মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
মঙ্গলবার, ১৬ই ফাল্গুন ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
৪৭, ’৭১–এর পর ২০১৬–এর হামলা: নাসিরনগর
‘এ ক্ষত কি আর সারব!’
প্রকাশ: ০৪:৪৯ am ২১-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৪:৫৯ am ২১-১২-২০১৬
 
 
 


গোলাম মর্তুজা ও শাহাদৎ​ হোসেন ||

  বিশ শতকের গোড়াতে কাজ শুরু। শেষ হয় ১৯১৫ সালে। চুন-সুরকির দালান। এপাশ থেকে ওপাশজুড়ে কবুতরের নকশা তোলা কার্নিশ, জোড়া সিংহ আর গণেশের খিলান করা সদর দরজা এখনো মলিন হয়নি। তবে ভয় আর শঙ্কায় মলিন বাড়ির সদস্যদের মুখ। তাঁরা বলছেন, গত এক শ বছরে তিনবার অস্তিত্বের সংকট অনুভব করেছেন তাঁরা। সাতচল্লিশে দেশভাগের সময়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের আগে আর সর্বশেষটা ঘটেছে গত ৩০ অক্টোবরের হামলার পর। সর্বশেষ হামলা ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তায় ডুবিয়েছে পরিবারের তরুণ সদস্যদের। 
দত্ত পরিবারের লোকজন এবং হামলার শিকার অন্য ব্যক্তিরাও বলছেন, একদিকে হামলার আতঙ্ক এখনো কাটেনি, তার ওপর যুক্ত হয়েছে বিচার না পাওয়ার শঙ্কাও। আর হামলার পর পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, তাঁদের বেশির ভাগই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন। এ ঘটনাও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
এসব কারণে শুধু দত্তবাড়ির সদস্যরাই নন, আশপাশের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অনেকেই বলছেন, এখানে নিজেদের অস্তিত্বের সংকট অনুভব করছেন। এ দেশে তাঁদের সন্তানেরা সমান সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। গত চার-পাঁচ পুরুষের সময়ে এমনকি পাকিস্তান আমলেও কখনোই তাঁরা এ রকম ঘটনার শিকার হননি।

গত ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের শতাধিক হিন্দু বসতবাড়ি ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এরপর আরও তিন দফায় হিন্দুদের পরিত্যক্ত রান্নাঘর-গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। দত্তবাড়ির মন্দিরে ভাঙচুরের মধ্য দিয়েই ওই হামলার সূত্রপাত।

যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গৃহনির্মাণ সহায়তা, সাধারণ সাহায্যসহ বিভিন্ন ধরনের সাহায্য দিয়ে সেই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার দৃশ্যমান চেষ্টা রয়েছে। জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান  বলেন, ৫০-এর বেশি পরিবারকে গৃহনির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের সাহায্য করা হয়েছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমাবেশ হয়েছে। সংগীতানুষ্ঠান ও মাছ ধরার উৎসব করা হয়েছে।

গত রোববার দত্তবাড়িতে গিয়ে কথা হয় বাড়ির কর্তা কাজলজ্যোতি দত্তের সঙ্গে। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে পরিবারের বহু পুরোনো সদস্যের সাদাকালো ছবি ঝোলানো, কোনো ছবি এক শ বছর আগে তোলা। এসব দেখিয়ে কাজলজ্যোতি বলছিলেন, সেই ব্রিটিশ আমলেই এ বাড়ির চারজন সদস্য কলকাতা থেকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ হয়েছিলেন। তখনকার আমলে সেই গ্র্যাজুয়েটদের দেখতে আশপাশের ১০ গ্রামের লোক বাড়িতে আসত। সেকি রমরমা অবস্থা! বাড়ি তৈরির ৩২ বছর পর দেশভাগ হলো। তখন প্রথমবারের মতো দত্তদের বাড়ি ছাড়ার একটা শঙ্কা তৈরি হয়। এ দেশে থাকবেন, না ভারতে চলে যাবেন, তা নিয়ে বাড়ির সদস্যরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। যেহেতু পরিবারের অনেক সদস্য তখনকার দিনে কলকাতায় লেখাপড়া করতে যেতেন, তাই কলকাতার সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো ছিল। অনেক আত্মীয়স্বজন দেশভাগের পর ভারতে চলেও গেলেন। তাঁদেরও যেতে বললেন। কিন্তু কাজলজ্যোতির বাবা-ঠাকুরদারা মাটির মায়া কাটাতে পারেননি।

কাজলজ্যোতি বলেন, ‘ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি হলেও আমাদের জীবনযাত্রায় খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তান আমলে এ বাড়িতেই বলা যায় এ অঞ্চলের আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ বাড়িতে এসে মিটিং করেছেন। চার নেতার দুজন মনসুর আলী ও তাজউদ্দীন আহমদও এ বাড়িতে এসেছিলেন। এ বাড়িতে এসে মিটিং করে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলায় পড়েন। এরপর এল মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়। বাড়ির লোকজন সবাই পালিয়ে গেল আগরতলায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ির কাছাকাছিই রাজাকার আর শান্তি বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। কিন্তু কোনো হামলা হয়নি এ বাড়ির ওপর। যুদ্ধ শেষে আবার সবাই বাড়িতে ফিরে এসেছে। সব আবার আগের মতোই হয়েছে। কিন্তু এবারের হামলায় যেন সবকিছু গোলমাল হয়ে গেল। বিনা উসকানিতে হামলা হলো বাড়িতে, বাড়িসংলগ্ন শতবর্ষী মন্দির থেকে সবকিছু নিয়ে গেল, ভেঙেচুরে একাকার করল। এরপর এখন আতঙ্কে সবাই। বাড়ির জ্যেষ্ঠ সদস্যরা মর্মাহত আর তরুণ সদস্যরা ক্ষুব্ধ।’

ওই বাড়ির এক তরুণ সদস্য বলেন, ‘অন্যরা কি আমাদের যন্ত্রণাটা বুঝবে? ধরুন, এক দুপুরে আপনি কাজে গিয়েছেন। বাড়িতে আপনার পরিবারের লোকজন আছে। হঠাৎ আতঙ্কিত পরিবারের সদস্যরা ফোন করে জানাল, কোত্থেকে একদল লোক বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর করছে। ছুটে এসে যে হামলা ঠেকাবেন, তারও কোনো উপায় নেই। হাজার হাজার হামলাকারী। হাতে দা, শাবল, লাঠি। কথা বললেই মেরে বসলে কী করার আছে। অথচ আমরা জানিই না কেন এ হামলা, কী আমাদের দোষ। বাসায় এসে দেখি বাচ্চা কাঁদছে, বড়রা হায় হায় করছে। এই যে অসহায়ত্বের অনুভূতি, তা প্রকাশযোগ্য নয়। সব আপনজন যেন রাতারাতি পর হয়ে গেল। এটা তো আর চোর-ডাকাতের হামলা নয়। এলাকার মানুষের এ রকম রূপ দেখার পর এভাবে এখানে কী করে থাকব, বলুন। আমার ছোট বাচ্চাটা যে পরে একই ঘটনার শিকার হবে না, তার নিশ্চয়তা কী।’ তিনি বলেন, হামলার ঘটনার পর তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেন না বাংলাদেশে থাকবেন কি না। যদিও জ্যেষ্ঠরা এখনো এ দেশেই থাকতে বলছেন।

কাজলজ্যোতি বলছিলেন, কিন্তু এ কথা ঠিক, হামলাকারীরা যখন মন্দির ভাঙছিল, তখন কতগুলো মুসলমান ছেলে একত্র হয়েই বাড়িটা বাঁচিয়েছে। সম্পর্কের দায়টা তারা ঠিকই রক্ষা করেছে। তবু সবকিছু যেন কী রকম এলোমেলো লাগে। আগে প্রায় প্রতিদিনই প্রতিবেশীরা (মুসলমান) দত্তবাড়িতে আড্ডা দিতে আসতেন। চায়ের আড্ডা বসত। কিন্তু হামলার পর সংকোচ, লজ্জায় তাঁরাও আসা বাদ দিয়েছেন।

নমশূদ্র পাড়ার মধ্যবয়সী শুক্লা সরকার এত কিছুর পরও হাসিমুখে বলছিলেন, ‘ছোটবেলায় বিয়া হইছে। এরপর আর কখনো দৌড় দেই নাই। সেই দিন বড় বড় দা দেইখা জীবনের মায়ায় এক দৌড়ে পাড়া ছাইড়া হাসপাতালে গিয়া উঠছি।’

নাসিরনগরের নমশূদ্র পাড়ার বিশ্বকর্মা মন্দিরেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। এই মন্দিরের দেখভালকারী কৃষক অঞ্জু ঘোষ বলেন, শত শত লোক কোত্থেকে যেন উড়ে এল। মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙল আর যত পিতল-কাঁসার মূর্তি, পূজার সরঞ্জাম থালা-বাসন ছিল সবই লুটে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় ভেঙে দিয়ে গেল সাধের ঢাকসহ সব বাদ্যযন্ত্র। মন্দিরের সিঁড়িতে বসে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে কথা বলছিলেন অঞ্জু। মন্দিরের সামনে তখনো পাহারায় আর্মড পুলিশের তিন সদস্য। তাঁদের দেখিয়ে অঞ্জু বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ গো

দাদা। কাম কইরা খাই। আখন তারা (পুলিশ) আছে বলে বুকে বল আছে। কিন্তু যে ঘটনা ঘটছে, তা একাত্তরেও হয়নি। মনটায় আঘাত দিয়া গ্যাছে গো দাদা, এ ক্ষত কি আর সারব!’

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Migration
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71