মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০
মঙ্গলবার, ২৪শে চৈত্র ১৪২৬
সর্বশেষ
 
 
আরজ আলী মাতুব্বর, কোন বিশেষণই যার জন্য যথেষ্ট নয়
প্রকাশ: ০২:৪২ pm ১৯-১২-২০১৯ হালনাগাদ: ০২:৪২ pm ১৯-১২-২০১৯
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


আশি বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিজের জন্য কবর নির্মাণ করবেন। গাছের ছায়ার বুকে সবুজ ঘাস নিয়ে শুয়ে থাকা ছোট্ট জমিনে একটি সাধারণ কবর। শহর থেকে নির্মাণ শ্রমিক আনিয়েছেন, আনিয়েছেন ইট, বালু, সিমেন্ট। এসব দেখে গ্রামের লোকজন হতভম্ব। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। বৃদ্ধ মানুষটির আচার -আচরণ ও কথাবার্তা তাদের কাছে দুর্বোধ্য। দাফনের জন্য লাশ নেই অথচ কবর খোঁড়া হচ্ছে। জীবিত ব্যক্তির জন্য কবর! যে ব্যক্তি কবর খোঁড়ার আয়োজন করেছেন, গ্রামের অধিকাংশ লোকের কাছে তিনি বিতর্কিত। এর আগেও মায়ের লাশ দাফন নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষদের সাথে ঝামেলা পাকিয়েছেন।

কবর কোন সাধারণ বিষয় নয়, এর সাথে ধর্ম সম্পৃক্ত। ধর্ম নিয়ে মশকরা করা গ্রামের লোকজন একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু বৃদ্ধের উপস্থিতিতে কিছু বলা যাবে না। বৃদ্ধ আপসহীন ঘাড়-ত্যাড়া। তাই সবাই অপেক্ষা করছে রাজমিস্ত্রিদের কাজ বুঝিয়ে তিনি কখন ঘটনাস্থলের আড়াল হবেন। আড়াল হতেই ধর্মের পাহাদাররা ভয় ভীতি দেখিয়ে রাজমিস্ত্রিদের তাড়িয়ে দেয়। রাজমিস্ত্রিরা কাজ বন্ধ করে চলে যায় বটে, কিন্তু ধর্মসেবকদের কোন লাভ হয়নি। জেদি বৃদ্ধকে থামানো যায়নি, তিনি নির্মাণ সরঞ্জাম হাতে তুলে নেন এবং নিজ হাতে নিজের কবর নির্মাণ শুরু করেন।

এটি কোন পরাবাস্তব সাহিত্য কিংবা পৌরাণিক কিচ্ছা অথবা হরর মুভির গল্প নয়। এটি একটি বাস্তব ঘটনা এবং এই গল্পের মূল চরিত্রের নাম আরজ আলী মাতুব্বর। যিনি জীবিত অবস্থায় নিজের একটি দাঁত, চুল ও নখ বয়ামে ভরে কবর দেন এবং নিজ মৃতদেহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের গবেষণার উদ্দেশ্যে দান করে যান। তিনি কোন বিজ্ঞানী কিংবা বিজ্ঞান আন্দোলনের নেতাকর্মী নন, এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে তার সরাসরি কোন সম্পর্কও নেই। তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়া একজন অসাধারণ কৃষক। আমরা জানি কৃষক মাত্রই অসাধারণ, কিন্তু যে কৃষকের গল্প বলছি তিনি বিশেষভাবে অসাধারণ।

মেডিকেলে আমার দেহদানের কারণ মায়ের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আমার মরদেহটির দ্বারা মানব কল্যাণের সম্ভাবনা বিধানে আমার সজীব মনের পরিতোষ ও আনন্দ লাভের প্রয়াস মাত্র। আমার মরদেহটির সাহায্যে মেডিকেল কলেজের শল্যবিদ্যা শিক্ষার্থীগণ শল্যবিদ্যা আয়ত্ত করবে, আবার তাদের সাহায্যে রুগ্ন মানুষ রোগমুক্ত হয়ে শান্তিলাভ করবে। আর এসব প্রত্যক্ষ অনুভূতিই আমাকে দিয়েছে মেডিকেলে মরদেহ দানের মাধ্যমে মানব কল্যাণের আনন্দলাভের প্রেরণা। এতে আমার পরিজনের বা অন্য কারো উদ্বিগ্ন হওয়া সমীচীন নয়।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
বরিশাল শহরের ছয় মাইল উত্তর-পূর্বে কীর্ত্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে লামচরি গ্রাম। ১৮৫৫ সালের আগে লামচরিতে কোন গ্রাম ছিলো না, ছিলো না কোন বসতি। জঙ্গলে ঠাসা একটি নিচু চর, যে চরে ভুলেও মানুষের পা পড়তো না। ১৮৫৫-৫৬ সালে একদল কৃষক লামচরিতে পা রাখেন এবং আবাদ শুরু করেন। দলটির নেতার নাম আমানুল্লাহ মাতুব্বর, তার ছেলের নাম এন্তাজ আলী মাতুব্বর। এন্তাজ আলীর ছেলে আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে আমাদের এই নিবন্ধ।

লামচরিতে বসতি শুরুর ৪৫ বছর পর ১৭ ডিসেম্বর ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম। ততদিনে গ্রামটি বেশ পরিণত চেহারা পেয়েছে। গ্রামের ঘরবাড়ি পুরোনো হয়েছে, অনেকেরই বংশবৃদ্ধি ঘটেছে, রাস্তা দেখে মনে হয় হাজার বছর ধরে মানুষ এই পথে হেঁটে বেড়াচ্ছে, পুকুরগুলো দেখে মনে হয় না নতুন কাটা হয়েছে, ফসলি জমিগুলো দেখে বুঝা যায় না কয়েক দশক আগেও এখানে কোন বীজ রোপিত হয়নি। কারো মুখে শোনার আগ পর্যন্ত আরজ আলীর বুঝার উপায় ছিলো না গ্রামটি বয়সে তার মাত্র চার যুগ অগ্রজ। এই কমবয়সী গ্রামে আরজ আলী বড় হতে থাকেন।

যেহেতু আরজ আলীর দাদা ও পিতার হাতে এখানে বসতি শুরু হয়, সেহেতু তাদের জমিজমার পরিমাণ খারাপ ছিলো না। লামচরি গ্রাম তখন জমিদারি শাসনের অধীন। লাকুটিয়ার রায় মহাশয় ছিলেন লামচরির অধিবাসীদের জমিদার। আরজ আলীর বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তার বাবা মারা যান। মৃত্যুর সময় পাঁচ বিঘা আবাদি জমি আর দু’টি টিনের ঘর রেখে যান। মানুষ রেখে যান তিনজন। স্ত্রী লবেজান বিবি, কন্যা বিবি কুলসুম ও পুত্র আরজ আলী। পুত্র ও কন্যারা বয়সে অত বড় নয়, তাই এন্তাজ আলীর বিধবা স্ত্রী খুব বিপাকে পড়েন। জমিজমা চাষ করার কেউ নেই, বর্গা দিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হলেন।

পরপর কয়েক বছর বন্যায় সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়। আকস্মিক বিপর্যয়ের মুখে মাতুব্বর পরিবার। নেই মানে নেই, কোন অর্থ কড়ি নেই, ফসল নেই, ঘরে খোরাকি নেই। অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটছে। এক বেলা খাচ্ছে তো আরেক বেলা খাচ্ছে না। কিন্তু জমিদারের লোকজন জমির খাজনা নিতে আসার জন্য বেলার অভাব হচ্ছে না। খাজনা না পেয়ে অত্যাচার নির্যাতন করতেও ভোলেনি জমিদারের পাইক পেয়দারা। শেষে খাজনা না দেয়ার অভিযোগে জমি নিলামে তুলে দখলে নিয়ে নেয় জমিদার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর মাত্র ছয় বছরের মাথায় তার রেখে যাওয়া ফসলি জমি হারিয়ে লবেজান বিবির ঘরভিটে ছাড়া আর কিছু রইলো না।

এমতাবস্থায় প্রতিবেশীর বাড়িতে কাজ করে যা পেতেন, তা দিয়ে সংসার পরিচালনার চেষ্টা চালান। কিন্তু অতি সামান্য উপার্জনে সংসারের প্রয়োজন মিটছে না। প্রচুর ধার কর্জ করতে হতো। শেষে পাড়ার লোকের বুদ্ধিতে নিরূপায় লবেজান বিবি সুদখোর জনার্দন মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। মহাজনের সুদের ফাঁদে পড়ে পরের বছর টিনের ঘর নিলাম করে দেন। ওরা ঘর খুলে নিয়ে যায়। খোলা আকাশের নিচে খালি ভিটের মাটি কামড়ে কান্নাকাটি করে কিছুদিন কেটে যায়। ক’দিন পর আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের দয়ায় শূন্য ভিটায় একচিলতে একটা ঘর উঠে। ঘরের দৈর্ঘ্য ছয় হাত, প্রস্থ পাঁচ হাত। দরকারি জিনিসপত্র রাখার পর শোয়ার জন্য যতটুকু জায়গা থাকে, পা গুটিয়ে ঘুমাতে হয়। ঘুমের মাঝে পা মেললেই মাটির কলস পড়ে বিছানা ভিজে, নয়তো ভাতের হাঁড়ির সব ভাত মাটিতে পড়ে নষ্ট হয়। এমনিতেই দু’বেলা খাবার জুটতো না, তার উপর যেদিন রাতে সাধের ঘুম ভাত কেড়ে নিতো সেদিন সকালে আর খাওয়া হতো না।

কোন রাতে ঘুমের ঘোরে পা লেগে ঘরের একপাশে রাখা পানির কলসি ভেঙে গিয়ে ঘরময় পানি ছড়িয়ে কাঁথা-বালিশ এইসব ভিজে গিয়েছে। আবার কোনদিন হাঁড়িতে রাখা পান্তাভাত ঘুমন্ত অবস্থায় হাতে লেগে ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে। আমার বেশ মনে পড়ে ঐ সময় আমাদের দু’বেলা খাবার জুটতো না। সকালে খেতাম এঁটে কলা দিয়ে পান্তাভাত। মা যদি লোকের বাড়ি কাজ করে ভাত আনতে পারতেন তাহলে রাতে খাওয়া হতো। তিনি কখনো সানকি ভরে ভাত-ছালুন আনেন। কখনো শাড়ির আঁচলে দুমুঠো চাল, হাতে এক ফালি বেগুন কিংবা দু-টুকরো শুটকি মাছ। সকাল থেকে সন্ধ্যা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন মা। আমি এক সময়ে সংসারে সাহায্য করার জন্য অন্যের গরুবাছুর নিয়ে মাঠে চরাতে শুরু করলাম।

পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিক্ষা
গ্রামের কাজেম আলী সরদারের বাড়িতে একজন মুন্সী রাখা হয়েছে বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য। তার নাম মুন্সী তাহের আলী। তিনি গ্রামের শিশুদের পড়ানোর জন্য মক্তব খুললেন। কয়েকজন অভিভাবক ডেকে বললেন তাদের সন্তানরা যেন মক্তবে আসে। আরজ আলী মক্তবে ভর্তি হওয়ার কথা বললে মা বলেন, টাকা কই বাপজান! মুন্সী বলেন টাকা লাগবে না, তালপাতা-কলাপাতায় লিখতে টাকা লাগে না। আরজ আলী মক্তবে যেতে থাকেন। একবছর লেগে যায় স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জণবর্ণ লেখা শিখতে। এরপর সে মক্তব বন্ধ হয়ে গেলে আব্দুল করিম নামে স্থানীয় এক মুন্সী আরেকটি মক্তব খুললেন। আরজ আলী সেখানে ভর্তি হন। দিন কয়েক পর মুন্সি বললেন আদর্শলিপি বই কিনতে হবে। মা বলেন, টাকা কই বাপজান! দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় তালপাতায় আরজ আলীর সুন্দর হাতের লেখা দেখে তাকে আদর্শলিপি বই কিনে দেন। এক প্রতিবেশী দিলেন ভাঙা শ্লেটের অর্ধেক। চক হিসেবে ব্যবহার করলেন চিনামাটির টুকরো। আসলে এটি একেবারে বিশেষ কোন ঘটনা নয়। তখন শত-শত শিশু এভাবেই কষ্ট করে লেখাপড়া শিখেছে। কিন্তু আরজ আলী অবিশেষ কোন ব্যক্তি নন। এ কথা বলার পেছনে কারণ আছে।

আরজ আলী তার একমাত্র বইটি বুকে আগলে রাখতেন। রাতে পায়ের ঠেলায় কলসির পানি পড়ে যেন বইটি ভিজে না যায় সেজন্য জামা কাপড়ের স্তুপের ভেতর রাখতেন। ততদিনে কৃষকের জমিতে কাজ শুরু করেন তিনি, জমিতে যাওয়ার সময়ও বইটি সাথে করে নিয়ে যেতেন। এমনকি কোথাও বেড়াতে গেলে তখনও। অারজ আলীর অবসর মানে আদর্শলিপি হাতে নিয়ে বসে পড়া। এর কিছুদিন পর মু্ন্সী বললেন বাল্যশিক্ষা বই কিনতে হবে। যথারীতি মা বললেন, টাকা কই বাপজান! এ যাত্রায় এগিয়ে এলেন ভগ্নিপতি। বাল্যশিক্ষা, কায়দা, আমপারা কিনে দিলেন। আরজ আলী তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। দুঃখের বিষয়, সেবছর মক্তবটি বন্ধ হয়ে যায়। এই মক্তবই আরজ আলীর শেষ শিক্ষালয়। এরপর তিনি আর কোনদিন মক্তব কিংবা স্কুলে যাননি। এখানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

মক্তব নেই, স্কুল নেই। তার দিন কাটে ছবি এঁকে, ঘুড়ি তৈরি করে, বাঁশ দিয়ে জলের কল বানিয়ে বিক্রি করে আর মানুষের জমিতে হাল দিয়ে। কিছু টাকা উপার্জন হয়, এতে মায়ের খানিকটা রেহাই হয়। এদিকে তাবিজ বিক্রেতা ভগ্নিপতি হলেন কাঠমোল্লা। তিনি ছবি আঁকা ও ঘুড়ি তৈরি পছন্দ করতেন না। শ্যালককে কয়েকবার মানা করার পরও সে থামেনি। তাই একদিন তার গায়ে হাত তুললেন, খুব মারলেন। রাগে, দুঃখে আরজ আলী উদ্দেশ্যহীনভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পথে এক মুরুব্বীর সাথে পরিচয় হলে তিনি জানতে চান আরজ আলীর ইচ্ছে কী? জবাবে জানতে পারেন আরজ আলী লেখাপড়া করতে চায়। এরপর তার দেয়া ঠিকানা ধরে গ্রাম থেকে অনেক দূরে শহর ছাড়িয়ে আরো দূরে অন্য এক গ্রামে একজন জনদরদী মৌলভীর কাছে যান। লাভ হয়নি। মৌলভীর স্কুলে ভর্তি হতে হলে পরিবারের অনুমতি লাগবে, তা নেই আরজ আলীর। তাই আবার গ্রামে ফিরে আসলেন। লেখাপড়ার আর কোন সম্ভাবনা রইলো না।

সতের বছর বয়সে এসে কিশোর আরজ আলী ঘরের মাচায় পরিত্যক্ত জিনিসের মাঝে রত্ন খুঁজে পান। একটি বস্তা, বস্তার ভেতর কতগুলো বই, যা আরজ আলীর কাছে অমূল্য সম্পদের চেয়েও অমূল্য, রত্নের চেয়েও অধিক রত্ন। বইগুলোর মধ্যে ছিলো ষষ্ঠ শ্রেণীর সকল পাঠ্য বই, ভারতবর্ষের ইতিহাস, সরল বাংলা ব্যকরণ, গোপাল ভাঁড়ের গল্পের বই আর বেশ কয়েকটি পুঁথি সাহিত্য। বইগুলো সম্ভবত তার ভগ্নিপতি মোল্লা হামিদের। যিনি জ্ঞানের বই বস্তাবন্দী করে অবাস্তব পবিত্র শাস্ত্রে মনোযোগী হয়েছেন। যা হোক, ভগ্নিপতিকে বেশি নিন্দা না করি। আরজ আলীর জীবনে তার অবদান অন্য কারো চেয়ে কম নয়।

এখন আরজ আলীকে আর পায় কে! জগতের সবচে সুখী মানুষ তিনি। দারুণ উৎসাহে সংসারের কাজ কর্ম করেন, ভুখা পেটেও হাসেন, গুনগুন করে গান গেয়ে যান, এবং অবশ্যই সুযোগ পেলে কুড়িয়ে পাওয়া বইয়ের গভীরে ডুব দেন। শুধু কী তাই? ভগ্নিপতির পুলিশে চাকরি হয়েছে। আরজ আলী এখন পুরোপুরি স্বাধীন। তার কাজকর্মে বাধা দেয়ার মত কেউই নেই। সদ্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতা ও বইগুলোর মাঝে সম্পর্ক করিয়ে দিলেন। সাথে রইলেন তিনি স্বয়ং।

ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্য বইগুলোর ত্রৈমাসিক সিলেবাস পড়ে শেষ করলেন। এবার পরীক্ষার পালা। কিন্তু পরীক্ষা নিবে কে? প্রশ্ন করবে কে, আর উত্তরপত্রে মার্কসইবা দিবে কে? চিন্তার কিছু নেই, পরীক্ষার্থী যিনি পরীক্ষকও তিনি। আরজ আলী মাতুব্বর নিজে নিজে প্রশ্ন তৈরি করেন, বই না দেখে উত্তর লিখেন, তারপর বইয়ের সাথে মিলিয়ে সেই উত্তরে নম্বর দেন। যে উত্তরগুলোয় ভুল আছে, সেগুলো আরো ভালো করে পড়ে বুঝে নেন। ইচ্ছে এবং তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পরিশ্রম আরজ আলীকে শ্রেণীর পর শ্রেণী, ধাপের পর ধাপ টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু এভাবে কত ক্লাস পর্যন্ত নিজের মাস্টারি নিজে করা যায়? অন্যের বেলায় জবাব কী হবে জানি না, আরজ আলী তার চাচাত ভাইয়ের কাছ থেকে বই নিয়ে এভাবে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন। ১৯৩৫-৩৬ সালে আই.এ শেষ করলেও এ যাত্রায় এক শিক্ষক-এক ছাত্রের ব্যক্তিগত কলেজে বি.এ তে ভর্তি হতে পারেননি, কারণ এই শ্রেণীর বই সংগ্রহ করা যায়নি। প্রায় চল্লিশ বছর পর ১৯৭৩ সালে যখন তার সেজ ছেলে বি.এ পড়ে, তখন ছেলের সাথে সাথে আরজ আলীও বি.এ’র সিলেবাস শেষ করেন।

যৌবনের শুরুতে
উনিশ বছর বয়সে এসে বুঝতে পারলেন পরিবারের হাল ধরার সময় হয়েছে। মায়ের উপর নির্ভর থাকা উচিত হচ্ছে না। মা বললেন কুলসুমের জামাই পুলিশে চাকরি করে কিছু টাকা পয়সা দেয়, আরজ আলী যদি হালচাষ শুরু করে তাহলে সংসারে আর অভাব থাকবে না। মায়ের কথামত হালচাষের সিদ্ধান্ত নেন। ভগ্নিপতি মোল্লা সাহেব পনের টাকা দিয়ে একটা গরুর ব্যবস্থা করে দিলেন। হাল চাষের জন্য আরেকটা গরু দরকার। গ্রামে একজন ব্যক্তি ছিলেন তারও মাত্র একটি গরু। দু’জন মিলে অংশীদারের ভিত্তিতে হাল চাষ শুরু করেন। এর কিছুদিন আগে নিলামে ওঠা সেই পাঁচ বিঘা জমির পুনঃবন্দোবস্তের ব্যবস্থা করে গেছে। এজন্য অবশ্য ঘরভিটে বন্ধক রাখতে হয়েছিলো।

মাত্র বিশ বছর বয়সে আরজ আলী তার মায়ের অনুরোধে বিয়ে করেন। ততদিনে পরিবারে আগের মত বিশ্রী অভাব অনটন নেই। ধীরে ধীরে সচল হতে থাকে পরিবারের টাকার চাকা। আরজ আলী মোটামুটি অর্থ উপার্জন করেন, সাথে ভগ্নিপতির সহযোগিতাও আছে। মা এখন বেশ খুশি, সুখী। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে এক থালা ভাত, অথবা দু’মুঠো চাল, এক ফালি বেগুন, দু’টি মরিচ যার একটি ভালো একটি পঁচা, এক টুকরো মিষ্টি কুমড়ো চেয়ে এনে সন্তানদের খাওয়ানোর দিনগুলো এখন কেবলই অতীত।

পাঠ্যপুস্তক পড়া বন্ধ হলেও আরজ আলীর লেখাপড়া বন্ধ হয়নি। তিনি নানান কায়দায় জ্ঞান বিজ্ঞানের বই সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করেন। কারিগরি শিক্ষার বইয়ের সংখ্যা বেশি ছিলো। এসময় তিনি ভূমি জরিপের কাজ শিখেন, কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখেন, ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে অনুশীলন করেন। বছর জুড়ে কাজ করে নিজেদের জন্য নতুন টিনের ঘর তৈরি করেন। ভগ্নিপতিকেও একটি টিনের ঘর তৈরি করে দেন। এরপর বোন কুলসুম ও ভগ্নিপতি আলাদা সংসার শুরু করেন।

একদিন আরজ আলী দারুণ একটা কাজ করে বসেন। বই পড়ে আর নিজ মেধা কাজে লাগিয়ে একা একা তৈরি করলেন একটি কৃত্রিম বৈদ্যুতিক পাখা। দেখতে বৈদ্যুতিক পাখার মত, কিন্তু এটা চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে না। পাখা তৈরির সংক্ষিপ্ত বিবরণ শুনুন তার নিজের মুখে –

“টিন কেটে তিনখানা পাতির সমন্বয়ে একখানা পাখা বানালাম বৈদ্যুতিক পাখার মতই। এবং উপরে মোটর বক্সের মত একটা বাক্সও বানালাম। তবে তার মধ্যে আমি রাখলাম মোটরের পরিবর্তে দুটি ক্রাউন পিনিয়ন। ওর একটার সাথে সংযুক্ত করলাম পূর্বোক্ত শায়িত দণ্ডটি এবং অপরটির সঙ্গে একটা খাড়া দণ্ড। এই খাড়া দণ্ডটির নিচেও অনুরূপ একটি বাক্সে দুটি ক্রাউন পিনিয়াম রাখলাম যার একটির সাথে যুক্ত করলাম খাড়া দণ্ডটি ও অপরটির সঙ্গে হাতল। এতে করে হাতলটি ঘুরালে পাখাটি ঘোরে। দণ্ড দুটি বানালাম লোহার শিক দিয়ে আর পিনিয়ন, পিনিয়ন বক্স ও অন্যান্য অংশ তৈরি করলাম কাঠের দ্বারা। মাস খানেক সময় লাগল পাখাটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে।”

১৯৩২ সালের মে মাসে লাকুটিয়ার জমিদার ও পূর্ব বাংলা রেলওয়ের ডি.টি.এস মিস্টার পরেশ লাল রায় আসবেন গ্রামের রহম আলী মাতুব্বরের বাড়িতে। খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে বজরা নিয়ে এসে এলাকা ভ্রমণ করছেন তিনি। রহম আলী তার বৈঠকখানা সাজিয়ে দেয়ার অনুরোধ করলেন আরজ আলীকে। দ্বিমত না করে বৈঠকখানাসহ অন্যান্য সাজসজ্জার কাজও করে দিলেন। সাথে রাখলেন একটা বিশেষ চমক। জমিদার মহাশয় যেখানে বসবেন, ঠিক মাথার উপর আরজ আলীর তৈরি কৃত্রিম পাখা ঝুলিয়ে রাখলেন। জমিদার এসে বসতেই পাখা ঘুরতে থাকে। এটা দেখে তিনি অবাক হন। কারণ গ্রামে বিদ্যুৎ নেই অথচ বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরছে! জমিদারকে সবকিছু বুঝিয়ে বলার পর তিনি মুগ্ধ হন এবং আরজ আলীকে কলকাতা গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর সমস্ত দায়িত্ব নিলেন। যদিও এর জন্য মায়ের অনুমতি নিতে হয়েছে। মা কখনো আরজ আলীর শিক্ষার পথে বাধা হননি, কখনোই না। জমিদারের সাথে কথা হলো তিনি কিছু জরুরী কাজ ও ভ্রমণ শেষ করতে করতে নভেম্বর মাস হয়ে যাবে, সেই মাসে আরজ আলী প্রকৌশল পড়তে কলকাতা যাবেন।

মায়ের মৃত্যু ও জীবন বদলে যাওয়া
অবশেষে নভেম্বর মাস আসে। এর মধ্যে আরজ আলী তার সিলেবাস এগিয়ে রাখলেন। তিনি যেখানে পড়তে যাবেন, সেখানকার শিক্ষক শৈলেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা ‘মটর শিক্ষক’ বইটি সংগ্রহ করে পুরোপুরি আত্মস্থ করেন। হবু শিক্ষকের লেখা বই শেষ করে দারুণ রোমঞ্চিত আরজ আলী কলকাতা যাওয়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে থাকেন। মায়ের পরামর্শে বন্ধু-বান্ধবদের ডেকে খাওয়ালেন। নিজেও অনেকের বাড়িতে দাওয়াত খাচ্ছেন। গ্রামের লোকজন খুব খুশি। কারণ এই গ্রামে খুব বেশি শিক্ষিত মানুষ নেই। আরজ আলী যদি প্রকৌশল পাস করেন, তাহলে তিনিই হবেন সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি।

চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুক ভরা আশা নিয়ে ঘুমানো যাচ্ছে না। ঘুম আসে না। প্রায় নির্ঘুম রাত কাটছে আরজ আলীর। আজ সারাদিন বাড়ি ভর্তি মেহমান ছিলো। রাতে খাওয়া দাওয়া করে সবাই বিদায় নিলেন। অনেকে আবার আরজ আলী ও তার মাকে ফিরতি দাওয়াত দিলেন। মেহমানরা চলে যাওয়ার পর সবকিছু গুছিয়ে মা ও ছেলে ঘুমিয়ে পড়লেন।

রাত একটার সময় লবেজান বিবি ডাকছেন – “কুডি, ও কুডি, আমারে ধর!” মায়ের ডাক শুনে আরজ আলী উঠলেন, মাকে ধরলেন। বাতি জ্বালিয়ে মাকে ধরা, চাচীকে ডাকা, চাচী আসা – মোট মিনিট দশেক। এরমধ্যে সব শেষ। মা’কে ধরে রাখা গেলো না। তিনি চলে গেলেন। চলে যাওয়ার দশ মিনিট আগেও কেউ ভাবেনি তিনি চলে যাবেন। অসময়ে বজ্রপাতের চেয়েও আকস্মিকভাবে মায়ের মৃত্যু ঘটায় তা মেনে নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে আরজ আলীর, আসলেই কষ্ট হচ্ছে। এমন মৃত্যুর সামান্যতম প্রস্তুতিও কারো ছিলো না। আরজ আলী বাস্তববাদী মানুষ। তিনি জানেন বার্ধক্যে সবাইকে মরতে হয়, কিন্তু মা যে তার কাছে কেবল মা-ই ছিলেন না। মা ছিলেন তার রক্ষাকবচ। অভাব, অনটন, ঝড়, তুফান, জলোচ্ছ্বাসসহ সব ধরনের দুর্যোগ থেকে মা’ই রক্ষা করতেন তাকে। আজকের পর হতে আর মা’কে তিনি দেখবেন না। এই ঘরে মায়ের মুখ দেখা যাবে না কোথাও। মায়ের কোন ফটো অথবা হাতে আঁকা ছবিও নেই। কিন্তু একটি ছবি খুব দরকার। মায়ের চেহারা ঘরে থাকবে না, তা কী করে হয়।

সকাল আটটা। শহর থেকে বিশ টাকা পারিশ্রমিকে খুব ভালো একজন ফটোগ্রাফার আনিয়েছেন আরজ আলী। তাদের দু’জনকে একসাথে দেখে গ্রামের মানুষ বুঝতে পারলেন আরজ আলী লাশের ছবি তুলবেন। চারিদিকে শুরু হলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আগত ধর্মীয় ব্যক্তিরা বলাবলি করতে লাগলেন এমনিতেই ইসলামে ছবি তোলা হারাম, লাশের ছবি তোলাতো আরো হারাম। তার উপর মেয়ে লোকের লাশ। ইমামসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সবাই জানাজা না করে লাশ ফেলে রেখে চলে গেলেন। কিন্তু আরজ আলী যে ছবি তুলবেনই। এবং তুললেনও। এরপর বিষণ্ণ মনে সাধারণ মুসল্লীদের সাথে নিয়ে নিজে নিজেই মাতৃলাশের সৎকার করলেন। দাফন শেষে মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আরজ আলী বলেছিলেন –

মা! আজীবন তুমি ছিলে ইসলাম ধর্মের একনিষ্ঠ সাধিকা। তুমি কখনো নামাজের ‘কাজা’ করনি, করনি কখনো তছবিহ তেলায়াত ও তাহাজ্জুদ নামাজে গাফিলতি। আর আজ সেই ধর্মের দোহাই দিয়ে একদল মুসল্লী তোমাকে করতে চাইল শেয়াল-কুকুরের ভক্ষ্য, তাঁদের কাছে হলে তুমি তুচ্ছ, অবহেলিতা ও বিবর্জিতা, হলে নিন্দা ও ঘৃণার পাত্রী। সমাজে আজ সর্বত্র বিরাজ করছে ধর্মের নামে ‘কুসংস্কার’। তুমি আমায় আশীর্বাদ কর- আমার জীবনের ব্রত হয় যেন ‘কুসংস্কার দূরীকরণ অভিযান’। আর সে অভিযান সার্থক করে আমি যেন তোমার কাছে আসিতে পারি। আশীর্বাদ কর, মোরে মা। আমি রেখে আসতে পারি যেন সেই অভিযানের দামামা।

বিশ্বাসের পরিবর্তন
আরজ আলীর ঘরে তখন তিন বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান। কন্যা ও কন্যার মাকে একা রেখে প্রকৌশল পড়তে কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিলেন। বরং মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে করা প্রতিজ্ঞার পেছনে ছুটতে শুরু করলেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়ে বিজ্ঞানে আস্থা খুঁজে পেলেন। আরজ আলী বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে –

শিশুরা সাধারণত মাকেই ভালোবাসে। কিন্তু এমন মাও আছেন, যিনি উগ্র স্বভাবী, রুক্ষভাষী ও অলস প্রকৃতির; সর্বদা রাগিয়াই থাকে। শিশু হয়ত মলত্যাগ করে বকুনি খায়, দুধ চেয়ে চড় খায়। এমতাবস্থায় শিশু দাদা-দাদী, ভাই-বোন বা অন্য কাউকে ভালোবাসে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শিশুকে সর্বদা তুষ্ট রাখে, তাকেই ভালোবাসে। আমার অন্তরের আকাঙ্খা পূরণ বা মনের খোরাকি দান করেছে ও করছে বিজ্ঞান। তাই আমি বিজ্ঞানে বিশ্বাসী, বিজ্ঞানকে ভালোবাসি।

জীবনে চলার পথের তিক্ত-মিষ্ট অভিজ্ঞতা আরজ আলীকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশ্বাসে অন্ধ থাকতে দেয়নি। তিনি দেখেছেন সৃষ্টি, স্রষ্টা, ইহকাল, পরকাল, দেবতা-নবী, পাপ পূণ্য নিয়ে একেক ধর্মে একেক বিশ্বাস। আবার একই ধর্মের মাঝেও অনেক বিশ্বাস। এবং প্রায় সকল বিশ্বাসই অযৌক্তিক, বিভ্রান্ত। এ ধরনের বিশ্বাসকে তিনি ‘অন্ধ বিশ্বাস’ হিসেবে দেখতেন। আর একজন অন্ধ বিশ্বাসী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। কারণ তিনি যুক্তিনির্ভর মনের মানুষ। তাই তার মন সবকিছুর সমাধানে বিজ্ঞান ও যুক্তির উপর নির্ভর করতে চেয়েছে এবং এই কারণে বিশ্বাসের পরিবর্তন করতে ‘বাধ্য’ হয়েছেন।

গ্রামের মানুষের সাথে তার সম্পর্ক
গ্রামের মানুষদের সাথে আরজ আলীর সম্পর্ক ছিলো অম্ল-মধুর।  তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন এবং লেখালেখির বিষয়বস্তু জানাজানি হয়, তখন থেকে সমস্যা শুরু হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে আমরা সকলেই অবাক হই পাশের এলাকায় একজন ধর্ম ব‍্যবসায়ী পীর থাকা সত্ত্বেও আরজ আলী অক্ষত ছিলেন কিভাবে? আরজ আলী গ্রামের মানুষের কুসংস্কার বিশ্বাস দূর করার জন্য চেষ্টা করতেন। তাদের সাথে কথা বলতেন। কারণ তিনি দেখেছেন গ্রামের মানুষের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ এই কুসংস্কার। তিনি যখন এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন কেউ কেউ তার কথা মানতেন, আবার কেউ কেউ ধর্মীয় অনুভূতির কারণে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতেন। কিন্তু কেউই তার প্রতি মারমুখী ছিলেন না। নিজের কবর তৈরি করার পর তার স্ত্রী এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন, যদি গ্রামের লোকজন ভেঙে ফেলে! জবাবে আরজ আলী বলেছিলেন, গ্রামের লোকজন তার কথা মানে না, হয়তো বিরক্তও হয়, কিন্তু কবর ভাঙবে না। – এই এক কথায় গ্রামের লোকদের সাথে তার সম্পর্কের ব্যাখ্যা হয়ে যায়।

তখন চরমোনাই পীরের (বর্তমান চরমোনাই পীরের বাবা) লোকজন আরজ আলীকে নিয়ে খুব ক্ষ্যাপা। এরই মধ্যে তার লিখিত ছোট ছোট বই মানুষ পড়েছে এবং এসব বইয়ে ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহযুক্ত প্রশ্ন থাকায় অনেকেই আরজ আলীর উপর রুষ্ট হয়েছেন। এমতাবস্থায় একদিন পীরের লোকজন আরজ আলীর বাড়িতে এসে বলে তাকে পীর সাহেব ডেকেছেন। তার স্ত্রী ভয়ে অস্থির। নিশ্চয় খারাপ কিছু হবে। স্ত্রীকে অভয় দিয়ে আরজ আলী পীরের লোকদের সাথে বেরিয়ে যান। কিছুদূর গিয়ে কী মনে করে আবার ঘরে এসে একটা ঝোলা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নেন। পীরের লোকজন ভয় পায়, ব্যাগের ভেতর কী না কী!

এরপর পীরের বাড়ি গিয়ে দেখেন তিনি বৈঠকখানায় বসে আছেন। আরজ আলীকে বসতে বলেন। পীরের মুরিদরা মনে মনে খুব খুশি, “মাতুব্বরের আজ খবর আছে।” পীর কথা শুরু করেন। বই পড়া, ধর্ম নিয়ে ‘উল্টাপাল্টা’ প্রশ্ন করা নিয়ে কিছুক্ষণ নসিহত করলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন জমি পরিমাপের জিনিসপত্র সাথে এনেছেন কিনা। আরজ আলী সাথে করে আনা ঝোলা ব্যাগ দেখান। পীর বলেন তার সমুদয় সম্পত্তি সন্তানদের মাঝে ভাগ করার কাজটি করে দিতে হবে। নিশ্চয় তিন চারদিন লাগবে, তবে কাজ যেন আজই শুরু করে দেন। এরপর নিজ লোকদের বলেন আরজ আলীর জন্য খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে। মুরিদরাতো অবাক! এভাবে ছেড়ে দিলো! পীর তাদেরকে বললেন আরজ আলী খুব ভালো ও যোগ্য মানুষ। তার বই পড়া এবং ধর্ম নিয়ে কথা বলায় ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। গ্রামের মানুষের ধর্ম বিশ্বাস কাটানো এত সহজ নয়!

প্রতিবেশী কিংবা অপরাপর গ্রামের লোকজনও আরজ আলীকে অসম্ভব সম্মান করতেন। কারণ তার মত বহু কাজে পারদর্শী, জ্ঞানী ও পরোপকারী ব‍্যক্তি দশ গ্রামে ছিলো না। চরমোনাই পীর বলেছিলেন-

আরজ আলীর হাত পড়লে একশ খুন থেমে যায়।
 
এ কথা তিনি বলেছেন জমি জরিপকে কেন্দ্র করে। আরজ আলী যেদিন থেকে জমি জরিপ শুরু করেন, এলাকায় জমির ভোগদখল সংক্রান্ত বিষয়ে বিবাদের হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমতে থাকে। এই কাজে আরজ আলী ছিলেন গ্রামের মানুষের জন্য বিশেষ নির্ভরতা।

তিনি ছিলেন শান্ত। সহজে রাগ করতেন না। প্রতিশোধ পরায়ণ ছিলেন হয়তো, কিন্তু তা অহিংস। তিনি জেদি ছিলেন এবং অপরের যাত্রা ভঙ্গ না করে নিজ পরিশ্রমে জেদ উদ্ধার করতেন। ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে তাকে দুনিয়ার মন্দ কথা বললেও তিনি শান্ত থাকতেন এবং যুক্তি সহকারে কথা বলতেন। এসব গুণের কারণে গ্রামের মানুষ তাকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতো।

আরজ আলী মাতুব্বরের সৃষ্টি, কর্ম ও দেশসেবা
আরজ আলীর জীবন চলার পথ মসৃণ ছিলো না, তিনি মসৃণ করে নিয়েছিলেন। এত অভাব, এত বাধা, এত সমস্যার মাঝেও তিনি জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াননি। বন্ধ করেননি শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা। থামিয়ে দেননি নতুন নতুন বিষয়ের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার প্রয়াস। শৈশবে অন্যের গবাদি পশু মাঠে চরিয়ে দু’মুঠো চাল এনে মাকে সাহায্য করেছেন। কিশোর বয়সে ঘুড়ি ও জলকল বানিয়ে বিক্রি করে সংসারে যোগান দিয়েছেন, আরেকটু বড় হয়ে হালচাষী হয়েছেন, এরপর জমি জরিপের কাজ করেছেন, জাল ও কাপড় বুনে বিক্রি করেছেন, বিয়ে বাড়িতে রান্না করেছেন, পুঁথি লিখে সেই পুঁথি গেয়ে টাকা উপার্জন করেছেন- এরকম আরো অনেক কিছু। এত কিছুর মাঝেও লেখাপড়া বন্ধ করেননি। এমনকি ৭৩ বছর বয়সে এসে বকেয়া থাকা বি.এ’র পাঠ্যপুস্তক পড়ে শেষ করেছেন।

তিনি তার জীবনে কী কী কাজ শিখেছেন এবং করেছেন, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া যাক। বাঁশ দিয়ে জলকল তৈরি, কাপড় বোনা, মাছ ধরার জাল বোনা, চিত্রাঙ্কন, নিজ প্রতিষ্ঠিত স্কুল এবং অন্যের স্কুলে শিক্ষকতা, সিলিং ফ্যান তৈরি, ডায়নামো তৈরি, এয়ার ইঞ্জিন, জলঘড়ি নির্মাণসহ আরো অনেক কিছু। এর সবকিছু তিনি করেছেন অদম্য কৌতূহল থেকে, জানার ইচ্ছে থেকে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কারিগরি শিক্ষা ছাড়াই তিনি সফল হয়েছিলেন কারণ সফল হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন। তিন তিন বার তার সংগ্রহের সকল বই ঝড় তুফানে উড়িয়ে নিয়ে গেছে, তবুও তিনি বই সংগ্রহ করে জ্ঞানার্জন থেকে বিরত হননি। শেষবার সাইক্লোনে যখন তার শতাধিক বই নদীতে ভেসে যায়, তখন তিনি বলেছেন, মাতৃবিয়োগেও এত বেদনা পাননি, বই হারিয়ে যত বেদনা পেয়েছেন। কিন্তু আরজ আলীকে রুখে দেয়ার সাধ্য মানুষতো দূরে থাক, প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও ছিলো না।

শুধু নিজ কৌতুহল নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না তিনি। নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছেন। লামচরি গ্রামে শিক্ষার মূল সমস্যা ছিলো শিক্ষকের বেতনের অভাবে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। এ সমস্যা নিরসনে সমবায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এলাকায় সেচ ব্যবস্থার জন্য খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, গ্রামের কৃষকদের কৃষিজ্ঞান বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন, নতুন নতুন ফসল উৎপাদনে উৎসাহ দিয়েছেন। আর যে কাজটি করে তিনি অধিক মাত্রায় সন্তুষ্ট ছিলেন তা হলো গ্রামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা। যে লাইব্রেরি গ্রামের মানুষকে এখনো আলোকিত করে যাচ্ছে। মৃত্যুর আগে তিনি তার লাইব্রেরির জন্য বেশ কিছু টাকাও রেখে যান। যেন টাকার অভাবে লাইব্রেরিটি বন্ধ হয়ে না যায়। এভাবেই তিনি দেশের সেবা করে গেছেন।

ভেকের কাছে ‘ডোবা’ই তার দেশ, কৃষকের ‘দেশ’ তার পল্লী, এবং রাষ্ট্রনেতার কাছে ‘দেশ’ তার গোটা রাষ্ট্র। আমার ‘দেশ সেবা’ মানে ‘রাষ্ট্র সেবা’ নয়, পল্লী সেবা।

আরজ আলীর প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ১৮টি। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্রদের জন্য পাঠ্য বই থেকে শুরু করে নিজ আত্মজীবনীও আছে। তার প্রথম রচনা সম্ভবত পুঁথি গান (১৯২০)। এরপর বাল্য সোপান (১৯৩৩), সীজের ফুল (১৯৩৩), ক্ষেত্রফল পুস্তক (১৯৬০), সত্যের সন্ধান (১৯৭৩), অনুমান (১৯৮৩), স্মরণিকা (১৯৮২), ভিখারির আত্মকাহিনী, ভাবি প্রশ্ন সহ অন্যান্য গ্রন্থ রচনা করেন। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত রচনা মিলিয়ে প্রকাশনী সংস্থা ‘পাঠক সমাবেশ’ তিন খন্ডে ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র’ প্রকাশ করে। এই সমগ্রে তার প্রায় সকল রচনার সংকলন করা হয়েছে।

আরজ আলী মাতুব্বরের রচনার প্রধান রসদ হচ্ছে প্রশ্ন। তিনি ধর্ম, ঈশ্বর, ইহকাল, পরকাল, স্থান, কাল নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন করেছেন। যে প্রশ্নগুলো আমার আপনার মাথায়ও আসে। প্রশ্নের পাশাপাশি এসব প্রশ্নের কমবেশি ব্যাখ্যা করেছেন (প্রশ্নের ব্যাখ্যা, উত্তরের নয়)। তার প্রশ্নের সংখ্যা ও ধরন দেখলে বুঝা যায় এসব বিষয়ে তিনি কী পরিমাণ ভেবেছেন এবং ভাবনার কত গভীরে গিয়েছেন। আত্মজীবনীসহ প্রায় সকল রচনায় উঠে এসেছে ব্যক্তিগত নীতি নৈতিকতাবোধ, সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের স্বরূপ। তিনি ধর্ম ও ধর্ম বিশ্বাসকে খুলে-মেলে উল্টে-পাল্টে দেখে আবার সুন্দরমত ভাঁজ করে দিয়েছেন। বাংলা ভাষায় এরকম চিন্তা ও সন্দেহ জাগানিয়া পুস্তকের সংখ্যা খুব বেশি নেই। আরজ আলী মাতুব্বর কলম ধরেছিলেন কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তিনি মনে করতেন দুর্জ্ঞেয় এবং রহস্যময়

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

Editor: Sukriti Kr Mondal

E-mail: info.eibela@gmail.com Editor: sukritieibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71