বুধবার, ২২ জানুয়ারি ২০২০
বুধবার, ৯ই মাঘ ১৪২৬
সর্বশেষ
 
 
সূর্যসেনকে ধরিয়ে দেয়ার সংবাদ মিলল ছোলতানে!!!
প্রকাশ: ১১:৫৫ am ০৭-০১-২০২০ হালনাগাদ: ১১:৫৫ am ০৭-০১-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


রাতের খাবার খেতে বসেছেন নেত্র সেন। এমন সময় দরজায় শব্দ। খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করলেন পাড়ারই এক যুবক। আচমকা দায়ের কোপে মাথা বিচ্ছিন্ন নেত্র সেনের। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী থরথর করে কাঁপছেন। যাওয়ার আগে ঘাতক বলে গেলেন, এটাই উপযুক্ত শাস্তি মাস্টারদার সঙ্গে বেঈমানির।

চোখের সামনে স্বামীর এমন মৃত্যু দেখে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত স্ত্রী। স্বামী হারানোর বেদনা একপাশে রেখে তিনি এটা জেনে বেশি কষ্ট পাচ্ছিলেন যে, তার স্বামী ব্রিটিশদের পুরস্কারের লোভে ধরিয়ে দিয়েছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের মত একজন মানুষকে। স্বামীর অপরাধের কিছুটা প্রায়শ্চিত্য করতেই ঘাতকের নাম কাউকে বলেননি তিনি। ব্রিটিশ পুলিশ শত চেষ্টা করেও ওই বিধবার মুখ থেকে নামটি বের করতে পারেনি।

অন্যদিকে মরার আগে সেই পুরস্কারের টাকাও চোখে দেখেননি নেত্র সেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা, চট্টগ্রামের সন্তান মাস্টারদা সূর্যসেনকে ধরার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণার সংবাদটি ১৯৩০ সালের ৩০ মে প্রকাশ করেছিল দৈনিক ছোলতান। দুই আনা দামের ৮ পৃষ্ঠার দৈনিকটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটির দুর্লভ একটি কপি রয়েছে জলছাপ বইয়ের লেখক, তরুণ শিল্পোদ্যোক্তা তারেক জুয়েলের সংগ্রহশালায়।

দৈনিক ছোলতান-এর ওই সংখ্যায় দুই কলামে প্রধান শিরোনাম করা হয়েছে, ‘রেঙ্গুনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জের/আরও দশ জনের মৃত্যু/ভারতীয় দোকানপাট যানবাহন বন্ধ/পুলিশ ও সৈন্যদলের কড়া পাহারা’। তৃতীয় কলামের শুরুতে শিরোনাম, ‘বন্দুকের গুলিতে মিঃ গান্ধী নিহত/শিলচরে শ্বেতাঙ্গদিগের বিচিত্র অভিনয়’। চতুর্থ কলামের শুরুতে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুন্ঠন সংক্রান্ত খবরটি ছাপা হয়।

সংবাদটির মূল শিরোনামে উল্লেখ করা হয়, ‘চট্টগ্রাম হাঙ্গামার তদন্ত’; উপশিরোনাম করা হয়, ‘পলাতকের সন্ধানে পুরস্কার/সরকারের বিফল চেষ্টা’ সংবাদে উল্লেখ করা হয়, “চট্টগ্রাম, ২৭ শে মে। এখানে অস্ত্রশস্ত্র লুট করার ব্যাপারে যাহারা নেতৃত্ব করিয়া ছিলেন, এখনও তাহাদের কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। নিম্ন লিখিত ২০ জন পলাতককে ধরাইয়া দেওয়ার জন্য জেলা মাজিস্ট্রেট পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছেন,- সূর্য্য সেন, অনন্ত সিং, নির্মল সেন, গনেশ ঘোষ, অম্বিকা চক্রবর্ত্তী, লোকনাথ বউল প্রত্যেককে ধরাইয়া দিলে ৫ হাজার টাকা হিসেবে পুরস্কার।

জীবন ঘোষাল, আনন্দ গুপ্ত, হরিপদ মহাজন, বীরেন্দ্র দে- প্রত্যেকের জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার; তারকেশ্বর দস্তিদার, ভবতোষ চ্যাটার্জি, সরোজ গুহ, সুধাংশু, রামকৃৃষ্ণ বিশ্বাস, তেমেন্দ্র দস্তিদার, কৃৃষ্ণ চৌধুরী, ক্ষীরোদ ব্যানার্জি, ধীরেন্দ্র চৌধুরী, নীরেন্দ্র দত্ত- আড়াই শত টাকা হিসেবে পুরস্কার দেওয়া হইবে। পূর্ব্ব তালিকায় কতকগুলি ভুল ছিল। তাহা সংশোধন করিয়া বর্তমান তালিকা প্রস্তুত করা হইয়াছে। উক্ত পলাতক ব্যক্তি দিগকে আশ্রয় বা খাদ্য প্রদান করিতে নিষেধ করিয়া ম্যাজিস্ট্রেট এক আদেশ দিয়াছেন। এখনও রাত্রে সাজোয়া গাড়ী রাস্তা পাহারা দিতেছে। সহরের অবস্থা এক রূপ শান্ত আছে। কার্ফু অর্ডার এখনও বলবৎ আছে।”

প্রসঙ্গত, ১৭৫৭ সাল থেকে প্রায় ২০০ বছর ধরেই ব্রিটিশরা আমাদের সম্পদ লুট করেছে এবং এ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ রকম শোষণের মধ্যে গোপনে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠে শহরে-গ্রামে। এরমধ্যে চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অগ্রনায়ক ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। চট্টগ্রামেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন মুক্তিকামী মানুষদের নিয়ে একটি দল। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা যোগ দেন সশস্ত্র বিদ্রোহে। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার দখল করা হয়। এরপরই মাস্টারদাকে ধরতে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে ব্রিটিশরা। দুই বছর পর ১৯৩২ সালের জুলাইয়ে পুরস্কারের অর্থমূল্য দ্বিগুণ করে দশ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়।

সরকার ১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে শুরু করে। পরবর্তীতে মাস্টারদা পটিয়ার কাছে গৈরালা গ্রামে আত্মগোপন করেন। কিন্তু সূর্যসেনের লুকিয়ে থাকার তথ্য স্থানীয় বাসিন্দা নেত্র সেন পুলিশকে জানিয়ে দেয়। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গোর্খা সৈন্যরা স্থানটি ঘিরে ফেলে। সূর্যসেন ধরা পড়েন।

১৯৩৩ সালে সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তের বিশেষ আদালতে বিচার হয়। ১৪ আগস্ট সূর্য সেনের ফাঁসির রায় হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়াারি চট্টগ্রাম কারাগারে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।  তাদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসির পর লাশ দুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজারে তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।

দৈনিক ছোলতান-এর ১৯৩০ সালের ৩০ মে সংখ্যাটি সংরক্ষণ করা চট্টগ্রামের সন্তান তারেক জুয়েল একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমার একজন মামা শ্বশুরের কাছ থেকে দৈনিক ছোলতান-এর দুর্লভ সংখ্যাটি সংগ্রহ করেছি। বেশ পুরোনো, দুর্লভ যে কোনো কিছু আমি প্রতিনিয়ত সংগ্রহের চেষ্টা করি, এটা আমার নেশা, মনের খোরাক।

সূএ: একুশে প্রত্রিকা

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

Editor: Sukriti Kr Mondal

E-mail: info.eibela@gmail.com Editor: sukritieibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71