বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
বৃহঃস্পতিবার, ৯ই অগ্রহায়ণ ১৪২৪
 
 
বন্যার পদধ্বনি
প্রকাশ: ০৭:৫৩ am ১৫-০৮-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:৫৩ am ১৫-০৮-২০১৭
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


মাসব্যাপী বন্যা প্রলম্বিত হওয়ার শঙ্কা ** প্রধান তিন নদীতে পানি বাড়ছে ** ২৭টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি ** বন্যা মোকাবিলায় সব প্রস্তুতি রয়েছে :দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ২০টি জেলা গত চারদিন ধরে বন্যা কবলিত। প্রতিদিনই নদ-নদীগুলোতে পানি বাড়ছে, প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। সবচেয়ে বেশি পানির ধারক যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে গত ৭০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পানি বেড়েছে। এদিকে, বাংলাদেশের উজানের দেশ চীন, নেপাল ও ভারতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এসব দেশের বন্যার সিংহভাগ পানি বাংলাদেশের নদ-নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়বে। এর মধ্যে আগামী ২০ ও ২১ আগস্ট অমবস্যার প্রভাবে সাগরের পানির উচ্চতা এমনিতেই বাড়বে। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার পর এবারই প্রথম বড় তিন নদীর পানি একসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবমিলিয়ে চলতি বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ এলাকাব্যাপী ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, দেশের উজানের তিন অববাহিকা-গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। অন্তত আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পানিস্তর বাড়বে। গত রবিবার  ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীতে ৪৭ সেন্টিমিটার, গঙ্গা-পদ্মায় ২২ সেন্টিমিটার এবং মেঘনা অববাহিকায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের নদনদীগুলোর পর্যবেক্ষণ পয়েন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হয় যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্ট দিয়ে। গতকাল সোমবার দুপুরে ওই পয়েন্ট দিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে    বেশি উচ্চতায় ২০ দশমিক ৭৮ সেন্টিমিটার পানি প্রবাহিত হয়েছে। গতকাল নদীগুলোর অন্তত ২৭টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র এবং যমুনায় আগামী তিন দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এ সময়ে পানির উচ্চতা প্রায় দেড় ফুট বাড়বে। ফলে এ নদীগুলোর অববাহিকায় দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। গঙ্গা-পদ্মার এবং সুরমা-কুশিয়ায়ায় পানি বাড়তে থাকায় এবং নেপালে ও ভারতের বিহারে-আসামে বন্যা পরিস্থিতি থাকায় দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতেও বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিবে। রাজধানী ঢাকার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সাইফুল হোসেন গতকাল বলেন, গত ৪-৫ দিন ধরে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির ফলে উত্তরের এবং উত্তর-পূর্বের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি অবনতিশীল রয়েছে। এই বন্যা পরিস্থিতি মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। তিনি বলেন, দেশের নদীভাগের ৯০ শতাংশ পানি আসে উজান থেকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা দিয়েই আসে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। প্রধান তিন নদীর অববাহিকায় পানিবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক। তবে এবারের বন্যা ১৯৮৮ কিংবা ১৯৯৮’র বন্যার মত কিংবা তা ছাড়িয়ে যাবে কিনা, সেটি এখনই বলা যাবে না।

এদিকে এ বছর নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে যে বন্যা দেখা দিয়েছে তা নজিরবিহীন। ওই এলাকায় বন্যার কারণ তিস্তা-পুনর্ভবা ও ধরলা নদীর পানিবৃদ্ধি। গত ৫০ বছরে ওই নদীগুলোতে এত পানিবৃদ্ধি হয়নি। ফলে ওই এলাকার মানুষও চলমান বন্যার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। ফলে আকস্মিক বন্যায় উত্তরের জেলাগুলোতে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, উত্তরের জেলাগুলোতে যে বন্যা দেখা দিয়েছে তেমন বন্যা স্বাধীনতার পর ওই এলাকার মানুষ দেখেননি। এমন বন্যা সিরাজগঞ্জ বা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অনেকটা অনভিজ্ঞতার কারণেই এই বন্যায় উত্তরের জেলাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। গতকাল দুপুরে তিনি জানান, নদ-নদীগুলোর ৯০টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের ৬৯টিতে পানি বাড়ছে। এর মধ্যে ২৭টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার উপরে বয়ে যাচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এবং সুরমা-কুশিয়ারায় পানি বেড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ধরলা, তিস্তা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, গুর, ইছ-যমুনা, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, আত্রাই, পদ্মা,  সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, যদুকাটা, সোমেশ্বরী ও কংস নদীতে পানি বিপদসীমার উপরে বইছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং পাউবো’র ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা দেশের ও চীন-ভারত-নেপালের বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানান, দেশের বড় নদীগুলোসহ অধিকাংশ নদীতে আগামী তিনদিন পানি বাড়বে। এরপর দুইদিন স্থিতিশীল থাকবে। এরমধ্যে অমবস্যার প্রভাবে সমুদ্র ও নদীর পানিও ফুলে উঠবে। দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। কিন্তু উত্তরের পানি দ্রুত গড়িয়ে মধ্যাঞ্চলে আসে। ফলে মধ্যাঞ্চলের ঢাকার নিম্নাঞ্চলসহ অন্যান্য জেলাগুলো এ সময় প্লাবিত হবে। মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো অনেকটাই সমতল, ঢালু কম। এ অঞ্চলের ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুরে পানি ধীরগতিতে গড়ায়। তখন মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলা প্লাবিত হয়ে পড়বে। এরমধ্যে চীন, ভারত ও নেপালে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস রয়েছে। ওই বন্যার পানিও বাংলাদেশের নদীভাবে প্রবেশ করে একসাথে অনেক বড় এলাকা প্লাবিত করবে এবং বন্যার সময় দীর্ঘায়িত হবে।

এ প্রসঙ্গে পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবার বেশ আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। বড় নদীগুলোতে একসাথে পানিবৃদ্ধি এবং উজানের দেশগুলোতে বন্যার কারণে দেশের বন্যা এলাকা ও সময় এবার অনেক বাড়বে। প্রায় মাসব্যাপী প্রলম্বিত হতে পারে বন্যাকাল। ১৯৮৮’র চেয়ে বড় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য দ্রুত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা দরকার।

১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের ৬৮ শতাংশ এবং ১৯৮৮ সালের বন্যায় ৬১ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ২০০৭ সালের বন্যায় ৪০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ডুবে গিয়েছিল।

জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় (ইউএনআরসিও) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণাকেন্দ্র  (জেআরসি) গত ১০ আগস্ট বৈশ্বিক বন্যা পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দিয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ভুটান ও নেপালের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অঞ্চলগুলোতে গত শুক্রবার থেকে পানি বাড়ছে এবং ১৯ আগস্ট পর্যন্ত এই পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হতে পারে। ২০০ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার উজানে বন্যার মাত্রা সবচেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। দ্য ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ইসিএমডব্লিউএফ) এক পূর্বাভাসে জানায়, আগামী ১০ দিনের মধ্যে হিমালয়ের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে করে ব্রহ্মপুত্রের ভারত ও বাংলাদেশ অংশে পানি বাড়বে।

বন্যা মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুতি

গতকাল রাজধানীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, উত্তরাঞ্চল থেকে পানি নামার সময় মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, রাজশাহী, টাঙ্গাইল ও ভোলা জেলা প্লাবিত হতে পারে। পানি এলে ঢাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ১৯৮৮ সালের চেয়ে বড় বন্যা হলেও আমরা মোকাবিলা করতে পারব। আমাদের সকল প্রস্তুতি রয়েছে। খাদ্য সঙ্কটও নেই, থাকবে না। বন্যার এই দুর্যোগ মাসখানেক স্থায়ী হতে পারে এবং শেষ না হওয়ায় পর্যন্ত সরকারের তত্পরতা চলবে।

তিনি জানান, দুর্গত হয়েছে এবং হতে পারে এমন ৩৩টি জেলায় ১০ হাজার ৬৩০ মেট্রিক টন চাল ও তিন কোটি ১০ লাখ টাকা ইতিমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়ের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। যেসব অঞ্চলে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে সেসব এলাকার সংসদ সদস্যরা ইতিমধ্যে এলাকায় চলে গেছেন এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে মন্ত্রণালয় সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কোথায় কী প্রয়োজন, সেভাবেই আমরা চাহিদা মেটাচ্ছি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বলেন, উদ্ধারকারী যানবাহন ও নৌকা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জিআরের টাকা দিয়ে নৌকা কিনতে বলা হয়েছে। কয়েক জায়গায় উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, বিজিবি এবং সেনা বাহিনীর সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71