ সমাজের একটি ক্ষতিকর দিক।

বাল্য বিবাহ একদিকে যেমন নারীকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তেমনি সমাজকে বিরূপ ভাবে প্রভাবিত করছে। পুরুষ শাসিত এ সমাজে মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে তাদের স্বাধীনতা নষ্ট বা হরণ করা হচ্ছে।

যা নারী, পরিবার, সমাজ তথা সমগ্র সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও সচেতন সমাজের লোক ধারণা বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করতে হলে এ আইন জোরালো করতে হবে।

এছাড়াও নারী শিক্ষা ও নারীর স্বাবলম্বন অর্জনই পারে বাল্য বিবাহের অভিশাপ থেকে নারীকে মুক্তি দিতে। এ ছাড়া তারা আরও বলছে যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলে কঠোর আইন প্রনয়ন করে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহন করে এ বিষয় মোকাবেলা করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আগ্রহী হতে হবে। সর্বোপরী আমাদের সমাজে গণ-সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বাল্য বিবাহের বিষয়টি আমাদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আইনগত, রাষ্ট্রিয় ও সর্বোপরি সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে বিচার বিশ্লেষন করে সমন্বিত ভাবে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারলেই সমাজ থেকে এ সর্বনাশা প্রথা নির্মুল করা সম্ভব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সাইফুল হাসান বলেন, ২০১৬ সালে ৮ মাসে প্রায় ৬৪টি বাল্য প্রতিরোধ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসের ১১ দিনের ব্যবধানের বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে ৪টি।

পৌর অঞ্চলের চন্দনগাঁতীতে৪টি , দৌলতপুর ১টি, লক্ষীপুর এলায় ১টি বিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে। তার একটি মাত্র উদাহরন দেওয়া হলো।

গত ৭ জানুয়ারী শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর মতি মার্কেট গ্রামে অভিযান চালিয়ে বাল্য বিবাহ বন্ধ করেন। শারমিন খাতুন(১৪) উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মতি মার্কেট গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে।

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার রাতে শারমিনের পরিবার গোপনে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল হাসান পুলিশ নিয়ে অভিযান চালিয়ে বাল্য বিবাহ বন্ধ করে দেয় এবং তাদেও কাছে মুচলেকা নেয় যে ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া প্রর্যন্ত বিয়ে দেবেনা।

প্রশাসনের আসার খবর পেয়ে বরপক্ষের লোকজন পূর্বেই পালিয়ে যায়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল হাসানের হস্তক্ষেপে বাল্য বিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় স্কুল পড়ূয়া ছাত্রী হ্যাপি খাতুন (১৩)।

গত শুক্রবার রাতে উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াগাতী গ্রামের অভিযান চালিয়ে বাল্য বিবাহ বন্ধ করেন। স্কুল ছাত্রী হ্যাপি উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াগাতী গ্রামের ইসমাইল হোসেনের মেয়ে ও স্থানীয় এসএন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজের সপ্তম শ্রেনীর ছাত্রী।

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার রাতে স্কুল ছাত্রী হ্যাপির পরিবার গোপনে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল পুলিশ নিয়ে অভিযান চালিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধ করে।

এসময় বর-বরযাত্রী ও ছেলে এবং মেয়ের পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে যায়। স্থানীয় ও এলাকাবাসীর নিকট বাল্য বিবাহের কারণ হিসাবে জানাতে তারা জানান, এলাকার বখাটের ছেলেদের তান্ডবতা, ইভটিজিং, অশ্নীলতার কারনেই পরিবারের পক্ষ থেকে ১৮ বছর পূর্বেই বিবাহ দিতে আগ্রহ হচ্ছে।

বেলকুচি উপজেলা প্রশাসন ও থানা প্রশাসন এই সকল বখাটের উপর আইন প্রয়োগ করলেই গত ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭সালে বাল্য বিবাহের প্রবনতা কমে আসবে বলে তারা ধারনা করছে।

সে ক্ষেত্রে প্রশাসনকে বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে কোন ছাড় না দেওয়া অপরদিকে স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের উপর ইভটিজিংকারীদের সরাসরি তাদের জেল হাজতে প্রেরণ করা উচিৎ বলে মনে করছে সচেতন সমাজের লোকজন।

 

এইবেলাডটকম/চন্দন/গোপাল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Migration
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71