শুক্রবার, ২৬ মে ২০১৭
শুক্রবার, ১২ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪
সর্বশেষ
 
 
ঘুরে আসুন পল্লীকবির বাড়ী
প্রকাশ: ০৬:৪১ pm ১৯-০৩-২০১৬ হালনাগাদ: ০৭:২৪ pm ১৯-০৩-২০১৬
 
 
 


অরুন শীল : পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হল  সোমবার।

১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকায় মারা যান তিনি। পরে তাঁকে ফরিদপুর সদরের গোবিন্দপুর গ্রামে পৈতৃক বাড়ির প্রিয় ডালিম গাছতলায় দাফন করা হয়। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী এই কবির লেখা ‘বেঁদের মেয়ে’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’, ‘কবর’, ‘নিমন্ত্রণ’ ও ‘আসমানী’ কবিতা আজও পাঠকের মনে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। পল্লীকবির জন্মদিনে এইবেলার পক্ষ থেকে ফরিদপুর থেকে ফিরে তৈরী করা হয়েছে এ প্রতিবেদন।

 “এই খানে তোর দাদির কবর, ডালিম গাছের তলে তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে” প্রিয় পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের কথা বলছি। কবির ভিজিয়ে রাখা সেই কবরটির পাশে আজও তার কবর ভিজিয়ে রেখেছে হাজারও দর্শনার্থীর চোখের জল।

ফরিদপুরের অম্বিকাপুর। কবি জসিমউদ্দীনের বাড়ি। নিস্তব্ধ গ্রাম। স্রোত হীন কুমার নদ। খোলা বাতাস। প্রকৃতির দৃশ্য মন কেড়ে নেয়। কুমার নদের পশ্চিমেই কবির বাড়ি। প্রবেশ করতেই পল্লী গ্রামের প্রকৃতি যেন আমার অনুভূতি স্পর্শ করে স্বাগত জানাচ্ছে। চারিদিকের গাছপালা, বাগান, কবির সমাধি ক্ষেত্র, পাখির কিঁচির মিচির শব্দ। কবির বাড়ী-আঙ্গিনায় চারটি দোচালা টিনের ঘর। তাতে লেখা; কোনটি কার ঘর। দক্ষিণে কবির ঘরে প্রবেশের অনুমতি না থাকায় চার পাশটা ঘুরেই দেখতে হলো। বারান্দায় ছোট ছোট পাটের ছিকা। ভিতরে নকসা করা মাটির রঙিন কলস রাখা। কিছক্ষণ কবির ঘরের আশে পাশে ঘুরলাম। অনুভূতিতে অনুভব করছিলাম।

অতি সাধারণ ঘরেই জন্ম নিয়েছেন এই কবি। ছোট্ট টিনের ঘরেই  জসিমউদ্দীনের জন্ম। কবির স্মৃতিঘরে বিভিন্ন মূহুর্তের ছবি তুলে চার দেয়ালে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কবির জীবনের ব্যবহারের বিভিন্ন জিনিস। তার কাঠের আলমারি, থেকে শুরু করে আছে একটা সুন্দর পালকিও।

কিন্ত স্মৃতিঘরের দুটি আলমারিতে সাজানো অসংখ্য মাটির পুতুল সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে দর্শনাথীদের। মজার ব্যাপার হলো প্রিয় কবির প্রিয় পুতুল; স্মৃতিঘরে পুতুলগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে সকলকে। স্মৃতিঘরের সামনে একটি সাইনবোর্ডে বিশ্বকবির লেখা। জসিমউদ্দীনের কবিতার ভাব ভাষা, রস ও বর্ণ নতুন মাত্রার।  


উঠানের পূর্ব দিকে এখনও ঢেকি-ঘরটি’ স্মৃতি স্বরূপ আছে। ঢেকি-ঘরের সামনে কবির লিখা কিছু কথা মনকে ছুঁয়ে গেল। “আমাদের গরীবের সংসার। ঘি-ময়দা-ছানা দিয়ে জৌলুস পিঠা তৈরীর উপকরণ মায়ের ছিলো না। চাউলের গুড়া আর গুড় এই মাত্র মায়ের সম্পদ।”
কথাগুলোর মাঝে ছিলো একরাশ মায়া, আবেগ অন্যদিকে মায়ের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিক। কতো অল্পতেও মানুষ সুখি হতে পারে- পল্লী কবি তার ভাষায় প্রকাশ করে গেছেন।
ঢেকি-ঘরের পাশেই আরেকটি ঘর। কবির এই ঘরে ঢুকেই অনেক ছবির মাঝে কবি পত্নী‌ মমতাজ জসিমউদ্দীনের ছবিটি দেখলাম। ৯ম শ্রেণীতে পড়াকালীন ১৪ বছর বয়সী এই কিশোরীকে কবি তার স্ত্রী হিসেবে ঘরে তোলেন। বিয়ের আরো অনেক আগেই জসিমউদ্দীন তাঁর অমর “কবর” কবিতাটি রচনা করেন, যেটি ছিল তার স্ত্রীকে নিয়েই লিখা।

ঘরের দেয়ালজুড়েও অনেক স্মৃতি কথা, টুকরো কাহিনী। বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিষগুলো এখনও কবির ইতিহাস। জীবনধারার প্রতিচ্ছবি। আছে তার ব্যবহারের কলম, বিভিন্ন বই খাতা ও অন্যান্য সামাগ্রি। সেখানেও রয়েছে অনেক মাটির ও তুলার পুতুল। ঘরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে কবির নিজ জীবনের বিভিন্ন কথা লিখা যা ছবির মতই টানানো।
ঘরজুড়ে কবির এতো স্মৃতিচিহ্ন, কবির অস্তিত্ত্বটাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। কবির ঘরের সামনেই কবির নিজ হাতে লাগানো একটি গাছের সামনে দাড়ালোম। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় লাগানো সেই গাছ আজও তাঁর বাড়িটিকে সাজিয়ে রেখেছে। আর তার বাড়ির পল্লী প্রকৃতিকে আরো সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছে।


কবির সাথে প্রকৃতির যে কি নিবিড় সম্পর্ক। তা তাঁর বাড়িটি দেখলেই ধারনা করা যায়। কবির লাগানো সেই গাছগুলিতে ঝুলছে বিভিন্ন মাটির কলসি। সেই গাছে নাকি পাখি বাসা করতো, তাই সে সেইসব কলসি বেঁধে রাখতো যাতে পাখির নিশ্চিন্তে তাঁর গাছে থাকতে পারে। কতটা পল্লী প্রকৃতির প্রেমিক ছিলেন পল্লী জসিমউদ্দীন। পুরো বাড়িই সেটির প্রতিচ্ছবি।
কবির লাগানো গাছ আর পাখিদের জন্য এই সুব্যবস্থা দর্শনার্থীদের সাথে কবির হৃদয়ের মিলে যাওয়া জায়গাটাকে আরো অনেক স্পষ্ট করে তুলছিলো।
এবার উঠান থেকে বেরিয়ে, বেশ কিছুটা পূর্ব দিকে ২০১১ সালে নির্মিত কবির পিতা আনসার উদ্দীনের স্মৃতিঘরটি দেখতে গেলাম।
অন্যসব ঘরের থেকে কিছুটা ভিন্নতায় সাজানো এ ঘরটি। পুরো ঘরজুড়ে পাটের ছিকা যার ভিতরে মাটির কলস দিয়ে সাজানো। কাঠের আলমারি, ব্যবহৃত জিনিস ও বিভিন্ন ছবি রাখা। ঘরে মাঝখানে কাঁচের চারকোনা বাক্সে রাখা সে সময়কার ব্যবহৃত শাড়ি, চাঁদর, টাইপ ম্যাশিন, কলম ইত্যাদি। রয়েছে ব্যবহৃত মাটির পাত্র এবং আরো অনেক কিছু। সেই ঘরে রয়েছে কবির পিতা মাতার ছবিসহ তাঁর পুরো বংশ পরিচয়। এবার আমি কবি ও তার পরিবারের অনেক সদস্যের কবরের সামনে এসে দাড়ালোম। মাটি থেকে কিছুটা উচু সেই জায়গাটি।

 

আকাশে মেঘ থাকা সত্বেও ছুটে বিরামহীন বয়ে চলা কুমার নদের শীতল বাতাসে বেড়ালাম। এই নদের পরিচ্ছন্ন জলে আজো যেন মিশে আছে কবির স্মৃতি। বয়ে যাচ্ছে কুমার নদ, থেমে নেই সময়, বন্ধ হয়ে গেছে শুধু একরাশ রঙ্গিন স্বপ্নে ঘেরা কবির দুটি চোখ। ডালিম গাছের ঠিক নিচে নিশ্চল, নিশ্চুপে থাকা পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের সমাধী সামনে গিয়ে নিরুপায় লেখকের কন্ঠে উচ্চারিত হলো এই কথা, “এই খানে পল্লী কবি, ঘুমায় ডালিম গাছের তলে,
লাখো ভক্ত  এই জনপ্রিয় কবিতাটির রচয়িতা কবি জসীম উদ্দীন। তিনি জন্মেছিলেন ১ জানুয়ারি ১৯০৩ সালে। কবির জন্ম নানাবাড়িতে। ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে। তার পৈত্রিক ভিটা তাম্বুলখানার পাশের গ্রাম গোবিন্দপুরে। এই গোবিন্দপুরেই কবির বাল্যকাল ও কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে। কুমার নদীর তীরে এই গোবিন্দপুর গ্রাম। এই গোবিন্দপুরেই কবি জসীম উদ্দীনের তিন পুরুষের ভিটা। জানা যায় কবির পিতা, পিতামহ ঐ অঞ্চলের প্রভাবশালী লোক ছিলেন। গ্রামীণ সমাজের রাজনীতি ও ধর্মীয় ব্যাপারে এলাকায় তাদের পরিবার দীর্ঘকাল আধিপত্য করেছে। তবে ফরিদপুর জেলা শহর থেকে একটু দূরে তাম্বুলখানা গ্রামে নানা বাড়ি। সেই তাম্বুলখানায় বর্তমানে আর কবির মামাদের কোনো উত্তরাধিকার নেই। এই গ্রামে কবি জসীম উদ্দীনের নামে সম্প্রতি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কবির পিতার নাম মৌলানা আনছার উদ্দিন মোল্লা। কবির পিতার নামে গোবিন্দপুর রেলস্টেশনের কাছে একটি হাইস্কুল আছে। কবিরা ছিলেন মোট চার ভাই। বড়ো ভাই মফিজ উদ্দিন মোল্লা, সেজ ভাই নূরুউদ্দীন আহম্মদ। নূরুননাহার সাজু নামে কবির একমাত্র বোন। ১৯২১ সালে মোসলেম ভারত পত্রিকায় কবির ‘মিলন গান’ নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটিই কবির প্রকাশিত প্রথম লেখা। ১৯২৫ সালে প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা কল্লোল তার বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ প্রকাশিত হয়। এর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন ‘কল্লোল’ পত্রিকার সম্পাদক দীনেশ রঞ্জন দাশ। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় তার আলোড়িত কাহিনী কাব্য ‘নকশীকাঁথার মাঠ।’ এর পর কবি এমএ পাস করেন।

১৯৩৩ সালে প্রবাদ প্রতিম পুরুষ এবং ময়মনসিংহ গীতিকার সম্পাদক ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে লাহিড়ী রিসার্চ এ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দেন। এ বছরই তার কাব্যগ্রন্থ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ প্রকাশিত হয়। অতঃপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৪৩ সালে মহসীন উদ্দীনের মেয়ে দশম শ্রেণীর ছাত্রী মমতাজ-এর সাথে বিয়ে সম্পন্ন হয় কবির। তারপর থেকে মমতাজ হলেন মমতাজ জসীম উদ্দীন। তার ডাক নাম মণিমালা। ১৯৬৮ সালে বিশ্বভারতী তাকে সম্মানসূচক ডিলিট প্রদান করে।

১৯৭৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন এবং এ বছরই কবি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। কবির মৃতদেহ গোবিন্দপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ওখানে কবরস্থ করা হয়। গোবিন্দপুর এখন কবিতীর্থ ফরিদপুর জেলা শহর থেকে মাত্র দশ বারো টাকায় রিকশা কিংবা ভ্যান গাড়িতে যাওয়া যায়। কুমার নদীর তীরে কবির পৈতৃক ভিটা গোবিন্দপুর। আর এই গোবিন্দপুরে এবং কুমার নদীর কাদা জলে লালিত পালিত হয়েছিলেন কবি জসীম উদ্দীন। কবি শুয়ে আছেন, তার শিয়রে একটি ডালিম গাছ আছে।

কবর কবিতায় কবির সেই জনপ্রিয় লাইন….

‘ঐখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’

কবির পাশেই আরও এগারটি কবর। কবির তিন ভাই মরহুম, ব্যারিস্টার মওদুদ ও হাসনা মওদুদের বড়ো ছেলে আসিফ, কবির বড়ো ভাইয়ের স্ত্রী জরিনা খাতুন, ভাইয়ের মেয়ে হোসনে আরা দোলন, কবির ছোটো বোন নূরুননাহার সাজু ও কবির আম্মা এবং নাম না রাখা একটি শিশুর কবর। কবরের বেদি ছাড়িয়ে গেলেই দক্ষিণ মুখো কবির বাড়ি। ভিটায় পাকা বাড়ি একটি, সেখানে লেখা আছে কবি ভবন। কিন্ত কবি যে ঘরে থাকতেন সে বাড়ির ভিতরে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি চৌচালা টিনের ঘর। এই ঘরের সামনে সিঁড়ি, সিঁড়ির দু’দিকে লেবু গাছ, মাঝখানে ডালিম। একটু দূরে পেয়ারা গাছ। বাড়িতে আরও দুটো চৌচালা ঘর আছে। একটির অবস্থা একেবারেই করুণ। যে কোনো সময় ঝড়-বাতাসে ভেঙে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বাড়িতে কবির উত্তরাধিকার কেউ থাকে না। দীর্ঘ বছর ধরে এ বাড়িটি দেখাশুনা করেন ফিরোজ বানু ও তার স্বামী শাহজাহান মোল্লা। কবির পত্নী এবং ছেলেমেয়েরা মাঝে মধ্যে বেড়াতে আসেন গোবিন্দপুরে। কবি সেকালে তার লেখনির মাঝে পল্লী মানুষের জীবন ও চালচিত্র, শ্রমিক দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষের কথা ছাড়াও তার কবিতায় দোল খায় কুমড়োর ডগা, কচি পাতা, ছোট্টো নদীর মাঠের রাখাল,  সাপুড়ের মেয়েকে নিয়ে তিনি যে অপূর্ব অনুপম কাব্য গাঁথা রচনা করেন তা কি শুধু পল্লী সাহিত্য? তা যে কতো আধুনিক তা কবির কাব্য গাঁথাকে গবেষণা না করলেও অতি সহজে বুঝা যায়। তিনি শতবর্ষ পরেও যদি আধুনিক কবিকে আমরা ‘পল্লী কবি’ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সীমানার মাঝে বন্দি করে রাখি, তাহলে কবির সৃষ্টির প্রতি সত্যিই অবমূল্যায়ন করা হবে। যদিও কবি ‘পল্লী’ উপাধিতে বিপুল খ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেছিলেন।কবির কবিতায় পল্লী সাহিত্যের আখ্যানপ্রবণতা প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি তার বিষয় হিসেবে পল্লী বাংলার জীবনকেই চিত্রিত করেছেন। কিন্ত সে জন্যই তাকে ‘পল্লী কবি’ বলা কি সেটা আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া কবি যে গদ্য গ্রন্থগুলো রচনা করেছেন-তার মূলও অনেক। সত্যিই আমরা ভুলতে বসেছি যে সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে কবির আত্মজীবনী বা স্মৃতি কথা জাতীয় গ্রন্থগুলো এবং ভ্রমণ কাহিনী আর গল্প ও উপন্যাসসমূহ যে সহজ অনুপম শিল্প আকারে লাভ করেছে তাতে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হয়ে আছে তার অতি আধুনিক মন, মনন, চিন্তা ও সামাজিক দর্শন। আমাদের মধ্যযুগের মূল ধারার কাব্যেও কাহিনী বা আখ্যান আছে এবং তার পটভূমি পল্লী বা নগর যাই হোক না কেন, যে হিসেবে ভাগ করে আমরা তাকে পল্লী সাহিত্য বা নাগরিক সাহিত্য বলি না। কারণ সাহিত্যের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, শিল্পের প্রকাশ শৈলীর ধরণ ও ভঙ্গি অনুযায়ী তার চরিত্র নির্ধারণ হয়। আমাদের দেশে অসংখ্য ‘পথুয়া কবি’ বা পল্লী কবি আছেন তারাও কোনো না কোনোভাবে সমকালীন ঘটনা নিয়ে কাব্য চর্চা করেছেন এবং কবিতা রচনা করে থাকেন। সেই সব কবিতা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তার পুনঃপ্রকাশ বা পুনঃপ্রচার না করে কবি অন্য কবিতা রচনায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।

এটা পল্লী কবির কবিতা রচনার একটা প্রধান ধারা। কিন্ত কবি জসীম উদ্দিনের কবিতা কি এমন সাময়িক? মোটেই তা নয়। কবির নকশি কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, একের পর এক সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। কবির কবিতা নির্মাণ কলায় এমন কিছু আছে যা বাঙ্গালি জীবনের সমকালীনতাকে ধারণ করে। সেজন্যই কবিকে পল্লী কবি না বলে বাঙ্গালির কবি হিসেবে চিহ্নিত করা যথার্থ এবং সম্মানজনক হবে বলে মনে করি। পল্লী কবিরা গ্রাম বাংলার মানুষের সংবাদ পিপাসা ও রসতৃষ্ণাকে মেটাতে পারলেও তাতে তাদের চৈতন্যের স্তরের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়। হৃদয়ে খুব একটা বিকশিত হয় না। এমনি গ্রাম বাংলার মানুষের মাঝে তা পুনঃপ্রচারের উত্তরণ ঘটে না। এখানেই কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা পল্লী কবিতা থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়ে আছে। পল্লী কবির কবিতা স্টোরিও টাইপ, পুনরাবৃত্তিময়, নিয়ম এবং ছকে বাধা। জসীম উদ্দীনের কবিতা কি তাই? আমার মতো সবাই এ প্রশ্নের উত্তরে  বলবেন না। তাহলে জসীম উদ্দীনকে কোন যুক্তিতে পল্লী কবি বলবো?কোনো যুক্তি তর্কে জসীম উদ্দীনকে পল্লী কবি বলা সম্ভব নয়,  বাঙ্গালি এবং বাংলা ভাষাভাষির অন্যতম জসীম উদ্দীনের কবিতা রাখালিয়া সুর ও পল্লী জীবনের ভাববস্তু আছে। আরো আছে কথকথার ধরণ ও আখ্যান প্রবণতা! কবি তার কবিতায় দেশ কাল,সমাজ, মানুষ ও জীবন চিত্র চিত্রিত করেছেন তা শুধু কেবল সুন্দরই নয় বলতে হয় কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা সংহত, পরিপাটি ও অনুপম শিল্প আকার লাভ করেছে।

কবি কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর মন্তব্য করেন, জসীম উদ্দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রকৃতি কবির হৃদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে লিখতে পারে না তিনি, জসীম উদ্দীনের নকশি কাঁথার মাঠ কবিতাকে সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা বলে মন্তব্য করে বলেছিলেন, আমি এটাকে আদরের চোখে দেখেছি, কেনো না এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী জীবন আমার কাছে  চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে। আর এক ধরনের পল্লী কবিতা আছে যা ভাব গভীর ও দার্শনিকতাপূর্ণ। এতে গ্রাম বাংলার স্বকীয় চিন্তা প্রক্রিয়ার একটা ধারা পাওয়া যায়। এই সব কবিতার ভাবুকতা যথেষ্ট উচ্চ মানের বৈকি! বাউল সম্রাট লালন ফকির, হাসন রাজা, রাধারমন, সৈয়দ শাহনূর প্রমুখ কবির রচনায় এই ধারাটি সমৃদ্ধ। জসীম উদ্দীন সাধারণ লোক কবির নিরস আঞ্চলিক কবিতা এবং ভাবুক দার্শনিক লোক কবির ভাব-সাধনাকে নিবিড়ভাবে বেছে নিয়ে নিজস্ব একটা ধারা তৈরি করেছেন। এই ধারা আসলে এক ধরনের পূর্ণ নির্মাণ। অপ্রধান কবিদের মধ্যে যে মাঝে মাঝে আলোর বিচ্ছুরণ থাকে শক্তিমান কবি সেই সম্ভাবনাময় অংশকে একটু ঘষে মেজে, একটু রংয়ের ছোপ দিয়ে সে অংশটুকুকে আলোচিত করে বা জীবনের প্রাণবন্ত স্পর্শ শিল্প সৃষ্টি করে গড়ে তোলেন।

ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের নির্দেশে ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোক সাহিত্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কবি ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রতিটি পল্লীগ্রামে অবস্থান করেন, সে সময় কবি এই নব ধারা তার বাংলা ভাষা শব্দ ও রীতির ব্যবহার, শব্দ নির্বাচন, প্রয়োগ রচনা রীতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বাংলা শাশ্বত শব্দ ও রীতি তাকে আকৃষ্ট করে মূলত লোক সাহিত্য সংগ্রহকে ও গবেষণার কাজ করার ফলে। এ হলো লোক সাহিত্য ঐতিহ্য পুনঃনির্মাণ। জসীম উদ্দীন তাও করেছেন। তিনি বলেছেন, লোক সাহিত্যকে বা লোক সঙ্গীতকে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করার অনেক বড় ধরনের অসুবিধা আছে। কারণ প্রায়শই তা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রুচির সঙ্গে মেলে না।তাই এ ধরনের রচনার নবায়নে আমার অনেকগুলো পদ্ধতি ছিলো। আমি কখনো একগুচ্ছগান সংগ্রহ করে তার মধ্যে যেগুলো শহরের রচনার লোকদের রুচির সঙ্গে খাপ খায় সেগুলোই বেছে নিতাম। গ্রাম সাহিত্য থেকে অশ্লীল বা আপত্তিকর এবং খুব অশ্লীল অংশ কেটে কুটে বাদ দিয়ে আমি তাকে ভদ্র সমাজের উপযোগী করে তুলতাম। আমি কখনো কৃষকের পর্ণ কুটিরে গিয়ে হয়তো একটি লোকগীত শিখতাম…..। যার সুর আমাকে আকৃষ্ট করতো কিন্তু এর বাণী ছিলো স্থল এবং অস্পষ্ট। তাই আমি এতে নতুন শব্দ যোগ করে শিক্ষিত রুচির উপযোগী করে তুলতাম। কখনো এমনও হয়েছে যে গ্রামবাসী আমাকে একখানা গান দিয়েছে সে শুধু সুরটা জানে এবং গানের দু’চার লাইন মাত্র মনে রাখতে পেরেছে। আমি ওই ভাব বজায় রেখে গানের বাকি অংশটা তৈরি করে নিয়েছি।  জসীম উদ্দীনের এই আধা মৌলিক গানগুলো বাস্তবিক পক্ষে খুব মূল্যবান।

 

এই বেলা ডট কম/ইআ/এসজি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

সম্পাদক: সুকৃতি কুমার মন্ডল

Editor: ‍Sukriti Kumar Mondal

Communication with Editor: editor@eibela.com

News Room E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ:

 E-mail: editor@eibela.com

  মোবাইল:+8801517-29 00 01

 

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71