সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০
সোমবার, ২৯শে আষাঢ় ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ০৪:২৭ pm ০৭-০৬-২০২০ হালনাগাদ: ০৪:২৭ pm ০৭-০৬-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


আমার জীবনের অবর্ণনীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে আমি বাসায় আসলাম। হয়তো রাত তখন দুইটার উপরে বাজে, সোমা ড্রয়িং রুমে অপেক্ষা করছে, বলে উঠলো, কি গো এতো দেরি করলে কেনো? কথা না বলে শুয়ে পড়লাম আমি। রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো না হয় আমার মধ্যেই থাক। ঘটনার প্রবাহ ঘটলো ঘুম থেকে উঠার পরও। চিরচারিত অভ‍্যাস, সকালে ইমেল চেক করা। তখন আইএসএন এর ডাইয়ালাপ কানেকশন নিতে হয়। টেলিফোন লাইন দিয়ে ইন্টারনেটে ঢুকতে হয়। অনেকবার ট্রাই করার পর আইএসএন এর সার্ভারে কানেক্ট হলো। কতগুলো মেইল আসলো, আসলো কিছু জাঙ্ক মেইল ও। জাঙ্ক মেইলের মধ্যে হটাৎ করে একটা ইমেল চোখে পড়লো, মেইলটা এনসিআর এর পোর্টাল থেকে আসা। আমি হুবহু মেইলটা তুলে ধরছি-

Dear Mr. Gentlemen,
We have some business opportunity in Standard Chartered Bank in Bangladesh, They are looking for paper roll for their ATM network, we are the biggest supplier for that. If you are interested please coordinate with Mr. Zakir Zawader, he is heading of Cress of SCB BD.
Regards,
Saneep Sethi
NCR Global Holding Limited.

আমি কখনোই NCR এ আগে কোন মেইল বা ইনকোয়ারি দেই নাই। বুঝতে পারলাম না কেন এই জাঙ্ক মেইলটা আমার ইনবক্সে আসলো? অতো ভাবাভাবি না করে রেডি হয়ে আমি ১১টার দিকে পূর্বানী হোটেলের সামনে হাদী মেনশনে গেলাম। জাকির ভাই স্টান্ডার্ড চাটার্ড ব‍্যাংকের হেড অব ক্রেস। সৌভাগ্য বশত আমি তাকে আগেই চিনি। উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবি এর স্টুডেন্ট ছিলেন। উনাকে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই চিনতাম কিন্ত জানতাম না যে উনি এসসিবিতে কাজ করেন। স্টান্ডার্ড চাটার্ড ব‍্যাংক একটি প্রফেশনাল ব‍্যাংক, আজুরে আলাপ করার সময় তার নাই। সরাসরি আলাপ, আমি এনসিআরের মেইলটা দেখালাম। জাকির ভাই বললো- আমি এনসিআর এ মেইল করেছিলাম, কিন্তু তুমি পেলে কি ভাবে? এটা তো আমার কাছে আসার কথা। তরিৎ গতিতে বলল, বাদ দাও তুমি এই ব‍্যবসা করবে নাকি? আমিও বললাম কেনো করবো না, ব‍্যবসা করার জন্যই আসছি আপনার কাছে। সে বললো, আর বলো না, এখনকার ভেনডর গুলো খুব খারাপ ৬০০ টাকার জিনিস বিক্রি করে ৫৮০০ টাকা, এইটা কোন কথা? সে আমাকে অফার করলো এই বলে, একটা পেপার রোল দুবাই NCR এ ৬০০ টাকা, ফ্রেইট কষ্ট, ইমপোর্ট ডিউটি মিলে ধরলাম আরো ৬০০ টাকা তোমাকে আমি ২৫০০ টাকা করে দিবো, দেখো পারো কিনা? আমি উত্তর দিলাম জাকির ভাই আমি পারবো, কিন্তু জাকির ভাই আমার তো টাকা নাই, উনি বললো, তুমি ব‍্যাংকের অনেক সেফ করে দিচ্ছো, ব‍্যাংক তোমাকে ৭৫℅ অগ্রিম দেবে প্রয়োজনে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। উনি আমাকে বসতে বললেন, সর্বসাকুল‍্যে এক ঘন্টার বেশি হবে না, যেহেতু ব‍্যাংকের অনেক টাকা সেইফ হবে তাই দুই থেকে তিন বছরের মোট কতগুলো পেপার রোল লাগবে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে উনি জেনে নিয়ে আমাকে এমন একটি কার্যাদেশ দিলো যার ৭৫℅ অগ্রিম এর পেমেন্ট অর্ডারের মূল্য ছিলো ৮.৭ মিলিয়ন টাকা। যাত্রা শুরু ব‍্যাংক জগতে, স্টান্ডার্ড চাটার্ড ব‍্যাংক, ব্রাক ব‍্যাংক, শুরু করলাম একটার পর একটা, আগের সম্পর্কগুলো জোরা তালি দিতে লাগলাম, আগের সম্পর্ক বলতে, যখন আমি ISL, ডেস্কটপে কাজ করতাম, ঐ সুবাদে যাদের সাথে আমার খাতির ছিলো, World Bank, WHO, UNDP, US Embassy, বাংলাদেশ ব‍্যাংক এর উচ্চ পর্যায় অফিসারদের সাথে। আমি যখন ISL এ চাকরি করতাম পরিচয় হয়েছিল রেইজ মিলার নামে আমেরিকান এক ভদ্রলোকের সাথে, জানতে পারলাম ওনার ওয়ার্ড ব‍্যাংকের চাকরির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। আমি উনার সাথে বাংলাদেশ অটোমেটিক ক্লিয়ারিং হাউস প্রজেক্ট সম্মন্ধে আলাপ করলাম আর এই প্রজেক্ট সম্মন্ধে সনদ্বীপ সেথী আমাকে ধারনা দিয়েছিল। সরকারেরও বাংলাদেশ ব‍্যাংকের অনেক ডিপার্টমেন্ট ডিজিটাইজেশন করার ব‍্যাপারে চাপ ছিলো। রেইজ মিলার আমার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করলো, বাংলাদেশ ব‍্যাংকের কনসালটেন্ট হবার জন‍্য। আমি দেরি করলাম না। ওনার সিভিটা ডেপুটি গভর্নরের কাছে পৌছে দিলাম। বাংলাদেশ ব‍্যাংক এই ধরনেরই লোক খোজ করছিল। তাই বাংলাদেশ ব‍্যাংক রেইজ মিলারকে কনসালটেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেয় এবং উনাকে দায়িত্ব দেয় আমার ঐ স্বপ্নের প্রজেক্টে। কাজ শুরু করি একে অপরের পরিপূরক হিসাবে। প্রক্রিয়া হলো টেন্ডারের- BACH Project, বাংলাদেশ ব‍্যাংক স্বচ্ছতার জন‍্য ওপেন টেন্ডার কল করে। আমাদের সাথে অনেক বিদেশী কোম্পানি পার্টিসিপেট করে। কাজ পেয়ে যায় সিংগাপুরের একটি কোম্পানি। রেইজ মিলার খুব আফসোস করল আমার জন্য কারণ কাজটা আমি পাইনি তাই।

বাংলাদেশ ওটোমেটিক ক্লিয়ারিং হাউস (BACH) চালু হলো। কমার্সিয়াল ব‍্যাংক গুলোর সাথে কানেক্টিভিটি এস্টাব্লিশড করার কাজও আমার এগিয়ে চললো কিন্ত বাদ সাধলো ফিজিক্যাল সিকিউরিটি ইন্সট্রুমেন্ট যেমন, ব‍্যাংকের চেক, পে ওডার, ডিমান্ড ড্রাফ এগুলো নিয়ে, তখন এক একটা একএক রকম সাইজের সিকিউরিটি ডকুমেন্ট গুলো ব‍্যবহার করতো আর এগুলো সবই ছাপা হতো, গাজীপুর টাকশাল থেকে। এর বাইরে চেকের মতো মূল‍্যবান ডকুমেন্ট কোথাও ছাপা হতো না। বাংলাদেশে কারো আইডিয়া ছিলো না, ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন যেটাকে এমআইসিআর (MICR) চেক বলা হয় আর চেক ডিজিটালি ট্রানজেকশন করা যায়। মেশিন রিডেবল চেক। আলাপ করলাম রেইজ মিলারের সাথে, আলাপ হলো চৌধুরী মহিদুল হকের সাথে, উনি তখন পেমেন্ট সিস্টেমের এক্সেকিউটিভ ডিরেক্টর। বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাপ হলো সিস্টেম এনালিস্ট জাহিদ ভাই, হিমাদ্রী দা আরো অনেকের সাথে, প্রেজেন্টেশন দিলাম একাধিক বার, গুরুত্ব তুলে ধরলাম বাংলাদেশের ব‍্যাংক গুলোর একই সাইজের চেকের ব‍্যবহার কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। টাকশাল থেকে বাইরে চেকবুক প্রিন্ট করতে হলে বাংলাদেশ ব‍্যাংকের পলিসি পরিবর্তন করতে হবে। একাধিক বার দেখা করলাম গভর্নরের সাথে, দেখা করলাম এস কে সুর এর সাথে উনি তখন বাংলাদেশ ব‍্যাংকের ডেপুটি গভর্নর। পলিসি পরিবর্তন হলো। অনুমতি পেলাম টাকশালের বাইরেও চেকবুক প্রিন্ট করার। প্রেজেন্টেশন দিতে থাকলাম প্রতিটি কমার্সিয়াল ব‍্যাংক গুলোকে। তারা জানতোই না এমআইসিআর (ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন) কি জিনিস, E13B ফ্রন্টের ব‍্যবহার, এ‍্যালগোরিদম সুত্রটা কি? বুঝাতে থাকলাম একের পর এক ব্যাংক গুলোকে। এই প্রেজেন্টেশনে আমার টিমে ছিলো, তাহরিমা, আমিন, তাপস, প্রার্থ‍্য আরো অনেকে। বাংলাদেশ ব‍্যাংক সার্কোলার ইস‍্যু করলো, সময় সীমা বেধে দিলো। প্রথমে ব্রাক ব‍্যাংক আমাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো, ইমরান ভাই তখন ব্রাক ব‍্যাংকের ম‍্যানেজিং ডিরেক্টর ও কায়ছার তামিজ আমিন ভাই আমাকে কোলেটারেল সিকিউরিটি ছাড়া তিন কোটি টাকা লোন দিলো এমআইসিআর (ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন) মেশিন আনার জন‍্য এবং ব্রাক ব‍্যাংকের সকল সিকিউরিটি ডকুমেন্ট পারসোলাইজড করে দেওয়ার প্রথম কার্যাদেশটি দিয়ে। আমি ইমরান ভাই, কায়সার ভাইয়ের কাছে চির কৃতজ্ঞ এবং তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সর্বদা। বাংলাদেশে তখন পঞ্চাশের উর্ধে ব‍্যাংক, একটা কোম্পানির পক্ষে বাংলাদেশের সমস্ত ব‍্যাংকের সিকিউরিটি ডকুমেন্ট গুলো পরিবর্তন করে একটা ইউনিফর্ম সাইজে আনা দুরূহ ব‍্যাপার, তাই কয়েকজন উদ্যোগতা তৈরি করে ফেললাম, তাদের কাছে টেকনোলজি শেয়ার করলাম, প্রযুক্তির ব‍্যবহারে ট্রেনিং দেওয়ালাম, তাদের কাছে এমআইসিআর (ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন) মেশিন গুলো বিক্রয় করলাম। উদ্দেশ্যে একটাই প্রযুক্তির ব‍্যবহার যেনো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ ব‍্যবহার হতে পারে। ঐ কোম্পানি গুলো- চেক ব‍্যুরো সার্ভিস লি., নেটওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ লিমিটেড, হাবেলী সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস লি., এদের শেখালাম, তৈরি করলাম, টেকনোলজি দিলাম, বলতে দিধা নাই, নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সমস্ত কমার্সিয়াল ব‍্যাংক গুলো একই ইউনিফর্ম সাইজ করে ফেললাম। প্রযুক্তির সুফল আসতে থাকলো পর্যায় ক্রমে। এমআইসিআর (ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন) চেক ব‍্যবহারে দেশের অর্থনৈতিক চাকা একধাপ এগিয়ে চলতে থাকলো, কালো টাকার বা মানিলন্ডারিং হ্রাস পেতে শুরু করলো। নন এমআইসিআর (ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন) চেকগুলো তিন থেকে চার দিন লাগতো ক্লিয়ারিং হতে আর এখন ক্লিয়ারিং হয় সেম ডে'তে। হাই ভেলু চেক গুলো ক্লিয়ারিং হয় কয়েক ঘন্টার মধ্যে। অর্থের ব‍্যবহার যতো ত্বরান্বিত হয় সে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তত তারাতারি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমআইসিআর (ম্যাগনেটিক ইন্ক্ ক্যারেক্টার রিকগনিশন) চেক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। শতভাগ সততা, নিষ্ঠা, আর আমার একাগ্রতায়, বাংলাদেশ ব‍্যাংকের পরিচালিত কমার্সিয়াল ব‍্যাংকগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় ব‍্যাংকগুলো ছাড়া সিকিউরিটি ডকুমেন্ট প্রাইভেটাইজেশনের মাধ্যমে সফলতার সাথে পরিচালিত হতে লাগল যা অদ‍্যবধি বিদ‍্যমান। চলবে....

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71