সোমবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৭
সোমবার, ৮ই কার্তিক ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
দেশীয় পপ সংগীতের প্রতীক পুরুষ আজম খান
প্রকাশ: ০১:২৫ am ০৬-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ০১:২৫ am ০৬-০৬-২০১৫
 
 
 




পপ ও ব্যান্ডসঙ্গীতের এই অন্যতম অগ্রপথিককে ‘গুরু’ নামে ডাকা হয়। বাংলা লোকসঙ্গীত, আধুনিক ও সমাজ সচেতন গানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের পপরীতির স্বার্থক সম্মিলন ঘটিয়েছেন তিনি।আজম খান ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক৷ বাংলাদেশে পপ সংগীতের অন্যতম পথপ্রদর্শক৷ তাঁর চটুল পপ আঙ্গিকের সংগীত বাংলাদেশের যুব সমাজের কাছে পেয়েছে বিপুল সমাদর৷ শুধু বাংলাদেশেই নয় গোটা উপ মহাদেশেও আজম খান পেয়েছেন অসাধারণ জনপ্রিয়তা৷
বাংলা পপসংগীতের অবিসংবাদিত সম্রাট আজম খান। যার কণ্ঠে উন্মোচিত হয়েছিল বাংলা গানের এক অন্যধারা। দেশীয় পপগানের আকাশে তিনি ঘটিয়েছিলেন নতুন সূর্যোদয়। যে কারণে বাংলাদেশের পপসংগীতাঙ্গনের সব তারকা বিনা দ্বিধায় ভালবাসা আর অসীম শ্রদ্ধায় তাকে বসিয়েছেন পপগুরুর আসনে। অপরাজেয় এই যোদ্ধা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য। জীবন বাজি রেখে ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়। যুদ্ধোত্তর দেশে সূচনা করেছিলেন আরেক সংগ্রামের। সে সংগ্রাম নতুন ধারার সংগীত সৃষ্টির। সংস্কৃতির অচলায়তনে তুমুল আলোড়ন তুলে স্বাধীন দেশে পাশ্চাত্য সংগীতের ধারায় সংগীত রচনা ও পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তারুণ্যের দুর্দমনীয় বাঁধভাঙা স্পন্দন বইয়ে দিয়েছিলেন তিনি, বাংলাদেশে পপসংগীতের পথিকৃৎ হিসেবে। তার গানের জাদুতে, গায়কির নৈপুণ্যে মুগ্ধ সংগীতপ্রেমী কোটি বাঙালি। এমনকি ভিন্ন ভাষাভাষী অগণিত মানুষের কাছেও দারুণ সমাদৃত একজন সংগীতশিল্পী তিনি।
আজম খানের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুর কলোনির ১০নং সরকারি কোয়ার্টারে। তার পুরো নাম মাহবুবুল হক খান। বাবা আফতাবউদ্দিন আহমেদ ও মা জোবেদা খাতুন। আফতাব উদ্দিন ছিলেন সেক্রেটারিয়েট হোম ডিপার্টমেন্টের এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। আজম খানের তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে। বড় ভাই সাইদ খান, মেজো ভাই আলম খান (সুরকার), ছোট ভাই লিয়াকত আলী খান ও ছোট বোন শামীমা আক্তার খানম।
১৯৫৫ সালে প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে বেবিতে ভর্তি হন। এরপর ১৯৫৬ সালে কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাইমারিতে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৭০ সালে টিএন্ডটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি।
১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানান। এরপর থেকে সেখানে বসতি তাদের। ১৯৮১ সালে ১৪ই জানুয়ারি সাহেদা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় আজম খানের। তখন তার বয়স ছিল ৩১ বছর। সহধর্মিণী মারা যাওয়ার পর থেকে একাকী জীবন কাটান তিনি। আজম খান দুই মেয়ে এবং এক ছেলের জনক। বড় মেয়ে ইমা খান, মেজো ছেলে হৃদয় খান ও ছোট মেয়ে অরণী খান। এ ছাড়া আছেন চার ভাই, এক বোন।
পপসম্রাট আজম খান ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সক্রিয়ভাবে।

‘‘ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা আজম খান’’
মাত্র ২১ বছর বয়সে যুদ্ধে অংশ নেন তিনি।সে সময় তার গান সহযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছিল।
একাত্তরে যুদ্ধ শুরুর পর আজম খানের গন্তব্য ছিল আগরতলা৷ ঢাকা থেকে পুরো পথটাই তিনি পেরিয়েছেন, পায়ে হেঁটে, দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে৷ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আজম খান গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ভারতের মেলাঘর শিবিরে৷ সেই শিবিরেই তাঁকে দেখেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বড় ছেলে রুমী৷ রুমী স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন৷ তবে যুদ্ধকালীন সময়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আজম খানের কথা বলেছিলেন তিনি৷ জাহানারা ইমাম তাঁর ‘‘একাত্তরের দিনগুলি'' বইতে রুমী'র বলা মেলাঘরের গল্প তুলে ধরেন এভাবে,
‘‘সে রাতে টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি কি, একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর:
হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ
বুঝলাম আজম খান গাইছে৷ আজম খানের সুন্দর গানের গলা৷ আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা৷ সেদিন সেই রাতে চারদিক ভীষণ অন্ধকার, অন্যসব ব্যারাক আর তাঁবুর সবাই বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে গেছে৷ ন'টা-দশটাতেই মনে হচ্ছে নিশুতি রাত৷ ঐ একটা তাঁবুর ভেতর হারিকেনের আলো ছড়িয়ে সাদা রঙের পুরো তাঁবুটা যেন ফসফরাসের মতো জ্বলছে''৷
ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে আজম খান কুমিল্লার সালদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন৷  আজম খান ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইনচার্জ। আর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল খালেদ মোশাররফ। তিনি সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত অপারেশন তিতাস।ঢাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে আজম খান বাম কানে আঘাত পান৷ পরবর্তীতে এই আঘাত ভুগিয়েছিল তাঁকে৷ মুক্তিযুদ্ধে সর্বশেষ মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংঘটিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন।

পপগুরু আজম খানের খুব কাছের বন্ধু গণসংগীত ও লোকসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর৷ তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে একসঙ্গেই অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা দু'জন৷ গানের সুরে আন্দোলনকে জাগিয়ে তুলেছিলেন দুই বন্ধু৷
ফকির আলমগীর বলেন, আজম খানের মধ্যে একটা স্বাধীন চেতা, দ্রোহী মন ছিল৷ সেই চেতনা থেকেই তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন৷
সত্তরের প্রথমার্ধে বংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম কনসার্ট৷ তার পর থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশ জুড়ে৷ ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা পপ সংগীতের এক প্রতীক পুরুষ৷ মুক্তিযুদ্ধের পর তার ব্যান্ড উচ্চারণ এবং আখন্দ ভ্রাতৃদ্বয় (লাকী আখন্দ ও হ্যাপি আখন্দ) দেশব্যাপী সংগীত জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।



১৯৭২ সালে বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেককে ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকাল করে অনুষ্ঠান শুরু করেন। ওই বছরই ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ আর ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সরাসরি প্রচার করা হয় বিটিভিতে। ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয় এ দুটো গান। দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে যায় তাদের ব্যান্ড। আজম খান ১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’ শিরোনামে গান গেয়ে হইচই ফেলে দেন। তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘আমি যারে চাইরে’, ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘একসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি। শুধু সংগীতেই নয়, মিডিয়ার অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার বিচরণ ছিল সাবলীল।
১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে হিরামনের একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।
২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম মডেল হন। এরপর ২০০৫ ও ২০০৮ সালে বাংলালিংক এবং ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপন করেন।
আরেকটি পরিচয়ে তার বেশ সুনাম ছিল। ক্রিকেটার আজম খান। গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলেছেন।
বিশ্বের বেশ ক'টি দেশে কনসার্ট পরিবেশন করেন আজম খান৷ এসব কনসার্টে শুধু প্রবাসী বাঙালিই নয় বহু বিদেশী সংগীতানূরাগীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি৷ বাংলা সংগীতের নানা ধারার গান পপ আঙ্গিকে গেয়েছেন আজম৷
খুব সহজ সরল জীবন যাপন করতেন তিনি৷ যদিও ১৭ টিরও বেশি হিট গানের অ্যালবাম বেরিয়েছে বাজারে৷ কয়েক মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে৷ কিন্তু কপিরাইটের কারচুপির কারণে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা তাঁর ছিল না৷ আর এই টাকার অভাবেই সিঙ্গাপুরে ক্যান্সারের চিকিৎসা হতে পারেনি৷এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দুরারোগ্য ব্যাধির সংগে লড়াই করে ২০১১ সালের পাঁচ জুন আমাদের ছেড়ে তিনি চিরতরে চলে যান না ফেরার দেশে। দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এ শিল্পী। দেশজ লোকসংগীত, পল্লিগীতি, আধুনিক অথবা সমাজ সচেতন গানের সাথে পপ শৈলীর মিশ্রণ দিয়ে গানের এক বিরাট সম্ভার রেখে গেলেন তিনি৷
বাংলা গানে নতুন একটি ধারার সূচনা তার হাত ধরে। সত্তরের দশকে পপ ও রকসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছেন তিনি। তার কালজয়ী সব গান সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাবে আজীবন।
লেখা ও সম্পাদনা : হাবিবুর রহমান সিজার
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
Loading...
 
 
 
Loading...
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করুন # sukritieibela@gmail.com

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

   বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: sukritieibela@gmail.com

  মোবাইল: +8801711 98 15 52 

            +8801517-29 00 01

 

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71