সোমবার, ২৫ মে ২০২০
সোমবার, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১১:২০ pm ২০-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১১:২০ pm ২০-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


ভারত হচ্ছে গরীবের বিদেশ। বিদেশ ভ্রমণ নাকি সৃষ্টিকর্তার ইশারা ছাড়া হয় না। আমার অনেক দিনের শখ, অনেক স্বপ্ন একবার এই ৫৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাইরে যাবো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইশারা হচ্ছে না বলেই যেতে পারছি না, শেষ পর্যন্ত ইশারা হলো। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ করেছি, মাস্টার্সের ক্লাশ তখনো শুরু হয়নি। নিজের আয়ে চলা একজন অল্পসাহসী যুবকের ভারত ছাড়া আর কোথায়ই বা যাওয়ার শখ হতে পারে? কিন্তু ভারতে যাবো, কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো এ্ই সব অজনা একটা ভীতিও ভেতরে ভেতরে কাজ করছিলো। একদিন বন্ধু বাবুলের সাথে আমার এই পরিকল্পনার কথা বললে ও জানালো জীবনের সাথে কথা বল। কোলকাতায় ওর বোন থাকে দেখ ও যায় কিনা। জীবন আমার তখন এ-প্লাস টাইপ বন্ধু, গোল্ডেন টাইপ না। রাজেন্দ্র কলেজে আমাদের ইন্টারমিডিয়েট পাঠ একসাথে হয়েছে, আমি মানবিকে ও বাণিজ্যে। আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে জীবনের সাথে আলাপ করলাম ও এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলো। আমাকে আশ্বস্ত করে বললো, আমার বোনের বাড়িতে থাকবো দুইজন একসাথে কোনো সমস্যা নেই। জামাইবাবু কি মজার জিনিস গেলে দেখতে পাবি। ভারতে যাবার পরিকল্পনা নিয়েই আমি ঢাকা থেকে ফরিদপুরে গিয়েছি। তার আগে ভারতের টুরিস্ট ভিসা নিয়েছি, পাসপোর্টে তখন সবুজ কালির সিল মারা হতো। পাসপোর্টের শেষ পৃষ্ঠায় ৫০ ডলার এনডোর্স করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালের ২২ ডিসেম্বর বিকেলে জীবন তার এক বন্ধুকে নিয়ে মোটর সাইকেলে আমার গ্রামের বাড়িতে এলো। উদ্দেশ্য পরদিন আমাদের যাবার ব্যাপারটা ফাইনাল করা। অবশেষে এলো বহুল কাঙ্খিত সেই দিন ২৩ ডিসেম্বর ১৯৯৫ । দিন পনেরো থাকার মতো কাপড়-চোপড় নিয়ে আমার ট্রাভেল ব্যাগ রেডি করে ফেললাম। আমরা বেনাপোল বর্ডার দিয়ে বাই রোডে ইন্ডিয়া যাবো। বাসে উঠতে হবে ফরিদপুর বাস টার্মিনাল থেকে। জীবনের সাথে আমার দেখা হবে ফরিদপুর বাস টার্মিনালে। আমি এসে দেখি ও আগেই এসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা যশোরের একটা বাসে উঠলাম। যশোর থেকে বেনাপোলের বাস ধরবো। যশোর থেকে বেনাপোলের বাস পেতে আমাদের কষ্ট হয়নি। আমার ভেতরে উত্তেজনা জীবনের চেয়ে বেশি কারণ এর আগেও ও ভারতে গেছে। জীবনে আমি প্রথমবার বিদেশ যাচ্ছি। এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গকিলোমিটারের বাইরে যাচ্ছি। এটা মোটেই কোনো ছোটোখাটো ব্যাপার নয় আমার কাছে। বেনাপোল বর্ডারে এসে আমার মাথা ঘুরে গেলো বিশাল লম্বা লাইন। ট্রাভেল ট্যাক্স জমা দিতে হলো একটা ব্যাংকে। জীবন যেহেতু আগে এসেছে ও সব জানে, কোথায় যেতে হবে, কত টাকা জমা দিতে হবে, এটা তো সরকারি খরচ। বেসরকারি খরচও কিছু আছে তার নাম ঘুষ। কাস্টম অফিসার আমাদের লাইনে সবার কাছ থেকেই টাকা নিচ্ছে, না দিলে হ্যানস্থা করছে। মানি ব্যাগ বের করে বাংলাদেশের টাকা নিয়ে যাচ্ছি কিনা সেগুলো দেখছে। জীবন আগে থেকেই আমাকে বলে রেখেছিলো, বাংলাদেশী টাকা যা আছে জাঙ্গিয়ার ভেতরে লুকিয়ে ফেলতে ও নিজেও তাই করেছে।
ঘুষ দিতে আমি অভ্যস্ত না জীবনে কোনোদিন কাউকে এক পয়সা ঘুষ দেইনি। লাইনে আমার সামনের লোকটা সরে যাবার পর কাস্টম অফিসার আমার ব্যাগ চেক করতে শুরু করলো। জীবন বললো, তুই নিজের পরিচয় দিবি বলবি একজন লেখক। দরকার হলে তোর একটা বই ওনাকে দিয়ে যাবি। আমি সেই মোতাবেক একটা বই হাতে রেখেছি, অফিসার ব্যাগ হাতড়ে বললো, বিশ টাকা দেন। আমি বললাম, স্যার আমি একজন লেখক। আমি আপনাকে আমার লেখা একটা গল্পের বই দিচ্ছি। বলেই বইটা তার দিকে এগিয়ে দিলাম। জীবন পেছন থেকে আমার পিঠে একটা খোঁচা মারছে।
অফিসার বইটা নেড়ে চেড়ে বললো, ঠিক আছে বইও দেন টাকাও দেন। ইমিগ্রেশন পার হয়ে একটু সামনে হেঁটে গেলাম। জীবন বললো, আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি জানিস? এটা হচ্ছে নো ম্যানস্ ল্যান্ড। মানে এই জায়গাটার মালিক বাংলাদেশ ইন্ডিয়া দুই দেশই। এখনই আমরা হরিদাসপুর ইমিগ্রেশন এ ঢুকবো। ভারতের সীমানায় ঢুকে আবার একই ঝামেলা, আমাকে তেমন কিছু করতে হচ্ছে না। জীবনই কোত্থেকে একটা ফরম এনে বললো, এটা ফিল আপ কর। ভারতের ইমিগ্রেশন অফিসার যখন কথায় কথায় জানতে পারলো আমি লেখক, সে মনে হয় খানিকটা খুশি হলো। বললো, আমাদের নিয়ে কিছু লিখবেন।

জীবন সাথে থাকায় আমার জীবনটা অনেক সহজ হয়ে গেলো। কোথায় কিভাবে যাবো সেটা কাউকে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে না ও সব জানে। আমাদের দুজনেরই যেহেতু টাকা পয়সা সীমিত, আমরা হরিদাসপুর বর্ডার থেকে বনগাঁও যাবো, সেখান থেকে ট্রেনে শেয়ালদা। বনগাঁও যেতে আমরা দুজন একটা লোকাল বাসে উঠে পড়লাম বাসে প্রচন্ড ভীড়। সিট পাওয়া তো দুরের কথা, দাঁড়ানোরই জায়গা হয় না। তারওপর আমাদের দুজনের হাতে দুটো ট্রাভেল ব্যাগ, ভাড়া দিলো জীবনই। ভাড়া কত ছিলো ঠিক মনে নেই কিন্তু আমরা চল্লিশ পয়সা ফেরত পাবো। সেটা আমরা কেন ফেরত চাচ্ছিনা দেখে কন্ডাকটর বললো, বাংলাদেশের মানুষ এত বড়লোক নাকি রে বাবা চল্লিশ পয়সাকে কিছুই মনে করছে না। বাসের রড ধরে দুজন দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছ, দৃশ্যটা উপভোগ করার মতো পরিস্থিতি আমাদের নেই। বনগাও রেল স্টেশনে এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হলো। এদিকে দুজনই প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। এক আন্ডেওয়ালার কাছ থেকে দুজন দুটো ডিম কিনে খেলাম। প্রায় এক ঘন্টা অপেক্ষা করার শেয়ালদার ট্রেন এলো।
শেয়ালদা পৌছতে আমাদের বিকেল হয়ে গেলো। এতদিন শুধু শেয়ালদা স্টেশনের নাম বইতে পড়েছি। আমি অবাক হয়ে জীবনকে বললাম, দোস্ত এখানে যত মানুষ, কমলাপুর স্টেশনে তার অর্ধেক মানুষও পাবি না। আরও অবাক হলাম যখন দেখছি সবাই হিন্দিতে কথা বলে। কোলকাতার ভাষা বাংলা তাহলে বেশির ভাগ মানুষ হিন্দি কেন বলে সেটা মাথায় আসছিলো না। সুনীল সমরেশ শীর্ষেন্দুর বই তাহলে এখানে কারা পড়ে! জীবন বললো, পাশে দোকান আছে কিছু খাবি? আমার কিছুই খেতে ইচ্ছে করছিলো না। জীবনের বোনের বাড়িতে গিয়ে নিঃশ্বাস ফেলার আগে আমি কিছুই খাবো না। আমি বললাম, জীবন আর কতক্ষণ লাগবে? ও জবাব দিলো আমাদের এখন আরেকটা ট্রেনে উঠতে হবে। সেই ট্রেনে আমরা রানাঘাট নামবো। রানাঘাট থেকে রিকশায় আমার বোনের বাড়ি পনেরো মিনিটের পথ।রানাঘাটের ট্রেনে উঠতে আমাদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হলো। মনে হচ্ছিলো কোলকাতার সব লোক এই ট্রেনে এসে উঠেছে। দরোজা দিয়ে যত লোক উঠছে জানালা দিয়ে তারচেয়ে বেশি। ব্যাগ দুটো সামলে আমরা দুজন কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছি। দুটো স্টেশন পার হবার পর ভিড় কমতে শুরু করলো। প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা রানাঘাট স্টেশনে এসে নামলাম। জীবনের বোনের বাড়ি নতুন গ্রামে। স্টেশন থেকে বের হয়ে রেল লাইন ক্রস করতে হয়। তারপর কাচা রাস্তায় রিকশায় প্রায় পনেরো মিনিটের পথ। আমাকে আগে থেকেই সব শিখিয়ে দিয়েছিলো জীবন। শুধু ওর বোনের বাড়ি ছাড়া আর সব জায়গাতেই আমার পরিচয় আমি হিন্দু। ও আমার নাম দিলো স্বপন। স্বপন দেবনাথ। আমি বললাম, হিন্দু পরিচয় না দিলে সমস্যা কি? জীবন বললো, সমস্যা আছে, কিছু কিছু হিন্দু পরিবার আছে আমার আত্মীয় সজন ওরা যদি জানে তুই মুসলমান তাহলে তারা তোকে ঘরে ঢুকতে দেবে না। নিজেকে স্বপন দেবনাথ ভেবে নিয়েই আমরা রিকশায় উঠলাম। আর ঠিক পথেই জীবনের এক পূর্ব পরিচিতের সাথে দেখা। সে আমাদের রিকশা থামিয়ে প্রায় দশ মিনিট আটকে রাখলো। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো স্বপন দেবনাথ হিসেবে। কিন্তু তার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় একটা বিরাট ভুল করে বসলাম। লোকটার সাথে হ্যান্ডশেক করে বললাম, ঠিক আছে দাদা, আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। ইনশাআল্লাহ শব্দটা অভ্যাসবশতই মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে। সাথে সাথে জীবন আমার পায়ে পাড়া দিলো। লোকটা খানিকটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাতেই জীবন বললো, আসলে বাংলাদেশে আমাদের মুসলমানদের সাথে এত বেশি চলাফেরা করতে হয় যে ওদের কালচার আমাদের কালচার এক হয়ে গেছে। বোনের মমতা কী জিনিস যার বোন নেই সে কোনোদিনই বুঝতে পারবে না। আমাদেরকে রিকশায় দেখেই জীবনের বোন দৌড়ে এলো। এসে ওকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেললো যে আমার নিজেরই কান্না পেয়ে গেলো। সাদাসিদে ফরসা আর মায়াভরা এক ত্রিশোধ মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ইনি শুধু জীবনেরই দিদি না আমারও দিদি। আমার দিকে তাকিয়ে সে বললো, তোমার নাম কি ভাই?
আমি আবার ভুলে স্বপন দেবনাথ বলতে গিয়েছিলাম, সাথে সাথে জীবন আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো, ওর নাম আশরাফ, আমার বন্ধু। আমরা একসাথে পড়েছি, ও ভালো বই লেখে। দিদি খুশি হয়ে বললো, তোমার বইয়ের গল্প শুনবো। তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে এখন দুইজনে মুখ হাত ধুয়ে কিছু খেয়ে নে। বাড়ির ভেতরে ঢুকছি ঠিক তখনই একজন আলাভোলা টাইপের মানুষ একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো, কি শালাবাবু, তোমার না আগেই আসার কথা ছিলো। বুঝতে পারলাম ইনি জীবনের সেই জামাইবাবু। জামাইবাবুর শাটের বোতাম অর্ধেক খোলা। লুঙ্গির গিঁট মনে হচ্ছে বুকের কাছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আরো দুজন মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো জীবন- ইনি হচ্ছে আমার মাসি মা, জামাইবাবুর মা আর ইনি আমার মেসোমশাই। বয়স্ক এই দুজন নারী পুরুষের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম তারাও অত্যন্ত সাদাসিদে এবং ভালো মনের মানুষ। মাসিমার প্রথম কথাই ছিলো- জীবন যেমন আমাদের ছেলে যে কয়দিন এখানে থাকবে তুমিও আমাদের ছেলে হয়ে থাকবে। আর এই যে দেখছো বকুল ফুলের গাছটা। আজ প্রথম দিনই তোমাদের জন্য বকুল ফুল ভাজবো। যদি খেয়ে ভালো লাগে তাহলে প্রতিদিন...। আমি দেখলাম উঠানে একটা বড় গাছ, গাছে বড় বড় সাদা ফুল ফুটে আছে। বকুল ফুল ভাজা খেতে হবে এটা ভাবতেও যেন একটু কেমন লাগছিলো কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না। আমরা দুজনই গোসল সেরে ফেললাম। চাপ কলের ঠান্ডা পানিতে শরীর শিরশিরিয়ে উঠলো। সারাদিনের জার্নির ধকল কাটাতে এটার কোনো বিকল্প ছিলো না। রান্নাঘর ছাড়া এ বাড়িতে দুটো ঘর, পাকা ঘরটাতে দুটো কামড়া। তার একটাতে আমার আর জীবনের থাকার বন্দোবস্ত হলো। দুজনের জন্য একটা লেপ।
সেদিন আমরা আর কোথাও বের হলাম না। সন্ধ্যার দিকে সাদাসিদে জামাইবাবুর সাথে গ্রামের রাস্তায় হাটতে বের হলাম। কাছেই একটা আশ্রমের মতো ছিলো। সেখানে গিয়ে আমরা তিনজন একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। জামাইবাবু হাতের ইশারায় যেটা জিজ্ঞেস করলো তার অর্থ মদ খাবার অভ্যাস আছে কি না। থাকলে সে ব্যবস্থা করবে। অভ্যাস আমার নেই, কখনো ছিলো না। কিন্তু জীবন আমার পায়ে পাড়া দিয়ে যেটা বলতে বললো তার অর্থ আমি যেন হ্যাঁ বলি। তাহলে ওর সুবিধা হয়।পরদিন আমরা কোলকাতা দেখতে বের হবো। জামাইবাবু কাজে চলে গেলো। একটা বিড়ির ফ্যাক্টরির সাথে তার কাজ। আমি আর জীবন আবার রানা ঘাটে এসে কোলকাতার ট্রেন ধরলাম। প্রথম দিনে আমাদের দেখার লিস্টে ছিলো ভিক্টোরিয়া পার্ক, তারা মন্ডল আর ময়দান। আর বিকেলের দিকে আমরা যাবো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাসায়। আমি আমার একটা বই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করেছিলাম। তিনি তাতে অনেক খুশি হয়ে আমাকে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন তিনি ফরিদপুরে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতে চান। তার নিজের জন্ম ফরিদপুরে এবং সেখানে তার পূর্ব পুরুষের বাড়ি হওয়ায় আমার সাথে তিনি আত্মীয়তা বোধ করেছেন। ভিক্টোরিয়া দেখার পর আমরা দ্রৃত চলে গেলাম তারা মন্ডল দেখতে। এটা আমার কাছে অদ্বুত একটা জিনিস মনে হলো। ভেতরে ঢুকে অন্ধকার ঘরটায় মাথার ওপর দিকে সিনেমার মতো পর্দা। আকাশের কোথায় কোন তারা আছে, কোন নক্ষত্রের কি ইতিহাস এক ঘন্টায় সব জেনে ফেললাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাসা ছিলো গড়িয়াহাটে। আমি আর জীবন খুঁজে খুঁজে সেখানে পৌছতে বিকেল পার হয়ে গেলো। বাসার বাইরের গেটের সিকিউরিটি আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে ইন্টারকমে ফোন দিলো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিললো আমাদের। কয়তলায় কিভাবে যেতে হবে গার্ড আমাদেও বুঝিয়ে দিলো। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে দেখা হবে, ছরি তুলতে পারবে এটা ভেবে জীবনও বেশ উত্তেজিত। লেখায়, চিঠিতে সুনীলকে যতটা প্রাণখোলা পাই, বাস্তবে আমাদের দুজনের কারো কাছেই সেটা মনে হলো না। মনে হলো একটা রোবটের সাথে আমরা বসে আছি। আমরা কিছু জিজ্ঞেস করলে রোবট নীরস গলায় জবাব দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আমাদের জন্য নাস্তা এলো। দুটো পিরিচে গোলাকৃতির কিছু একটা, সাথে চামচ। প্রথমে ভেবেছিলাম লাড্ডু টাইপ কিছু হবে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, তোমরা খাও আমি একটু আসছি। তিনি ভেতরে চলে যাবার পর জীবন বণলো, দোস্ত এটা এত শক্ত কেন? জিনিসটা কি? চামচ দিয়ে এত শক্ত জিনিস কিভাবে খায়?
খাদ্যবস্তুটা আমাদের দুজনের কাছেই অপিরিচিত। যাইহোক উনি ভেতর থেকে ফিরে আসার আগেই একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমি দেখি জীবন মুখে নিয়ে কামড়ে ভাঙার চেষ্টা করছে। আমিও চেষ্টা করলাম, তখনই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ফিরে এলেন।

আমাদের ভারত ভ্রমণ কোলকাতা এবং আশেপাশেই সীমাবদ্ধ রইলো। একবার জীবনকে বললাম, চল দিল্লি টিল্লির দিকে যাই। ও বললো, ব্যাটা পঞ্চাশ ডলার নিয়া ভারতে আইছোস, আবার দিল্লী যাবি!
প্রতিদিন সকালে গোসল নাস্তা সেরে আমরা দুজন রানাঘাট স্টেশনে চলে যাই। তারপর সেখান থেকে কোলকাতা। কোলকাতা শহরের কোথায় কি আছে জীবনের জানা। হাওড়া ব্রিজ দেখে যতটা উৎফুল্ল হবো ভেবেছিলাম ততোটা হতে পারিনি। মনে হয়েছে এটা ছবিতেই বেশি সুন্দর। তবে হাওড়া রেল স্টেশনে আসার পর যেন আকাশ থেকে পড়লাম। জীবন বললো, দেখছিস, শালা আমরা এতোদিন পড়ে আসছি কমলাপুর স্টেশন যেমন বড়ো তেমন সুন্দর। এবার বল হাওড়া স্টেশন তাহলে কি? জবাব আমার কাছে ছিলো না কারণ আমি নিজেও অবাক হবার বোধ হারিয়ে ফেলেছিলাম। রেল স্টেশন এত বড় হয় কী করে! এখান থেকে নাকি ভারতের সব জায়গায় ট্রেনে যাওয়া যায়।

সপ্তাহ খানেক পর ভুলেই ছিলাম যে আমার একটা হিন্দু নাম আছে। জীবন একদিন বললো, শোন কাল আমরা আমার এক পিসির বাড়িতে যাবো কোলকাতায়। ওখানে কিন্তু তুই অবশ্যই বলবি তোর নাম স্বপন। নাইলে আমার পিসি তোকে ভেতরে ঢুকতে দিবে না। আমি ভাব সম্প্রসারণ মুখস্থ করার মতো বলতে লাগলাম, মাই নেম ইজ স্বপন, মাই নেম ইজ স্বপন। জীবনের পিসির বাড়িতে গিয়ে আমি আর কোনো ভুল করিনি। আমি শুধু ওকে বললাম, দেখিস দোস্ত, আমাকে যেন কাছিম-টাছিম না খাইয়ে দেয়। জীবন আমাকে আশ্বস্ত করে বললো, ওটা আমি দেখবো তুই চিন্তা করিস না। জীবনের পিসি জীবনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। সেই কান্না আর সহজে থামে না। তার পিসির পরিবার বাংলাদেশ থেকে কোলকাতায় চলে এসেছে উনিশ বছর আগে। এই উনিশ বছরে আর একবারও সে বাংলাদেশে যেতে পারেনি। তার ভাই বোন যারা বাংলাদেশে রয়ে গেছে কারো সাথেই তার আর দেখা হয়নি। জীবনের এই পিসির কান্না আর নিজের জন্মভূমির প্রতি প্রবল আকুতি আমাকে খুব স্পর্শ করেছিলো। আমি এখনো সেই দৃশ্য ভুলতে পারিনি।জীবনের পিসতুতো বোন অঞ্জলি। বয়সে আমাদের চেয়ে বেশ ছোটো, সদ্য কিশোরী। জীবনকে দেখে সে অনেক খুশি। দাদা দাদা বলে অস্থির। পরদিন ওই আমাদেরকে সাথে নিয়ে গেলো জগদ্বন্ধু ক্লাবের মাঠে। আশপাশ ঘুরিয়ে দেখালো। সারাক্ষণ সে জীবনকে ঘেঁষে থাকে। খুব গলাগলি ভাব হয়ে গেলো ওর সাথে। তারপর কী হলো কে জানে, হঠাৎ দেখি মেয়েটা জীবনের আর কাছে আসে না। জীবনের বোনের নাম কল্পনা। আমাকে প্রথম দিন থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছিলো যে তার কাছে আমার আর জীবনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। জামাইবাবুর সরলতা আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। তার দেশত্যাগের গল্প শুনে আমার নিজের খুব খারাপ লেগেছিলো। মাগুরা থেকে সপরিবারে, একরকম বাধ্য হয়েই তারা ভারতে চলে আসে বেশ কয়েক বছর আগে। এখানে এসে জীবনকে নতুন করে সাজানোর চ্যালেঞ্জ গুলোকে সে এবং তার বাবা কিভাবে পার করেছে সেই গল্প শুনতে শুনতে আমি যেন বাংলাদেশে তাদের অতীতটাকে দেখতে পাই।

জীবনে প্রথমবার বিদেশে এসেছি। যতটা সময় পাই জীবনকে নিয়ে কোলকাতার দিকে বেরিয়ে পড়ি। আমি নরমাল প্যান্ট শার্টে থাকলেও জীবন স্যুট টাই পরে বাবু সেজে বের হয়। পুরো কোলকাতায় একদিন আমরা একটা লোককেও স্যুট টাইয়ে দেখিনি। ব্যাপারটা জীবন খেয়াল করে বললো, কাল থেকে আর স্যুট পরবো না। শালার এখানে কেউ স্যুট পরে না। সেই দিন বিকেল বেলা নিউমার্কেটের সামনে স্যুট পরা এক ভদ্রলোককে দেখে জীবন খুশি হলো। অন্তত কোলকাতার একজনকে পাওয়া গেছে। এক আশ্চর্য কৌতূহলে আমি জিজ্ঞেস করলে সে বললো সে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া থেকে এসেছে।
দেখতে দেখতে দু-সপ্তাহ পার হয়ে গেলো। এর মধ্যে কোলকাতার দর্শনীয় যা ছিলো মোটামুটি দেখা হয়ে গেছে। নিউমার্কেট লিন্ডসে স্ট্রিট, আলীপুর চিড়িয়াখানা, জাকারিয়া স্ট্রিটে অনেক বাংলাদেশের মানুষের সাথে পরিচয় হলো। বেশিরভাগই গেছে ব্যবসার কাজে, কিউ চিকিৎসার জন্য। তখন শীতকাল থাকায় আমরা ইচ্ছে মতো কমলা আর আঙুর খেয়েছিলাম। বড় বড় কমলা পাওয়া যেতো চার টাকা হালি, বাংলাদেশে তার দাম বিশ টাকা। জীবন এক হালি কমলা একসাথে ছিলে বলতো, যা পারিস খেয়ে নে। বাংলাদেশে গিয়ে খেতে পারবি না।

দেখতে দেখতে আঠারো দিন পার হয়ে গেলো। আর একদিন পরেই আমাদের ফিরে যাবার পালা। এই অল্পদিনেই খুব আপন হয়ে গিয়েছিলো জীবনের বোনের পরিবার। ওদেরকে ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। মাসীমা যাকে ডাকতাম, সে তো প্রায় কেঁদেই ফেলে। আমি কথা দিয়েছিলাম এক বছরের মধ্যে আবার আসবো। কল্পনা দিদি সময় পেলেই আমার সাথে গল্প করতো। তার বাবা-মাকে না দেখার কষ্টের কথা বলতো। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, জীবনের প্রয়োজনে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস করলেও তাদের মন পড়ে আছে বাংলাদেশের এক গ্রামে। ফেরার দিন দিদি আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললো, তুই এই টাকাটার কথা জীবনকে কিছু বলবি না। দেশে গিয়ে একটা ফ্যান কিনে জীবনের হাতে দিবি। এটা আমার বাবার জন্য। দূর দেশে বসে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের এই ভালোবাসা, তার মূল্য অসীম। ফ্যানের দাম তো সামান্য, কিন্তু তার ভালোবাসার মূল্য অনেক।

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71