মঙ্গলবার, ২৭ জুন ২০১৭
মঙ্গলবার, ১৩ই আষাঢ় ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
হাতের নিপুঁণ ছোঁয়ায়
বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য তৈরী করলো বগুড়ার হতদরিদ্র কৃষক আব্দুল হান্নান
প্রকাশ: ০৩:৩৪ pm ১০-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৩:৩৪ pm ১০-০১-২০১৭
 
 
 


বগুড়া প্রতিনিধি : হাতের নিপুঁণ ছোঁয়ায় বঙ্গবন্ধু’র ভাস্কর্য তৈরী করলো বগুড়ার হতদরিদ্র কৃষক আব্দুল হান্নান ।

আকাশে উড়ে যায় শালিকের ঝাঁক, যায় উড়ে কত জাত, কত রকমের পাখি, নদীর দু’ধারে নৌকায় পাল তুলে, জাল পেতে মাছ ধরে জেলে, বেদের বহর যায় ঢেউয়ের তালে তালে, একতারায় কন্ঠে বাউল, গায় দেশের গান-ইতিহাসের পাতায় লেখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’’ স্বরচিত কবিতার স্বপ্ন ও  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আর্দশে অনুপ্রাণিত হয়ে এক বুক আশার আলো মাথায়  নিয়ে নিজেকে ভাস্কর্যের শিল্পীর খাতায় নাম লেখাতে শুরু করে আব্দুল হান্নান নামের এক হতদরিদ্র কৃষক। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের  শিবপুর গ্রামের এক মুসলিম গরীব পরিবারে পিতা আবু তালেব আলী ও মাতা রোকেয়া বেগমের  ঘরে তার জন্ম হয় ১৯৭১ সালে।

 

আব্দুল হান্নান নিজ চোখে মুক্তিযুদ্ধ না দেখলেও ছোটবেলা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ইতিহাস তার হৃদয়ে ব্যাপক নাড়া দিত। পিতা-মাতার অভাবী সংসারে লেখাপড়ায় প্রাইমারী গন্ডি পার হতে না পারলেও দেশ স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে তার আগ্রহ ছিল ধারনাতীত। কিশোর বয়স থেকেই মনেপ্রাণে নিজেকে ভাস্কর্য শিল্পী  হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ ছিল প্রবল।

কিন্তু অভাবী সংসারে ভাস্কর্য তৈরীর জন্য যেসব প্রয়োজনীয় উপকরণ যোগাড় করার দরকার তা মন থেকে সড়াতে পারেনি। মাঠে কৃষকের কাজ করে স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে অনেকটা হিমশিম খেলেও নিজের মনের মধ্যে শৈল্পিক ভাবনাকে বাস্তবে রূপদান দিতে সামান্য লেখাপড়ায় চাকুরী নেয় সিগারেট কোম্পানীর বাজারজাত করণের কাজে।৭ বছর  চাকুরী করার পর  সামান্য পুঁজি  নিয়ে নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের মধ্যে ভাস্কর্য  শিল্পের শুভ সুচনা করেন।

কোন ওস্তাদগত সান্নিধ্য না  নিয়েই অন্তরের চোখ দিয়ে তার কল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে তার হাতের নিপুঁণ ছোঁয়ায় প্রথমত: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম, মৌচাক, কুমিরসহ নানা ভাস্কর্য তৈরীর মাধ্যমে হাতের কাজ শুরু করেন তিনি।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অবধি ৪৪ বছর বয়সী টকবগে যুবক আব্দুল হান্নান অভাবের সাথে জীবন যুদ্ধ করে ভাস্কর্য শিল্প থেকে নিজেকে দুরে রাখতে না পারায় পুনরায় জেগে ওঠে নতুন স্বপ্ন বাস্তবে রূপদান দিতে।

তাইতো তিনি নতুন ভাস্কর্য হিসেবে বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি তৈরির কাজ। এ কাজের উপকরণ হিসাবে বেছে নেয় সিমেন্ট, বালি, কাঠের তৈরী ফ্রেম, টাইলস্ বা মোজাইক ও কাঁচ এবং রং তুলির নিপুঁণ ছোঁয়া। নিজের হাতের শৈল্পিক ও মননশীল ছোঁয়ায়  তৈরী করেন দেশ তথা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র  পরপর ২টি ভাস্কর্য।

প্রথম পর্যায়ে  ৫০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ৪০ ইঞ্চি প্রশস্ত এবং ৭ ইঞ্চি পুরু সিমেন্ট বালি ও অন্যান্য সামগ্রীর সম্বনয়ে গড়া প্রায় আড়াই মণ ওজনের ভাস্কর্যটির গায়ে টাইসল বা মোজাইক, কাঁচ লাগিয়ে, সুন্দর টেকসই কাঠের তৈরী ফ্রেমে বসিয়ে ভাস্কর্যটিকে পরিপূর্ণ রূপদান করে। এ ভাস্কর্যটি নির্মাণে ব্যায় ৩০/৩৫ হাজার টাকা হলেও চাহিদামত অর্থের যোগান দিতে না পারায় মনের মধ্যে শৈল্পিক ক্রটির সংশয় আজো কাটেনি।

এ ভাস্কর্য তৈরীর পরপরই পুনরায় গত সাড়ে ৩ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিজের ২৫ শতাংশ জমি বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যায়ে গত ডিসেম্বর মাসে শেষ করেন “শতাব্দির মহানায়ক” নামের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫ফুট ৭ইঞ্চি উচ্চতায় কাঠের শৈল্পিক ডিজাইনে ৮ ফুট উচ্চতায় কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো এবং ১ ভরি ওজনের সোনার তৈরী নৌকা প্রতিক সম্বলিত পুরো ভাস্কর্য। এ কাজেও ব্যবহার করেছেন রড, সিমেন্ট, বালি, টাইলস্, পিতলের নেমপ্লেট ও গ্লাস।
 

কয়েক বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের ভাস্কর্য তৈরী করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছেন ওই কৃষক আব্দুল হান্নান। শুধুমাত্র ওই ভাস্কর্য তৈরী করেই মনের সাধ মেটাতে পারেনি, তার আরও ইচ্ছা ছিল দামী কিছু উপকরণ দিয়ে তৈরী করার। তিনি তার প্রথম তৈরী ভাস্কর্যটির নামকরণ করেন-‘মহাবীর’। ভাস্কর্যটির গায়ে মহাবীর শব্দটি  পিতলের পাত দিয়ে লিখতে গিয়ে শিল্পী আব্দুল হান্নান উৎফুল্ল কন্ঠে উচ্চারণ করেন ‘ মহাবীর নাম লিখেছি পিতলের পাতে, ইচ্ছা ছিল লিখব স্বর্ণের পাতে কিন্তু দারিদ্রতা ও বিত্তবানদের আর্থিক সহযোগীতা না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। অল্প লেখাপড়ায় ভাষাগত জ্ঞান গড়িমা কম থাকার অক্ষমতা নিয়ে তিনি বলেন- মহাবীর’ শব্দটি অন্য কোন সাধারণ শব্দ নয়, এর ভাবার্থ বিরাট। বাংলার আকাশের নিচে ‘মহাবীর ’শব্দটি একটি নামের সাথেই লেখা যায়- যে নামটি হলো নাম্বার ওয়ান, একবাক্যে সবাই চেনে মহাবীর ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরি করেই তার নির্মাণ শৈলীর ইতি টানেনি। অদম্য ইচ্ছা নিয়ে তার আরো স্বপ্ন দেশের প্রথিতযশা জাতীয় ব্যক্তিত্ব, ফুল, ফলসহ নানা ইতিহাস ও ঐহিত্য তৈরী করা। কিন্ত আর্থিক প্রতিকুলতায় হোচট খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ ব্যাপারে ভাস্কর্য শিল্পী কৃষক আব্দুল হান্নান এ প্রতিবেদককে জানান, কিশোর বয়স থেকেই স্বপ্ন নিজেকে ভাস্কর্য শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। তাইতো আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে  নিজের  শৈল্পিক ভাবনায় অন্যান্য ভাস্কর্যের মধ্যে অন্যতম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য তৈরী করা। তবে তার নির্মিত ভাস্কর্যটি কতটুকু সুন্দর ও গুরুত্ব বহন করবে জানা না  থাকলেও বেশ কয়েক জন শুভাকাঙ্খি তার কাজের পারিশ্রমিক বাবদ দেড়/ দুই লক্ষাধিক টাকা কৃষক হান্নান দিয়ে কিনে নিতেও চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ভাস্কর্যটি বিক্রি করেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- আমি একজন হতদরিদ্র গরীব কৃষক, আমার শৈল্পিক চিন্তায় গড়ানো ভাস্কর্য বিক্রি করলে নিজে মুল্যহীন হয়ে যাব। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাস্কর্যটি কোন অর্থের বিনিময়ে নয় নিজে হাতে জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌছে দেয়ার স্বপ্ন দানা বেঁধেছে এবং স্বহস্তে ভাস্কর্য উপহারটুকু  তুলে দিতে পারলেই নিজের জন্ম সার্থক মনে করবেন। শৈল্পিক কারুকার্যের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের ভাস্কর্যটি শেরপুর উপজেলার জামায়াত অধ্যুষিত গ্রাম হওয়ায় ভেঙ্গে ফেলার আশংকায় রাত জেগে পাহারা দিয়ে কবে নাগাদ দেশরতœ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিতে পারবেন সেই প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছেন ভাস্কর্য শিল্পী হতদরিদ্র কৃষক আব্দুল হান্নান।
 

এইবেলাডটকম/দীপক/এফএআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71