শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭
শুক্রবার, ৫ই কার্তিক ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা : জিয়াউর রহমান
প্রকাশ: ০১:০৭ pm ৩০-০৫-২০১৫ হালনাগাদ: ০১:০৭ pm ৩০-০৫-২০১৫
 
 
 


হাবিবুর রহমান সিজার : জিয়াউর রহমানকে ভাগ্যের বরপুত্র বলা হয়। সৌভাগ্যের কারণে একজন সাধারণ মেজর এর পদ থেকে তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত কতে পেরেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি মাঝে মধ্যে ধূর্ততা ও কূটকৌশলের আশ্রয় নিলেও তাঁর সততা ও দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত। তার আমলে সামরিক বাহিনীতে অনেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এসব সত্ত্বেও মৃত্যুর বহু বছর পরও তার জনপ্রিয়তা পূর্বের মতই অক্ষুণ।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশীজাতয়তাবাদের প্রবর্তক, সবাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণার অন্যতম পাঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী থানার অন্তর্গত বাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত ও লাজুক প্রকৃতির। তার পিতামহ মৌলভী কামালউদ্দীন ছিলেন বাগবাড়ী গ্রামের একজন আদর্শবান মানুষ। এইমানুষটিই ছিলেন জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব।
মৌলভী কামালউদ্দীনের ছিল সাত ছেলে ও দুই মেয়ে। তার পঞ্চম পুত্র মনসুর রহমান ছিলেন একজন কেমিস্ট। বিয়ে করেছিলেন জলপাইগুড়িতে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম চা-বাগানের মালিক আবুল কাশেমের কন্যা জাহানারা খুতুনকে। জাহানারা খাতুন রাণী নিজে ছিলেন শিক্ষিতা ও সংস্কৃতিমনা। তিনি বেতারে নজরুল সঙ্গীত গাইতেন। জিয়া বাল্যে পিতামহের আদর্শবান চরিত্রকে খুবই পছন্দ করতেন। পরবর্তীতে তাই তার জীবনে পিতামহের আদর্শ যথেষ্ঠ প্রভাব ফেলেছিলÑসেই সঙ্গে মায়ের গুণাবলীও তাকে গুণান্বিত করেছিল।
জিয়ার পিতা ছিলেন একজন কেমিস্ট। তিনি চাকুরীসূত্রে কলকাতায় বসবাস করতেন। জিয়া বগুড়ায় মা ও দাদার কাছেই মানুষ হন। তার বড় ভাইয়ের নাম রেজাউর রহমান। ইঞ্জিনিয়ার। তৃতীয় ভাই মিজানুর রহমান চাকুরীজীবী। চতুর্থ ভাই খলিলুর রহমান একজন ফার্মাসিস্ট। ছোট ভাই আহমেদ কামাল চাকুরীজীবী।
জিয়াউর রহমান প্রথম দু’বছর গ্রামের এক প্রাইমারী স্কুলে পড়াশুনা করে কলকাতায় বাবার কাছে চলে যান। সেখানে তিনি বিখ্যাত হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন এবং কয়েক বছর পড়াশুনা করেন। ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগষ্ট দেশ স্বাধীন হয়ে পাকিস্তান হলে জিয়াউর রহমানের বাবা কলকাতা থেকে করাচীতে চলে যান কেমিসেটর চাকরী নিয়ে। ১৯৪৮ সালের ১লা জুলাই জিয়াকে করাচী একাডেমী স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলটি বর্তমানে তাইয়েব আলী আলভী একাডেমী নামে পরিচিত।
জিয়াউর রহমান ইংরেজীতে ভাল বক্তৃতা দিতে পারতেন। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি আংরেজীতে বক্তৃতা দিয়ে সকলের উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছিলেন। ১৯৫২ সালে তিি ন করাচি একাডেমী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর তিি ন ভর্তি হন করাচি ভি.জে কলেজে। তিনি স্কুল ও কলেজ জীবনে খেলাধূলায় পারদর্শী ছিলেন। হকি, ফুটবল খেলা ছাড়াও তিনি একজন ভাল অ্যাথলেটও ছিলেন। টেনিশ, স্কোশও ভাল খেলতেন। তিনি বিনা ক্লান্তিতে বিরামহীনভাবে মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারতেন। দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে গণচীনে যেয়ে পায়ে হেঁটে জিয়াউর রহমান চীনের বিশ্ববিখ্যাত প্রাচীর বহু মাইল অতিক্রম করে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমানের বাল্যকালে ইচ্ছা ছিল তিনি ডাক্তার হবেন। কিন্তু ভি.জে কলেজে ভর্তি হবার পর নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
১৯৫৫ সালে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবহিনীতে সেকেণ্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন পান। এরপর তিনি গ্রহণ করেন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ।
১৯৬০ সালে তিনি তার পছনেদর পাত্রী দিনাজপুর শহরের বাসিন্দা ব্যবসায়ায়ী ইসকান্দর আলীর সুন্দরী কন্যা খালেদা খানম পুতুলকে বিয়ে করেন। এই খালেদা খানমই পরবর্তীকালের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৬৩ সালে তিনি তৎকালীন ডি.এফ.আই অর্থাৎ সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে যোগদান করেন।
১৯৬৫ সালে পাকভারত যুদ্ধের সময় তিনি তার কোম্পানী নিয়ে লাহোরের খেমকারান সেক্টরের বেদিয়ানে সরাসরি শত্র“র মোকাবেলা করেন। এতদিনে যেন তার সৈনিক জীবন সার্থক হলো। এই যুদ্ধে তিনি মোটামুটি বীরত্বের পরিচয় দেন।এই যুদ্ধে তার চেয়ে উচ্চপদস্থ অফিসারদের নেতৃত্বাধীন ব্যাটালিয়নই লাভ করেছিল সর্বাধিক বীরত্বের পদক। অবশ্য ঐ ব্যাটালিয়নের অধনসথ জিয়াউর রহমানের কোম্পানীও পুরস্কার অর্জন করে। রণাঙ্গণে তার এই বীরতেবর জন্য তাকে ১৯৬৬ সালের জানয়ারি মাসে পাকিস্তানের সামরিক একাডেমীতে একজন প্রশিক্ষকের দায়িত্বভার দিয়ে কাকুলস্থ পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে পাঠানো হয়।
১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তাকে বদলী করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জয়দেবপুরে সাব ক্যান্টনমেন্ট ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২য় ব্যাটালিয়নে সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ড কে র পাঠানো হয়। এই বছরই চার মাসের উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য জিয়াউর রহমানকে জার্মানীতে পাঠানো হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭০ সালে দেশে ফিরে আসার পর আবার তাকে বদলী করা হয় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেখানে তাকে নবগঠিত অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ডের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়।
১৯৭০ সালে জিয়াউর রহমানের পিতা মনসুর রহমান ইন্তেকাল করেন। তারপর তার মাতাও ক্যান্সার রোগে মারা যান। তার ধৈর্য ও সহ্যশক্তি ছিল অপরিমেয়। তিনি শোকে দুঃখে বা হতাশায় কখনো ধৈর্য হারাতেন না বা ভেঙ্গে পড়তেন না।
১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচন এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনসমূহ হয়ে গেল তদানীন্তন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে। উভয় পরিষদেই বিজয়ী হলো তদানীন্তন বাংলাদেশীদের প্রতিনিধিত্বকারী আওয়ামীলীগ। তাদের এই বিজয় ছিল একেবারেই নিরঙ্কুশ। কিন্তু পশ্চিমারা তবু আওয়ামীলীগকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে নানা টালবাহানা শুরু করলো। ফলে এদেশবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়তে শুরু করলো। ঢাকাসহ সারাদেশে মিছিল-মিটিং চলতে লাগলো। এই অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন এবং ঘোষণা করলেন ঃ “এবারের সংগ্রাম ামাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” মুজিবর রহমানের ৭ই মার্চের এই ভাষণকে মেজর জিয়া একটি “গ্রীণ সিগন্যাল” হিসেবে বিবেচনা করেন।
মেজর জিয়া ১৭ মার্চ লেফটেন্যান্ট কর্ণেল এম.আর. চৌধুরী, ক্যাপ্টেন অলি আহাদ এবং মেজর আমিন চৌধুরীকে নিয়ে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে এক গুরুত্বপূর্ণ গোপন বৈঠকে মিলিত হন। এই বেঠকে স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন মেজর জিয়া ও তার দেশপ্রেমিক সাথীরা।
১৯৭১ সালের ১৫ই মার্চ পাকিসতানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলেন। শুরু করলেন বঙ্গবন্ধরি সঙ্গে প্রহসনের আলোচনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা ব্যর্থ হলো। ২৫শে মার্চ রাতে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করলেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো।
ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করার দিন থেকেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরে “সোয়াত” ও “বাবর” নামে দুটো জাহাজ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নামাতে শুরু করে। াত ১১টার দিকে কমাণ্ডিং াফিসার লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জানজুয়া মেজর জিয়াউর রহমানকে এক কোম্পানী সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাবার নির্দেশ দেন। তিনি ষোলশহর থেকে বন্দরে যাবার পথে বেরিকেডের সম্মুখীন হন। বেরিকেড সরাতে দেরী হবার মুখে বাঙ্গালী ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান এসে জিয়াউর রহমানকে এই মর্মে সংবাদ দেন যে, বন্দরে পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে।
২৬ মার্চ ইপিআর এর ওয়্যার লেসের মাদ্যমে পাঠানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম পাঠ করলেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা এম.এ হান্না ন। হ্নাানই টেলিফোনে বিষয়টি জিয়াউর রহমানকে জানিয়ে তার সহযোগিতা কামনা করেন।
চট্টগ্রামে অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত অবস্থাতেই পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর সশস্ত্র আক্রমণের প্রতিবাদে জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাক সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন।
২৭ মার্চ জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেন, যাতে তিনি বলেন ঃ "ও গধলড়ৎ তরধ ফড় যবৎবনু ফবপষধৎব রহফবঢ়বহফধহপব ড়ভ ইধহমষধফবংয ড়হ নবযধষভ ড়ভ ড়ঁৎ এৎবধঃ ঘধঃরড়হধষ খবধফবৎ ঝযবরশয গঁলরনঁৎ জধযসধহ."
সংকটের সেই অমানিশায় জিয়ার ভয়তাড়ানিয়া ও সাহস জাগানিয়া এই দীপ্ত উচ্চারণ বাংলাদেশ এবং তার জনগণকে এগিয়ে নিয়ে গেল স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে, বিজয়ের দিকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
রামগড়ে থাকাকালীন সময়ে মেজর জিয়া স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সরকার গঠনের ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়েন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আওয়ামীলীগের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ আগর তলায় পৌঁছে যায়। এসময় মেজর জিয়াও সরকার গঠনে সহযোগিতা দানের জন্য নিয়মিত আগরতলায় যাতায়াত করতেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল। কুষ্টিয়ার ভবেরপাড়া গ্রামে গঠিত হয় ‘মুজিবনগর’। এই মুজিবনগরেই সৈয়দ নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং কর্ণেল এম.এ.জি ওসমানীকে বাংলাদেশ ‘মুক্তিবাহিনী’র সর্বাধিনায়ক করে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” গঠন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়া জেড ফোর্সের কমাণ্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই মাসে জেড ফোর্স গঠিত হবার পর পরই জিয়াকে ময়মনসিংহ জেলা ও টাঙ্গাইল জেলার অপারেশনের দায়িতব দেওয়া হয়। তিনি তার বাহিনী নিয়ে তিনটি বড় রকমের অপারেশনের দায়িত্ব নেন। এগুলো হলো কমলাপুরের যুদ্ধ, বাহাদুরাবাদ ঘাট সংঘর্ষ এবং নকশি সীমান্ত ফাঁড়ি আক্রমণ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনা দেবার পর থেকে দেশ শত্র“মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জিয়া তার সহযোদ্ধা ও সৈনিকদের নিয়ে একের পর এক বিজয়গাঁথা রচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী জিয়াউর রহমান জাতীয় বীরদের তালিকায় একটি উজ্জ্বল নাম। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর “বাংলাদেশ” নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। আর তাই গভীরভাবে কৃতজ্ঞ জাতি তাকে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সম্মান ও গৌরবজনক ুপাধি ‘বীর উত্তম’ দানে সম্মানিত ও গৌরবান্বিত করে।
স্বাধীনতা লাভের পর তিনি কুমিল্লা ব্রিগেডের কমাণ্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। একই বছর কর্ণেল পদে ১৯৭৩ এর মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং ১০ই অক্টোবর মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তারিখে শেখ মুজিবর রহমান এক অশুভ অভ্যুত্থানে নিহত হন। এসময় খনদকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পদ লাভ করেন। তিনি তিন বাহিনীর প্রধানদের উপরে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর স্থলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ২৫ আগষ্ট সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব দেন। এই নিয়োগে কেটা বিশেষ শ্রেণী ক্ষুব্ধ হলো। চলতে থাকলো ক্সমতা দখলের ষড়যন্ত্র। তবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তাই সেই বছরই ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্যুর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে নিজের হাতে ক্ষমতা নেবার মাত্র দুই দিন পরেই ার এক মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল তাহের এর সমর্থনপুষ্ট সিপাহী-জনতারা মিলে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। এবং ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেতাদের সহ অনেকেই নিহত হলেন। ৭ নভেম্বর ভোরবেলা অনুষ্ঠিত এই সিপাহী বিপ্লব এখন ইতিহাসের অন্যতম অঙ্গ। জিয়াকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বভারগ্রহণ করেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত হবার পরপরই জিয়াউর রহমান সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান। শাসনতন্ত্রের শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”, সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ সংযোজিত হয়। রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করা হয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করা হয়।
তিনি দেশ স্বাধীন হবার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল ‘জামায়াতে ইসলামী’ ও ‘মুসলিম লীগ’কে রাজনীতি করার সুযোগ প্রদান করেন।
১৯৭৭ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি “একুশে পদক” প্রবতৃন করেন।
১৯৭৭ সালের ৩০শে মে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে জিয়াউর রহমানের নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচীর পক্ষে শতকরা ৯৮.৮৮ ভাগ ভোট পড়ে।
১৯৭৭ সালে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন গণ ঐক্য জোটের মনোনীত প্রার্থী জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী। এই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৭৬.৬৩ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। জেনারেল ওসমানী পান ২১.৭০% ভোট।
১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর জিয়া পূর্ণরূপে রাজনীতিতে প্রবশ করেন। ঐ বছরের ১ লা সেপ্টেম্বর তিনি ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ গঠন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিএনপি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশে অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তরুণরা দলে দলে এই দলে ভিড়তে শুরু করে। বর্তমানে এই দলটি এক মহীরুহ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জেনারেল জিয়া বাংলাদেশকে প্রগতিশীল, সমাজতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলবার জন্য ওজনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলবার জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ১লা নভেম্বর তিনি খাল খনন কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন। তার এই কর্মসূচী জনপ্রিয় হয় এবং সারাদেশে তুমুল আলোড়ন ওঠে।
প্রেসিডেন্ট হবার পর তনি ব্যাপকভাবে বিদেশ সফর করেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে সফর করে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন তৎপরতায় তাদের সহায়তা কামনা করেন।
১৯৭৯ সালের ৩১শে জুলাি তিনি লুসাকায় কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। তার শাসনামলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি যুবসমাজকে দেশের উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে ‘যুব কমপ্লেক্স’ গঠন করেন।
১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে মক্কার তায়েফে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। তার একান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। এবছরের ১৯ ফেব্র“য়ারি সাভারের জিরাবো গ্রামে তিনি ‘স্বনির্ভর’ “গ্রাম সরকার” গঠন সংক্রান্ত কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন। এ বছর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দান করেন। ১২ই ডিসেম্বর পাশ করেন “যৌতুক প্রথা বিরোধী” আইন।
তিনি ইসলামী সম্মেলন সংস্থার তিন সদস্য বিশিষ্ট ‘আল কুদস’ কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। ইসলামী সম্মেলন সংস্থার নয় সদস্য বিশিষ্ট শান্তি মিশনেও তিনি নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।
তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন। টেলিভিশনে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “নতুন কুঁড়ি” তার আমলে চালু করা হয়।
১৯৮১ সালের ২৭শে মার্চ ইরাক-ইরান যুদ্ধ অবসানে ইসলামী মধ্যস্থতা কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে জেদ্দা গমন করেন জিয়াউর রহমান। ২১ এপ্রিল তিনি দক্ষিণ এশিয়া ফোরাম (ঝঅঅজঈ) এর গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাব ও পরিকল্পনা উত্থাপন করেন। ২২ এপ্রিল মরক্কোয় জেরুজালেম সংক্রান্ত শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন।
জিয়া ছিলেন সকল অর্থনৈতিক, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লোভের ঊর্ধ্বে। তার সততা কিংবদন্তী সমতূল্য ছিল।
১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে সামরিক বাহিনীর কিছু বিপথগামী াফিসারদের দ্বারা বুলেটবিদ্ধ হয়ে জিয়াউর রহমান নিহত হন। নিহত হবার পর তার সার্কিট হাউজে মালামালের মধ্যে পাওয়া যায় একটি রংচটা টিনের সুটকেস, দুটি সাফারি সার্ট, একটি প্যান্ট, একটি ছেঁড়া গেঞ্জি, একটি সাধারণ টু-ইন-ওয়ান, একটি পুরানো ব্রিফকেস।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মরদেহ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনে সংসদ সংলগ্ন এলাকায় দাফন করা হয়।

এইবেল ডট কম/এইচ আর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71