বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০১৭
বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মাঘ ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
দুর্ভাগা হিন্দু মুক্তিযোদ্ধার কপালে ৪৫ বছরেও জোটেনি সনদ
প্রকাশ: ০৩:৪২ pm ০৭-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৩:৪২ pm ০৭-০১-২০১৭
 
 
 


সুনামগঞ্জ:: একাত্তরে ধীরেন্দ্র সরকারের বয়স ছিল ২০। মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য যুদ্ধ করেননি। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভেবে এখন একটি সনদ তাঁর দরকার। এই আক্ষেপের কথা জানালেন ৪৫ বছর পরে।

তখন তিনি সুনামগঞ্জ শহরের বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সবার বড়।

যুদ্ধ শুরু হলে বাড়ি চলে আসেন। মানুষ তখন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত ছুটছিল। মানুষের এই অনিশ্চিত যাত্রা দেখে ধীরেন্দ্রর মনে ধাক্কা লাগে। পাক সেনারা তত দিনে তাঁর পাশের গ্রামে পৌঁছে গেছে। তিনিও পরিবারের সঙ্গে যান ভারতের বালাটে। মৈলাম শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।   সেখানে মানুষ ছিল গাদাগাদি করে। এ সময় চাচাতো ভাই কামদা সরকার তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু বাবা মত দিচ্ছিলেন না। তাই আগস্টের একদিন পরিবারকে না জানিয়েই ট্রেনিং নিতে চলে যান।

 

মেঘালয়ের ইকোওয়ানে প্রায় এক মাস ট্রেনিং নেন তিনি। অস্ত্র হাতে নিয়ে সহজ-সরল ছেলেটির বুক কেঁপে উঠেছিল। দলের সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে ফের বালাট ট্রানজিট ক্যাম্পে চলে আসেন। খবর পেয়ে বাবা দেখা করতে আসেন। সঙ্গে একটি চাদর ও কিছু ফল। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ছেলেকে রণাঙ্গনে যাওয়ার অনুমতি দেন।  

সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা বনগাঁওয়ে জলিল ভূঁইয়ার ডি কম্পানিতে পাঠানো হয় তাঁকে। ওই কম্পানির টুআইসি (সেকেন্ড ইন কমান্ড) ছিলেন সুনামগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তালেব আহমদ। ধীরেন্দ্রকে তিনি সম্মুখযুদ্ধের জন্য হাতে-কলমে অস্ত্র চালানো শেখান। তিনি বলতেন, ‘ধীরেন্দ্র, যুদ্ধক্ষেত্রে ঘাবড়াতে নেই। সাহস আর শক্তিই বড় সম্বল। ইসলামপুর এলাকায় ছোটখাটো একটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন ধীরেন্দ্র সরকাররা। পরে মঙ্গলকাটা-ইসলামপুর এলাকায় নভেম্বরের ২৭ তারিখ আরেকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন ধীরেন্দ্র। ওই যুদ্ধে তালেব আহমদকে ধরে নিয়ে যায় পাক হায়েনারা। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় তালেব আহমদের দল। ধীরেন্দ্র সরকারসহ দলের অন্যরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ওই যুদ্ধে ধীরেন্দ্রর বন্ধু আলাউদ্দিনকেও ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তান বাহিনী। বাবার দেওয়া চাদরের তলে অনেক রাত কাটিয়েছেন ধীরেন্দ্র আর আলাউদ্দিন। তালেব আহমদ, আলাউদ্দিনসহ ধীরেন্দ্রর অনেক সহযোদ্ধাই আর ফিরে আসেননি।

ধীরেন্দ্র এখনো ভুলতে পারেন না তালেব আহমদের স্মৃতি। বললেন, ‘অসম্ভব সাহসী ছিলেন তালেব ভাই। অস্ত্রের পাশাপাশি একটি ধারাল চাকুও সঙ্গে রাখতেন। তার সাহস ও মনোবল দেখে আমরা সাহস পেতাম। ’

তালেবকে হারানোর কয়েক দিন পরেই ধীরেন্দ্ররা খবর পান মুক্তিসেনাদের আক্রমণের মুখে পালাতে শুরু করছে পাক হায়েনারা। ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মুক্ত দিবসের পর ধীরেন্দ্র সরকার অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগীরগাঁও ক্যাম্পে গিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করেন। বিজয় দিবসের ১০-১২ দিন পর বালাটের মৈলাম শরণার্থী শিবির থেকে পরিবারকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।

স্বাধীন দেশে বিজয়ীর বেশে স্কুলে গেলে অভিনন্দন জানায় সতীর্থরা। মুক্তিযুদ্ধের পরে এই বিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পাস করেন। পরিবারে অভাব ছিল, তাই আর পড়তে পারেননি; বাবার সঙ্গে হাত লাগান গৃহস্থালিতে। ১৯৭৬ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীতে। অবসর নেন ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এখন বাড়িতেই থাকেন। কৃষিকাজ করেন। স্ত্রী প্রাঞ্জলী দেবী, তিন ছেলে বিস্ময় সরকার, মৃণ্ময় সরকার এবং উদয়ানন্দ সরকারকে নিয়েই সংসার। তবে পঁচাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ-সংক্রান্ত সনদ হারিয়ে ফেলেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে পরে ক্ষোভে-দুঃখে আর তোলেননি। এখন অবশ্য সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সনদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। উল্লেখ্য, ৫নং বালাট সাব-সেক্টরের ‘নমিনেল রোল অব এফ-সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টার সুনামগঞ্জ’র ১৯নং পৃষ্ঠার ১০৬৯ ক্রমিক নম্বরে তাঁর নাম আছে। 

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Migration
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71