বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০
বুধবার, ৬ই কার্তিক ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
প্রথম নারী চিকিৎসক ডাঃ কাদম্বিনী বসুর মৃত্যু বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৪:৪৭ pm ০৩-১০-২০২০ হালনাগাদ: ০৪:৪৭ pm ০৩-১০-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


ডাঃ কাদম্বিনী বসু গঙ্গোপাধ্যায়, যাঁর ঝুলিতে রয়েছে একগুচ্ছ রেকর্ড। প্রথম নারী যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করেন। তিনি ও চন্দ্রমুখী বসু ছিলেন ব্রিটিশ অধিকৃত দেশগুলির মধ্যে প্রথম ভারতীয় নারী, যাঁরা প্রথম বি.এ পাশ করেন।

কাদম্বিনী শুধু ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষিত প্রথম বাঙালি তথা দক্ষিণ এশীয় মহিলাই নন, চন্দ্রমুখী বসুর সাথে তিনিই সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্নাতক। ব্রাক্ষ্ম সমাজের অনুপ্রেরণায় কাদম্বনীর বাবা ব্রজকিশোর বসু মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে উদ্যোগী হন। কাদম্বিনীর শিক্ষা শুরু হয় ঢাকার ইডেন মহিলা বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন বালিগঞ্জের বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে এবং ১৮৭৮ সালে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এবং চন্দ্রমুখী বসু ১৮৮১ সালে এফএ এবং ১৮৮৩ সালে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে বিএ পাস করেন। এফএ পাশ করেই তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার আবেদন জানান। কিন্তু পুরুষ অধ্যুষিত জগতে এক মেয়ের অনুপ্রবেশ কি এতো সহজে হবে? আসতে থাকে বাধার পর বাধা।  মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন তিনি সে যুগে মাসে ২০ টাকা সরকারি স্কলারশিপ পেতেন।

কাদম্বিনী ডাক্তারি পড়তে শুরু করার সময়েই বিপত্নীক দ্বারকানাথের সাথে কাদম্বিনীর বিয়ে হয়। দ্বারকানাথ ছিলেন কাদম্বিনীর থেকে বয়সে অনেকটাই বড় এবং কাদম্বিনীর স্কুলশিক্ষক। দ্বারকানাথের এই বিয়ে তাঁর অনেক আত্মীয় এমনকি আধুনিকমনস্ক ব্রাহ্ম নেতারাও মেনে নিতে পারেননি। রাগ করে এই বিয়েতে সে কারণে দ্বারকানাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শিবনাথ শাস্ত্রী পর্যন্ত আসেননি।

সেই সময় বিয়ের পরে মেয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতেন না। কিন্তু কাদম্বিনীর ক্ষেত্রে একেবারেই তা হয়নি। দ্বারকানাথের আগ্রহেই কাদম্বিনী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। যে-কারণে কাদম্বিনীকে নানান কথা শুনতে হয়।

কাদম্বিনীর সহ্যসীমা ছাড়াল যখন 'বঙ্গবাসী' নামে সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল একটি কার্টুন ছাপলেন। কার্টুনে তিনি দেখালেন, ডাঃ কাদম্বিনী স্বামী দ্বারকানাথের নাকে দড়ি দিয়ে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ডাঃ কাদম্বিনীকে ‘স্বৈরিণী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন পত্রিকা সম্পাদক। কারণ কাদম্বিনী নাকি মোটেই ঘরোয়া 'বাঙালি বউ' নন। ঘর-সংসারের দিকে তাঁর মন নেই। এমনকি বারবনিতা বলতেও দ্বিধা করলেন না পত্রিকা সম্পাদক মহেশ পাল। ব্যাস! কাদম্বিনী চুপ থাকার পাত্রী নন। অপমানিত কাদম্বিনী মামলা করলেন পত্রিকা সম্পাদক মহেশ পালের বিরুদ্ধে। কাদম্বিনীর পাশে দাঁড়ালেন স্বামী। 'বঙ্গবাসী' পত্রিকার সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালের ১০০ টাকা জরিমানা আর ৬ মাসের জেল হল।সেই সময় এই ধরনের মামলা করা, বিশেষ করে এক শক্তিশালী পুরুষ কাগজের সম্পাদকের বিরুদ্ধে কোনো নারীর মানহানির মামলা করাটা মোটেই কিন্তু সহজ কাজ ছিল না।

দ্বারকানাথের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি ভারত-সভা এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কংগ্রেসে তিনিই প্রথম নারীদের প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলেন। যার ফলে কাদম্বিনীর নেতৃত্বে প্রথম ৬ জন নারী কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে যোগ দেন। এই ছ'জনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী ও তাঁর মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরাণী ছিলেন। দ্বারকানাথের স্ত্রী কাদম্বিনী-ই কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম নারী বক্তা ছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী ও কাদম্বিনী বসু জাতীয় কংগ্রেসের সর্বপ্রথম দুই নারী সদস্যা ছিলেন।

কাদম্বিনী পাঁচ শিশু সন্তানের মা হওয়া সত্ত্বেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করতেন। যা সেসময় ভাবতেই পারতেন না কেউ। একে নারী চিকিৎসক তার উপর অন্যের বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা! এক অসম্ভব বিষয় ছিল। কাদম্বিনী বিশেষ করে সেই সব নারীদের বাড়ি যেতেন যারা অসুস্থ হলেও হাসপাতালে আসার সুযোগ পেতেন না।

বিখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ ডেভিড কফ লিখেছেন, "কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে স্বাধীন ব্রাহ্ম নারী। তৎকালীন বাঙালি সমাজের অন্যান্য ব্রাহ্ম এবং খ্রিস্টান নারীদের চেয়েও তিনি অগ্রবর্তী ছিলেন।"

কাদম্বিনী ছিলেন সূচিশিল্পেও বেশ নিপুণা। অবসর সময়ে বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ করতেন তিনি।

দ্বারকানাথ-কাদম্বিনীর ছয় নম্বর গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়ির ছাদে রবীন্দ্রনাথ মাঘোৎসবের প্রস্তুতি হিসেবে গান শেখাতে আসতেন। তাঁর কাছ থেকে গান শুনে সুর তুলে নিতেন বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েরা। তবে অল্প বয়সী তরুণরাই সেখানে বেশি আসত। গান গলায় তুলে নিতে আসতেন যে যুবকরা তাঁদের মধ্যে ছিলেন নরেন্দ্র দত্ত। বেহালা হাতে এসে বসতেন সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর। সেই সময়ের দুই বিখ্যাত পরিবার, রায় পরিবার ও গাঙ্গুলি পরিবারের মধ্যে গড়ে ওঠা বহু কালের বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধন রচনা করে। ধীরে ধীরে বাংলার দুই নামকরা বাড়ির মধ্যে সাংস্কৃতিক বাঁধনের সঙ্গে জীবনের গাঁটছড়াতেও বন্ধন রচিত হয়। বাঁধা পড়েন উপেন্দ্রকিশোর দ্বারকানাথের কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে। উপেন্দ্রকিশোরের সাথে বিবাহ হয় বিধুমুখীর।

কাদম্বিনী চা বাগানের শ্রমিকদের শোষনের বিষয়ে অবগত ছিলেন এবং তিনি দ্বারকানাথের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেন। যিনি আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের কাজে লাগানোর পদ্ধতির নিন্দা করেছিলেন। কবি কামিনী রায়ের সাথে কাদম্বিনী দেবী বিহার এবং ওড়িশার নারীশ্রমিকদের অবস্থা তদন্তের জন্য ব্রিটিশ সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ দিনটাতেও কাদম্বিনী রোগীর বাড়ি গেছেন। জটিল অস্ত্রোপচার করেছেন। ঘরে এসে পরিতৃপ্ত কাদম্বিনী পুত্রবধুকে বলেছিলেন, "সার্থক ও সুন্দর দিন ছিল সেটা। তাঁর এত ভাল লাগছিল যে তিনি শূন্যে উড়ে বেড়াতে চাইছিলেন।"

সাবলম্বী, স্বাধীনচেতা কাদম্বিনী সবসময় বলতেন তিনি কারো কাছে এমনকি নিজ পুত্রেরও গলগ্রহ হয়ে থাকতে চান না। কর্মাবস্থায় তাই মরতে চেয়েছিলেন তিনি। হয়েও ছিল তাই, পুত্রবধূর সাথে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই স্নান করতে গিয়ে কঠিন সেরিব্রাল স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই মহিলা ডাক্তার। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর হাত ব্যাগে পাওয়া যায় পঞ্চাশটি টাকা। তাঁর শেষ রোজগার।

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71