শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০
শনিবার, ৯ই কার্তিক ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১১:০৩ pm ১২-০৭-২০২০ হালনাগাদ: ১১:০৩ pm ১২-০৭-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


আমার মত অনেকের প্রিয় বন্ধু জীবন। সে তার জীবনী লিখছে। হয়তো তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কেও লিখবে। সকলের মতো আমিও একনিষ্ঠ মনে ওর লিখা পড়ছি আর হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি মনে করে কখনো হাসছি কখনো কাদছি। সঙ্গত কারণেই কয়েকদিন আগে আমার ফেসবুক আইডিতে আমার সম্পর্কে জীবনের লিখা একটা বিষয়ে correction দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম একজন পাঠক হয়ে সকলের মত আমিও এর রস আস্বাদন করব। কিন্তু এর মধ্যে দেখলাম বাবুল তার অ-সাধারণ লেখনীর মাধ্যমে জীবনের জীবন চরিত ও কিছু নাবলা কথা বলেছে। ওদের দু'জনের লিখনিতে সঙ্গত কারণেই আমার সম্পর্কে কিছু কথা এসেছে । সে কারনে দু'একটি কথা লিখার লোভ সামলাতে পারলাম না। জানি, আমি জীবন বা বাবুলের মত কেউ নই। নেই কোনো সাফল্য গাথা। তাই আমার কথা কারো কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলে ক্ষমা প্রার্থী।

১৯৮৭ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ফরিদপুর এ আমি কলা শাখার প্রথম বর্ষের নবীন ছাত্র । নগরকান্দা থেকে নিয়মিত বাস যোগে ফরিদপুর আসি। বাসে আসতে রাস্তা থেকে আরো অনেক ছাত্র উঠে। দু'একদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম বাবুল আমাদের সাথে মানবিক শাখায় পড়ে। ব্যাস দেখতে শুনতে সুন্দর, পোশাকে আসাকে মার্জিত, শান্ত, সৌম্য ছেলেটি মনে হয় খারাপ হবেনা, যে ভাবনা সেই কাজ। নিজে গিয়ে পরিচিত হলাম। পরিচয় হল মাইনুদ্দিন (সোনারগাঁ হোটেলে চাকরি করে), রফিক (মানিক নগরে আমার লজিং ঠিক করে দিয়েছিল, কোথায় আছে জানিনা), ফিরোজ আশরাফ (কথা সাহিত্যিক), সেলিম (সাবেক চেয়ারম্যান, গেরদা), আরিফ (বর্তমান ফুলসুতী ইউনিয়ন এর চেয়ারম্যান), তালমার মজিবর সহ অনেকের সাথে। তবে ঠিক কবে এবং কিভাবে জীবনের সাথে প্রথম পরিচয় হলো তা মনে নেই। জীবন বানিজ্য বিভাগে পড়ত। হয়তো কমন ক্লাসের মাধ্যমেই পরিচয় হয়ে থাকবে। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই আমরা একে অপরের বন্ধু হই। একসাথে আড্ডা, ঘুরাঘুরি ভাবের আদান প্রদান এই আর কি। এর মধ্যেই আমার মাথায় রাজনীতির পোকা উকিঝুকি মারতে শুরু করে। অবশ্য আগে থেকেই মাথার মধ্যে এই পোকা ছিল। ইতিমধ্যে আমরা তিনজন বেশ ইন্টিমেট বন্ধু হয়ে পড়েছি। যতদুর  মনে পরে বাবুল- জীবন দুজনের সাথেই এ বিষয়ে আলাপ করি। কিন্তু জীবন জানিয়ে দেয় ও এসবের মধ্যে নেই। তখন কিন্তু জীবনই আমার প্রথম পছন্দ ছিল। কারন বাবুল অনেকটা লাজুক ও নিরীহ প্রকৃতির ছিলো। বাট তার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল। এই বিষয়ে আগে থেকেই সে পড়াশোনা করতো। তাছাড়া তার বাবা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলো। যেহেতু জীবনের কোন আগ্রহ নেই, সেহেতু শেষ পর্যন্ত আমি আর বাবুল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি। পড়াশোনা, আড্ডার পাশাপাশি পার্টির মিছিল মিটিংয়ে আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ চলতে থাকে। জীবন রাজনীতিতে না জড়ালেও  আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন দিন দিন নিবিড় হতে থাকে। একবার (১৯৮৯) আমি আর বাবুল রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে সদস্য পদে নির্বাচন করি। আমার মনে আছে তখন এই সদস্য নমিনেশনের জন্য সে কি লিয়াজোঁ, লবিং। একই পোস্টার, একই লিফলেট, একই wall paint, একই সাথে ভোট চাওয়া "অজয় ও বাবুল" কে ভোট দিন। আমার মনে আছে আমি সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। ১৯৯১ সালে আবার আমি সংসদের নাট্য সম্পাদক নির্বাচিত হই। যাই হোক সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়ানো আর পরোপকার শেষে রাতে ঠিক বই পড়তাম। বাবুল তার শহরতলীর গ্রামের বাড়িতে থাকায় বেশিরভাগ সময় আমি আর জীবন এক সাথেই থাকতাম। আর পরে তো বাবুল ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে ঢাকায় চলে যায়। শুরু করে দিবা-রাত্রি বিরামহীন পার্টির কাজ। কত, সকাল, দুপুর, বিকাল এমন কি গভীর রাত পর্যন্ত আমিও ওর সাথে সাথে দলের কাজের জন্য ছুটা ছুটি করেছি। আজ সে আমাদের হাজার বন্ধুর গর্ব, অসম্ভব মেধাবী, দায়িত্ব পড়ায়ন। দেশ, দেশের মানুষ আর পার্টির প্রতি ওর commitment আমাকে অবাক করে দেয় । আমি বিশ্বাস করি ওর এই ত্যাগ বিফলে যেতে পারেনা। পার্টি ওকে সুযোগ দিলে আমি নিশ্চিত দেশ ও দল অবশ্যই উপকৃত হবে। তবে পার্টি আর দেশ কে ভালো বাসতে গিয়ে নিজের পরিবারকে ও ভুলে না যায় সেটাই আমার আশঙ্কা। ওর ছেলেটিও মেধাবী আর অসম্ভব মিষ্টি। ওদের জন্য থাকল আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।

আমি যে জীবন কে চিনি:
আমার চাইতে বেশী পড়া লেখা করত, টিউশনি করত, হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিলো। সব সময় আড্ডা বাজ, বন্ধু বৎসল ও উদার মন। নতুন জিন্স, কেডস, টি শার্ট তার খুবই প্রিয় ছিলো। মোটর সাইকেল দেখলে ওটা তার চালাতেই হবে- সে যার হোক আর যে ভাবেই হোক। অনেকের মধ্যে দু'জনের নাম এসময় আমার খুব মনে পড়ছে ১. রানা, ওর বাবা ফরিদপুর কারাগারের কারা কর্মকর্তা ছিলেন। রানার CDI-100 লাল রং এর  HONDA BRAND সাইকেল জীবন নিজের মনে করেই ব্যবহার করতো। এই মোটর সাইকেলটি আমারও অনেক জরুরি প্রয়োজনে কাজে লাগতো। নির্বাচনের ভোট চাওয়া, বিপদে আপদে দৌড় ঝাপ, রানা সাইকেল নিয়ে ঠিকই হাজির। ২. ভোলা, গোয়ালচামটের এই বন্ধুও তাই। ঐ বয়সেই জীবনের খরচের হাত এত বড়, যা আমি সচরাচর দেখি না। হাতে টাকা আসলে দুই হাতে খরচ করে শুন্য না হওয়া পর্যন্ত তার স্বস্তি নেই।জীবন ও আমি কাছাকাছি সময়ে ফরিদপুর ছেড়ে ঢাকা আসি, বাবুল তারও আগে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় আর পুরোদস্তুর রাজনীতি করতে থাকে। ওর ধ্যান জ্ঞান ঐ রাজনীতিতে পরিণত হয়। আমি আর জীবন চাকরি করতে থাকি, সে এক লম্বা ইতিহাস, কিছুটা জীবন- বাবুল লিখেছে। আমি সে দিকে যেতে চাই না। কিন্তু খুবই বেদনার দু-একটা বিষয় না বললেই নয়, যা আমাকে সারাজীবন কষ্ট দেয়-
১৷ সুদর্শন: জীবনের একমাত্র ছোট ভাই। আমাকেও নিজের দাদার মত ভালবাসত। দাদাই বলতো, এমন কি অজয় দাদাও বলত না। সদ্য HSC শেষ করেছে।

২০/২১ বছরের উঠতি যুবক। ওরা দুই ভাই এলিফ্যান্ট রোডের বাটার মোড়ের কাছে একটি কম্পিউটার দোকান পরিচালনার কাজ শুরু করেছে। সম্ভবত এটা ওর প্রথম ব্যাবসা। জীবন তখন বিবাহিত। ইস্কাটন গার্ডেনে থাকে। ব্যাবসার পরিকল্পনা, যেমন এটা কোন computer hardware business হবেনা, এটা হবে software related, business কারা কাস্টমার হবে, কি ভাবে হবে, দোকান সাজানো, ফার্নিচার সেটিং, জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধন কি ভাবে হবে সব কিছুতেই দুই ভাই মানিক জোরের মত কাজ করছে, আমরা যখন যতটুকু সম্ভব সাথেই আছি। ২০০৩ হবে হয়তো, বিকাল মনে হয় ৫:৩০ বা ৬:০০ টা হবে।আমি ফোন টা একটু পরে পেয়েছিলাম তখন আমি রাতের খাবার খেতে বসেছি। আমার বাসা তখন ঢাকা সেনানিবাসের কচুক্ষেত এলাকায়। হঠাত জীবনের ফোন। ফোন তুলতেই জীবনের সে কি আর্তনাদ, অজয়.! সুদর্শন মোরে গেলরে, একটি বাস ওকে চাপা দিছে, আমি কি করবো.? তাড়াতাড়ি পিজি হাসপাতালে আয়, আমি ওকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছি। অমনি দৌড়, তখন তো আমাদের কারো গাড়ি ছিলো না। একটা CNG নিয়ে পিজি হাসপাতালে পৌছনোর আগেই জীবন বলল, পিজি ভর্তি করলো না, ঢাকা মেডিকেল যাচ্ছি, CNG ঘুড়িয়ে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে দেখি, Emergency তে একটা রোগীবাহী trolley তে সুদর্শন শুয়ে আছে। কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন নেই কিন্তু কোন ডাক্তার ওকে দেকছে না। বুঝতে পারলাম আঘাত টা ওর মাথায়। বুকটা আমার পাথর হয়ে গেল। আমাকে জড়িয়ে জীবনের সেই আর্তনাদ আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। ঘাতক বাস আটকানো হয়, পরে ড্রাইভার ও ধরা পরে। জানতে পারলাম, ড্রাইভার না, গাড়ি চালাচ্ছিল হেল্পার। ওকে ধরে আনল রমনা পুলিশ। জীবন বলল, আমার ভাই নাই, ওকে আমি আর পাবো না, শুধু আমার ভাইয়ের শরিলটা কাটাছেঁড়া না করে ফেরত দিন। শেষ হয়ে গেল সুদর্শন। জীবন প্রথমবার একা হয়ে গেল।

২৷ জীবনের বাবা: ২০১৪ সাল হবে। জীবনের বাবা অসুস্থ। ভারতের কলকাতায় পাঠাল জীবন চিকিৎসার জন্য। তখন জীবন অর্থনৈতিক ভাবে আজকের অবস্থানে পৌছে গেছে। বাবার চিকিৎসার সাথে কোন আপস নেই। একদিন সকালে ওর অফিস থেকে ও বলল, বাবার অপারেশন করাতে হবে। চল কলকাতা যেতে হবে, আজই বিকেলে যাব। দুজন সেই দিনই সন্ধার আগেই কলকাতা হাসপাতালে পৌছে গেলাম। সেখানে আগেই শংকর আর আমাদের বন্ধু তাপস উপস্থিত ছিল। জীবনের বড় ভাইরা ভাই ও ছিলেন। গিয়ে দেখলাম কাকা বেশ সুস্থ। জীবনের বড় দিদি পাসে বসা। কাকিমা ওদের গ্রামের বাড়ি ছিলেন। আমরা বসে নানা রকম গল্প করলাম। জীবন বলল, কাল বাবার জন্য কিছু কাপড় চোপর কিনতে হবে। কাকা আমাকে বললেন, বয়স হয়েছে তো হাত পায়ের গিরে ব্যাথা করে। তুই আমার জন্য দুই বোতল বৈদ্য নাথের রুমা অয়েল নিয়ে আশিস তো। পর দিন আমি, জীবন আর তাপস গড়িয়ার একটা মার্কেটে গেলাম জীবন কাকার জন্য বেশ কিছু ধুতি, পঞ্জাবি আর ফতুয়া কিনল। শেষের দিকে বলল, বাবার ভাল শাল নেই, একটা সুন্দর শাল পছন্দ কর। সব কেনা হল। আমি বললাম দারা কাকা আমাকে একটা জিনিস কিনতে বলেছে। বেশ কিছু দোকান খুজে ঐ তেল পেলাম। আমি ১০ বোতল কিনলাম। ওরা বলল, অত দিয়ে কি করবি.? আমি বললাম আমার বাবার জন্যও কিছু নিয়ে যাব। যথারীতি সব জামা কাপড়ের সাথে আমি যখন ৬ বোতল মালিসের তেল দিলাম কাকা বললেন, এত আনলি কেন, এত দিয়ে কি করব, তোর বাবার জন্য তিনটা নিয়ে যা। আমি বললাম বাবার জন্য আছে, আপনি রাখুন। দুই/ তিন দিন পর অপারেশনের দিন ঠিক হল। ঐ দিন সকালে কাকা বলছিল, দেখ, আমি তো বলগুলো কত সহজেই ফু-দিয়ে উপরে উঠাতে পারি। বুকেও কোন ব্যাথা নেই, আমার অপারেশনের কি দরকার.? আমি তো ভালই আছি। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন ওনার open heart করতে হবে। জীবন আমরা সবাই ভাবলাম বয়স হয়েছে, attack হয়েছে, অপারেশন করলে অনেকদিন ভালো থাকবেন। জীবন তার আগেই ঐ হাসপাতালের সবচাইতে ভালো ডাক্তার আর অপারেশন package ঠিকঠাক করে রেখেছে। অপারেশনের আগের দিন সকালে জীবন, আমি, তাপস ও শংকর চার জনে মিলে রক্ত দিলাম। ওখানে গ্রুপ কোন বিষয় নয়। আপনি যে কোন গ্রুপ এর রক্ত দিতে পারেন, ওরা প্রয়োজনীয় টা ওদের রিজার্ভ থেকে সরবরাহ করে। পর দিন বেলা ১১.০০ টার দিকে কাকাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। তখনো উনি বলছিলেন, আমার অপারেশান না করলেও চলত। ঐযে অপারেশন থিয়েটারে উনাকে অজ্ঞান করা হয় আর জ্ঞান ফেরেনি। এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত জীবন একা হল। আর সারাজীবনের জন্য বিধবা ও একা হলেন- সাদা মনের মানুষ, মমতাময়ী কাকিমা। উনাদের দুজনের আন্তরিক ভালবাসা আমি পেয়েছি। কাকিমার হাতের অনেক রান্না আমি খেয়েছি। কাকার মৃত্যুর পর জীবনের কেনা ঐ শাল শেষকার্য সম্পাদনের সময় কোন একজন দরিদ্র মানুষকে দেয়া হয়। আর আমি যে ৪ বোতল তেল নিয়ে এসেছিলাম তার এক বোতল এখনো আমার বাসায়। আজকের এই দিনে কাকা বাবুর আত্বার শান্তি কামনা করছি। চলছে....

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71