বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭
বৃহঃস্পতিবার, ১৬ই চৈত্র ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
সাংস্কৃতিক রাজধানী মহাস্থানগড় ও প্রাসঙ্গিক চিন্তা
প্রকাশ: ১০:৩৭ am ১০-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ১০:৩৭ am ১০-১২-২০১৬
 
 
 


 ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ ||

আমরা যারা বাংলাদেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জানার চেষ্টা করি। গবেষণার চেষ্টা করি তারা একটি বিষয়ে দারুণভাবে বিস্মিত আর হতাশ হই। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের কাছেও এদেশের ঐতিহ্যিক গৌরবের গভীরতা স্পষ্ট নয়। পাঁচ শতকের পর ইউরোপে সামন্ততান্ত্রিক জীবনে গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থায় যখন মানুষ বন্দী তার বহু আগে অর্থাত্ আট থেকে ছয় খ্রিস্টপূর্বাব্দে গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চলে দ্বিতীয় নগরায়ন শুরু হয়ে গেছে। এ পর্বে চার থেকে তিন শতকে নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটে বাংলাদেশে। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বর প্রত্নস্থল সে গৌরব বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপে নয় থেকে দশ শতকে একটু একটু করে শিক্ষার আলো জ্বলে গির্জাগুলোতে। পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে এগারো থেকে বারো শতক লেগে যায়। অপরদিকে বাংলায় আট শতকের মধ্যেই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। আমাদের পূর্বপুরুষের এই উজ্জ্বল কৃতিত্ব জেনে নতুন করে বর্তমান প্রজন্মকে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য তাদের নিয়ে যেতে হয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডার প্রত্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে। অন্যতম প্রাচীন নগর মহাস্থানগড়ে গিয়ে গবেষকরা নিঃসন্দেহ হবে আজকের আধুনিক সভ্যতায় বাস করা দাম্ভিক দেশগুলোর অন্ধকারাচ্ছন্ন দশা ছিল যখন, সে যুগে তখন বাংলায় গড়ে উঠেছিল নগর সভ্যতা। নওগাঁর পাহাড়পুর বিহার, ময়নামতির শালবন বিহার, আনন্দ বিহার এসব স্পষ্ট করবে ইউরোপ নয়—বাংলা-বিহার অঞ্চলই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ায় নেতৃত্ব দিয়েছিল পৃথিবীতে। এভাবে ঐতিহ্য প্রজন্মের মধ্যে বার বার মানসিক শক্তি ফিরিয়ে দেয়। একটি দেশ একটি জাতিকে নতুনভাবে প্রত্যয়ী হয়ে এগিয়ে যেতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাই চালিকাশক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এসব কারণে সভ্য দেশগুলো অনেক যত্নে নিজ দেশের প্রত্ন ঐতিহ্য রক্ষা করে। অক্ষরে অক্ষরে মান্য করে প্রত্ন আইন। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের অনেক ঊর্ধ্বে রাখে প্রত্ন অঞ্চল সুরক্ষার প্রশ্নটি।

আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ হচ্ছে সম্প্রতি সার্কভুক্ত দেশগুলোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার মহাস্থানগড়কে সার্ক দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা মহাস্থানগড়ের হাজার বছরের উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এলো সেই সঙ্গে প্রত্ন অঞ্চল হিসেবে মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেল। এতে পর্যটকদের কাছেও মহাস্থানগড়ের আকর্ষণ অনেক বৃদ্ধি পাবে।

অথচ উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করা এদেশে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাধর সংস্কৃতি-মুর্খ, নীতিহীন সুবিধাবাদী আর লোভী মানুষের হাতে প্রত্নস্থল ও প্রত্নসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে এসব তস্করবৃত্তির অপরাধে প্রত্ন আইনে দণ্ডের বিধান থাকলেও আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যায় অপরাধীরা। প্রত্ন অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চললেও প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র, শিক্ষক, মিডিয়া কর্মী, সুশীল সমাজের দু’একজন আর পরিবেশবাদী সংগঠন প্রতিবাদ করে। প্রতিবিধানের জন্য কখনো কখনো আদালতও এগিয়ে আসে। তবে প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই সংখ্যাটি নিতান্তই ছোট। অথচ নিজ ঐতিহ্য রক্ষায় যেভাবে সরব হওয়ার কথা ছিল ইতিহাসবিদ, ইতিহাসের শিক্ষক ছাত্রের, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক সমিতি সংগঠনগুলোর পরিচালকদের আর দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্কৃতি কর্মীদের তেমনটি দেখা যাচ্ছে না।

তবে কি প্রত্ন সংস্কৃতির গুরুত্ব সকলের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে? অদ্ভুত শোনালেও প্রশ্নটিকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রত্নতত্ত্ব চর্চার বয়স তিন দশকের বেশি নয়। একারণে শিক্ষিত দায়িত্বশীল অনেকের মধ্যে এখনো প্রত্নতত্ত্ব ও প্রত্ন ঐতিহ্যের গভীরতা বোঝায় অস্পষ্টতা রয়েছে। ইতিহাস বোধটাও কি খুব স্পষ্ট হয়েছে? ডাক্তারি বিদ্যার মত ইতিহাস যে একটি বিশেষায়িত বিষয় সেভাবে কি আমরা সব সময় ভেবে থাকি? চোখের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কি হার্টের চিকিত্সা করবেন? আধুনিক যুগপর্বের সামাজিক রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ শিক্ষক কি (ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা বা তাম্রলিপির ক্লাসে বক্তৃতা করবেন? অথবা মধ্যযুগের আরবি ফারসি শিলালিপি ও মুদ্রা বিশ্লেষণ করে বা পোড়ামাটির শিল্প কিংবা মূর্তিতত্ত্ব বিচার করে ইতিহাস নির্মাণ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে? প্রত্ন অঞ্চলের সংকট আর অরাজকতা অনুসন্ধান এবং প্রস্তাবনা করার দায়িত্ব কোন পাত্রে অর্পণ করা উচিত তা কি আমরা ভেবে দেখি? কিন্তু এদেশে সবই হয়। পরিচিত এবং ক্ষমতাবান ইতিহাসবিদ বা সাংস্কৃতিক কর্মী হলেই হলো, জাত বিচার না করে বিশেষায়িত বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে ফেলি। দায়িত্বশীল অনেকে দেশের প্রতি ভালোবাসার আবেগে প্রত্নসম্পদ রক্ষার পথঘাট না বুঝে বড় বড় সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেন। তাতে চোখের মলম পায়ের ঘায়ে লাগানোর মত বিড়ম্বনা তৈরি হয়। আর এর ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে এখন।

প্রত্নবস্তু যে একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রমাণ্য দলিল একথা সকলেই মানবেন। অথচ লালবাগ দুর্গের জায়গা দখল করে ভূমিদস্যুরা ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে, প্রত্নআইন লঙ্ঘন করে দুর্গের অভ্যন্তরে স্যুটিং হচ্ছে, মাজারের দোহাই দিয়ে ক্ষমতাবানরা মহাস্থানগড়ে আড়াই হাজার বছর আগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গুঁড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। অথচ দেশে বড়-বড় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো পালন করে অমার্জিত নীরবতা। সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে ঘোষিত মহাস্থানগড়ে বছর কয়েক আগে মাজার কমিটির তত্ত্বাবধানে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে  প্রত্নআইনের তোয়াক্কা না করে পূর্বপুরুষের গড়া হাজার বছরের সংস্কৃতির পাঁজরে গাঁইতি শাবলের আঘাত পড়েছিল। মহাস্থানগড় প্রত্নস্থলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কাস্টুডিয়ান তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে অবৈধ তত্পরতায় ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে বলায় এবং সাংবাদিকদের কাছে অপতত্পরতার কথা প্রকাশ করায় মাজার কমিটি তথা স্থানীয় সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিধায়কদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ হুমকির মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল।

প্রত্নতত্ত্ব অনেক বেশি বিজ্ঞানমনস্ক বিশেষায়িত বিষয়। এ অঞ্চলের সংকট অনুধাবন আর মোচনে ভূমিকা রাখার কথা প্রত্নতত্ত্ববিদদের। নিদেনপক্ষে প্রাচীন ও মধ্যযুগের শিল্পকলা বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদ ছাড়া এ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা সহজ নয়। কিন্তু দায়িত্বশীলদের আচরণে বা নীতি নির্ধারণে বোঝা যায় না এই সত্য বোঝার দায় কারো আছে। আশার কথা আমাদের প্রত্নসম্পদ রক্ষার জন্য অনন্যোপায় হয়ে সুশীল সমাজের দু’একজন আদালতের দ্বারস্থ হয়ে লালবাগ দুর্গ ও মহাস্থানগড়ের সমূহ ধ্বংসযজ্ঞকে ঠেকাতে পেরেছেন। তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা থাকবে। আদালত এসব অভিযোগ তাত্ক্ষণিক বিবেচনায় এনেছে, কখনো স্বপ্রণোদিত হয়ে যোগ্য রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে মাঝে মাছে কিছু বিস্ময়কর বিষয়ও চোখে পড়ে।

 

মহাস্থানগড়ের সংকট নিয়ে যখন লেখালেখি আর প্রতিবাদ হচ্ছিল তখন সংকট নিরূপণ ও দিকনির্দেশনা পাওয়ার জন্য ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে দিয়েছিলেন মহামান্য আদালত। যদিও বিশেষজ্ঞ মহলের কাছে এই কমিটিকে বিশেষায়িত অঞ্চলে প্রায় বিশেষজ্ঞহীন কমিটি বলে মনে হয়েছে তবুও আদালতের ইচ্ছে ও আন্তরিকতাকে সাধুবাদ জানাতে হয়। কমিটির বর্ণনা দিতে গিয়ে সকল কাগজেই তদন্ত কমিটিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল।’ অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অমন কোনো বিভাগ নেই। আসলে তথ্য বিভ্রাট সব অঞ্চলেই সংকট তৈরি করে। এসব বিভ্রান্তি আর সংকট থেকে বের হওয়া জরুরি। আমরা যদি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাই। ঐতিহ্য চর্চার মধ্যদিয়ে জাতিকে এগিয়ে নিতে চাই, নতুন প্রজন্মকে প্রাণিত করতে চাই তবে বুক দিয়ে আগলে রাখতে হবে প্রত্নসম্পদ। আমাদের দেশের বাস্তবতায় বলতে হবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্থানীয় প্রশাসনের বিধায়করা যদি প্রত্ন-ঐতিহ্যের গুরুত্ব বোঝেন দেশের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থাকে তবে প্রত্নক্ষেত্র রক্ষা পাওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। আর উল্টোটি হলে কি সংকট দৃশ্যমান হয় মহাস্থানগড় এর প্রমাণ

১৯৯৪-এর কথা স্মরণ করা যেতে পারে। মহাস্থানগড়ে শাহ সুলতান বলখি মাহিসওয়ারের মাজার সংলগ্ন মোগল মসজিদটি ভেঙে আধুনিক মসজিদ বানানোর উদ্যোগে সে সময়ের জেলা প্রশাসক অগ্রণী হয়েছিলেন। সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের প্রবল আপত্তির মুখেও ক্ষমতাবান জেলা প্রশাসক মাজার কমিটির সাথে একাট্টা হয়ে স্মৃতি হিসেবে একটি গম্বুজ রেখে আধুনিক ঝকঝকে মসজিদ বানিয়েছিলেন। যে কারণে আজ আদালত মসজিদ সরিয়ে নেয়ার কথা যতই বলুক না কেন তা কার্যকর করা কঠিন।

আমাদের ধারণা সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণার মাহাত্ম্য আছে বলে বোধহয় মহাস্থানগড় রক্ষা পেতে পারে। একই মনোযোগ অন্য প্রত্নস্থানগুলোর ওপরও দেয়া অনিবার্য। তবে প্রকৃত বিশেষজ্ঞ সম্পৃক্ত না হলে প্রত্নস্থল রক্ষা করা কঠিন।

 

 লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71