রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
রবিবার, ১৪ই ফাল্গুন ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
ধর্ম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়
প্রকাশ: ০২:০৬ pm ০৫-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০২:০৬ pm ০৫-০১-২০১৭
 
 
 


যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন। যা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের মতো। এর মধ্যে আমিও একজন। আমি যদিও পুরোপুরি ধার্মিক নই, তবে ধর্মের বিধিনিষেধ যেমন নামাজ পড়া, রোজা করা, মিথ্যা না বলা, প্রতারণা না করা, মানুষের উপকার করা, সৎ পথে চলা—এই বিষয়গুলো মেনে চলার চেষ্টা করি।

আমি যখন বাংলাদেশে ছিলাম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম পালনের প্রতি অন্য অনেকের মতো আমারও বিতৃষ্ণা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা, জামাত-শিবিরের ধর্মের নামে হিংস্র রাজনীতি, অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মোল্লাদের মানবতা বিরোধী ফতোয়া, নিজেদের ফায়দার জন্য রাজনীতিবিদদের ধর্মের ব্যবহার ইত্যাদি, অনেক তরুণকে করেছিল ধর্মের প্রতি বিমুখ।

ধর্মকে প্রকৃতভাবে না জানার কারণে ধর্মহীনতাকে বেছে নিয়েছিল অনেক তরুণ। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের বিরোধিতা করাটাই যেন ছিল প্রগতিশীলতার মাপকাঠি (হয়তোবা এখনো আছে)। আমি যখন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, ধর্মান্ধদের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে বলার জন্য আমাকে নাস্তিক ও মুরতাদ বলেও ঘোষণা করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আমার অন্য অনেক দেশের মুসলমান বন্ধুদের দেখে আমি ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জানার জন্য আগ্রহী হই এবং কোরআন শরিফের ইংরেজি অনুবাদ পড়া শুরু করি। আমি তখন অনুভব করা শুরু করি, ইসলাম বা অন্য যেকোনো ধর্মই মানুষকে খারাপ হতে শেখায় না। ধর্ম মানবতার কথাই বলে, মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় শুধু মানুষ হিসেবেই। আল কায়েদা, আইসিস বা যেকোনো জঙ্গিবাদই ধর্মের অপব্যবহার করে ধর্ম না জানা মানুষগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে।


নাইন ইলেভেনের পর পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জানার জন্য মানুষের আগ্রহ বাড়ে এবং অনেক মানুষ ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, মুসলমানদের প্রতি ঘৃণাজনিত অপরাধের প্রবণতাও বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ের ইসলামি চিন্তাবিদের অনেকেই উত্তর আমেরিকার ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলমান।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষী নির্বাচনী প্রচারণা ও তাঁর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে আরেক দফা জানার আগ্রহ তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসীদের মধ্যে। চলমান সময়ে অনেক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ইসলাম ধর্ম বিষয়ে জানার জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করছে। গত দেড় মাসে এই ধরনের দুটি অনুষ্ঠানে আমার বক্তা হিসেবে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।


প্রথম অনুষ্ঠানটি ছিল Thanksgiving Day উপলক্ষে। ওই অনুষ্ঠানে প্রথমেই আমাকে পবিত্র কোরআন থেকে সুরা পাঠ এবং তারপর দোয়া করার জন্য অনুরোধ করা হয়। আমি সুরা ফাতেহার অনুবাদ পাঠ ও তারপর দোয়া করি। অনেকেই আমাকে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে প্রশ্ন করে এবং পরে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই জন্য যে, আমি ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে তাদের ভুল ধারণা কিছুটা হলেও শুধরানোর চেষ্টা করেছি।


পরের অনুষ্ঠানটি ছিল একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এখানে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধর্মের বিষয়ে জানানোর জন্য একদিন বিভিন্ন ধর্মের লোকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল ইসলাম ধর্ম বিষয়ে বলার জন্য। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর সামনে আমি ইসলাম ধর্মের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি এবং ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রাণিত করি আমাকে প্রশ্ন করার জন্য। অনেকগুলো প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল আইসিস ও মুসলমানরা কেন মানুষ হত্যা করে এবং ইসলাম ধর্ম কেন মানুষ খুন করার জন্য প্ররোচনা দেয়।

আমার উত্তর ছিল-কোনো ধর্মই মানুষ হত্যা বা মানুষের ক্ষতি করার জন্য বলে না। মুসলমানদের ধর্ম গ্রন্থে বলা আছে যদি কেউ বিনা অপরাধে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল।

আর যদি কেউ একটি জীবন বাঁচায়, সে যেন পুরো মানবজাতিকে বাঁচাল। আসলে ধর্মের শিক্ষা আর সে ধর্মের কিছু অনুসারীর আচরণ এক নাও হতে পারে; আর যদি সেটা না হয় তার জন্য ধর্মকে দোষ দেওয়া যায় না। আমি ওদেরকে বলি যেমন ধরো যিশুখ্রিষ্ট—যাকে মুসলমানরাও নবী বলে মানে এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা যার অনুসারী, তিনি কি মানুষকে ঘৃণা করার কথা বলেছেন বা এটা বলেছেন যে, এই রঙের মানুষদের ভালোবাসো এবং ওই রঙের মানুষদের ঘৃণা কর।

না, উনি তা বলেননি। কিন্তু ওনার অনেক অনুসারী এই আমেরিকাতেই অনেককে ঘৃণা করে। তাই বলে তাদের আচরণের জন্য কি যিশুকে বা পবিত্র বাইবেলকে দায়ী করা যাবে। উত্তর হবে—না। ঠিক একইভাবে আইসিস বা কিছু মুসলমানের হিংসাত্মক আচরণের জন্য ইসলাম বা পবিত্র কোরআনকে দায়ী করা যাবে না।


যখন ইসলাম ধর্মের নামে সারা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানো হচ্ছে এবং যেখানে ইসলাম সংখ্যালঘু ধর্ম, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশে ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জানা এবং সেই ধর্ম পালনকারী নাগরিকদের শ্রদ্ধা করা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চেষ্টা করা হচ্ছে এটা নিশ্চিত করতে যে, মুসলমানরা তাদের ধর্ম যেন পালন করতে পারে নির্ভয়ে। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষগুলো আজও বাস করছে নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে।


আমার এই ভেবে কষ্ট ও দুঃখবোধ হয়, এই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করে ও সংখ্যালঘু হয়েও আমরা যেভাবে সমান মানবাধিকার ভোগ ও নির্ভয়ে ধর্মচর্চা করি। সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের সহকর্মী, প্রতিবেশী, বন্ধু ও সাধারণ মানুষ আমাদের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। সেখানে আমি যেই দেশে জন্ম নিয়েছি, সেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, যারা জন্ম জন্মান্তর বাংলাদেশে বাস করছে অন্য সবার মতো, যাদের একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, তারা কীভাবে নির্যাতিত হচ্ছে তাদেরই প্রতিবেশী, বন্ধু আর রক্ষকদের হাতে।

ড. মাহফুজুল ইসলাম খোন্দকার: Professor and Chair, Department of Criminal Justice, Kutztown University, Pennsylvania, USA.

 

এইবেলাডটকম/পিসি 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Migration
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71