বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০
বৃহঃস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
ভারত-চীন সংকট নাকি চীনের নিজের সংকট !
প্রকাশ: ০৯:৫৮ pm ১৭-০৬-২০২০ হালনাগাদ: ০৯:৫৮ pm ১৭-০৬-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


অনিকেত মহাপাত্র 

ভারতের চীনকে নিয়ে সংকট নাকি চীনের নিজের সংকট; এখানেই রয়েছে মূল সূত্র। বিদেশনীতিও কোনো বহিরাগত কিংবা  বি-জাগতিক বিষয় নয়। তাকেও ধরা যায় খাওয়া-মাখার সাধারণ সূত্রে। দেহ যত বাড়ে তাকে নিয়ে সমস্যাও তত বাড়ে। চীন ঠিক এই অবস্থার মধ্যে চলেছে। হংকং নিয়ে এমনিতেই জেরবার হয়ে আছে। হংকং-সমস্যাটি দ্বি-মাত্রিক অভিঘাত এনেছে। প্রথমত.বিশ্বের সামনে চীনের ইমেজ। হংকং নিয়ে চীন যতটা এগিয়েছে, ওখান থেকে ফেরা যায় না এমনটা নয় কিন্তু ফেরাটা মুশকিল। আমেরিকা সহ অন্যান্যদের সঙ্গে এক অদৃশ্য ইগোর লড়াইয়ে পৌঁছে গেছে। দ্বিতীয়ত. হংকং-অচলাবস্থা ঠিক মতো সামলাতে না পারার জন্য রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর প্রতি এক ধরণের অনাস্থা তৈরি হতে শুরু করেছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে। এই দুটি বিষয় ছাড়াও আর একধরণের অসহায়তা কাজ করছে। চীনের পক্ষে তার নিজস্ব মেজাজে অশান্ত জনগণকে সবক শেখানোর পদ্ধতি এখানে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কারণ মূল চীনা ভূখণ্ডের মতো হংকং-কে বিশ্বের কাছে দুর্গম করে রাখা অসম্ভব। কারণ ১৯৯৭ সালের পহেলা জুলাই হংকং স্পেশাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিজিওন বা বিশেষ শাসনাঞ্চল হিসেবে গণ্য হয় চীনা প্রজাতন্ত্রের অন্তর্গত হয়েও এই ক্ষেত্রে ভারসাম্যের সামান্য হেরফের ঘটলে চীনের পক্ষে তা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। 
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর জন্য চীনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়। দেশের এবং পার্টির ভেতরেই তিনি এখন নিরাপত্তাহীনতায়  ভুগছেন। তাই গঠন করে নিয়েছেন একটি নিজস্ব চক্র। বিশ্বস্ত নয়জন রয়েছেন সেই চক্রে, তাঁরাই চালাচ্ছেন দেশ। আর তাঁরা প্রতিনিয়ত আশংকা করছেন এক চীনা বসন্তের। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে সি. সি. পি (চিনা কমিউনিস্ট পার্টি ) -তে পাস হয়ে উঠে গেছে পার্টি ও প্রশাসন উভয় ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন থাকার মেয়াদ বিষয়ের ঊর্ধ্বসীমা সংক্রান্ত নতুন নিয়ম। যা নিয়ে পার্টির ভেতরে ক্ষোভ ধূমায়িত ছিল। অনেকেই চাইতে শুরু করেছেন শি এর অপসারণ। তাদের অনেকের আপত্তি শি-এর অতি আগ্রাসী বিদেশনীতি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ক্রমাগত সম্পর্ক খারাপ করা নিয়ে। তাছাড়া কোভিড-এর বেশ আগে থেকেই চীনে বেকারত্ব একটি সমস্যার কারণ হয়ে উঠছিল। আবার কোভিড পর্বে চীনের অপরিছন্ন ভূমিকা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন ছিল। আন্তর্জাতিক স্তরে চীনের ঋণাত্মক ভাবমূর্তি শেষমেশ চীনের ক্ষতিই করবে, এই জাতীয় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে চীনে। এই বছরের মে মাসের একুশ-বাইশ তারিখেই হয়তো শি টের পেতেন প্রকাশ্য বিরোধিতার তীব্রতার কিংবা চীনা বসন্তের। কারণ সি. পি. পি. সি. সি (চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স ) এবং এন. পি. সি ( ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস) অনুষ্ঠিত হত ওই সময়ে কিন্তু কোভিড পরিস্থিতিতে  সেই অধিবেশন আয়োজন সম্ভব হয়নি। হয়তো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন শি। চেয়েছিলেন নিজের ও সঙ্গে সঙ্গে নয় চক্রের অবস্থান আর একটু পোক্ত করে নিতে। কিন্তু ক্রমে পরিস্থিতি চিন ও শি-এর জন্য জটিল হয়েছে। যে বেকারত্বের সংখ্যা গতবছর ছিল কুড়ি মিলিয়ন তা এইবছর এসে দাঁড়িয়েছে সত্তর থেকে আশি মিলিয়নে। আর বিশ্বব্যাপী লকডাউনে চীন তার পণ্য সেইভাবে বেচতে পারেনি। শুধু তাই নয় বহু কোম্পানি তাদের উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে চীনকে আর চাইছে না। ফলে চীনের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ঋণাত্মক পর্যায়ের  সূচনা হয়েছে। কড়া শাস্তির তোয়াক্কা না করেই পার্টির বহু পদাধিকারী, প্রশাসক, শিক্ষাব্যক্তিত্ব, ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ চীনে ব্যবহৃত সামাজিক মাধ্যম উইচ্যাট-এ শি-এর বিরোধিতা করে পোস্ট করেছেন নিজেদের মত, শেয়ারে শেয়ারে ভরে গেছে। এমন পোস্টও দেখা গেছে শি-কে ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে তাঁর চীনে মার্কস থাকেন না, আছে একমাত্র মাস্ক। শাস্তির ভয়কে তুড়ি মেরে মানুষ মুখর হচ্ছেন। হংকং-এর মানুষের অনমনীয় মনোভাব চীনের মূল ভূখণ্ডের মানুষকেও  সাহসী করে তুলেছে, এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তাই শি এবং তাঁর নবগ্রহ মূল ভূখণ্ডের মধ্যে আর কোনো ফ্রন্ট খোলার সাহস পাচ্ছেন না । হংকং-এর আগুনে হাত পুড়িয়ে তাঁদের সেই বোধোদয় হয়ে গেছে। তাই তাঁরা বাইরে খুলতে চাইছেন ফ্রন্ট। সেই কারণেই ভারত-চিন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে চীনের অতি সক্রিয়তা সব দেশ যখন অতিমারি সামলাতে ব্যস্ত সেই সময়ে এই ধরণের কার্যকলাপ থেকে এটি বুঝতে অসুবিধে হয় না যে নিজের ঘর কোনোমতে সামাল দেবার মরীয়া চেষ্টা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন দেশ কোভিড নিয়ে যেভাবে চীনকে দায়ী করছিল ও ক্ষতিপূরণের দাবি করছিল, সেই সব থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর প্রচেষ্টা থেকেই এই জাতীয় হঠকারিতার সূত্রপাত। 

বহুজাতিক সংস্থা, যারা চীন থেকে নিজেদের উৎপাদন শাখা সরিয়ে ভারতে আনতে চেয়েছিল কোভিদ-পরবর্তী সময়ে, তাদের জন্যও যেন এই বার্তা- যে ভারতে আপনারা যেতে চান সেই ভারত অস্থির। 
চীন তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রচারের জন্য, তাদের ঋণাত্মক ভাবমূর্তি তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া হাউসগুলিকে প্রভূত অর্থ উৎকোচ দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়াকে চীন যে আরো ত্বরান্বিত করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার জন্যই দরকার যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা। খেলার শুরুতে সুতোটা নিজের হাতে থাকলেও যেকোনো সময় খেলার নিয়মে তা হাতবদল হয়ে যেতে পারে। ঠিক যেমনটা হয়েছে মহাসড়ক প্রকল্পে কিংবা হংকং-এর ক্ষেত্রে। শুধু তাই নয় সামগ্রিকভাবে চীন একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইছে। তাই তার আঙ্গুলি হেলনে নেপাল হঠাৎ করে অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে। উত্তর কোরিয়াও আবার গা-ঝাড়া  দিয়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী হাওয়া তুলছে সেখানকার সরকার শি ঠিক সেইরকম জাতীয়তাবাদী স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন যা তাঁর ক্ষমতাকে আপাতত বাঁচাবে। গালিওয়ান উপত্যাকার কাছে টানাপোড়েন কিংবা সম্প্রতি লাদাখে যে সীমা সংঘর্ষ ঘটলো; যাতে ভারতের কুড়িজন সেনা শহিদ হলেন, চীনের পক্ষে তেতাল্লিশ হতাহত, সেই ঘটনা সমগ্র এশিয়াকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে হেলিকপ্টার থেকে চীনা সেনার আক্রমণ এবং ভারতের প্রত্যুত্তর, এই অঞ্চলে এক জটিলতার সৃষ্টি করল। যে কারণে হয়তো চীন ভারতের থেকে একটি প্রত্যাঘাতের ভীতিতে আছে। যা বোঝা যায় চীন সরকারের দেওয়া বিবৃতিটির ভাষা দেখলে। ভারত সরকার বাক যুদ্ধে না জড়িয়ে সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যোগ্য জবাব দিচ্ছে। তবে ভারতের পক্ষে ক্ষতিকারক দিক হল কোভিড-পরবর্তী সময়ে যে গতিতে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে পারতো তা কিছুটা মন্দীভূত হতে বাধ্য। কারণ ভারতের চীন লাগোয়া অংশ সামলাতে আরও বেশি সৈন্য মোতায়েন করতে হবে। সীমান্তের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যও ব্যয় হবে যথেষ্ট। তাই বর্তমান সময়ে ভারতের পক্ষে পরিস্থিতি বেশ জটিল হলেও চীন কিন্তু আরও সংকটে। জালে পড়ে যাওয়া পশুর মতই বিভ্রান্ত চীন। যে চৈনিক মহা-পরিকল্পনার কথা শোনা যায় তা আসলে মিথ, ঠিক যেমন করে চীনের বিশ্ব-মুক্তি কামিতা! সংকটে স্বরূপ চেনা যায়।

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71