বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
বৃহঃস্পতিবার, ৯ই অগ্রহায়ণ ১৪২৪
 
 
ধর্ষণ : নূরিতা নূসরাত খন্দকার (শেষ খণ্ড)
প্রকাশ: ০২:৪৬ am ০৪-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ০২:৪৬ am ০৪-০৬-২০১৫
 
 
 


জীবনকে নতুন করে গড়ে নেয়া সম্ভব যদি আমরা একটু নিজেদের দিকে তাকাই। যেমন তুমি আজ নিজের দিকে তাকালে। সেখানে শুধুই অসঙ্গতির ঘুড়িটাই দেখতে পেয়েছ। সঙ্গতির নাটাই নিশ্চয়ই এখন খুঁজে পাবে। সেটা খুঁজে নেয়াই তোমার জন্য খুব জরুরি। একজন ধর্ষককে সমাজ যা শাস্তি দেয় তুমি যদি সেটা মাথা পেতে নাও তবে তাই করবে। তবে আমি তোমার নামে কোন জিডি করব না। এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকো।
কেন তুমি জিডি করবে না? এটা তো তোমার ন্যায্য কাজ।
তোমার কি মনে হয় আমার মাথা খুব খারাপ হয়ে গেছে? আমি আমার ন্যায্য সম্পর্কে কিছুই জানি না?
না ঠিক তা মনে হচ্ছে না। বরং তুমি বুদ্ধিমতীই নও অনেক অনেক বেশি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন।
হ্যাঁ এই দূর দৃষ্টি থেকেই আমি নিজেকে অনেক দূরে দেখতে চাই। জিডি করলে আমি নিজেকে সেখানে দেখতে পাব না।
মানে?
মানে, আমাদের মুখস্ত সমাজ আর কিছু মুখস্ত দৃষ্টি। আমি এখন থানায় গিয়ে তোমাদের নামে কেস করলে যেটা হবে, সমাজের এক অংশ আমার প্রতি মায়া দেখাবে, এনজিও এগিয়ে আসবে, তোমার বাবার প্রতিপক্ষরা আমাকে খুব সাপোর্ট দেবে। অন্য প্রনাতে কিছু মানুষ আমার জয়দীপের প্রেম নিয়ে সন্দেহ কথা তুলবে, আমার চরিত্র হননের আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তোমার বাবা টাকা পয়সা সব দিয়ে হয় আমার মুখ বন্ধ করার কৌশল করবেন, নয়তো আমার জীবনটাই কেড়ে নিবেন। এইসবের ভিতর দিয়ে যেটা হবে তা হল আমার মা অতি দ্রুত মারা যাবেন। ছোট নিষ্পাপ ভাইটার জগত মরে যাবে। আমি লক্ষ্য ভ্রষ্টা হয়ে সমাজের আরও সব ধর্ষকদের খাদ্য হব। যে দেশে কবর খুঁড়ে মৃত শরীর রেপ করা হয়, সে দেশের থানায় গেলে সেখানেও যে আমাকে আরও একবার ধর্ষণ করা হবে না সে বিষয়ে নিশ্চয়তা কে দেবে? যদিও সমাজের সবাই ধর্ষক নয়। কিন্তু তোমার বাবার পরিচয়টাই তো আমার জন্য কাল। বল, আমি বেঁচে থাকতে পারব কি? তুমি আমাকে ধর্ষণ করেছ, আরও অনেককেই করেছ। এখন তুমিই বল একজন ধর্ষিতাকে সমাজ কি চোখে দেখে এখনও? এই সমাজে ধর্ষক শাস্তি পায় কিন্তু সমাজে প্রভাব থাকলে বেকসুর খালাসও পায়। কিছুদিন আগেই এ দেশে একজন খেলোয়াড় আর একজন তারকা নিয়ে ঝড় উঠেছিল। মেয়েটি কেস করেও কোন ফল পেলনা। খেলোয়াড় ঠিকই খেলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু মেয়েটি কেন কেস করেও খেলোয়াড় বেকসুর খালাস পায় সমাজ আর প্রশ্নবানে ফিরেও দেখেনি সেদিকে। তুমি ধর্ষক তুমি নিজেই ভাল জানো, সমাজের চোখে ধুলো দিয়ে একজন ধর্ষিতাকে কিভাবে তোমরা চরিত্রহীন বানাতে পারো; কিভাবে তোমরা আইনের মুখে টাকা গুঁজে একটা নিষ্কলঙ্ক মেয়েকে সমাজের চোখে কলঙ্কিত করতে পারো। এসব তোমাদের খুব ভালো করেই জানা আছে। আর সমাজও জানে কিভাবে টাকাওয়ালাদের পক্ষে সাক্ষী দিতে হয় আর অসহায়দের আরও দুর্বল করা যায়। আর ধরেই নিলাম না হয়, আমি তোমার নামে কেস করে জিতে গেলাম। এই জিতে যাওয়ার প্রাপ্তি কি? ধর্ষক শাস্তি পেয়েছে এই কি শুধু সান্ত্বনা? জীবন কি সান্ত্বনার জন্য? সমাজের চোখ জানবে তুমি একটা ধর্ষক তাই তো?
কেন এটা জানলেও কি তোমার আত্মতৃপ্তি হবে না?
এটা আত্মতৃপ্তির বিষয় যতটা, তারচেয়ে বেশি সমস্যা হল এটা একটা সঙ্কট।
আমি আইনের কাছে শাস্তি পেলে আর সঙ্কট কোথায়?
সেখানেই তো তুমি ধর্ষক, তোমার দূর দৃষ্টি নেই। আছে কেবল অস্থিরতা।
আচ্ছা বেশ। মানলাম। তাহলে তুমিই বল শঙ্কট কোথায়?
সঙ্কট আমি কোথাও চাকরি করে শান্তি পাব না। বাজার করতে গেলে লোকে আমার দিকে যেভাবে তাকাবে সেই চাহনি আমার সহ্য হবে না। আমি কাউকে প্রেম নিবেদন করতে পারব না। আমি আমার প্রতিবেশী- আত্মীয়স্বজন সকলের চোখে প্রথম পরিচয়েই ধর্ষিতা হয়ে বেঁচে থাকব। সর্বত্রই আমি একটা নুহ্যমান জীবন যাপন করব। অথচ আমি হীন জীবন যাপন করতে পৃথিবীতে আসিনি। আমার স্বাভাবিক যাপন শক্তি নেয়ার অধিকার কারো নেই। সেটা তুমি বুঝতে যদি নারী হয়ে জন্মাতে।
তাহলে তুমি কি করতে চাও?
আমি চাই তুমি তোমার নিজের শাস্তি বেছে নাও, আমার চোখের সামনে নিজেকে শাস্তি দাও। আর তোমার সাথে আরও দুজন ছিল ওদের শাস্তিও ওরা বেছে নিবে।
ওদের কথা আমি বলতে পারব না।
তোমাকে পারতেই হবে।
তুমি তো সাংঘাতিক মেয়ে! অসহায় চেহারার ভিতরেও চোখে এত তেজ!
অবশ্যই আমি তোমার মত নই। ধর্ষিতার হয়েও ধর্ষকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার দৃঢ়টা আমার আছে। ভনিতা নেই এখানে। সব স্পষ্ট, স্বচ্ছ্ব।
এতই স্পষ্ট যে, নিজে দেবে না বলে বলে ফেলে দিচ্ছ কঠিন শাস্তির মুখেই।ওদের কিভাবে বলব?
সেটা তোমার একান্ত বিষয়।
ভারি মুশকিলে ফেললে তো।
তুমি আমাকে জীবনের যে মুশকিল প্রান্তে ফেলেছ তারচেয়ে এটা কিছুই নয়। বল তুমি কি শাস্তি দেবে নিজেকে?
আমি মন থেকেই চাই তুমি আমাকে জনসম্মুখে জুতা পেটা কর। যত খুশি তত। আমার মৃত্যুও দিতে পারো।
আমি তো তোমাকে বলেইছি আমি নিজে কোন শাস্তি তোমাকে দেব না।
আমি আমার ইচ্ছের কথা বলেছি।
আচ্ছা একটা কাজ করতে হবে তোমাকে। শাস্তি না কিন্তু কাজ।
বল কি করতে হবে?
একজন গাইনি ডাক্তার আনতে হবে।
ডাক্তার তো তোমাকে দেখে ফেলবে।
আমার মুখে কাপড় ঢাকা থাকবে।
ও। ঠিক আছে। আমি মোবাইল করে আনার ব্যাবস্থা করছি।
ঠিক আছে। এবার বল কি শাস্তি দিবে নিজেকে?
ভাবছি পায়ে, না হয় হাতে গুলি করব। সারাজীবন পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকব।
বাজে বোক না।
বাজে বোকলাম কোথায়? সিরিয়াসলি বলছি।
পঙ্গু মার্কা কোকানো জীবন থাকলে নিজের অসঙ্গতিগুলোকে শুধরাবে কখন?
তাও তো ঠিক। আচ্ছা পূজা তোমার অনেক বুদ্ধি তুমি আমাকে বলে দাও না প্লীজ। একদম তোমার মনের মত একটা শাস্তি বলে দাও।
ঠিক আছে। এই শহরে যত ধরশিতা আছে সবার জন্য সুষ্ঠু কাজের ব্যবস্থা করে দাও। সমাজের চোখ বদলে দাও। ধর্ষিতা মানেই তার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে এই মুখস্ত চিন্তা থেকে সমাজকে বের করে আনার উদ্যোগ নাও। আর পথে ঘাটে মেয়েদের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা কর। যেন প্রত্যেক মেয়ে দিনে রাতে সব সময় এই শহরের রাস্তায় চলার সাহস পায়।
তুমি খুব বুদ্ধিমতী। প্রথমে আমাকে ইমোশনাল করে দিয়ে আমার পেট খালি করে সব কথা শুনে নিলে। শাস্তি দেবে না দেবে না বলে ফেলে দিলে কঠিন শাস্তির মুখে! ঠিক আছে আমি তাই করার চেষ্টা করব। যত কঠিনই হক যতদিন বেঁচে থাকব এই কাজেই মন দিব। আজীবন করে যাব। এবার আমি বুঝেছি, ঐ দুটাকেও এই কাজে লাগাব। কিন্তু জয়দীপ তার কি হবে?
ওর শাস্তি যা পাবার আমি দিয়েছি। এখন তুমি ভেবে দেখ ওকে তুমি রাখবে কি রাখবে না।
আচ্ছা ওর কি হাল তাই তো জানি না।
তোমার ইচ্ছা থাকলে জেনে নিও। আমি খুব টায়ার্ড। আমাকে বাসায় ফিরতে হবে। তুমি ডাক্তার ডাকো জলদি।
ঠিক আছে। আচ্ছা একটা কথা বলবে?
কি?
আজকের পর যদি কখনও রাস্তায় দেখা হয় আমি কি তোমার সাথে কথা বলতে পারব?
না। আমি তোমাকে চিনব না। তবে হ্যাঁ আমি অপেক্ষায় থাকব নিজেকে কেমন শাস্তি দিচ্ছ সেটা দেখার জন্য। আর শোন ভুলেও কখনও জয়দীপের কাছে আমার মোবাইল নাম্বার চাইবে না। আর অন্য কারো কাছেও আমার সম্পর্কে কোন খোঁজ নিবে না।
তোমার মায়ের ওষুধ কি আমি কিনে এনে দেব?
না। আমি তোমাকে ইমোশনাল করার জন্যই ওইটুকু মিথ্যে বলেছিলাম।
মানে?
মানে খুব সহজ। শোন, আমি নারী অধিকার বিষয়ক একটা এনজিওতে চাকরি করি। মাসে যা আয় তা দিয়ে আমরা ভালই চলি। এছাড়াও বড় বাজারে আমার পৈতৃক দুটো দোকান আছে, কিছু জমিও আছে। এখন দ্রুত ডাক্তারকে ফোন দাও। বাসায় যেতে হবে। পুঞ্জ খুব মন খারাপ করে আছে। সে জানে অফিসের কাজে কাল রাতে বাসায় ফিরিনি, ফেরার পথে তার জন্য বায়না সামগ্রী কিনতে হবে। আমি মাকে বলেছি বিকেলের মধ্যে ফিরব। ও হেল্লো! কি ভাবছ অমন হা করে। এই ইস্তি ...
হু। না।
হু না মানে?
ভাবছি কি যেন শ্লোকটা তোমাদের মহালয়ার দিন মাইকে বাজে?
দুর্গা পূজা এখনও দেরী আছে। সময় হলে জেনে নিও মাইকে শুনে।
পূজা, তোমাকে শত শত শ্রদ্ধা জানালেও আমি নিজেকে তৃপ্তি দিতে পারব না। তুমি একটা কথা ঠিক বলেছিলে, ধর্ষক আসলে কাউকে ধর্ষণ করেনা; নিজেই ধর্ষিত হয়ে যায়। যেমন আমি। আমি নিজেই নিজেকে অসম্মান করেছি। তোমাকে অসম্মান করার যোগ্যতা আমার নেই। তোমাকে ধর্ষণযোগ্য নও। তোমাকে ধর্ষণ করিনি আসলে আমি নিজেকেই ধর্ষণ করেছি। নিজের শরীরকে, আত্মসম্মানকে। সত্যি আজ আমি নতুন দৃষ্টি খুঁজে পেয়েছি। নিজেকে অসংগতির ভিড়ে ঠেলতে পারবো না আর। কিছুতেই না। আজ আমি জীবনের গভীরে এমন আদরের ছোঁয়া অনুভব করেছি যার মধ্যে কোন যৌনতা নেই, যা জৈবিক নয় কেবল মানবিক। বোধ হয় এবার আমি মানুষ হয়ে উঠব। কবে কোন মানুষ এসে জীবনের দিক বদলে দিবে কেউ জানে না। তুমি আমার বয়সে বেশ ছোটই হবে। সেই তুমিই আমাকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দায়িত্ব দিলে। আর আমার মনে হচ্ছে আমি যেন এই কাজটির জন্যই জন্মেছিলাম। নিজেকে জানতে পারিনি বলেই ভুল পথে ভুল কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি। আজ আমি আমাকে খুঁজে পেয়েছি পূজা।
বাল্মীকি এক সময় ডাকাত ছিলেন,তারপর চেতনাদয়ের পরিবর্তনে তিনি মুনি হয়ে ওঠেন। রামায়ন রচনা করেন, যেখানে প্রতি অধ্যায়ে কাহিনীর ভিতর দিয়ে নীতি কথা লেখেন। যদি মানুষের খারাপ দিকগুলো তিনি না জানতেন তাহলে তার বিপরীতে ভালো রিপুকে প্রকাশ করতে পারতেন না। তুমিও তোমার জীবনের আকাশে যে অসংগতির ঘুড়ি দেখেছ তারি উল্টোগুলো তোমার নাটাইয়ে বাঁধা আছে। জীবন তোমাকে অসংগতির ঘুড়ি দেখিয়েছে এবার নাটাই খুঁজে নেয়ার দায়িত্ব তোমার নিজের।
(শেষ পর্ব)
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71