শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
মুক্তিযুদ্ধেরকাল পুরুষ: বিধুবাবু
প্রকাশ: ১১:৪৫ pm ২৩-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ১১:৪৫ pm ২৩-১২-২০১৬
 
 
 


রত্নদীপ দাস রাজু: দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন- “এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি পুরুষ, কালজয়ী ব্যাক্তিত্ব, প্রখ্যাত সমাজসেবক, নবীগঞ্জের এক সময়ের জমিদার ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা প্রয়াত শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত (বিধুবাবুর) মৃত্যুতে আমরা সেই কথাটি পুণঃরুচ্চারণ করতে পারি। তিনি আজ আমাদের মধ্যে স্বশরীরে নেই, কোন দিনই আর থাকবেন না। কিন্তু তাঁর যে প্রাণের মৃত্যু নেই, সেই প্রাণ আমাদের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকবে। অক্ষয় হয়ে রবে অনন্তকাল।

শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত বা (ঝ.চ. উধংমধঢ়ঃধ) পোষাকী নাম। তবে বৃহত্তর সিলেটবাসী, আত্মীয়-শুভাকাঙ্খী এবং কিছু প্রবাসীদের কাছে তিনি “জমিদার বিধুবাবু” বা “বিধুবাবু” নামেই অতি পরিচিত। কীর্তিমান এ পুরুষ ১৯২৭ সালের ২৭ মে অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার নবীগঞ্জ থানার গুজাখাইড় গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন (যদিও তাঁর জন্মস্থান মনিপুর রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলে পিতার কর্মস্থলে)। তাঁর পিতা জমিদার সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মাতা গুরুকুমারী দাশগুপ্ত। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এফ.এ. (বর্তমানে আই.এ) পাশ করে মনিপুর রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলে সেনাবাহিনীতে কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন। পিতামহ জমিদার হরনাথ দাশগুপ্ত, প্রপিতামহ জমিদার গুপীনাথ দাশগুপ্ত এডভোকেট (তৎকালে নবীগঞ্জে মুন্সেফ কোর্ট ছিল, তিনি মুন্সেফ কোর্টে প্রেক্টিস করতেন)। এডভোকেট গুপীনাথ দাশগুপ্ত’র পিতা জমিদার রামনাথ দাশগুপ্ত আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে জমিদারির গুড়াপত্তন করেন। বিধুবাবু ৫ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে সপ্তম। বিধুবাবু বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন  দুঃসাহসী, জেদী, স্বাধীনচেতা, মেধাবী ও উন্নত রুচির আধিকারী। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের অনুসারী। তিনি নবীগঞ্জ জে.কে. উচ্চবিদ্যালয়ে এক বছর পড়াশোনা করে ভর্তি হন সিলেট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে, সেখান থেকে এন্ট্রাস, সিলেট এমসি কলেজ থেকে আই.এ. হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করার পর কলকাতা রিপন কলেজ  থেকে পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন বিদেশি বিমান সংস্থায় চাকুরি করেন। “কলকাতা রিডিং ক্লাব” থেকে ঘোড়া দৌড় প্রশিক্ষন এবং “কলকাতা সুটিং ক্লাব” থেকে বন্দুক চালানুর প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। মাহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উজ্জ্বীবিত হয়ে সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেটে যোগদানের জন্য তারিখ  নির্ধারিত হওয়ার পর বাড়িতে মা-বাবার আশীর্বাদ নিতে আসলে বাড়ীতে ভয়াবহ ডাকাতি, অত:পর পিতৃবিয়োগের কারনে গ্রামেই থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। জীবনাচারে তিনি ছিলেন এক অনন্য সামন্ত, সজ্জন, শৌখিন, মানবদরদী ও ন্যায়পরায়ন। আবার উন্নত ব্যক্তি চেতনা ও মানসিকতার পরিচয় ঘটে তাঁর বৃহত্তর ফুলের বাগান, বিভিন্ন প্রজাতির পশু-পাখি পালন, রবীন্দ্র সংঙ্গীতে ভাব এবং বহু বিচিত্র বইপড়া ও সংগ্রহ শালায়। যাতায়াতের জন্য তৎকালীন সময়ে গাড়ির যোগাযোগ না থাকায় তিনি রাজকীয় ঘোড়ায় ছড়েই সর্বত্র যাতায়াত করতেন। এর জন্য প্রতি ৩/৪ বছর  পরপর আমদানী করতেন বিদেশ থেকে উন্নত প্রজাতির ত্যাজী ঘোড়া। পড়তেন সাদা শার্টের সাথে কালো বা মানান সই প্যান্ট, মাথায় সাহেবী ক্যাপ, পায়ে সু, চোখে কখনো বা সানগ্লাস, পিঠে ঝোলত দু-নলা বন্দুক, মুখে কখনো কখনো শোভাপেত কালো পাইপ। রাজকীয় ঘোড়ার উপর সওয়ার করা সুদর্শন বিধুবাবুকে তখন নেতাজী সুভাষ বসু কিংবা মোগল সেনাপতি মানসিংহের মতই মনে হতো। ব্যক্তিত্বের প্রখড়তা ও জ্ঞানের অসাধারণ গভীরতার জন্য সবাই তাঁকে মান্য করতো। জমিদারী প্রথার অবসান হলেও নবীগঞ্জবাসী সহ আশেপাশের উপজেলার মানুষ তাঁকে জমিদার হিসেবে মান্য করতো। তাঁর চমৎকার ব্যবহার, সম্মোহনী ক্ষমতা ও মন্ত্রমুগ্ধ কথার মোহনযাদুতে যে কেউ তাঁর ভক্তে পরিনত হতো। তাঁর সৎসাহস, জ্ঞান-বুদ্ধি, উদারতা, পরোপকারীতা, জনসেবা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষনতা ও চিরকুমার জীবনাচার তাঁকে করেছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তি পুরুষ।

অবিভক্ত বৃটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের কংগ্রেস কমিটির অন্যতম সদস্য বিধুবাবু দেশ বিভাগের পর ফিরে আসেন নিজ গ্রামে বেছে নেন কৃষি ভিত্তিক জীবন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে পূর্ব বাংলায় স্বাধীকারের চেতনায় ক্রমাগত জ্বলে ওঠে, এরপর  ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী-মুজিব এর নেতৃত্বে তিনি যুক্তফ্রন্টের  পক্ষে তৃণমূলে ব্যাপক কাজ করেন। মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর সাথে সেই সময়েই আদর্শিক সম্পর্ক থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে । নবীগঞ্জে তখনকার সময়ে তিনিই ছিলেন মূল নেতৃত্বে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো তাঁরই নির্দেশে। পাকিস্তান আমলে (আনুমানিক১৯৬৪ সালে) প্রথম নবীগঞ্জ থানার আওয়ামীলীগের কমিটি গঠিত হলে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। ব্যক্তিগত অনিচ্ছা থাকা সওে¦ও নবীগঞ্জবাসী তাঁকে ১৯৬৫ সালে নির্বাচিত করে নবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। জনপ্রতিনিধি  হিসেবে তিনি বহু সংখ্যক নতুন রাস্তা, ব্রীজ, কালভার্ট নির্মান, বাজার বসানো সহ নবীগঞ্জে বিভিন্ন প্রতিষ্টান নির্মান করে নবীগঞ্জকে অধুনিকায়ন করতে যেমন ভূমিকা রাখেন, তেমনি বড় বড় বিরোধ নিষ্পত্তি করে স্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। জাটিল ও সময় সাপেক্ষ মামলা মোকাদ্দমা কোর্টে যেতে না দিয়ে সুষ্ট ও চিরস্থায়ী সমাধান করে দিতেন অনায়াসে। শুধু নবীগঞ্জ নয়, অত্র অঞ্চলের বিচার সালিশে তিনিই ছিলেন প্রাধান বিচারক। এছাড়া বিধুবাবু তাঁর সময়ে বর্তমান নবীগঞ্জ উপজেলা অডিটারিয়াম, ইউ.এন.ও সরকারী বাসভবন, সহ তৎকালীন সি.ও অফিসের বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মান করেন। এছাড়া তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৬৫/৬৬ সালে নবীগঞ্জে প্রথম নবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন অফিসের সামনে ইউনাইটেড ব্যাংক লি: স্থাপিত হয়। যেটা ছিলো নবীগঞ্জের সর্ব প্রথম ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রথম একাউন্টছিলো বিধুবাবুর। এর প্রথম এমাউন্টছিলো ১০,০০১/- টাকা। একটা সময়তিনি নিজে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর পৈত্রিক “কৃষি খামার”-এ আধুনিক পদ্ধতিতে অধিক ফসল ফলানোর ব্রত নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। বৃহত্তর সিলেট জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন তাঁর “কৃষি খামার” দেখতে ও জানতে আসতেন।গ্রামাঞ্চলে কৃষিতে উন্নয়নের জন্য তিনি পাকিস্তান আমলে“শ্রেষ্ট কৃষক” এর সম্মাননা পান। তিনি ১৯৬৫ সালে নবীগঞ্জে প্রথম পাওয়ার টিলার মেশিন তাঁর খামারের জন্য এনেছিলেন।

৬৬’র ছয়দফা ও ৬৯’র গনআন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তৎকালে নবীগঞ্জে তিনিই ছিলেন আওয়ামীলীগের প্রাণপুরুষ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের ‘নবীগঞ্জ’ আসনে আওয়ামীলীগ থেকে মনোনিত করা হলেও তিনি নির্বাচনে নিস্পৃহ ছিলেন। নির্বাচন না করলেও আওয়ামীলীগ প্রার্থীর সাথেই ছিলেন, অন্য অনেকের মতো দু’নৌকায় পা রাখেন নি। ৭১-এ পাক-সেনারা হবিগঞ্জে ঘাঠি গড়লেও তিনি বিচলিত হননি। চেয়ে ছিলেন সবাইকে নিয়ে শান্তি বজায় রেখে একত্রে থাকতে। এরই মধ্যে নবীগঞ্জ থানা পুলিশ নবীগঞ্জের সকল লাইন্সেস কৃত বন্দুক জব্দ করলে তাঁর বন্দুকও জব্দ করা হয়। স্থাণীয় ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনিক সকল পর্যায়ের কর্মকর্তার সাথে ছিল তাঁর উঠাবসা। তিনি জানালেন- “মরতে হয় এ দেশেই মরব, দেশ ছেড়ে যাব না। জীবনের নিরাপত্তা চাই।” এরই মধ্যে তাঁর জব্দকৃত বন্দুক ফেরৎ পান। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার কাজ। ২/৩ এপ্রিল মেজর সি. আর দত্ত কর্তৃক সংগঠিত শেরপুর-সাদিপুরের যুদ্ধে তাঁর বন্দুক, দেশিয় অস্ত্র সহ শত শত লোক নিয়ে ভূমিকা রাখেন। নির্বাচিত হন নবীগঞ্জ থানা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক। ছাত্র, যুবক, কৃষকদের সংগঠিত করে অবসর প্রাপ্ত আনসার ও পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে গঠন করেন নবীগঞ্জের সর্ব প্রথম মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড। এই সংবাদ গুলি নবীগঞ্জ শান্তি কমিটির মাধ্যমে পাক-বাহিনীর দৃষ্টিগোচর হলে হবিগঞ্জের দায়িত্বে থাকা পাক-মেজর ইউসুফ দুররানী তাঁকে সেনাক্যাম্পে আসার আমন্ত্রন জানায়। নবীগঞ্জের নেতৃত্ব স্থানীয় লোকজন, শুভাকাঙ্খী সবাই সেদিন তাঁকে সেনা কেম্পে যেতে বাধা দেন। কারণ সেনাক্যাম্পে যাওয়ার অর্থ আর ফিরে না আসা। যারা ফিরে আসেন তারা শান্তি কমিটির  নেতা হয়ে। কিন্তু অসীম সাহসের অধিকারী বিধুবাবু  সেনা কেম্পে যান তাঁর স্বভাব সুলভ ভাবে বন্দুক ঝুলিয়ে ঘুড়ায় চড়ে। সেখানে মেজর ইউসুফ দুররানীর সাথে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর তাঁর ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা ও সাহসীকতায় তাঁকে ধন্যবাদের সহিত বিদায় জানালে তিনি নবীগঞ্জ ফিরেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে একজন হিন্দুলোক হয়েও এই রূপ সাহসীকতা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব বিস্তারে নবীগঞ্জের শান্তি কমিটির সেক্রেটারী আব্দুর রহমান হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরছিল। বিধুবাবুর সাথে ছিল তার অহি-নকুল সম্পর্ক। কিন্তু বিধুবাবুর সাহসীকতা, জনবল ও দুরদর্শিতার সাথে কোন ভাবেই পেরে উঠছিল না। সব সময় নিতে হয়েছে পরাজয়ের স্বাদ। শান্তি কমিটির নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরও নবীগঞ্জ-হবিগঞ্জের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে সু-সম্পর্ক থাকার কারণে পেরে উঠছিল না। এমনকি পাকিস্তানী মেজর ইউসুফ দুররানীকে কথার মোহনযাদুতে বশ করার ঘটনা তার বুকে লোহার শলাকার মতো বিঁধ ছিল। প্রতিদিন বিধুবাবুর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে কর্তৃপক্ষকে বিষিয়ে তুলেও পেরে উঠছিল না। কিন্তু নবীগঞ্জ থানার ওসি বদলি হয়ে যখন আব্দুল মালেক যোগদান করে, তখন এখানকার পরিবেশ বুঝে উঠার পূর্বেই ওসিকে আব্দুর রহমান প্রভাবিত করলে ওসিও বাবুর বিরোদ্ধাচরণে যোগ দেয়।এদিকে ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ সেনাক্যাম্পে বার্তা আসে যে, একজন প্রভাবশালী হিন্দু লোককে স্বশস্ত্র ভাবে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ হয়নি। তাঁকে দেশদ্রোহিতার মামলা দিয়ে থানায় জীবিত বা মৃত ধরে আনতে নির্দেশ দিতে। পাকিস্তান সরকারের বিরোদ্ধে ষড়যন্ত্র ও দেশদ্রোহীতার কারণে নবীগঞ্জের ৩৬০ জনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হয়, যার প্রধান আসামী বিধুবাবু। তাঁকে দেখা মাত্র গুলি করারও নির্দেশ ছিল। জুন মাসের প্রথমার্ধে একদিন এক এস.আই এর নেতৃত্বে মোট চার জন পুলিশ সকাল বেলা উপস্থিত হয় গুজাখাইড় গ্রামের বাবুর বাড়ীতে। বাবু তখনো ঘুম থেকে উঠেন নি। পুলিশ বাড়ীর গেইটে আসা মাত্র প্রহরী ও বাবুর বিশ্বস্ত লোক প্রমোদ নমঃশুদ্র বাবুকে পুলিশ আসার খবর দিলে বাবু পুলিশদের বাংলোতে বসিয়ে মূল ঘরের দিকে হেটে আসছেন, এরই মধ্যে পুলিশ তাঁকে পিছন থেকে লক্ষ্য করে গুলি ছুরলে মূল ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ানো প্রমোদ এ দৃশ্য দেখেই বাবুকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলতে গিয়ে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়। বাবুও সহসা দেওয়ালের ভেতর বন্দুকের বক্সের ক্লিপ টিপে বন্দুক হাতে নিয়েই এক শটে তিন পুলিশকে হত্যা করেন। একজন কোনো রকম প্রান নিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশের সাথে ক্রসফায়ারে পড়ে বাবুর বিশ্বস্ত সহকারী অমূল্য চন্দ্র দাশ ও প্রমোদ নমঃশুদ্র মৃত্যুবরণ করেন। সমস্ত এলাকায় এ খবর ছড়িয়ে পরলে শুভাকাঙ্খীরা বাড়িতে জড় হয়ে বাবুকে অনুরোধ, মিনতী করে বাড়ী থেকে অন্যত্র যাওয়ার জন্য। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত কিছুতেই তিনি বাড়ী ছেড়ে বা এলাকা ছেড়ে যাবেন না। অবশেষে সবার অনুরোধে গ্রামবাসীকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত করে বিকাল বেলা সব কিছুকে পিছনে ফেলে এক কাপড়ে পাড়ি জমান মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে। সেই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর দেশের প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয় (শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী ছিলেন তাঁর বড় বোন কবিগুরুর ছাত্রী কালীপ্রভা দাশগুপ্ত’র সহপাঠী)। শিলং-এ ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা জেনারেল গুরু বক্স সিং, কর্নেল গীল, মেজর বক্সী ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ হয়। জেনারেল গুরু বক্স সিং তাঁকে ৫নং সেক্টরের বালাট ও টেকারঘাট সাব-সেক্টরের প্রধান সমন্বয়ক করে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। লড়াইয়ের সুবিধার জন্য মুজিবনগর সরকার কর্তৃক সেক্টরগুলো পুনঃর্গঠিত করার পূর্ব পর্যন্ত  বৃহত্তর সিলেট জেলার উত্তরাঞ্চল অর্থাৎ লাতু-আট গ্রাম থেকে শুরুকরে জৈন্তাপুর, রাধানগর, সিলেট, ছাতক, টেকারঘাট, সুনামগঞ্জ এবং তাহিরপুর পর্যন্ত বিস্তৃীর্ণ হাওড় এলাকায় যাঁরা নেতৃত্ব দান করেছিলেন তাঁদের মধ্যে তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য ব্যরিষ্টার শওকত আলী, মাহফুজ ভূইয়া, বিধুবাবু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন অন্যতম । তাঁর নেতৃত্বে ৫নং সেক্টরের অনেক গুলি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন সংগঠিত হয়। পাশাপাশি নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, দিরাই সহ ভাটী অঞ্চলে এদেশিয় ভদ্রলোকের মুখোশপড়া, সুযোগ সন্ধানী, ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ও রাজাকার কর্তৃক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়ীঘর লুন্টন, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষন সহ বিভিন্ন অপকর্ম প্রতিহত করেন। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অপারেশনের বিবরন সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করছি।

নবীগঞ্জ : অগাষ্ট মাসে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নবীগঞ্জ আক্রমন করে পাক-সেনা ও রাজাকার মুক্ত করবেন। ৬২ জনের একটি দল নিয়ে টেকারঘাট থেকে হরিনাকান্দি হয়ে জগন্নাথপুর থানা হয়ে নবীগঞ্জের মাধবপুর গ্রামের মহাজন বাড়ীতে ১০/১১ আগষ্ট আনুমানিক রাত ০১.৩০ টায় এসে আশ্রয় নেন। এ সময় তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন আজিজুর রহমান চৌধুরী (ছুরুক মিয়া) (সাবেক চেয়ারম্যান, বড়ভাকৈর) ও মহেন্দ্র কুমার দাশ রায় (সাবেক সরপঞ্চ, জগন্নাথপুর)। মহাজন বাড়ীর বিশাল অট্টালিকায় তাঁদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ীর মালিক সুধীর চন্দ্র দাশ মাষ্টারের সাথে বাবুর আন্তরিক সম্পর্কের কারণে। ৬২জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করেন, কিন্তু গুমাক্ষরে হলেও গ্রামবাসীর কাছে তা অজানাই ছিল। গোয়েন্ধা লাগিয়ে নবীগঞ্জের সংবাদ সংগ্রহ করেন। ৩ দিন, ৩ রাত সেখানে অবস্থান করার পর ১৩ আগষ্ট দিবাগত রাত ১১.০০/১২.০০টায় দিকে পাঁচটি গোস্তী নৌকা যোগে তাঁরা নবীগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মহেন্দ্র কুমার ও ছুরুক মিয়া বয়স্ক বিধায় মহাজন বাড়ীতে রয়ে যান। বাড়ীর নিরাপত্তা রক্ষায় দুইজন মুক্তিযোদ্ধাও রেকি যান। বিধুবাবুর নেতৃত্বে বিশাল মুক্তিফৌজ রাত ০২.০০/৩.০০ টায় নবীগঞ্জ পৌঁছে। সেদিন অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন সুবেদার রইছ উদ্দিন, সুবেদার আব্দুল আজিজ, পাইলট জহুরুল ইসলাম প্রমূখ। ২টা নৌকা থানার পিছনে রাজাবাদের নিকটে, ১টি শিবপাশার পুলের নিকট (বর্তমান শুভেচ্ছা কমিউনিটি সেন্টারের পাশে), ১টি নৌকা হাইস্কুলে মাঠের পূর্বে (বর্তমান টেকাদিঘীর মার্কেটের কাছে), ১টি নৌকা নবীগঞ্জ পূর্ব বাজারের উত্তরের ঘাটে (বর্তমান ডাক্তার সফিকুর রহমান এর বাসার নিকট) অবস্থান করে  বাজার ও থানাকে চার দিকে ঘেরাও করা হয়। রাত অনুমানিক ৩.৩০/৪.০০ টায় দিকে আক্রমন শুরু হয়। শুরুর দিকে স্থানীয় রাজাকার বাহিনী ও থানা পুলিশ এক হয়ে আক্রমন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কিছুক্ষন পর কয়েক জন পালিয়ে গেলে বাকীদের ধরে ফেলা হয়। ৩০-৪৫ মিনিট পর থানা পুলিশ আত্মসমর্পন করে। কাক ডাকা ভোরেই অপারেশন সমাপ্ত হয়। ক্রসফায়ার চলাকালে নবীগঞ্জ শান্তি কমিটির সেক্রেটারী আব্দুর রহমান নবীগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পুকুরে পড়ে সাঁতরে পালিয়ে যাওয়ার সময় হাতে গুলিবিদ্ধ হয় ও  সি.ও অফিসের একজন পিয়ন মারা যায়। নবীগঞ্জে তখন মুক্তিবাহিনীকে প্রতিরোধ করার মতো আর কোন শক্তি ছিল না। পুলিশদের সমস্ত অস্ত্র বিধুবাবুর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের কাছে নিয়ে  আসলে  মুক্তিবাহিনীর প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করে। সূর্য যখন লাল আভা নিয়ে পূর্ব আকাশে উদীয়মান সেই সময় অর্থাৎ ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে তিনি নবীগঞ্জ থানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। নবীগঞ্জ বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত শাখা-বরাক নদীতে উপস্থিত নৌকার মাঝি-মাল্লা, বাজারের দোকানী আশে পাশের গ্রামগুলো সহ সর্বত্র সবার সুখে বিধুবাবুর সাহসীকতা ও আক্রমন নিয়ে আলোচনা জোয়ার। ধরা পড়া রাজাকার ও পুলিশদের সেদিন হাতের কাছে পেয়েও  তিনি তাদের হত্যা করেননি। পাক-সেনাদের সহযোগীতা না করার পরামর্শ দিয়ে চলে যান গুজাখাইড় নিজ বাড়ীতে। সেখানে নবীগঞ্জের স্থানীয় যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুত করার জন্য ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। তিন দিন প্রশিক্ষনের পর তিনি সঙ্গীয় মুক্তিবাহিনী নিয়ে চলে যান টেকারঘাট। কিন্তু চুরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। মীরজাফরের উত্তরসূরী দুরর্বৃত্তরা সেদিন বিধুবাবুর সরলতাকে কাজে লাগিয়ে হবিগঞ্জে গিয়ে পাক-সেনাদের নিয়ে আসে। সরিষপুর থেকে পায়ে হেটে নবীগঞ্জে বিকাল বেলা পৌঁছেই বাজারে গনহত্যা ও হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্টান ধ্বংশ করে। পূর্ববাংলার তিনটি ঐতিহ্য রথের একটি নবীগঞ্জ গোবিন্দ জিউড় আখড়ার রথ আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয় কালীবাড়ী (বর্তমান ডাক বাংলো ও থানার মধ্যবর্তী যা এখনো উদ্ধার হয়নি) ও কানাই লাল জিউড় আখড়া। কালীবাড়ীর সেবক সুরেশ চক্রবর্তীকে গুলিকরে শাখা-বরাক নদীতে ভাসিয়ে দেয়। ব্যবসায়ী, পূজারী ও অসংখ্যাক নিরীহ লোককে হত্যা করে। গুজাখাইড়, গয়াহরি, দওগ্রাম, জন্তরী, কাগাপাশা, নজীপুর, সেকান্দপুর,  গুগড়াপুর সহ বানিয়াচং-নবীগঞ্জের অসংখ্যাক গ্রামের হিন্দুদের বাড়ী-ঘর পুড়িয়ে, নিরীহ লোককে হত্যা করে। বিধুবাবু’র বাড়ীতে ২৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী “গুপীনাথ ভবন” লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করে এবং বাড়ী’র মন্দির আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে নবীগঞ্জ শান্তি কমিটির নেতা আব্দুর রহমানের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী। তাছাড়া নবীগঞ্জে ৭১-এ সংগঠিত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়ীঘর লুন্টন, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষন সহ সমস্ত নারকীয় হত্যা যজ্ঞের নেতৃত্বদেয় নবীগঞ্জ শান্তি কমিটির আহবায়ক মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল (রাইয়াপুর), সেক্রেটারী আব্দুর রহমান (গুজাখাইড়), মোশাহিদ মিয়া (রাইয়াপুর), আব্দুল মালিক (পশ্চিম জাহিদপুর) প্রমুখ। বিধুবাবুর মধ্যে মানবিকতা, ক্ষমা ও মহানুভবতার যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায় তা নিঃসন্দেহে অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত  হয়ে থাকবে। যে রাজাকারের নির্দেশে তাঁর বাড়ীঘর ধ্বংস হলো, কোটিটাকার ধন-সম্পদ লুণ্ঠিত হলো, তাঁর সম্প্রদায়ের শত শত লোকের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে ছাঁই করে দেওয়া হলো, সেই রাজাকারকে যুদ্ধের পর হাতের মুঠোয় পেয়েও নিজেতো কিছুই করলেন না, এমনকি উপস্থিত শত শত লোক যাঁরা এই রাজাকারের অত্যাচার ও নির্যাতনে নানাভাবে ক্ষকিগ্রস্থ হয়েছিল তাদেরকেও কিছুই করতে দিলেননা; বরং তিনি নিজে পাহাড়া দিয়ে ঐ রাজাকারকে নবীগঞ্জ থানায় সোপর্দ করলেন। প্রতিহিংসা পরায়নতা থেকে এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে মুক্ত রেখে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা কতজনের পক্ষে সম্ভব? মানবিকতার এমন উজ্জল দৃষ্টান্ত বিরল।

নভেম্বর মাসের আনুমানিক ১৫/১৬ তারিক বিধুবাবু পুন:রায় মুক্তিবাহিনী নিয়ে নবীগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। দেশের ভিতরে অবস্থান করেন নবীগঞ্জের বড় ভাখৈর গ্রামের আজিজুর রহমান চৌধুরী (ছুরুক মিয়া) চেয়ারম্যানের বাড়ীতে। ভোর বেলা নবীগঞ্জ প্রবেশ করে পাক বাহিনীর নিয়ন্ত্রনে থাকা থানা পুলিশকে তাদের কাছে আতসমর্পন করার ঘোষনা দেন। পুলিশ আত্মসমর্পণ না করে আক্রমন করলে মুক্তিবাহিনী পাল্টা আক্রমন চালায়। কিছু সময় পরই পুলিশ আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। বিধুবাবুর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা সকল পুলিশকে বেঁধে নবীগঞ্জ ত্যাগ করে চলে যান টেকারঘাট।

বানিয়াচং : বাংলাবর্ষের ভাদ্রমাস, তখন বানিয়াচং সদরে রাজাকারের শক্ত ঘাটি হওয়াতে তাঁদের দৌরাত্যও আত্যাধিক। এই রাজাকাররা এহেন কোন অপকর্ম নেই যা তারা করেনি। এই অবস্থার উপর ভিত্তিকরে বিধুবাবু সিদ্ধান্ত নিলেন বানিয়াচং অপারেশন করেন। ভাদ্রমাসের প্রথম দিকেই (বুধবার ১২ টার দিকে) গোয়েন্দা লাগিয়ে সংবাদ সরবরাহ করেন। দাশ পার্টির কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাশ’র গ্রুপ, কমান্ডার আতাউর রহমান (দিরাই) সহ প্রায় ৫০ জনের একটি দল নিয়ে আক্রমন করেন। আক্রমনের সাতে সাথেই তাদের প্রতিরোধ সুযোগ না দিয়ে ৫২জন  রাজাকারকে রাইফের সহ আটক করেন। একজন রাইফেল ফেলে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। রাজাকারদের ধরে নিয়ে আসেন টেকারঘাট। এদিকে বানিয়াচং জুড়ে আকাশে-বাতাস ধ্বনিত হচ্ছে বিধুবাবু’র নাম। বানিয়াচং শতভাগ সকল এ অপারেসনের পর পাক-বাহিনীর ভীত কেঁপে ওঠে। টেকারঘাট রাজাকারদের নিয়ে আসার পর তিনি তাঁদের মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করেন।

দিরাই : টেকারঘাট সাব-সেন্টারের কমান্ডার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত  ও প্রধান সমন্বয়ক বিধুবাবু অগাষ্ট মাসের কোন এক সময়ে দিরাই থানা আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন। দিরাই থানা তখন পাক-বাহিনীর নিয়ন্ত্রনে। বিধুবাবুর নেতৃত্বে সেই দিন কমান্ডার আতাউর রহমান দিরাই হাই স্কুলরোডে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে, এ.কে.এম জুবায়ের  চৌধুরী সুজানগর রোডে ৩৫ জন নিয়ে বিডিআর কমান্ডার মজিদ চৌধুরী আরও ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর আক্রমন, পাক সেনারাও পাল্টা আক্রমন শুরু করে। টানা তিন দিন তিন রাত বিরামহীন যুদ্ধ চলাকালে মুক্তি বাহিনীর গুলাবারুত শেষ হওয়ায় পাক-বাহিনীরও শেষ হয়েগিয়ে ছিল। মুক্তিবাহিনী সেই দিন বালাট ফিরে যান। অপারেশন সর্ম্পুন সফল না হলেও তিন দিনের বিরামহীন যুদ্ধে দিরাই বাজারের পার্শ্ববর্তি গ্রাম গুলোতে বিধুবাবুর জয়ধ্বনী উড়ছিল।

তারপর একদিন দেশ স্বাধীন হলো। সবাই দেশে ফিরে আসতে লাগলেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধকালে কেউ যুদ্ধে, বাকীরা শরনার্থী শিবিরে ছিলেন। এমতাবস্থায় জনহীন বাড়ী-ঘর লুটপাট করে নেয়ে দেশের ভিতরে থাকা শান্তি কমিটির নেতৃবৃন্দ, রাজাকার-আলবদর ও ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা। দেশে ফিরে এসে প্রায় সকলেই ঘর নেই, চালে টিন নেই; বাড়ীর ধান-চাল, গরু-ছাগর কিছুই নেই। সব লুটপাট হয়ে গেছে। বিধুবাবু নবীগঞ্জ এসেই লুটপাট বাড়ীদের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার জানিয়ে কড়া নির্দেশ দিলেন। বললেন -“লুটের মালপত্র ফিরিয়ে দিতে হবে”। লুটেরারা ভয়ে আতংঙ্খে কোন কোন গ্রামে বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের বাড়ী জমা করতে লাগল। কোন কোন গ্রামে দেখা গেল রাতের আধারে ঘরের কাছে লুকিয়ে মালপত্র দিয়েগেছে। নবীগঞ্জ সদরে ডাক বাংলোতে কয়েক দিন চললো লুটপাটকৃত মালামাল জমা দেওয়া। ইতিমধ্যেই এক প্রভাবশালী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এসে বললেন,-“লুটের মালামাল সবকিছু ফেরৎ দিতে হবে না। হাঁসের মাঝে ডিমটা দিয়ে দাও।” এর পরদিনই লুটের মালামাল ফেরৎ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

যুদ্ধ বিধ্বস্থ নবীগঞ্জ পূর্ণগঠনে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। সেই সময় সরকারী বরাদ্দের পাশাপাশি নিজ তহবীল থেকে আর্থিক সহযোগীতা ও বাড়ীঘর পূর্ণ:নির্মানে সহযোগিতা করেন। হল্যান্ডের একটি সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ হিন্দু জেলেদের বাড়ী নির্মান, বিশেষ বরাদ্ধ প্রদান করেন। ৭২’র প্রথমদিকে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে একান্ত সাক্ষাত করলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেন। তখনো তিনি ব্যক্তিগত আলোচনা রেখে হবিগঞ্জ মহকুমার সরকারী বরাদ্ধ রাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। যুদ্ধত্তরদেশে সারা দেশের ন্যায় নবীগঞ্জে-হবিগঞ্জেও পড়নের কাপড়ের অভাব ছিল ভীষন। তিনি চট্টগ্রাম জাহাজে আসা ইমপোর্টের কাপড় ক্রয় করে নবীগঞ্জ-হবিগঞ্জ এনে কিনা দরে বিক্রয় করেন। এতে করে এই অঞ্চলের কাপড়ের ঘাটতি অনেকটাই কমে যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশে নবীগঞ্জবাসীসহ তাঁর সহযোদ্ধা, ভক্ত, শুভাকাঙ্খী সকলের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের এই কিংবদন্তিকে সরকার বীরত্ব ভূষন খেতাবে ভূষিত করবে। তাঁদের এই  প্রত্যাশা যেমন পূর্ণ হয়নি তেমনি স্বাধীনতার চারদশকেও অধিক সময় অতিবাহিত হলেও তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাঁর জন্ম ও কর্মভূমি নবীগঞ্জে স্মৃতি স্বরূপ কোন কিছু করা হয়নি। সারাদেশে যখন কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে তাঁদের নামানুসারে সড়ক, চত্ত্বর বা প্রতিষ্টানের নামকরনের উদ্যোগ গ্রহন করেন। এক্ষেত্রে বিধুবাবুর প্রতি এই অবহেলা সত্যিই পীড়াদায়ক। বর্তমান প্রজন্ম এ অনুদারতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে চায়। তরুন প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। তরুন প্রজন্মের প্রচেষ্টায় ও বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় হবিগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বধিনায়ক এম.এ.রব স্মরণে এম.এ.রব স্মুতি জাদুঘর ও পাঠাগার এবং মুক্তিযুদ্ধের আরেক কিংবদন্তি কমান্ডেন্ট লতিফুর রহমান চৌধুরী (মানিক চৌধুরী) এর নামে হবিগঞ্জের একটি রাস্থার নামকরণ করা হয়েছে। যা অবশ্যই সরকাররের প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এরই ধারাবাহিকতায় যদি নবীগঞ্জ বিধুবাবুর নামানুসারে একটি স্মৃতিজাদুঘর ও সংগ্রহশালা কিংবা তাঁর গ্রামের বাড়ীর রাস্থা নবীগঞ্জ-বানিয়াচং রোডটি বিধুবাবু রোড বা থানা চত্ত্বর নামকরণ করা হয়, তাহলে কিছুটা হলেও এ দেশপ্রেমিক বীরের প্রতি আমাদের ঋন কিছুটা শোধ হবে। আর তা না হলে জাতির কাছে একটি প্রশ্ন অজানাই থেকে যাবে, বিধুবাবুর মূল্যায়ন কেন হয়নি? আর আমাদের এই বিখ্যাত উক্তিটিও মনে রাখতে হবে যে -“যে দেশে গুণীজনের কদর নাই সে দেশে গুণীজন জন্মায় না।” একজন প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব, জনদরদী জননেতা বিধুবাবু’র প্রসঙ্গে আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগ ও আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

২০০৫ সালের মার্চে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি কলকাতা শহরে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পর পরিবারের অন্যান্যদের অনুরোধে সেখানেই রয়ে যান। দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকার পর গত ৯ মার্চ ২০১৩ ইং শনিবার রাত ১১.০০ মিনিটে ইহলোক ছেড়ে পরলোকে গমন করেন চিরকুমার, প্রজ্ঞাবান এই ব্যক্তিত্ব। অন্যায়ের কাছে তিনি কখনো মাথানত করেননি। আজীবন গণ-মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। জমিদার হয়েও কোন দিন তাঁর কথা বা ব্যবহারে জমিদার সুলভ আচরণ বা অহংকার প্রকাশ পায়নি। তিনি ছিলেন দেশাত্ববোধ ও মানবতাবোধ সম্পন্ন একজন আদর্শ পুরুষ। সমাজচিন্তা, ধর্ম, রাজনীতিসহ জ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তাঁর প্রবেশ ঘটেনি। বিশ্ব রাজনীতি, বিশ্ব সাহিত্য, রবীন্দ্র সাহিত্য ছিল তাঁর নখদর্পনে। বৃহত্তর সিলেটের সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে যে ক’জন প্রথিতযশা গুনী ব্যক্তি জন্ম নিয়েছেন তাঁদের মধ্যে শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত (বিধুবাবু) অন্যতম।

 মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর আদর্শ অন্যের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। বিধুবাবু ছিলেন তেমনই একজন কালজয়ী ব্যক্তিত্ব, যাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, আদর্শে সমুজ্জ্বল হয়ে। মৃত্যুকালে তিনি বড়ভাই, ভাতিজা, ভাতিজিসহ অসংখ্য গুণাগ্রাহী রেখে গেছেন। আজকের দিনে তরুণদের সামনে যখন আদর্শ ব্যাক্তিত্বের অভাব, তখন বিধুবাবুর মতো ব্যাক্তির মৃত্যুতে বিরাট শুন্যতা সৃষ্টি হবে। আর তাঁকে হারানোর ক্ষতি পূরণ হতে পারে, তাঁর মহৎ কর্মময় পথ অনুস্মরণের মধ্যদিয়ে। আমরা নতুন প্রজন্ম তাঁকে যেন দেখে সব সময় উদ্ভোদ্ধ হই, অন্তরে লালন যেন করি সর্বদা তাঁর আদর্শ। আমি তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এবং তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, নবীগঞ্জ উপজেলা শাখা ; প্রতিষ্টাতা ও সভাপতি, কুটিশ্বর দাশ স্মৃতি সাহিত্য পরিষদ, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ; শিক্ষানবীশ আইনজীবী , জজকোর্ট  হবিগঞ্জ ।

 

এইবেলাডটকম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Mr. Helal
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71