শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭
শনিবার, ১১ই চৈত্র ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
অস্তিত্ব রক্ষার পথ খুঁজছেন তাঁতীবাজারের হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা
প্রকাশ: ০৩:৪১ am ১১-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৩:৪১ am ১১-০১-২০১৭
 
 
 


ঢাকা::  কোটি টাকায় কেনা নিজের দোকান উৎপল মণ্ডলের। সেই দোকানে স্বর্ণ বন্ধকির কারবার করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। দোকানের নাম 'কণিকা গোল্ড হাউজ'। তবে উৎপল জানালেন, অচিরেই হয়তো কণিকা গোল্ড হাউজ হয়ে যাবে কণিকা গার্মেন্টস। তার সঙ্গে আলাপে জানা গেল, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণ এক বছরের জন্য বন্ধক রাখলে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে থাকেন তারা। এ জন্য ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা সুদ আদায় করা হয়। ভালো-মন্দ মিলে চলছিল কারবার। তবে গত চার বছর আগে শুরু হওয়া মন্দা যেন কাটছেই না। নগদ টাকায় কেনা দোকানটা তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাই ব্যবসার ধরন পরিবর্তনের জন্যই গার্মেন্টস করার পরিকল্পনা করেছেন।

অস্তিত্ব রক্ষার্থে নতুন পথ খুঁজলেও স্বর্ণব্যবসায়ীদের সবাই ব্যবসার ধরনে এমন পরিবর্তন আনতে পারছেন না। কারণ পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের স্বর্ণের ব্যবসা মূলত ছোট ছোট খুপরিনির্ভর। এমন তিন ফুট বাই চার ফুটের এক ছোট্ট খুপরিতে আলাপ হলো স্বর্ণের কারিগর মিঠু সরকারের সঙ্গে। প্রমাণ সাইজের একটি সিন্দুুক আর ক্ষুদ্রাকৃতির একটা দাঁড়িপাল্লা রাখার পর খুব একটা জায়গা নেই ঘরে। কুঁকড়েমুকড়ে সে

ঘরেই বসে আছেন মিঠু সরকার। ধ্যানী বকের মতো নিশ্চুপ তিনি। কথা বলতে চাইলে কতক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকলেন। লম্বা হাই তুলে গোঙানির মতো একটা শব্দ তুলে বসতে বললেন। তাঁতীবাজারের স্বর্ণের কারিগর মিঠু সরকার জানালেন, স্বর্ণের কারবারে সব সময় কাজ থাকে না। তাই বলে পনেরো দিন ধরে কাজ না পেলে কাঁহাতক ভালো থাকা যায়।

কেন কাজ নেই, কতদিন ধরে এ খরা? মিঠু সরকার জানালেন, 'সোজা কথা হচ্ছে ভেজাল নাই তাই ব্যবসাও নাই। ব্যাস।' ব্যাখ্যায় তিনি জানান, আগে গহনায় পরিমাণে বেশি খাদ (ভেজাল) দেওয়া যেত। ক্রেতারা তখন অর্ধেকও খাঁটি সোনা পেত না। স্বর্ণের কারবারে মূল মুনাফাটা ছিল ওখানেই। তাতে ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু স্বর্ণের খাদ এবং মান নির্ণয়ের যন্ত্র 'বাংলা গোল্ড' বাজারে চলে আসায় ব্যবসা উঠেছে লাটে। এখন সামান্য ফির বিনিময়ে যে কোনো ক্রেতা এ মেশিনের মাধ্যমে স্বর্ণে কী পরিমাণ খাদ আছে কিংবা কত ক্যারেট মানের স্বর্ণ কিনছেন তা সহজেই জেনে নিতে পারেন। ফলে অলঙ্কার তৈরিতে প্রয়োজনীয় দুই আনার বেশি খাদ দেওয়ার সুযোগ এখন আর নেই। এ কারণে ভালো নেই এ শিল্পের মালিক, কর্মচারী কেউই। মিঠু সরকার বলেন, ১৫ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে স্বর্ণের কারিগরির কাজে এসেছেন তিনি। এখন বয়স বায়ান্ন। স্বর্ণের কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ শেখেননি। এ কারণে প্রয়োজন হলেও পেশাটা বদল করা সম্ভব হচ্ছে না।

দোকানি, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায় মন্দার অন্য একটি কারণের মধ্যে রয়েছে চোরাচালান। শুল্ক ফাঁকি দেওয়া স্বর্ণের কাছে মার খাচ্ছে দেশি স্বর্ণের ব্যবসা এবং উদ্যেক্তারা। মাঝে মধ্যে বিমানবন্দরে বিশাল পরিমাণে চোরাচালানের স্বর্ণ ধরা পড়ার ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় কী পরিমাণ অবৈধ স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আসতে একজন যাত্রী ৯ ভরি পর্যন্ত স্বর্ণ বিনা শুল্কে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন। ফলে দেশি স্বর্ণের বাজারে ক্রেতা চাহিদা কমছে। গোল্ডপ্লেটেড ইমিটেশনের ব্যবহার বৃদ্ধি ও উৎপাদনে উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ওঠা-নামার কারণেও স্বর্ণের কারবারে মন্দা চলছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদা এখন কম। বলতে গেলে মোট ব্যবহারের মাত্র ১০ শতাংশ স্বর্ণের বিকিকিনি চলে দেশে। কারণ, বিদেশ থেকে আসার সময় অনেকেই স্বর্ণ নিয়ে আসেন। দেশে ১০ শতাংশ সোনা শৌখিন ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। ৯০ শতাংশ সোনা সঞ্চয় করেন নারীরা বিনিয়োগ হিসেবে। শৌখিন সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার কমে যাওয়ায় যে তাঁতীবাজারে একসময় ৩০ হাজার শ্রমিকের ছোট হাতুড়ির ঠুকঠুক শব্দে ঝঙ্কার উঠত, তা শোনা যায় না। এখন মাত্র পাঁচ হাজারের মতো শ্রমিক কাজ করছেন এই বাজারে। এসব শ্রমিকের অনেকেই ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। সেখানে তারা ভালো আছেন বলেই দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে জানা গেল। কারণ, সারাবিশ্বের স্বর্ণের বাজারে ভারত এখন বড় ফ্যাক্টর।

তাঁতীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পবিত্র চন্দ্র ঘোষ বলেন, উলি্লখিত এসব কারণে সৃষ্টি হওয়া সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে স্বর্ণের একটি জাতীয় নীতিমালা। যাতে দেশের স্বার্থে আদি এই শিল্প খাতকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর মাধ্যমে সরকারের কাছে দেনদরবার করছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে । বাণিজ্য, শিল্প অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের কেবল আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সরকারের কাছে একটি জুতসই নীতিমালা পেলে মান এবং নকশার কারুকাজে বিদেশি গহনার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন তারা। কর্মসংস্থান হতে পারে লাখ লাখ মানুষের। অথচ পুরনো ঢাকার স্বর্ণের কারবারে দুর্দিনের কারণে এখন সব কারবারিই কর্মচারী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

পুরান ঢাকার পানিটোলা, কোতোয়ালি রোড, ঝুলনবাড়ি ও তাঁতীবাজার, কুমারটুলী, লালমিয়া মার্কেট, ইসলামপুর রোডসহ অন্তত সাতটি এলাকায় চলে স্বর্ণের কারবার। স্বর্ণের গহনা তৈরির কারখানা, গহনার দোকান ও গহনা বন্ধক রেখে টাকা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা_ এ তিন ধরনের ব্যবসা চলে এসব জায়গায়। সব ধরনের দোকানের সংখ্যা কম-বেশি এক হাজার। চাহিদামতো সারাদেশে স্বর্ণের অলঙ্কার সরবরাহ করা হয় পুরান ঢাকা থেকে। স্থানীয়ভাবে তৈরি স্বর্ণের দুর্দিনের কারণে স্বর্ণের সব ধরনের ব্যবসায় মন্দা চলছে এখন। এ কারণে এসব এলাকায় স্বর্ণের দোকানের পাশাপাশি এখন অন্যান্য সাধারণ পণ্যের পসরাও গড়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন না হলে স্বর্ণের কারবারের মতো একটি আদি খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সভাপতি গঙ্গাচরণ মালাকার বলেন, মেশিনে পরীক্ষা চালু হওয়ার ফলে শুরু হওয়া আপাত মন্দা ভবিষ্যতের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসবে। স্বর্ণে এখন আর কোনো ভেজাল নেই। কেউ এখন ভেজাল প্রমাণ করতে পারলে বাজুস তাকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেবে। বাজুসের এই নেতা জানান, খাদ নির্ণয়ের মেশিন আনার কারণে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। তবে ভেজাল ব্যবসায়ীরা স্বর্ণ ব্যবসা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন, এটাকে তিনি ব্যবসার আপাত ক্ষতি বলে আখ্যায়িত করেন।

গঙ্গাচরণ মালাকার অবশ্য এই ব্যবসার অন্য কিছু সমস্যার দিকে আলোকপাত করে বলেন, স্বর্ণ আমদানিতে ভরিতে তিন হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। বিক্রিতে ভ্যাট দিতে হয় পাঁচ শতাংশ। মজুরিতে শ্রমিককে দিতে হয় দুই আনা পরিমাণ প্রায় সাত হাজার টাকা। অন্যান্য ব্যয় তো আছেই। ফলে শেষ পর্যন্ত আর মুনাফার পাল্লায় তেমন কিছু থাকে না। অন্যসব পণ্যে মুনাফা কমপক্ষে ১০ শতাংশ, অথচ স্বর্ণ ব্যবসায় পাঁচ থেকে ছয় শতাংশের বেশি মুনাফা টেকানোই দায়। স্বর্ণ ব্যবসাকে বাঁচাতে সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাজুস সভাপতি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে একটি স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন দরকার। স্বর্ণ ব্যাংক গঠন করতে হবে যার মাধ্যমে সরকার থেকে ব্যবসায়ীরা ন্যয্য মূল্যে স্বর্ণ সংগ্রহ করতে পারবেন। ভ্যাট ও ট্যাক্সে যুক্তিসঙ্গত হার নির্ধারণও বিশেষ প্রয়োজন। 

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71