সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
সোমবার, ৮ই ফাল্গুন ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
পূজার হাসিতে উদ্ভাসিত হোক দেশ
প্রকাশ: ০৪:১৯ am ১১-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:১৯ am ১১-০১-২০১৭
 
 
 


শিতাংশু গুহ ||

স্বাগত ২০১৭। বছরের শুরুতে ছোট্ট পূজার ভুবনমোহন হাসি দেখে ভালো লাগল। পাঁচ বছরের ধর্ষিতা পূজা পহেলা জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে মুক্তি পেয়েছে। সম্ভবত হাসপাতাল গেটে অপূর্ব অথচ নির্মল হাস্যোজ্জ্বল ছবিটি তোলা হয়েছে। পূজার হাসিতে উদ্ভাসিত হোক দেশ। কঠোর শাস্তি পাক পাষাণ্ড ধর্ষক। মিডিয়ার খবর, পূজার চিকিৎসায় এগিয়ে এসেছিলেন শাকিল। তিনি নেই, তবু তাকে শুভেচ্ছা। পক্ষান্তরে বছরের শুরুর দিনটিতে তুরস্ক ও ব্রাজিলে সন্ত্রাসে মানুষ মরেছে। আইসিস দায়িত্ব নিয়েছে। এ কোন বিশ্ব, যেখানে মানুষ হত্যা করে ‘মানুষরূপী জানোয়ার’ আত্মপ্রসাদ লাভ করে? ২০১৭ হোক আইসিস, আলকায়েদা, বোকো হারাম বা মৌলবাদ মুক্ত বছর, হিংসার বদলে শান্তির ললিত বাণী জয়লাভ করুক। আবার বছরের প্রথম দিনে সিলেটে বই উৎসবে হামলা হয়েছে। হামলা করেছে একদল মুসল্লি। অভিযোগ সেই পুরনো, বই উৎসব চলাকালীন গানবাজনায় তাদের উপাসনায় ব্যাঘাত ঘটেছে।

এভাবে চললে, দেশে গ্রামেগঞ্জে আস্তে আস্তে গানবাজনা উঠে যাবে। বই উৎসবে যখন হামলা হয় তখন বুঝতে হবে, সমস্যার গভীরতা আছে। সামনে হয়তো বইমেলায় হামলা হবে? বই অনন্ত যৌবনা, বই উৎসবে হামলা মানে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর হামলা। বই উৎসবে হামলা করতে পারে কারা? একটি গল্প বলি, গল্প নয় সত্যি ঘটনা। সত্তর ও আশির দশকের অনেকটা সময় ঢাকায় ‘ইত্তেহাদ’ নামে একটি কট্টর ভারত বিরোধী, সাম্প্রদায়িক সাপ্তাহিক বের হতো। এর মালিক ছিলেন অলি আহাদ। রেজাউল হক সরোজ নামে এর একজন রিপোর্টার একবার অলি আহাদের কাছে জানতে চান যে, ভারত থেকে চোরাপথে প্রচুর বই আসছে, এ নিয়ে একটি রিপোর্ট করবেন কিনা? অলি আহাদ তাকে বলেছিলেন, না, রিপোর্টের দরকার নেই, বই আসতে দাও। অর্থাৎ তিন দশক আগে এবং এখনকার সাম্প্রদায়িকতার চিত্রটি ভিন্ন।

আগে সাম্প্রদায়িক শক্তি বইয়ের কদর জানতো, এখন জানে না। বই সংস্কৃতির অঙ্গ। স্বাধীনতার পর সুধীমহল আশা করেছিলেন বা বেশ জোরেশোরেই বলতে শুরু করেছিলেন যে, কলকাতা নয় ঢাকা হবে ‘বঙ্গ-সংস্কৃতির’ কেন্দ্রবিন্দু। এখন আর সাহস নিয়ে কেউ ওকথা বলেন না? প্যারিসকে বিশ্ব সংস্কৃতির কেন্দ্র বলা হয়, কারণ ওখানে সবকিছু উন্মুক্ত। ঢাকা এখন বদ্ধ নগরী, যা সংস্কৃতির প্রধান বাধা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।’ ধর্ম যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়, তখন সেটা ধর্ম থাকে না। নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না। দেশে মৌলবাদের রমরমা দেখে মনে হয়, কিছুই রক্ষা পাবে না। একমাত্র ভরসা তরুণ সমাজ।

দেশে লোকসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে! বঙ্গবন্ধু ‘সোনার মানুষ’ চেয়েছিলেন, এখন সোনা তো দূরের কথা, মাটির মানুষেরই বেজায় অভাব। আগে বিশ্বে কোনো সমস্যা হলে উন্নত দেশগুলো আমাদের হাত ধরে টেনে কাছে নিতো। কিন্তু সন্ত্রাসের তাণ্ডবে এখন সিরীয় শরণার্থীরা ‘ট্রোজান হর্স’ হয়ে গেছে। ২০১৬-এ দেশে অনেক অনেকগুলো ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭-এ আশা করতে পারি আর কোনো ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা ঘটবে না? যদি ঘটে, তাহলে কি হবে? কিচ্ছু না, ক’দিন হৈচৈ হবে, তারপর সবকিছু আগের মতো! গত ক’বছর তো তাই দেখলাম। দেশে এমন কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি যে, যারা ওসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটায়, রাতারাতি তারা সবাই ‘মানুষ’ হয়ে যাবে? খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’- শুধু ডায়লগই হয়ে থাকবে।

এক সময় ‘তুই রাজাকার’ ডায়লগটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পায়। এখন সময় পাল্টাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে একদিন হয়তো ‘তুই মুক্তিযোদ্ধা’ বিরূপভাবে জনপ্রিয়তা পাবে। এর মধ্যে এমপি লিটন নিহত হলেন। তাকে নিয়ে দল, সরকার সবকিছুই করলেন, যা করা উচিত ছিল। তবে এ হত্যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তেমন হৈচৈ দেখিনি? অথচ লিটন যখন শিশু সৌরভকে গুলি করেছিল, সামাজিক মিডিয়া তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি কখন যে চাঙ্গা হয় আর কখন ঘোরের মধ্যে থাকে সেটা বোঝা আসলেই দুঃসাধ্য। নতুন পাঠ্যবই নিয়ে এখন এখন নতুন অনুভূতি শুনতে পাচ্ছি। কথা ছিল জঙ্গিবাদকে নিরুৎসাহী করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে পাঠ্যবইয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হবে। পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ইতিবাচক না নেতিবাচক সেটা বুঝতে রকেট সাইন্টিস্ট হওয়ার দরকার নেই?

পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তন এল সেটা বামপন্থী মন্ত্রীর হাত দিয়ে! বাম রাজনীতির বারোটা কি এমনিতেই বেজেছে? মন্ত্রী মোল্লাদের দাবি মেনে হিন্দু লেখকদের প্রায় বাদই দিয়ে দিয়েছেন, এমনকি রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্র পর্যন্ত প্রায় বাতিলের খাতায়। কমরেড মন্ত্রী নিজেও পড়েছেন, “ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাবো পেড়ে”। ‘অজগর’ বা ‘আম’ বাংলা শব্দ। এখন মন্ত্রীর হাত ধরে এসেছে, অ-তে অজু; আ-তে আল্লাহ; ও-তে ওড়না? আরো আছে, ক-তে কলেমা, ট-তে টুপি, বা ঈ-তে ঈদ ইত্যাদি। মন্ত্রী শিশুদের কি শিখাতে চাচ্ছেন? এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায়? সদ্য বই বাজারে এসেছে, দেখা বা জানার সুযোগ তেমন এখনো হয়নি, সামাজিক মাধ্যমে যেটুকু জানা যায়, তা থেকে এটুকু বোঝা যায়, মন্ত্রী তার সব অর্জন হারিয়েছেন! কমরেড-মোল্লা ভাইভাই হলো কবে থেকে? তা মন্ত্রী কিছু কিছু এখনো বাদ রেখেছেন, হয়তো সামনে তিনি ফ-তে ফেরেশতা, শ-তে শরিয়া বা হ-তে হিজাব আনবেন?

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মাথায় কাঁঠাল রেখে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামের মধ্যে সাযুজ্য আনা বা অর্পিত সম্পত্তি আইনে বিশেষ ক্লজ ঢুকিয়ে দেয়া এবং কমরেডকে দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামিকরণের এক নতুন খেলা চলছে আমাদের দেশের রাজনীতিতে। এ খেলায় কে কাকে ঠকাচ্ছে বোঝা মুশকিল, তবে এতে চূড়ান্তভাবে ঠকছে জাতি। পাঠ্যবইয়ে এ পর্যন্ত যেটুকু দেখলাম তাতে মনে হয়েছে, ওটা আর যাই হোক বাংলা নয়। সাহিত্য না হয়ে ওটা আরবি বা ধর্ম বিষয়ে স্থান হতে পারতো। কমরেড মন্ত্রী হেফাজত বা ওলেমা লীগের দাবি মেনে নিয়েছেন। পত্রপত্রিকায় তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে তারা ‘খোশ-আমদেদ’ জানাতে ভুল করছেন না! মহাজোট সরকারের আমলে এটাই আমাদের প্রাপ্য ছিল? বছর দুয়েক আগে একজন মানবাধিকার নেতা আমায় ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াত লাগবে না, আপনার মহাজোট সরকারই ওদের সব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে!

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

 

আরও পড়ুন:: তেহাত্তর দিন পর পূজার বাড়ি ফেরা

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Migration
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71