বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০
বৃহঃস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
তাহারা থামিয়া নাই
প্রকাশ: ১০:৩৩ pm ১২-০৪-২০২০ হালনাগাদ: ১০:৫৩ pm ১২-০৪-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


মনজুরুল আহসান বুলবুল

হোম কোয়ারেন্টিনের সময় বেড়েই চলেছে। অবস্থা বেগতিক, একেবারে শিবরাম চক্রবর্তীর মতো। ‘উল্টোরথ’ পত্রিকার অমিতাভ বসু শিবরামের কাছে জানতে চাইলেন: ‘সকালে আপনি কখন ওঠেন?’ শিবরাম হেসে বললেন, ‘সেটা সময়সাপেক্ষ। ঘুম ভাঙলেই ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু রাতভর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এমন ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে সেই ক্লান্তি দূর করতেই আবার একটুখানি ঘুমিয়ে নিতে হয়। এমনি করে করে যখন না উঠে পারা যায় না, খুব খারাপ দেখায়, তখন বাধ্য হয়েই বিছানা ছাড়তে হয়।’ আমাদের তো এখন দিবস রজনী একাকার। অবস্থাও শিবরামের মতোই। যেসব দেখতে চাই না, শুনতে চাই না এখন বাধ্য হয়েই, সেসব দেখতেও হচ্ছে, শুনতেও হচ্ছে।

করোনাময় সব খবর। সবাই বিশেষজ্ঞ! কত মত—‘কেন হইলো, কেন হইলো না , কী করিলে কী হইত, এখন কী হইবে, কী করিতে হইবে, কিনা করিলে কী হইবে’— টেলিভিশনে এসব বাক্যবাণ আর সংবাদপত্র ও অনলাইনে পাঠ্যবাণে জীবন ওষ্ঠাগত প্রায়।
কিন্তু ওই যে জীবন বড় বালাই! নমস্য চিকিৎসক দেবী শেঠী বলছেন, মানুষের জীবনই যদি না বাঁচে তবে অর্থনীতি বাঁচাবে কে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইএমএফ বলছে, চাকরি বাঁচানোর পূর্বশর্ত হচ্ছে জীবন বাঁচানো। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় একই রকম বলেছেন।

এই নমস্যদের বাণী অনুসরণ করে জীবন বাঁচানোর কাজই তো করছি। স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব বরণ করে মুক্ত জীবনের প্রহর গুনছি। টিকে থাকলে জীবিকার কী হবে, সেই চাপ থেকেও তো মুক্তি নাই!

এর মধ্যে ভালো ভালো খবর শুনে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা আরও উগ্র হচ্ছে। পৃথিবীতে বায়ু এবং পরিবেশ দূষণের মাত্রা নাকি কমে এসেছে। কক্সবাজারে মনুষ্য অত্যাচারে যে প্রকৃতি এতদিন নিজেকে মেলে ধরতে পারছিল না, সেখানে প্রকৃতি নাকি এখন আপন ভাষায় বাক বাকুম করছে। তালাবন্ধ রমনার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি অবারিত সবুজের মহাপ্লাবন, শুনি ঝিঁঝি আর কোকিলের স্বাধীনতার গান। এই করোনা দুর্যোগেও পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতিতে খুশি হই। ছাদ থেকে মাঝে মধ্যে জনশূন্য রাজধানীর সড়কে মেট্রোরেলের অগ্রসরমান কাজে সুউচ্চ পিলারগুলো দেখে বলি, হে করোনা, অনুগ্রহ করে একটু করুণা করো। দূষণমুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য, রমনা আর কক্সবাজারের নিরুদ্রপ প্রকৃতি দেখার জন্য, আমাদের সম্মানের প্রতীক পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে এক নিঃশ্বাসে ছুটে যাওয়ার জন্য, ঢাকার বুক চিরে শীষ দিয়ে চলা মেট্রোরেলে চড়ে বাঁধাহীনভাবে মতিঝিল, মিরপুর, উত্তরা ঘুরে আসার জন্য, আর কিছুটা সময় দাও। দয়া কর।

কিন্তু প্রার্থনা শেষ করেই ‘ভ্রম’ ভাঙে। হিসাব দেখে আঁতকে উঠি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী করোনা আক্রান্ত হয়ে ৮ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ৩০ জন। আর ১৫ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৯ জন (৭ এপ্রিল পর্যন্ত)। দেশে গণপরিবহন বন্ধ। কিন্তু ট্রাক, মোটরসাইকেল আর স্থানীয় পরিবহন চলছে ফাঁকা রাস্তায়। এতেই এই অবস্থা। সড়ক দুর্ঘটনার এই করোনা আঘাত হেনেছে সিলেট, নাটোর, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর এমনকি খোদ রাজধানীতেও। শুধু কী দেশেই! করোনা মহামারিতে চীনে অবস্থান করে রক্ষা পেলেও, চেনগং ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের ছাত্র মো. ময়নুদ্দিন ওরফে মাইন (২২) চীনে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে এর মধ্যেই। যশোরের মাইন চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ২য় বর্ষে ৪র্থ সেমিস্টারে পড়াশোনা করছিল।

কাজেই, কী দেশে কী বিদেশে, করোনার হাত থেকে রক্ষা পেলেও সড়ক পথের দানব হয়তো ছাড়বে না আমাদের।

করোনায় গোটা পৃথিবী স্থবির হলেও ‘সড়ক দানব থামিয়া নাই’।

করোনার দাপটে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সব মানুষ আজ জীবনের দাবিতে একাকার। কিন্তু পত্রিকা খবর দিচ্ছে করোনাভাইরাসের বিস্তারের মধ্যেই ১০ দিনে ঢাকা মহানগরে ধর্ষণ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অপহরণের ২৮টি মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন ৩৭ জন। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত এই তথ্য জানিয়েছেন।

এর বাইরে গত এক সপ্তাহের ঘটনা—চুয়াডাঙ্গায় এক সংখ্যালঘু নারীকে ধর্ষণ চেষ্টায় একজনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে, খুলনার ডুমুরিয়ায় আটক হয়েছে ২ ধর্ষক, যশোরে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় আটক হয়েছে ৭ জন। শুধু হত্যা, ধর্ষণ নয়, নারীদের অপদস্থ করার দুর্বৃত্ত চক্রও থেমে নাই। এই চক্রের ছোবলে পড়ে করোনায় আক্রান্ত না হলেও নিজেকে বাঁচাতে পারেনি এক স্কুলছাত্রী। ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি দেওয়ায় নড়াইলের লোহাগড়ায় আত্মহত্যা করেছে ওই স্কুলছাত্রী। ওই গ্রামের এক সৌদি প্রবাসী এই ছবি ছড়িয়ে দেয়। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় এক কিশোরীকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কিশোরীর আপত্তিকর ভিডিও, ভাইরালের হুমকি দিয়েছে দুর্বৃত্তদল। ‘থামিয়া নাই’ ধর্ষককূল, নারী নির্যাতনকারীরা।

চুরি ডাকাতি থেমে নেই। ‘মুখোশ পরে ডাকাতি’ এমন শিরোনামে কত খবর দেখেছি। করোনাকালে সেই শিরোনাম পাল্টে হলো ‘মাস্ক পরে ডাকাতি’। সংবাদ মাধ্যম বলছে—ঢাকার মোহাম্মদপুরের বিল্লাহ ফার্মেসিতে ডাকাতি করা মাস্ক পরিহিত ডাকাতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে—ডাকাতদের মুখে মাস্ক থাকায় তাদের চেহারা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির সাহায্য ডাকাতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

থেমে নেই হত্যা, খুন, সহিংসতা। ১ এপ্রিল বাঘাইছড়িতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে কিশোর গ্যাং। পাবনার সুজানগরে গৃহবধূকে হত্যার দায়ে স্বামী গ্রেফতার হয়েছে। বাগেরহাটে প্রতিপক্ষের হামলায় ছয়জন আহত। প্রতিহিংসা থেমে নেই। থেমে নেই মারপিট, বাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ। গোপালগঞ্জে জমি নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৫, চান্দিনায় গরুতে ফসল খাওয়া নিয়ে হামলা ভাংচুর আহত ৪। রূপগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধ, বৃদ্ধকে কুপিয়ে হত্যা। সোনারগাঁ ও কালিয়াকৈরে হামলায় আহত ১২।

তবে ‘করোনা নীতি’ মেনে সংঘর্ষ হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়! সেখানে লুডু খেলা নিয়ে সংঘর্ষে দুই দলই ব্যবহার করেছে মাস্ক এবং সামাজিক দূরত্ব রক্ষার জন্য ব্যবহার করেছে তিন ফুট দৈর্ঘ্যের বাঁশের লাঠি, কারও কারও হাতে গ্লাভসও ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সংঘর্ষ ‘থামিয়া নাই’।

প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন, দুঃসময়েই মানুষের আসল পরিচয় পাওয়া যায়। বলছেন, এই দুঃসময়ে যারা ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম করবে তাদের ছাড়া হবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! থেমে নাই লুটপাট।

করোনা ত্রাণের তালিকা তৈরি নিয়ে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের হাতাহাতি হয়েছে, বিষয়টি গড়িয়েছে মামলা পর্যন্ত। নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় আওয়ামী লীগের এক নেতার গুদাম থেকে দুস্থ মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ভিজিডির চার মেট্রিক টন চাল উদ্ধার করা হয়েছে। নেতার নাম আয়েত আলী। তিনি উপজেলার কালিগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। অনিয়মের আরেক চিত্র—তাড়াশে প্রতিবন্ধী ভাতা তালিকায় ৯ প্রবাসীর নাম ঢুকিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বারুহাসী ইউনিয়নের তালিকায় ঢুকে গেছে পাশের সগুনা ইউনিয়নের আমেরিকা ও ইতালি প্রবাসীদের নাম। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে হতদরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল কালোবাজারে বিক্রির দায়ে এক ডিলারকে ভ্রাম্যমাণ আদালত এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ডিলার গাজিউল হক কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক ইউপি চেযারম্যান।

বন্ধ নেই সাংবাদিক নির্যাতনও। ত্রাণের অর্থ লোপাটের খবর করতে গিয়ে মারপিটের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। ভোলার বোরহানউদ্দিনে সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় নাবিল হায়দারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নাবিল হায়দার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বড় মানিকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন হায়দারের ছেলে। আর নিগৃহীত সাংবাদিক সাগর চৌধুরী। সাগরের অপরাধ কী? জেলেদের সরকারি সহায়তা হিসেবে এক মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা, কিন্তু নাবিলের বাবা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন হায়দার চাল দিয়েছেন ১৪ থেকে ১৫ কেজি করে। সাগর এ নিয়ে সংবাদ করার কারণে বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিতে মারধর করা হয় সাংবাদিক সাগরকে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে সরকারি ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের সংবাদ প্রচার করায় সাংবাদিক শাহ সুলতান আহমেদকে ক্রিকেট খেলার ব্যাট দিয়ে পিটিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান হারুন ও তার লোকজন। এসময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিক এম মুজিবুর রহমান ও বুলবুল আহমেদ। কারণ কী? সম্প্রতি দরিদ্রদের মধ্যে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করেন ইউপি চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান হারুন। কিন্তু ১০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি বিতরণ করেন ৫ কেজি করে। সাংবাদিকদের অপরাধ, এই অনিয়মের কথা লিখেছিলেন তারা।

দেশেই নয় শুধু, সাংবাদিক নির্যাতন থেমে নেই আশপাশের দেশেও। পাকিস্তানে এক স্বনামখ্যাত পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশককে জেলে পাঠানো হয়েছে, আরেকজনের নামে জারি হয়েছে ওয়ারেন্ট। মিয়ানমারে এক সিনিয়র সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

‘থামিয়া নেই’ মাদক চোরাচালান

কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী প্রধান কারারক্ষী তরিকুল ইসলাম শাহীনকে ৫২২ পিস ইয়াবা ও নগদ ৩ হাজার ১৬০ টাকাসহ আটক করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে থেকে তাকে আটক করা হয়।

থেমে নেই বন্দুক যুদ্ধের ছোট গল্পও। পহেলা এপ্রিল নওগাঁয় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ২ জন। আত্রাই ও পত্নীতলার এ ঘটনা ঘটে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় বন্দুকযুদ্ধে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন; তারা মাদক ব্যবসায়ী বলে পুলিশের ভাষ্য। নিহতরা হলেন টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন পল্লানপাড়ার সুলতান আহমেদের ছেলে মাহমুদ উল্লাহ (২৬) ও উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ঝিমংখালী এলাকার জাফর আলমের ছেলে মোহাম্মদ মিজান (২৪)। 

সীমান্তে তাণ্ডব থেমে নেই। আখাউড়া সীমান্তে বিএসএফের পিটুনিতে আহত হয়েছে এক বাংলাদেশি। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বাংলাদেশি এক যুবক নিহত হয়েছেন। উপজেলার চোষপাড়া সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত যুবকের নাম জয়নাল আবেদিন (৩৫)। তার বাড়ি রানীশংকৈল উপজেলার জওগাঁও গ্রামে।

একটু চোখ দিই আশেপাশে। করোনাকালে পৃথিবীর সবচাইতে বড় লকডাউন চলছে ভারতে। এই লকডাউনে কখনও বাদ্যি বাজছে, কখনও আলো নিভছে, কখনও প্রদীপ জ্বলছে। কিন্তু করোনার এই সময়ে নিজেদের পথ নকশা থেকে একটুও নড়েননি মোদি-অমিত শাহ। কাশ্মিরে পহেলা এপ্রিল গভীর রাতে নতুন আইন করা হয়েছে। করোনা আবহের মধ্যেই ভারতের জম্মু-কাশ্মিরের স্থায়ী বাসিন্দাদের সংজ্ঞা বদলে গেছে। গভীর রাতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে নতুন ডোমিসাইল আইন ঘোষণা করে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যারা জম্মু-কাশ্মিরে গত ১৫ বছর ধরে বসবাস করছেন বা ৭ বছর ধরে সেখানে পড়াশোনা করছেন, সেখানকারই কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দিয়েছেন—এমন সবাই কেন্দ্রীয় শাসিত রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দার (ডোমিসাইল) মর্যাদা পাবেন। যারা সেখানে অভিবাসী হিসেবে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার দ্বারা নিজেদের নথিভুক্ত করেছেন, তারাও এবার থেকে নাগরিক বলে গণ্য হবেন। কেন্দ্রীয় সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি গবেষণাগারের যেসব কর্মী গত ১০ বছর ধরে জম্মু-কাশ্মিরে কাজ করছেন, তাদের সন্তানরাও এই সুযোগ পাবেন। কেবল এই স্থানীয় বাসিন্দারাই জম্মু-কাশ্মির সরকারের নন গেজেটেড স্তরের লেভেল ফোর (কনস্টেবল, জুনিয়র অ্যাসিস্টেন্ট) পর্যন্ত সব পদে চাকরির আবেদন করতে পারবেন।

যথারীতি এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কাশ্মিরের রাজনৈতিক দলগুলো। এতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পাকিস্তান।

করোনা মহামারীতে জবুথবু অবস্থা আমেরিকার। কিন্তু এর মধ্যে ‘থামিয়া নেই’ চীন আমেরিকার কথা যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সরকারি সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বেইজিংয়ের হিসাব সেখানকার বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে ‘ভালো দেখাচ্ছে’—বুধবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেছেন, চীনের সঠিক হিসাব জানার কোনও উপায় নেই। চীন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখাচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাও প্রতিবেদন দিয়েছে। চীনও পাল্টা জবাবে বলেছে, আমেরিকার ধারণা অমূলক।  

থেমে নেই মধ্যপ্রাচ্যও। ইরাকে বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে প্যাট্রিয়ট মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, এই দুঃসময়ে মানবিকতা দেখানোর যে সুযোগটি পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেটিও তারা ব্যবহার করতে পারলো না।
সৌদি আরবকে নিজ দেশের পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে কারফিই জারি করে। দুই মসজিদের ‘কাস্টোডিয়ান’ সৌদি বাদশাহ বাধ্য হয়েছেন দুই মসজিদে নামাজ বন্ধ রাখতে। হজ এবার হবে কিনা সেটিও অনিশ্চিত। কিন্তু তাদের প্রতিহিংসা থেমে নেই। সৌদি আরব ইয়েমেনে করোনা সংক্রমিত মাস্ক ফেলছে এমন অভিযোগ করেছেন ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী ধাইফুল্লাহ আল সামী। তিনি জানান, সৌদি যুদ্ধ বিমানগুলো রাজধানী সানাসহ কয়েকটি শহরে বিপুল পরিমাণ মাস্ক ফেলছে। ধারণা করা হচ্ছে এগুলো সৌদি আরবের করোনা আক্রান্ত রোগী বা চিকিৎসকদের ব্যবহৃত।

করোনা হোক আর যাই হোক, নেশাগ্রস্ত মদ্যপদের থামিয়ে রাখে সাধ্য কার। লকডাউনে ভারতে বন্ধ মদের দোকানও। কিন্তু যারা প্রতিদিন মদ্যপানে অভ্যস্ত, তাদের অনেকের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই কারণে কয়েকজন আত্মহত্যা করেছেন। এই সমস্যা এড়াতে মদ্যপায়ীদের জন্য বিশেষ পাসের ব্যবস্থা করেছে কেরল সরকার। শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় মদ বিক্রির সরকারি নির্দেশে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ইন্ডিয়ান মেড ফরেন লিকার’ বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আবগারি দফতর থেকে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিক্রি করা হবে এই মদ।

যুদ্ধকালে যে কয়েকটি বিষয় বেশি ছড়ায়, তার একটি হচ্ছে গুজব। করোনাবিরোধী এই বিশ্বযুদ্ধের সময় তারও ব্যতিক্রম নেই। তথ্যের বিপরীতে অপতথ্যের বিশাল স্রোত। গুজব ছড়ায় সাধারণত যথাযথ তথ্যের অবাধ প্রবাহ আটকে গেলে। তখন কেউ অপ্রতুল বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলে, আবার আরেকদল মতলববাজ নিজের মতলবি লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নামে। এবারও ব্যতিক্রম নেই। অপ্রতুল তথ্যের বিষয়টি সঠিক ও পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে মোকাবিলা করা যায়, কিন্তু মতলবিদের কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করা যায় না। যাই করা হোক, এরা ‘যদি/তবে/কিন্তু’ বলে প্রশ্ন তুলতেই থাকবে। যাদের কিছুই ভালো লাগে না, তাদের অতি ভালো দিয়েও সন্তুষ্ট করা যায় না।

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই গুজবওয়ালারা হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। এই মতলববাজদের মধ্যে দেশে যারা আছেন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিদেশে অবস্থান নেওয়া দুর্বৃত্তরাও। মিথ্যা বাক্য বিন্যাসে আর বানোয়াট নানা ছবির মিশ্রণে তারা তাদের তৎপরতা চালিয়েই যাচ্ছে। কেউ কেউ নানা অপকর্ম করে ঠাঁই নিয়েছে বিদেশে। কাজেই তাদের কাছে না দেশ বড়, না মানুষ বড়, না সংকট বড়। তাদের কাছে বড় হচ্ছে, তাদের ‘মতলব’। যেসব দেশে তাদের বাস, সেখানে করোনায় মৃত্যু তাদের ঘাড়ে শ্বাস ফেলছে, কিন্তু তারা থেমে নেই, অপকর্ম চালিয়েই যাচ্ছে।

বাংলা রম্য ও রাজনৈতিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ আবুল মনসুর আহমদ তার ‘বিদ্রোহী সংঘ’ রচনায় ব্যবহার করেছিলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্যারডি। একটি অংশ এরকম—‘...মোরা, অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/মোরা দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল/মোরা ভীম ভাসমান মাইন/মোরা মানি নাকো কোন আইন/মোরা বিদ্রোহী বীর…।’ আবুল মনসুর আহমদ, আপনি স্বর্গ থেকে দেখুন, আমরা (মোরা) এখনও কতটা দৃঢ় আমাদের অবস্থানে। এতটুকুই নড়চড় নেই! এমনকি পুলিশ, সেনাবাহিনী আমাদের বাড়িতে রাখতে পারছে না, মসজিদ মন্দির থেকে বের করতে পারছে না। পথে, ফেরিতে আমাদের রুখে সাধ্য কার?

করোনায় অসহায় করুণ মৃত্যু আমরা দেখছি, কিন্তু থেমে নেই আমাদের উচ্ছৃঙ্খলতা। হত্যা থেমে নেই, ধর্ষণ থেমে নেই, সড়কপথে আমরা বেপরোয়া, থেমে নেই লুট, আত্মসাৎ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, পরস্পরের প্রতি আমাদের বিশ্বাস নেই, আস্থা, শ্রদ্ধা নেই। রাজনীতিতে পরস্পরের দিকে বক্র ভ্রু তুলে তাকানো থেমে নেই। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ক্রিয়াশীল বিবৃতিজীবীদের বিবৃতি থেমে নেই। নদী দখল, ভূমি দখল, পাহাড় দখল থেমে নেই। থেমে নেই ব্যাংক খালি করে নিজের পকেটভারির আয়োজন। থেমে নেই টাকা পাচার করে স্বপ্নের দেশে বিত্তবিলাসী জীবনের স্বর্গ গড়ে তোলা। তবে আশার কথা, তাদের সেই স্বপ্ন স্বর্গেও এবার করোনা ছোবল হেনেছে। কোথাও তাদের স্বস্তিও নেই।

আজ করোনা আক্রান্ত এই সময়ে সবাই বলছেন, করোনা পরবর্তী বিশ্ব নাকি বদলে যাবে। নিজেও তাই মনে করি। বড় আশায় বুক বাঁধি। আহা, কেমন হবে সেই বিশ্ব? এত মৃত্যু, এত কান্না, এত দীর্ঘশ্বাসে আমরা কি শুদ্ধ হবো? করোনা কি ‘তাহাদের’ নিয়ে যাবে? করোনা পরবর্তী বিশ্ব কি এমন এক বিশ্ব হবে, যেখানে অন্যায় থাকবে না, অসত্য থাকবে না, হিংসা, জাতি-শ্রেণি-বর্ণ-ধর্মবিদ্বেষ থাকবে না! তেমন একটি পৃথিবী দেখার জন্যই তো আরও কিছুদিন টিকে থাকতে চাই। হে করোনা, দয়া করো, করুণা করো।

গোটা নিবন্ধজুড়ে ‘যাহারা থামিয়া নাই’ বলে আক্ষেপ করলাম, নতুন পৃথিবী ‘ভাইরাস করোনা’র সঙ্গে সঙ্গে নির্মূল করুক সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রের চিহ্নিত-অচিহ্নিত এই সকল ‘করোনা’কে ।

এই বাংলার লোককবি বুঝি এমন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেই বলেছিলেন—‘...বল, মানুষও মধুরও নাম/এ ধরা আনন্দধাম/স্বর্গ রচিবো ধরণীতে…।’

লেখক: এডিটর ইন চিফ, টিভি টুডে

সূএ: বাংলা ট্রিবউন

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71