শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : বাংলা গদ্যের জনক এবং সমাজ সংস্কারক
প্রকাশ: ১০:৫১ am ১১-০৫-২০১৫ হালনাগাদ: ১০:৫১ am ১১-০৫-২০১৫
 
 
 




পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে অনেক যুগ প্রবর্তক মহাপুরুষের জন্ম হয়েছিল; ঈশবরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন বিরল গুণের অধিকারী। 
    পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দোপাধ্যায়। মা ভগবতী সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগেও ছিলেন আধুনিক চিন্তার অধিকারিণী। পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁদের পরিবারের খ্যাতি ছিল, কিন্তু আর্থিক অবস্থা মোটেও ভাল ছিল না। পণ্ডিত ও পরবর্তীতে মনীষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাল্য ও কৈশোরের কেটেছিল কঠোর দারিদ্র্যর মধ্যে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পিতা ঠাকুরদাসকে অল্পবয়সেই বীরসিংহ গ্রাম ছেড়ে অর্থ উপার্জনের জন্য কলকাতায় যেতে হয়। সেখানে নামমাত্র বেতনে এক ব্যবসায়ীর খাতা লেখার কাজে নিযুক্ত হন। ন্যায়নিষ্ঠা, নীতিপরায়ণতা, সততা, অধ্যবসায় ও স্বাধীনচেতা মনোভাব সম্বল করে কালক্রমে ঠাকুরদাস বন্দোপাধ্যায় একদিন সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
    পিতার ঐসব গুণ পরবর্তীকালে পুত্র ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যেও পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়েছিল। কঠোর দারিদ্রের মধ্যে মানুষ হলেও ঈশ্বরচন্দ্রের মনোবল ছিল অসীম এবং দৃঢ়। তিনি গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে পড়াশুনায় ও নিয়মানুবর্তিতায় কখনো অমনোযোগী হননি।
    ছেলেবেলায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। তিনি কতখানি মেধাবী ছিলেন সে সম্পর্কেও একটি গল্প আছে। তিনি অত্যন্ত অল্পবয়সে একবার পায়ে হেঁটে বাবার সাথে কোলকাতা গিয়েছিলেন। পথে মাইলস্টোনের সংখ্যার হিসাব গুণতে গুণতেই শিখে ফেলেছিলেন ইংরেজী গণনা।
    তিনি গ্রামের পাঠশালার পড়াশুনা শেষ করে মাত্র আট বছর বয়সে গ্রামের বাড়ি থেকে পিতার সঙ্গে পায়ে হেঁটে কোলকাতায় এসেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বাবার সঙ্গে কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে ভাগবত সিংহের বাড়িতে বাস করতে থাকেন এবং শিবচরণ মল্লিকের বাড়ির পাঠশালায় একবছর পড়াশুনা করেন। তারপর ১৮২৯ সালের ১ জুন তিনি কলকাতার সরকারি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। অপরিসীম অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশুনা করে তিনি স্কুলের পরীক্ষায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তিও লাভ করেন। তাঁর পাঠানুরাগের কাহিনী কিংবদন্তী হয়ে আছে। তেলের অভাবে ঘরে আলো জ্বালাতে পারতেন  না বলে পথের পাশে জ্বালানো গ্যাসের বাতির নিচে দাঁড়িয়ে পড়াশোনা করতেন। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত এভাবেই পথের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন পড়া তৈরি করতেন। এমনি অবিরাম কষ্টের মধ্যেই তাঁকে স্কুলের পড়াশোনা চালাতে হয়েছিল।
    সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ শ্রেণীর পাঠ কৃতিত্বের সাথে শেষ করে ঈশ্বরচন্দ্র ইংরেজী শ্রেণীর পড়া শুরু করেন। ১৮৮৩৩ থেকে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সাহিত্য শ্রেণীর পাঠ সমাপ্ত করেন। সাহিত্য শ্রেণীতে তিনি কৃতী শিক্ষক জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের কাছে শিক্ষালাভ করেন। সংস্কৃত কলেজে বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে পুনরায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
    ১৮৩৫ সালে বিদ্যাসাগর অলঙ্কার শ্রেণীতে ভর্তি হন। এই শ্রেণীতে তিনি এক বছর পড়াশুনা করেন। ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম হয়ে প্রচুর সুনাম অর্জন ও পুরস্কার লাভ করেন। এরপর তিনি বেদান্ত শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেই শ্রেণীতেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তারপর ভর্তি হন স্মৃতি শ্রেণীতে। এই শ্রেণীতেও তিনি অসাধারণ সাফল্য দেখান। সংস্কৃত কলেজে একাধিক্রমে বার বছর অধ্যয়ন করে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায় এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
বিদ্যাসাগর ১৮৩৯ খ্রিঃ হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি পরীক্ষার শেষে প্রশংসা পত্রে তাঁর নামের আগে ব্যবহার করা হয়।‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি তাঁর জন্য যথার্থই ছিল। বিদ্যার সাগর, জ্ঞানের সাগর, দয়ার সাগর, করুণার সাগর, মানবতার সাগর, প্রগতিশীলতার সাগর, বিবেকের সাগর, সব বিশেষণই তঁাঁর ক্ষেত্রে যথাযথ ও সুপ্রযোজ্য। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজ ত্যাগ করেন তখন তাঁর বয়স একুশ বছর।
    ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিদ্যাসাগর বিয়ে করেন। সে সময় অবশ্য সবার অল্পবয়সেই সবার বিয়ে দেওয়া হত। স্বাবলম্বী বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার প্রশ্ন ছিল না। বিদ্যাসাগরের স্ত্রীর নাম ছিল দিনময়ী দেবী।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে ২১ ডিসেম্বর একুশ বছর বয়সে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ঐ সময়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগে হেড পণ্ডিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একই সাথে বিদ্যালয় পরিদর্শকের দায়িত্বও পালন করতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পক্ষে এত অল্পবয়সে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করা সম্ভব ছিল না। ঐ কলেজের সেক্রেটারী মি. জি.টি মার্শাল এর ঐকান্তিক আগ্রহ, চেষ্টা ও বিশেষ সুপারিশে সেটা সম্ভব হয়েছিল।
    বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করাার পর ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজে এ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগদান করেন। সেই সময় ঐ কলেজের সেক্রেটারী ছিলেন রসময় দত্ত।
    চাকরী গ্রহণ করার পর গোটা সংসারের দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। পিতা চাকরী থেকে অবসর গ্রহণ করার তাঁকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর তিনি নিজের ছোট ভাইকেও কোলকাতায় নিজের কাছে এনে পড়াশোনা করাতে লাগলেন। শুধু নিজের আত্মীয় ছাড়াও অনেক অনাথ ছাত্রও তাঁর বাসগৃহে থেকে লেখাপড়া করত।
    এদিকে কর্মক্ষেত্রে তাঁর ক্রমশঃ উন্নতি হতে থাকে। আপন বুদ্ধিমত্তা ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় প্রদান করে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃতের অধ্যাপক, পরে অধ্যক্ষের পদে অধিষ্ঠিত হন।
    ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যাসাগর শিক্ষা ব্যবসথার উন্নতি বিধানে একটি মূল্যবান রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করেন। এ বিষয়ে সেক্রেটারী রসময় দত্তের সাথে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। এই মতবিরোধের কারণেই তিনি সংস্কৃত কলেজ থেকে পদত্যাগ করে ১৮৪৭ সালের ১৬ জুলাই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রত্যাবর্তন করেন।
    সংস্কৃত কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ভুল বুঝতে পারে। তারা এসে ঈশ্বরচনদ্রকে আবার সংস্কৃত কলেজে ফিরে যাবার অনুরোধ করেন। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও কলেজের পুনর্গঠনের বিষয়ে তাঁকে অবাধ সুযোগ দেওয়া হবেÑএই শর্তে তিনি পুনরায় ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে কলেজের সাহিত্য সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
    ১৮৫১ সালের ২২ জানযুয়ারি তিনি নবসৃষ্ট অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। এরপর তিনি সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। ইংরেজী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।
    কর্মজীবনে প্রবেশের পর থেকে তাঁর সাহিত্যকর্ম রচনার পালা শুরু হয়। তিনি সাহিত্যে অদ্ভুৎ সৃজনী প্রতিভার পরিচয় দিয়ে থাকেন। চাকুরী থেকে অবসরে যাবার পরই তিনি একান্তভাবে সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করেন। অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়েই তিনি বাংলার উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তকের অভাব অনুভব করেন। এসময় তিনি বহু বাংলা গদ্যগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর হাতে পড়েই বাংলা গদ্যরীতি তার আপন পথ খুঁজে পায়। এজন্য তাঁকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়।
    কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঈশবরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলার গদ্যের জনক আখ্যায় আক্যায়িত করেন। বিদ্যাসাগর সংস্কৃত, হিন্দী এবং ইংরেজী থেকে বহু গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অনুবাদকৃত গন্থের মধ্যে “সীতার বনবাস”, “ভ্রান্তিবিলাস”, “বেতাল পঁচিশ” এবং “কথামালার গল্প” সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এসব ছাড়াও তাঁর রচিত “বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ”, “বোধোদয়” এবং “আখ্যানমঞ্জুরী” গ্রন্থখানি আজও বাংলাভাষা গোড়-াপত্তনে অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়।
    তাঁর রচিত “বোধোদয়” সংস্কৃত কলেজের নিু শ্রেণীতে পড়ানোর জন্য রচিত, যা  বর্তমান বাংলা সাহিত্যে অনন্যসাধারণ বলে বিবেচিত। তিনি কবি কালীদাসের রচিত “শকুন্তলা” কাব্যের অবলম্বনে রচনা করলেন বাংলা গদ্যে “শকুন্তলা”। এছাড়া সেক্সপীয়রের নাটক “কমেডি অব এররস” এর অনুসরণে লিখলেন “ভ্রান্তিবিলাস” এবং রামায়ণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করলেন “সীতার বনবাস”। তবে তিনি শুধু যুগ যুগ ধরে সাহিত্য সাধনার জন্যই বাংলা ভাষাভাষীদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবেন নাÑতিনি একজন অসম সাহসী সমাজ সংস্কারক হিসেবেও হিন্দু সমাজে সবার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
    সাহিত্যকর্ম ও সমাজসংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাবিস্তারেও তাঁর অশেষ অবদান রয়েছে। সংস্কৃত শিক্ষার সংস্কার, বাংলা শিক্ষার ভিত্তি  স্থাপন এবং স্ত্রীশিক্ষার পত্তন ও প্রসারে তাঁর প্রয়াস এক অক্ষয় কীর্তি। তিনি শিক্ষাবিস্তারে বহু স্কু-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
    ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দেশীয় কয়েকজন ধনী ও শিক্ষিত  লোকের সহায়তায় এবং বেথুন সাহেবের উদ্যোগে কোলকাতায় স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের সূত্রপাত হয়। ছোটলাট ফ্রেডারিক হ্যালিডে সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি মেদিনীপুর, বর্ধমান, হুগলি এবং নদীয়া জেলায় নানাস্থানে অনেকগুলো বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে অবদান রাখেন।
    বিদ্যসাগর শিক্ষাবিস্তারে ২০টি৬ মডেল স্কুল ও ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
    বিদ্যাসাগর তাঁর মাকে দেবীর মত শ্রদ্ধা করতেন। তিনি অকাতরে মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতেন। গ্রামের দাতব্য চিকিৎসালয় ও বিদ্যালয়গুলো মায়ের ইচ্ছানুসারেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির গল্প এদেশে অনেকটা কিংবদন্তীর মত প্রচারিত।
    জানা যায়, ছোট ভাইয়ের বিয়ের চিঠি পেয়ে মাতৃ আদেশ পেয়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যক্ষ মার্শাল সাহেবের কাছ থেকে ছুটি চাইলেন বাড়ী যাবার জন্য। ইংরেজ অধ্যক্ষ ছুটি দিতে না চাইলে তিনি চাকুরী ছেড়ে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন মাতৃ আদেশ অমান্য করা অসম্ভব বলে। পরে ছুটি পেলে রাত্রেই বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথে প্রমত্তা দামোদর নদী। আবহাওয়া খারাপ থাকায় নদী পারাপারের জন্য কোন নৌকা পাওয়া গেল না। তখন তিনি নদী সাঁতরিয়ে বাড়িতে এসে পৌঁছালেনÑএমনি ছিল তাঁর মাতৃভক্তি।
    বিদ্যাসাগর কর্তৃপক্ষের সাথে মতবিরোধের কারণে ১৮৫৮ সালের ৩ নভেম্বর পাঁচশো টাকার মাসিক বেতনের সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ও অন্যান্য সরকারি পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
    বিদ্যাসাগর ১৮৫৬ সালে “তত্ত্ববোধিনী সভা”র সভ্য নিযুক্ত হন।
    ১৮৫৯ সালে তিনি “ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল” স্থাপনে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। ১৮৬৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় “হিন্দু মেট্রেপলিটন ইসস্টিটিউট”। বিদ্যাসাগর হন এর সেক্রেটারী। ১৮৭২ সালে এটিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং ১৮৭৯ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত করা হয়। বর্তমানে এর নাম “বিদ্যাসাগর কলেজ”।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন পরের দুঃখে অতি কাতর। মহকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেন। কবি নবীনচন্দ্র সেনও যৌবনে বিদ্যাসাগরের অর্থে লেখাপড়া করেছিলেন।
    বিদ্যাসাগর সহজ সরল জীবনযাপন করতেন। সাদাসিদে পোশাকে গায়ে মোটা চাদর এবং চটিজুতা ছিল তাঁর একমাত্র পরিচ্ছদ।
    বিদ্যাসাগরের আর একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল সমাজ সংস্কারমূলক কাজ। তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় প্রমাণ উপস্থাপন করে ১৮৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে “বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব” মীর্ষক পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। হিন্দু রক্ষণশীল সমাজ বিধবা বিবাহের তীব্র বিরোধিতায় মারমুখী হয়ে ওঠেন। ১৮৫৫ সালের অক্টোবর মাসে বিরুদ্ধবাদীদের অপতৎপরতার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবার জন্য একই শিরোনামে আরেকটি পুস্তক প্রকাশ করেন। ১৮৫৫ সালের ৪ অক্টোবর বিধবা বিবাহ আইন পাস করার জন্য ভারতের বৃটিশ সরকারের কাছে তিনি আবেদন পত্র পেশ করেন। এই আবেদন  পত্রের সাথে তিনি বিধবা বিবাহ আইনের একটি খসড়াও সংযুক্ত করে দিয়েছিলেন। ১৮৫৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাজা রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে বিরোধী শিবির থেকেও সরকারের কাছে বিপরীত একটি আবেদন পত্র দাখিল করা হয়। ১৮৫৫ সালের ১৭ নভেম্বর খসড়াটি গভর্ণমেন্ট অব ইণ্ডিয়া কাউন্সিলে উপস্থাপিত হয়। বহুবিধ বিচার-বিশ্লেষণের পর ব্যবস্থাপক সভা কর্তৃক বিধবা বিবাহ আইনের খসড়াটি গৃহীত হয়। ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই গভর্ণর জেনারেলের সম্মতিক্রমে এটি আইনে পরিণত হয়।
    ১৮৫৬ সালের ডিসেম্বরে আইন অনুসারে প্রথম বিবাহ করেন সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারতœ। বিদ্যাসাগরের উপস্থিত ও তত্ত্বাবধানে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে তাঁর নেতৃত্বে বহু বিধবা বিবাহ সম্পন্ন হয়।
    বিদ্যাসাগর নিজ পুত্রের সঙ্গে এক বিধবা কন্যার বিয়ে দিয়ে আইন প্রচলের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এ নিয়ে মায়ের সাথে তাঁর মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। অবশ্য তিনি মায়ের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন লক্ষ লক্ষ বিধবা মায়ের দুঃখকে।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করে গেছেন। ১৮৭১ সালের জলাই মাসে তিনি এ প্রথার বিরুদ্ধে শাস্ত্রীয় প্রমাণ উপস্থাপন করেন। প্রতিপক্ষ পণ্ডিতমহল ওসব পুস্তিকা রচনা ও প্রকাশের জন্য তাঁকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলে তিনি “কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাই পোষ্য” ছদ্মনামে “অতি অল্প হইল” (মে ১৮৭৩) এবং “আবার অতি অল্প হইল” শীর্ষক দুটি বিদ্রƒপাত্মক প্রতি আক্রমণ পুসতক রচনা করেন। বহুবিবাহ রোধে আইন প্রণয়ন না হইলেও তিনি এ প্রথার বিরুদ্ধে সমাজ সচেতনতা সৃষ্টিতে সক্ষম হন।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের স্রষ্টা হিসেবে খ্যাত। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গন্থের নাম হলÑবেতাল পঞ্চবিংশতি (হিন্দী বেতাল পচ্চাশির বঙ্গানুবাদ), শকুন্তলা (কালীদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম নাটকটির উপাখ্যান ভাগের বঙ্গানুবাদ ১৮৪৫), সীতার বনবাস (ভবভূতির উত্তর রামচরিত নাটকের ১ম অংক ও রামায়ণের ওড়াকাণ্ডের বঙ্গানুবাদ ১৮৬০), ভ্রান্তিবিলাস (সেক্সপীয়রের ঈড়সবফু ড়ভ ঊৎৎড়ৎং এর বঙ্গানুবাদ ১৮৬৯ ইত্যাদি)।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি দুঃস্থমহিলাদের সেবা সহায়তা দিয়ে বাঁচানোর জন্য জন্য “হিন্দু ফ্যামিলি গ্রাচুয়িটি ফাণ্ড” গঠন করেন। তিনি চিরদিন কুসংস্কার, গোড়ামি আর ধর্মন্ধতার বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে লড়াই করে গেছেন। বাঙালি জাতি সর্বপ্রথম বড় হবার, যোগ্য হবার, মানবিক হবার, আধুনিক প্রগতিশীল ও বিশ্বজনীন হবার সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত খুঁজে পেয়েছিল বিদ্যাসাগরের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্বন্ধে বলেছেনÑতিনি হিন্দু ছিলেন না, বাঙ্গালী বা ব্রাহ্মণ ছিলেন না, ছিলেন ‘মানুষ’। এই মন্তব্যের তাৎপর্য অতলস্পর্শী। কারণ কারো যথার্থ “মানুষ” হওয়া অত সহজ কথা নয়। তিনি আরো বলেছেনÑতাহগার মহৎ চরিত্রের যে অক্ষয় বট তিনি বঙ্গভূমিতে রোপণ করিয়া গিয়াছেন, তাহার তলদেশে জাতির তীর্থস্থান হইয়াছে।
    ডঃ সুকুমার সেন বলেছেনÑবিদ্যাসাগরের আগে বাংলা গদ্যের চল ছিল, চাল ছিল না।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধী বলেছেনÑআমি যে দরিদ্র বাঙ্গালী ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা করি তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
    বিশাল ও বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যাসাগর ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যাণ্ডের রয়াল এসিয়াটিক সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন।
    ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে সি.আই.ই উপাধিতে ভূষিত করে।
    কঠিন পরিশ্রমজনিত কারণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। শেষজীবনে তিনি বিহারের অন্তর্গত কর্মাটারে কাটান। সাঁওতালদের অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি তাদের অবহেলিত অবস্থা দেখে তাদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
    এই মহামতি বিদ্যাসাগর ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই ৭১ বছর বয়সে পরলোকগমণ করেন। তিনি বাঙ্গালী হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করে সমাজ সংস্কারের এক অসাধারণ ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন।

সম্পাদনা : হাবিবুর রহমান সিজার



 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Mr. Helal
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71